কেতাব হালতুননবী : সিলেটী নাগরী ভাষা ও সাহিত্যের আকর-গ্রন্থ

স্বপন নাথ

যে সময়কালে মানুষের মধ্যে শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার প্রবণতা ও উন্মুল মানসিকতা লক্ষ করছি; সে-ই সময় উৎস প্রকাশন শেকড় সন্ধানীর ভূমিকা গ্রহণ করেছে। আঞ্চলিক ইতিহাসের অচ্যুতচরণ চৌধুরী তত্ত্বনিধি রচিত জনশ্রুত শ্রীহট্টের ইতিবৃত্তের মতো গ্রন্থ প্রকাশ করে অর্জন করেছে সুধীমহলের প্রশংসা। এরই ধারাবাহিকতায় এ প্রতিষ্ঠান থেকে প্রকাশিত হলো, কবি মুন্সী সাদেক আলী রচিত নাগরী সাহিত্যের অন্যতম নিদর্শন কেতাব হালতুননবী পুঁথি। সাদেক আলী ছাড়াও নাগরী সাহিত্যের জনপ্রিয় কবিগণ হলেন শীতালং শাহ, শাহনূর শাহ, আরকুম শাহ, ইরফান আলী, নাছিম আলী, শাহ আছদ আলী, মুহম্মদ খলিল, ভেলা শাহ ও দৈখুরা প্রমুখ।
ইতিহাস-সমাজ-রাজনীতি-ভাষা-ঐতিহ্যের পরিপ্রেক্ষিতে সিলেটী নাগরী লিপি ও সাহিত্যের মূল্য অপরিসীম। এ-ই নাগরী সাহিত্যের অনন্য কবি ছিলেন মুন্সী সাদেক আলী। নাগরী গবেষক এস এম গোলাম কাদির কবি সাদেক আলীর জন্ম সন ১৭৯৮ বলে উল্লেখ করেছেন। দেওয়ান নূরুল আনোয়ার চৌধুরীসহ অনেকে বলেছেন ১৮০০ খ্রিস্টাব্দ। তবে তাঁর জন্ম-পরিচয় সম্পর্কে সকলেই একমত যে, কবি সাদেক আলীর জন্ম হয়েছে হিন্দু পরিবারে। তিনি বর্তমান কুলাউড়া থানার লংলা পরগনার দৌলতপুর গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। কবির পিতার প্রদত্ত নাম ছিল গৌরকিশোর সেন। তাঁর পিতা রামগোবিন্দ সেন মারা যাবার পর তিনি পিতৃব্য রামদুলাল সেনের কাছে পালিত হন। কিন্তু রামদুলাল সেনের মৃত্যুর পর তৎকালীন হিংগাজিয়া থানা (এখন গ্রাম নামে পরিচিত)-র পুলিশ কর্মকর্তা আবুল ফজলের কাছে আরবি ফারসি ভাষায় শিক্ষা লাভ করেন। সাদেক আলী অল্প বয়সে ১৮২৩ সনে হিংগাজিয়া থানার মুনসেফ নিযুক্ত হন। প্রায় সাত আট বছর চাকরি করার পর পীর শাহ নকিউল্লাহর কাছে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। সে-ই থেকে তাঁর নাম হয় সাদেক আলী। তাঁর মৃত্যু সন নির্দিষ্টভাবে জানা না গেলেও বলা হয় তিনি ১৮৬২ খ্রীস্টাব্দে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। সাদেক আলীর প্রকাশিত গ্রন্থ সংখ্যা চারটি। এগুলি হলো : ১. রদ্দে কুফুর ২. হালতুননবী ৩. মহব্বতনামা এবং ৪. হাশর মিছিল। কেতাব হালতুননবী পুঁথির মূল বিষয়বস্তু হলো

মুন্সী সাদেক আলী, কেতাব হালতুননবী, (লিপ্যন্তর ও ভূমিকা মো. আবদুল মান্নান), উৎস প্রকাশন, ঢাকা, ৪৫০ টাকা
হযরত মুহাম্মদ (স.)-এর জীবন-বৃত্তান্ত ও কর্মময় জীবনের ঘটনাবলি। মহানবীর ব্যক্তিগত জীবন, নবুওত প্রাপ্তি, কর্মজীবন, ধর্মপ্রচার ইত্যাদি লৌকিক ও অলৌকিক ঘটনা বর্ণনায় মহাকাব্যিক ব্যাপ্তিতে উপস্থাপন করেছেন কবি। এর অনুষঙ্গে বর্ণিত হয়েছে সৃষ্টিতত্ত্ব ও সৃষ্টিকর্তার বিভিন্ন মাহাত্ম্য কথা। কবি সাদেক আলী ৭১টি অধ্যায়ে হযরত মুহম্মদের জীবন ও কর্মকে বিন্যস্ত করেছেