সবার রবীন্দ্রনাথ

মনিরুজ্জামান
রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে যাঁরা ভাবেন বা যাঁরা 'বিশ্বকবি'র বই পড়ে আনন্দ পান, তাঁরা সমাজের কোন শ্রেণীর? এ নিয়ে ভাবতে বসলে সমাজের একটা চিত্র এবং সংস্কৃতির চেহারাটা ধীরে ধীরে চোখে ফুটে ওঠে৷ আমরা বলি রবীন্দ্রনাথ সবার, অর্থাত্‍ সব শিক্ষিতজনই রবীন্দ্রনাথকে জানেন, কমবেশী গ্রহণও করেন (হয়ত নিরক্ষর জনরাও অনেকে জানেন), কিন্তু জাতীয় সঙ্গীতের কবিকে জাতীয়ভাবে জানা ও স্বীকৃতির পৈঠায় তুলে আনার ব্যাপারটা সবার মধ্যে কি সমান? বিষয়টা গভীরদৃষ্টিতে ও আমাদের সাংস্কৃতিক সঙ্কটের আলোকে বিচারের দাবী রাখে৷
রবীন্দ্রনাথ বড় মাপের কবি বা লেখক জেনেও এক শ্রেণীর মানুষ আছেন যাঁরা কবির কোনও গ্রন্থ সংগ্রহ ও পাঠে আগ্রহী বা মনোযোগী হন না৷ তবে এঁরা ভক্তশ্রেণী, সন্দেহ নেই৷ এঁদেরই অনেকের পুঁজি 'আমাদের ছোট নদী' কিংবা 'তালগাছ' পর্যন্ত৷ সাহিত্যের কোন গভীরে রবীন্দ্রনাথ পৌঁছেছেন সে-সংবাদে তাঁদের প্রয়োজন নেই৷ সে-কথা বোঝার ক্ষমতাও তাঁদের নেই৷ থাকলেও তা তাঁরা কাজে লাগান না৷ তথাপি এঁরাই বুক ফুলিয়ে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে গর্ব করতে, বড় কবি বলে আনন্দ প্রকাশ করতে ভালবাসেন এবং এক্ষেত্রে এঁদের জুড়ি নেই৷ এঁরা সমাজে একদম চূড়া থেকে (রাজনীতি এবং ব্যবসায়) মায় থ্রি পাশ পর্যন্ত৷ সুতরাং জনসংখ্যার মাপেও সংখ্যাগরিষ্ঠজন৷ এতে অবাক হবার কিছু নেই৷
এর ভেতরে এবং হয়ত কিছুটা এর বাইরে এসেও আবার প্রশ্ন হতে পারে, রবীন্দ্রনাথকে কারা বেশী ভালবাসেন? যাঁরা নজরুলভক্ত, না কি বিপরীতজনের বিশুদ্ধ কোনও দল? (অবশ্য নজরুলের বই-পড়ুয়া নজরুলভক্ত কতজন, বোঝা মুসকিল৷)
মোট কথা দায় না পড়লে কেউ পাঠক হন কি? যারা টীকাভাষ্য রচনা করেন, খুঁটিনাটি সবকিছুকে মূল্যবান করে তোলেন, তাঁদেরও একরকম দায় থাকে বৈ কি৷ শেক্সপীয়রের আমলে লোকে মঞ্চে বসেই তাঁর নাটক দেখতো, বই পড়তো না৷ যারা শর্টহ্যান্ড জানতো তাদের ভাড়া করে এনে বইব্যবসায়ীরা অভিনয় চলাকালে চরিত্রের মুখ থেকে কথা (সংলাপ) লিখিয়ে নিত, গোপনে বই ছাপার জন্য৷ তাতে ভুলভ্রান্তি থাকতো এবং ব্যবসায়গত নানা বিপদের ঝুঁকিকেও সামলাতে হতো ব্যবসায়ীদের৷ শেক্সপীয়র ছাপা বইকে অমর্যাদাকর মনে করতেন, কারণ সত্‍ পাঠকেরা কষ্ট করে পাণ্ডুলিপি নকল করাতেন ও তার মর্যাদা দিতেন তখনকার দিনে৷ সম্ভ্রান্ত হওয়ার দায়ে শুধু তাঁরাই পাণ্ডুলিপিচর্চায় মনোযোগী হতেন বা অর্থব্যয় করতেন৷ বইপড়ার সংস্কৃতিটা অপেক্ষাকৃত নতুন এবং হালে আবার পুরনো হয়ে পড়ছে৷
সাধারণ পাঠক ঘড়ির দোলকের মতো৷ একবার ডাইনে তো একবার বাঁয়ে৷ একবার পূবে তো একবার পশ্চিমে৷ এই তাদের হেলন-দোলন স্বভাব৷ আজ অনেকেই বলতে শুরু করেছেন, রবীন্দ্রসূর্য এখন অস্তগামী৷ তবে সমস্যা, অনেকেই আবার তা গোপন করেন সামাজিক অবস্থান হারাবার ভয়ে৷ যারা রবীন্দ্রবিরোধী, তাঁরা সমাজে ব্রাত্য৷ কিন্তু যাঁরা অর্ধগোপন বা যাঁদের গুপ্তই বলা যায়, তাঁরা গোপনে বা অর্ধপ্রকাশ্যে যেভাবেই রবীন্দ্র-সমালোচনা করুন, তাঁরা লক্ষ্য করলেই দেখতে পেতেন রবীন্দ্র-বিরোধীদের সাথে তাঁদের স্পষ্টই পার্থক্যও আছে৷ রবীন্দ্রবিরোধিতা এখন একটা রাজনৈতিক প্রথামাত্র এবং তাদের অনেকেই একটা বাড়াবাড়ির সীমানায় অবস্থান নেন কিংবা উস্কানীমূলক ও সামপ্রদায়িক আলোচনার আশ্রয়ী হয়ে ওঠেন৷ 'সাহিত্যিক সন্ত্রাস' বলে কিছু আছে কিনা জানি না, হয়ত এর মাঝে তার স্বরূপ পাওয়া যাবে৷
এ সবকে আমি বলি সময়ের সৃষ্টি৷ মার্কসবাদী আলোচনাও যেমন এক সময় তুঙ্গে ছিল, 'মৌলবাদী' আলোচনাও তেমনি চূড়াস্পশর্ী৷ সময়-ঘড়ির পেন্ডুলামের এই দ্বি-সীমান্তবর্তিক চলাচল প্রবণতাকেই বলে কালের রথযাত্রা৷
আমাদের কৈশোরে সুকান্ত সেই কালটাকে ধরে নাড়া দিয়েছিলেন৷ এটাকে কি বলা যাবে? শুধুই ব্যতিক্রমী? এর পশ্চাতে কি কালের ভূমিকা কিছুই ছিল না? সে সময় একটা ঘটনার কথা মনে পড়ে৷ এটা আমার কৈশোরিক বিভ্রম বা আসক্তিও বটে৷ কলেজে পড়াকালে আমি একটা বিদেশী কসমোপলিটান হোস্টেলে থাকতাম, যেখানে সব কলেজের ছাত্ররাই থাকতে পারতো৷ সেখানেই পরিচয় হয় পরবতর্ীকালের অর্থনীতিবিদ আজিজুর রহমান খানের সাথে৷ তাকে দেখেই চিনতে পেরেছিলাম৷ ম্যাট্রিক পরীক্ষার পরে ময়মনসিংহে বেড়াতে গিয়ে টাউন হলে তাকে রবীন্দ্রনাথের ওপর বক্তৃতা করতে দেখেছিলাম৷ এ সেই ছেলে৷ 'বালকের মুখে রবীন্দ্র-আলোচনা'_এটা আমার কাছে অবিশ্বাস্যই মনে হচ্ছিল৷ কিন্তু তখন আমার কাছে মনে হচ্ছিল এই সেই সুকান্ত, যার 'আঠারো বছর বয়সের নেই ভয়'৷ তার সেই জনমুগ্ধকর আলোচনা উপবিষ্ট সকলের মতো সেদিন আমাকেও যে মুগ্ধ করেছিল, সে-কথা আজও ভুলতে পারি নি৷ এই উদাহরণের অর্থ এই যে, রবীন্দ্রনাথের সারকথাটি হৃদয়ঙ্গম করতে বয়স, বিদ্যা বা প্রশিক্ষণ নয়, বরং আগ্রহ এবং শ্রমই যথেষ্ট৷ আর সেটি যুগিয়ে দিতে কালেরও কার্পণ্য ঘটে না, শুধু নিতে হয় দু'টি হাত বাড়িয়ে৷
কিন্তু এর পরেও প্রশ্ন করা যায়৷ জন্ম-মৃতু্য সময়াধারের সেই রবীন্দ্র-বৈশাখে বা শ্রাবণে অধ্যাপক কিংবা সাহিত্যকমর্ীদের পাশে কোনও 'বালকের' উপস্থিতি এত গভীর হল কেন? আমি যে-সময়টার কথা বলছি তাহলে সে-সময়টা কেমন ছিল? আসলে তখন পঞ্চাশের দশক গড়াতে শুরু করে দু'এক পা এগিয়ে গেছে (১৯৫৩)৷ তখনকার দিনটা ছিল 'নতুন সাহিত্যে'র দিন এবং প্রগতি চেতনার কথা ছাত্রমহলে ছিল মুক্তির সনদস্বরূপ৷ সুকান্তর আঠারো তখন অগি্নবারুদ৷ ভাষা-আন্দোলন শুরু হয়ে গেছে, এবং চলছে, গাফফার চৌধুরীর, 'আমার ভায়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারী, আমি কি ভুলিতে পারি'৷ কণ্ঠে কণ্ঠে, ঢাকার বুদ্ধিচক্রে ও তরুণ সমাজে তখন অগত্যা'র শ্লেষ, সাংস্কৃতিক চত্বরে হাতে হাতে ঘুরছে দাঙ্গার পাঁচটি গল্প, পিঁজরা পোল, জুনু আপা ও অন্যান্য গল্প, সাবেক কাহিনী৷ লালসালুও এসে গেছে ততদিনে৷ সাহিত্যকমর্ীরা পথ পেয়ে গেছে চন্দ্রদ্বীপের উপাখ্যান, পথ জানা নেই, সামনে নতুন দিন, চরভাঙার নয়ান ঢুলি, জিবরাইলের ডানা এবং পরপর জেগে আছি, ধানকন্যা, মৃগনাভি-র মধ্যে; সৈয়দ শামসুল হক এসেছে তাস নিয়ে_একটু পরেই আসবে জহির রায়হানের সূর্যগ্রহণ৷ মাহেনও-মোহাম্মদীর ভ্রান্ত প্রচারের মুখে দাঁড়িয়ে এইসব গদ্যভাষার অমিতসম্ভব সৃষ্টি ও স্ফুলিঙ্গের পাশাপাশি সুকান্ত-নজরুল-রবীন্দ্র জয়ন্তীর প্রাতিস্বিক চর্চা চলতে থাকে৷ অন্যপ্রান্তে উত্তাল পল্টনের প্রতিদিনের রাজনৈতিক বিকেলসমূহ সে-সময় ভাষা-সাহিত্য সংস্কৃতির ক্ষেত্রে নতুন আন্দোলনের যে পটভূমি সৃষ্টি করছিল, নবযুগের ছাত্রমহলকে নিমেষেই যেন তা সচেতন ও আশাবাদী করে তুলেছিল৷
এইসব ঘটনা, প্রকাশনা ও কর্মোদ্যোগ কি নগরে কি মফস্বলে একদিকে যেমন ষাটের পূর্বপ্রস্তুতিস্বরূপ ছিল, তেমনি ছিল এক স্বতন্ত্র বিস্ফোরণের শক্তিস্বরূপও৷ এইরকম এক ঐতিহাসিক কালে রবীন্দ্রচেতনার একটা মান তৈরী হয়ে উঠেছিল৷ নবীন-প্রবীণ সবার কাছেই রবীন্দ্রনাথকে জানতে চাইত মানুষ৷ এভাবেই সেসময়ে শিহরণ এবং কালের ঢেউ এসে আপামর জনসাধারণকে স্পর্শ করেছিল সমানভাবে৷ মনে পড়ে আমি নিজেও সেই অল্পবয়সে গ্রামে বসেই '২৫শে বৈশাখ' শিরোনামে একটা প্রবন্ধ লিখেছিলাম৷ সম্ভবত এটাই ছিল আমার প্রথম সাহিত্যিক গদ্য৷ সময়কে আমি এভাবেই বুঝতে চেষ্টা করি৷
এখন সময়ের প্রেক্ষাপট বদলেছে৷ রবীন্দ্রচর্চার মান হয়েছে ভিন্ন৷ এখনও কি রবীন্দ্রনাথ সবার? না, আগেই বলেছি রবীন্দ্রবিরোধীদের রাজনৈতিক ও সামপ্রদায়িক অবস্থান গ্রহণের কথা৷ কিন্তু রবীন্দ্রনাথকে দেখার ভিন্নমাত্রা রচনার চেষ্টাও তবু চোখে পড়ে৷ যদিও সেটা এখন পর্যন্ত ক্ষীণ৷ এখনকার সমস্যা রবীন্দ্রবিরোধীদের নিয়ে নয়, রবীন্দ্রভক্তদের নিয়েই৷ তাঁরা রবীন্দ্রনাথকে এভাবে গ্রহণ করেছেন, যেন তিনি একটি আলোর শিখা এবং ভক্তরা পতঙ্গ মাত্র৷ যাঁরা কাছে গেছেন তাঁরা পুড়েছেন অর্থাত্‍
অস্তিত্বহারা হয়েছেন বা নিজস্ব সত্তাকে বিসর্জন দিয়েছেন৷ আর যাঁরা দূর থেকে তাঁকে অবলোকন করেছেন তাঁরা নার্সিসাসের মতো মুগ্ধ থেকেছেন নিজস্ব প্রতিবিম্বের জলে; তাঁরা নিজস্বতার ঠিকানায় রবীন্দ্রসত্তাকে মিলিয়ে ফেলেছেন৷ হয় তাঁরা রবীন্দ্রবলয়ে প্রবেশ করে অভিমণু্যর পরিণতি গ্রহণ করেছেন, না হয় আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে রবীন্দ্রপাদস্পর্শে মুক্তিলাভের জন্য ও নন্দিত হবার দুরাশায় স্বেচ্ছায় অহল্যার পাষাণ-কৌমার্য ধারণ করেছেন৷ রবীন্দ্র-পাঠক ও ভক্তদের এই বিচিত্র ধরনটি রবীন্দ্রনাথের জীবদ্দশায় এবং মৃতু্যতে যেমন কোনও প্রভেদ আনে নি, কালের বিবর্তনও সেখানে ভেদরেখা গড়তে পারে নি আজও৷
রবীন্দ্রবিচারের মাত্রা যুগে যুগে ভিন্ন হবে সেটাই স্বাভাবিক৷ কিন্তু বিচারের নামে প্রহসনও কম হয় নি, ইতিহাসে তার স্বাক্ষর রয়েছে৷ সংস্কৃতির বিবর্তন এবং পুনরাবর্তন বা অতীতমনস্কতা এক কথা নয়৷ কিন্তু বাঙালী সংস্কৃতিকে বার বার চড়ায় নৌকা আটকাবার দশায় ফেলার চেষ্টা হয়েছে৷ রবীন্দ্রনাথকে করা হয়েছে মূল লক্ষ্য৷ বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের পূর্বে পাবনা অধিবেশনে, কিংবা নোবেল পাওয়ার আগে কবিকে নিয়ে ঠাট্টানিন্দার নাটক আনন্দ বিদায় নাট্যাভিনয়ে, বা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে সিনেট হাউসে রবীন্দ্রনাথের বক্তৃতাকালে, 'সাম্রাজ্যবাদী' জাপান সম্রাটের আমন্ত্রণে প্রশান্ত মহাসাগরে যাত্রাকালে সিঙ্গাপুর জাহাজঘাটে, এবং আরও কয়েকটি স্থানে এমন কি কিছু কিছু অপ্রত্যাশিত ঘটনাও ঘটেছে৷
পশ্চিমেও প্রতিক্রিয়া ঘটেছে নানা রকম৷ ম্যাকমিলান কোম্পানীর গীতাঞ্জলির ভূমিকা লেখার পর কানকথা শুনে কবি ইয়েটস্ বিরূপ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন; টি.এস.এলিয়টের গুরু কবি এজরা পাউন্ড এবং আরও কেউ কেউ রবীন্দ্রনাথকে এশিয়ার প্রতিভূ ভাবতে অস্বীকৃতি জানান এবং চীন ও জাপানের দিকে মুখ ঘুরিয়ে নেন৷ রঁম্যা রঁলাও শেষের দিকে প্যারিসে রবীন্দ্র-শিল্পকলার প্রদর্শনীকে ফরাসী দেশের দুর্ভাগ্য বলে সমালোচনা করলেন (যদিও সেই সময় প্রদর্শনী-দেখা এক ড্রাইভার রবীন্দ্রনাথকে প্যারিসের বাইরে অনেকদূর পর্যন্ত ঘুরিয়ে দেখিয়েছিলেন, কোন ভাড়া না-নিয়ে এবং আন্তরিক সম্মান দেখিয়ে) ইত্যাদি৷ এরকম ঘটনা-দুর্ঘটনা মিলিয়ে রবীন্দ্রনাথকে আমরা পেয়েছি৷ তথাপি বিশ্বকবি তাঁর স্বআসনেই অটল ও বরেণ্য হয়ে রয়েছেন৷ রবীন্দ্রনাথের কোনও ক্ষতি হয় নি এসব অশ্লেষাবেলার তাত্‍পর্যহীন বিপণ্নতায়৷
কিন্তু একথা কি তবুও জোর করে বলা যাবে যে, রবীন্দ্রনাথকে বাঁচিয়ে রেখেছে তাঁর বিশেষ পাঠকেরাই? রবীন্দ্রনাথ নিয়ে চর্চা করেন, তাঁর গ্রন্থ পড়েন বা তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্মরণ করেন এমন পাঠকের পরিচয় কতখানি সন্তোষজনক? রবীন্দ্র-পাঠক তো তারাই যারা সাধারণভাবেই সাহিত্যের পাঠক৷ তার অতিরিক্ত 'বিশেষ' উপাধি আছে কি সেই 'মহত্‍' পাঠকদের? বিশেষত এই যুগের মিডিয়া তথা চ্যানেল-প্রিয়তার কালে? রাজনীতিমুখো সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে বিচার করলে তাদেরকে কি খুব বেশী করে খুঁজে পাওয়া যাবে? তাছাড়া উপযোগিতা (এটা যদিও স্বার্থেরই অপর নাম) এবং প্রয়োজনীয়তার দর্শনভুক্ত সমাজ অকারণে বা বিনা প্রয়োজনে কেন সাহিত্য এবং 'বিশেষ সাহিত্য' পড়তে চাইবে?
বলা বাহুল্য সাহিত্যের কিছু অকারণ পাঠক থাকে, যাদের মধ্যে মহিলা এবং কিশোর-কিশোরীদের সংখ্যাই অধিক৷ কথায় বলে কাজ নেই তাই চাচার নামে মামলা ঠোক৷ এরা সেই দলের৷ আমি এক অধ্যাপকের কথা জানি যিনি কর্মক্ষেত্রে প্রায় প্রতিদিন থলে হাতে বাজারে দায়িত্ববান গৃহকর্তার ভূমিকা পালনে বের হন এবং গভীর রাতে বা পরদিন ভোরে ছোট কেতাব পড়া শেষ করে গৃহে প্রত্যাবর্তন করেন৷ অন্য কেতাব অর্থাত্‍ সাহিত্যের নিকুচি করার দলে তিনি প্রথম৷ অথচ শ্বশুরালয়ে তিনি সুবেশ তথা 'লেজবিশিষ্ট ভদ্রলোক' এবং তাঁর অন্য পরিচয় তিনি সাহিত্যের (চাই ইংরেজী, বাংলা, সামনে যা আসে) একনিষ্ঠ পাঠক৷ তিনি অবসর সময় এ ভাবেই কাটান কোন রিডিং মেটেরিয়েলস সাবাড় করে৷ অথচ সাহিত্য আলোচনায় তাঁর অনীহাই কেবল চূড়ান্ত নয়, সাহিত্যিকদের মাথা মুড়াতে কেবল বাকী রাখেন৷
আমাদের সমাজ এই রকম পাঠকেরই আখড়া বিশেষ, এরাই সমাজের এবং সংস্কৃতির দলপতি৷ হুতোম পেঁচার নকশায় আছে, এক মায়ের তিন ছেলেই পাগল৷ বড় ছেলে একদিন তার মাকে নাকি বলেছিল, 'মা তোমার গর্ভটাই একটা পাগলাগারদ৷' আমাদের সমাজের এখন সেই অবস্থা৷ তাই ভাবতে অবাক লাগে এর পরেও রবীন্দ্রনাথ কি করে এখনও আলোচনায় উঠে আসেন? পরীক্ষার প্রয়োজনেও ছাত্ররা যেখানে রবীন্দ্রপাঠে বিরত থাকে, সেখানে এরকম আশ্চর্যবোধ করাই স্বাভাবিক নয় কি? প্রয়োজনের দর্শন ঠেলে রবীন্দ্রনাথ কি করে উজানে আসেন এই রহস্যের মধ্যেই সমাজের ইতিবাচক কোনও শক্তিই হয়ত কাজ করে৷
এবার রবীন্দ্র সংখ্যার কোনও কাগজে (অবশ্যই দৈনিক) দেখলাম রবীন্দ্রপাঠকের জরিপ বেরিয়েছে৷ পাঠকেরা প্রায় সবাই একবাক্যে বলেছে রবীন্দ্রনাথ পড়ি না, কঠিন লাগে৷ ছেলেবেলায় শোনা-কথা রবীন্দ্রনাথ বড় কবি, সেই রবীন্দ্রনাথ মাঝে মধ্যে কখনও সখনও এবং রবীন্দ্র ঋতুতে প্রায় প্রত্যহ নজরুলের সাথে মল্লযুদ্ধে নামেন, কিন্তু ফলাফল অমীমাংসিত৷
উপযোগবাদ বা প্রয়োজনীয়তার দর্শনে রবীন্দ্রনাথ বাদ পড়ে বলে রাজনীতি বা রাজনীতি-দর্শনে কোন কোন দল এটাকে কাজেও লাগায়৷ তিরিশের যুগে কমিউনিস্ট আন্দোলনের সময় তারা বেশ ভাল কাজে লাগিয়েছিল এই সুযোগটা৷ রবীন্দ্রনাথ সেদিন ছিলেন সামন্তপ্রভুর দলে, উপনিবেশী শক্তির পক্ষে৷ এমন কি ফ্যাসিস্টদেশ ইতালি-জার্মান প্রীতিবশবতর্ী৷ মার্কসীয় বিচারে রবীন্দ্রনাথের যখন তুলাধুনা হচ্ছে তখনই কিন্তু সুকান্তরাই (সুকান্ত পাঠে উজ্জীবিতরা) এই বিশ্বাসে ও প্রত্যয়ে ঘনিষ্ঠ হচ্ছে যে রবীন্দ্র সাহিত্যই মুক্তির দ্বারপথ৷ আবার তেমনি দেখি, মৌলবাদী চিন্তা তখনও ঠাঁই পায় নি, সে-সময় রবীন্দ্রবিরোধীরাই মার্কসীয় সমালোচনার উপজীব্যতাকে ধরিয়ে দিয়েছিল সহজেই৷
প্রগতিধারার পত্রিকা নতুন সাহিত্যে বিহার সীমান্তের এক মরণাপন্ন বৃদ্ধের কথা লেখা হল এভাবে যে, অন্তিমকালে সেই অর্ধজীবিত লোকটি জীবনের সঞ্জীবনী শক্তি খুঁজে পেয়েছিল রবীন্দ্র সংগীতের মতো আশ্চর্য ধ্বনিস্রোত শ্রবণ করে; যে-অবিশ্বাস্য সুরতরঙ্গ না-শুনে তার এতটা কাল কেটেছে৷ তাকে আবিষ্কার করে এক নতুন জীবন পেয়ে সে বলে উঠেছিল, 'এই সুর না শুনেই আমার মৃতু্য হচ্ছিল; কি হতভাগ্য মৃতু্যই না হতো আমার!' সুতরাং বোঝা গেল, রবি ঠাকুরের গান এবং সাহিত্য দুই-ই সামন্তস্বার্থরক্ষক হয়েও প্রগতিবাদীদের রক্ষাকবচ হয়ে ওঠে এক নিমেষে, নিশ্চয় অসাধারণ কোন বৈশিষ্ট্য আছে তার মধ্যে৷ নাকি এটাই 'পাঠকের মৃতু্য' কিংবা গুণ!
মাঝে মাঝে ভাবতে ইচ্ছে করে রবীন্দ্রনাথ বিদেশে কেমন আছেন? শান্তি-নিকেতনের বিদেশী বন্ধুরা (টমসন এবং অন্যেরা) রবীন্দ্র জীবদ্দশায় এক রকম বিচার বিশ্লেষণ করেছিলেন৷ শোনা যায় এডওয়ার্ড টমসনের ওপর রবীন্দ্রনাথের খুব আস্থা ছিল৷ পরে, টমসনের অনুবাদ বা আলোচনা অনেকেই খারিজের পক্ষপাতী হন৷ জার্মান ভাষায় ১৯১৩ সালেই কুর্ডউলফ রবীন্দ্র অনুবাদে হাত দেন এবং রবীন্দ্রসমগ্র বের করেন৷ পরে রাশিয়া ও ফ্রান্সে এবং জাপানে ও চীনে রবীন্দ্র অনুবাদ প্রশংসিত এবং জনপ্রিয়তার তালিকা অর্জন করে৷ সমপ্রতি শোনা গেছে হিব্রু ভাষায় গীতাঞ্জলি অনূদিত হচ্ছে৷ অর্থাত্‍ রবীন্দ্র-আবেদন এখনও নানা ভাষায় তুল্য-প্রসারমান৷ এর ভেতরেও নানা স্কুল নানা দর্শনভাগীরা নানা দৃষ্টির পরিচয় দিচ্ছেন৷ যেমন রবিনসনের সামপ্রতিক যে অনুবাদ (বৃহদাকার), উইলিয়ম রাদিচির কবিদৃষ্টি ও বিচারবোধ তা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন৷ পেংগুইন-এর পৃষ্ঠপোষকতা লাভে সক্ষম হয়েছেন রাদিচি৷ উল্লেখ্য, বোলটন এবং তারাপদ মুখোপাধ্যায়ের পরে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচ্যদেশীয় ভাষা স্কুলের বাংলা বিভাগের দায়িত্ব পড়েছিল উইলিয়মের ওপরে৷ বর্তমানে বিভাগীয় প্রধানের নাম হানা টম্পসন৷ রবীন্দ্রনাথকে তাঁরা গ্রহণ করেছেন এবং বিশ্বে ছড়িয়ে দিয়েছেন সেই মদনভষ্মকে, যার ফলে পৃথিবীর এখানে ওখানে গড়ে উঠেছে নানা রবীন্দ্রতীর্থ৷
খুব আলোড়ন জাগিয়ে, সাড়াজাগানো ব্যাপার ঘটিয়ে প্রচার করে এমনটা হচ্ছে বা হয়েছে তা কিন্তু নয়৷ 'নাহি জানে কেউ/ রক্তে তোর নাচে আজি সমুদ্রের ঢেউ,/ কাঁপে আজি অরণ্যের ব্যাকুলতা'_সেই রকম৷ রবীন্দ্রনাথ এমনিভাবে সবার ভেতরে ভেতরে পুষ্টি লাভ করেছেন৷ রবীন্দ্রনাথকে নিজেদের করে রাখা এই নিয়েই যেন এখন প্রতিযোগিতা৷ যেমন প্রগতিবাদীরা এড়িয়ে এসেছেন, তেমনি বিদেশে সাম্যবাদীরা এবং খ্রিস্টবাদীরাও৷ রবীন্দ্রনাথকে বিদেশে কেন গ্রহণ করে, এদেশে কেন অবহেলা করে এই সমাজদর্শন বা সমকালীন সাংস্কৃতিক চিন্তার সঙ্কট বা অপল্লবতার কথা নিয়ে এখানে আর কিছু বলতে চাই না, কিন্তু একটা কথা বলা দরকার যে, রবীন্দ্রনাথ এবং তাঁর আগে মাইকেল মধুসূদন কি আসলে স্বদেশী কবিদেরই কোনও উত্থান? নাকি 'ভিনদেশী এক আগন্তুক'? বুদ্ধদেব বসু, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী প্রমুখ যেন এ ধরনের সন্দেহ উত্থাপন করেন এবং সমাধান সন্ধানে প্রবৃত্ত হন৷ সৈয়দ আলী আহসান যেমন বলেন, মনস্তাত্তি্বকভাবে রবীন্দ্র-ইমেজে বাঁধা রয়েছে অজস্র 'শব্দরাজি'৷ অর্থাত্‍ তিনি পুরনো, আধুনিক রুচি-বহিভর্ূত, পরিত্যাজ্য৷ যেটুকু চলে সেটা প্রথামান্যতার কারণেই৷ এখনকার 'শব্দ' কি আর অতখানিই নির্লিপ্ত, নিবর্ীর্য এবং কালমনস্কতাবিহীন?
কিন্তু এখানে 'শব্দই ব্রহ্ম' ধরে এগুলে চলবে না৷ 'শব্দ' সাহিত্যের সেই উপাদান যা অভ্যন্তরীণ বন্ধনকে ধরিয়ে দেয়, এগিয়ে দেয়৷ আর রবীন্দ্রসাহিত্য সমাজবন্ধনের রূপ এবং সামাজিক বিবর্তনের প্রত্যাশা একই সাথে প্রকাশ করেছে৷ দার্শনিক ও ইতিহাসতত্ত্ববিদ ডব্লু. রুবিন একবার বাল্মীকি ও কালিদাসের তুলনা প্রসঙ্গে বলেছিলেন উভয়েই রাম ও সীতার ছবি এঁকেছেন, কিন্তু উভয়ের চিত্র থেকেই সমাজবাসী তথা নাগরিকগণ এই জন্য উপকৃত হয়েছেন যে, তাঁরা স্ব স্ব কালের কবির মধ্যে নতুনকালের বাণী তথা আধুনিকতার অভিযোজন দ্বারা পুনঃসিঞ্চিত হয়েছেন৷ আমরা রবীন্দ্রনাথের 'মেঘদূত' বিষয়ক কবিতায় শুধু কালিদাসকেই পাই না, সেকাল-একাল মিলিয়ে চিরপ্রবহমান এবং অভীষ্ট এক কালে উপনীত হই৷ কালের পুনঃনির্মাণে এবং কালের উত্তরণে কবিতাটি যে মহত্ত্ব অর্জন করেছে, 'শব্দ' তার এক উপযোগী বাহন মাত্র৷ সে পেছনে ফেলে আসে ঐতিহ্য_ভাষার ঐতিহ্য, দর্শনের ঐতিহ্য, ইতিহাসের পশ্চাত্‍ধারা৷ কবে ছান্দ্যোগ্য উপনিষদের কোন পৃষ্ঠায় উদ্দালক অরুণি যাজ্ঞবল্ক্যকে উত্তেজিত করার মতো কোন মন্ময় উক্তি করেছিলেন, বুদ্ধের সমবতর্ীকালের কোন রাজা আত্মা ও শরীর নিয়ে পরীক্ষামূলক কোন কর্মে উদ্যোগী হয়ে যুদ্ধবাদীদের আনুগত্যের দিকে ধাবিত করেছিলেন, সাংখ্যতত্ত্বে প্রকৃতির গুণ পুরুষনির্ভর কিনা, এসব তত্ত্ব ভারতীয় দর্শনকে যে দিকে ঠেলে দিয়েছিল, যুগে যুগে সাহিত্যে বা মহাকাব্যে কবিদের চিন্তাধারায় তা প্রকটিত হয়েছে৷ সাধারণ মানুষ তা করেছে উপভোগ, গ্রহণ করেছে মিথ বা পুরাণে ও ধর্মে, বিশ্বাসে এবং প্রাতিস্বিক সংস্কারে৷ তার সবই উঠে এসেছে শব্দে৷ তবু 'শব্দ' আসলে অর্থহীন৷
গ্রীক সাহিত্য যেমন গ্রীক দর্শন থেকে দূরে নয়, তা যেমন থেলসের, তেমনি উত্তুরে আয়নদেরও৷ (এবং উভয়ের কূটমিশ্রণ ও সংশ্রায়নে বটেই)৷ ভারতীয় কবিদের সেভাবেই আমরা চিন্তা করতে পারি৷ রবীন্দ্রনাথ তার ব্যতিক্রম নন৷ রবীন্দ্রনাথ অধ্যবসায় দ্বারা তা অর্জন করেছেন৷
কিন্তু রবীন্দ্রনাথ সেখানেই থেমে থাকেন নি৷ পশ্চিমে রবীন্দ্রসাহিত্যের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির কারণে ও রবীন্দ্র-আকাঙ্ক্ষায় বিশ্বের প্রতিকৃতি প্রতিবিম্বিত হতে থাকায় তিনি ভারতীয় দানকে পশ্চিমের জানালার রোদে মেলে ধরেন৷ রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে সমালোচনার একটা বড় কারণ এটাও৷ রবীন্দ্রদর্শন এবং সাহিত্য নিয়ে পরে যাঁরা কাজ করেছেন তাঁদের কাছে এটা খুব আশ্চর্য মনে হয়েছে যে, রবীন্দ্রনাথের বৈদিক চিন্তা ক্রমে বুদ্ধ-যাত্রায় ও শেষে যীশুর করুণা ভিক্ষায় পরিণতি নিচ্ছিল৷
টি.এস. এলিয়টের গীর্জামুখিতা আর রবীন্দ্রনাথের মানববাদী যীশু-বন্দনাকে এক করে ফেলায় এই ভ্রান্তি ঘটে, সন্দেহ নেই৷ কিন্তু এরপরও দেখা যায় জার্মান সমালোচক ও রবীন্দ্রভক্ত গিসেলা হার্দত্‍ (G. Herdt) রবীন্দ্রদর্শনে এমন নতুন অনেক কিছু পেয়েছেন যেখান থেকে তাঁর ধারণা হয়েছে এসবই রবীন্দ্রনাথের বহির্ভারতীয় সংযোজন৷ বিনয় ঘোষ একবার রবীন্দ্রনাথের সৌন্দর্যতত্ত্বের ব্যাখ্যায় কৌত্‍সিত্বের বিষয়কে যুক্ত করে রবীন্দ্রদর্শনের বিস্তার ঘটিয়েছিলেন৷ গিসেলার মতেও দেখি রবীন্দ্রনাথের সু এবং কু-এর ধারণায় ভাল/মন্দ বৈপরীত্য অপেক্ষা ভাল ও সত্যের সমীকরণ (রাইট এন্ড গুড) করেন এবং জার্মান নাট্যকার ফিডলার যেমন বলেন (ফিডলার'স ফমর্ুলা), সেভাবেই ইতিবাচকতার দিকে মনোযোগী হয়ে কবি সত্য ও কল্যাণের চিরন্তনতা কামনা করেন৷ রবীন্দ্রনাটকেই বিশেষ করে এই শ্রেয়োবোধক ও নীতিআশ্রয়ী শিক্ষামূলক (ডাইডাকটিক ও মোরালিস্টিক) চিন্তার উদ্ভাসন লক্ষ্য করা যায়৷ ফ্রেডরিখ হেইলার এসব কারণ দেখিয়ে রবীন্দ্রনাথকে 'নন-ব্যাপটাইজড ক্রিশ্চিয়ান' (অদীক্ষিত খ্রিস্টান) বলেছিলেন৷
এসব প্রসঙ্গ নিয়ে আরও যে সব কথা বলা দরকার, তার অবকাশ এখানে নেই৷ আমাদের বলার উদ্দেশ্য, রবীন্দ্রনাথ যেমন নিন্দায় ব্রহ্ম, প্রশংসায়ও ব্রহ্ম৷ রবীন্দ্রনাথের একটাই পরিচয়_তিনি জাতীয় বা বিজাতীয়, এদেশীয় বা বিদেশীয় নন, দীক্ষিত বা অদীক্ষিত নন, আমাদের বা তোমাদের নন, তিনি শুধুই রবীন্দ্রনাথ৷ শত্রুরও তিনি মিত্রেরও তিনি; সমালোচকেরও তিনি, ভক্তেরও তিনি৷ তিনি ক্ষুদ্রের নন, বৃহতের৷ পুরনো হয়েও নতুনের৷ তিনি সবার।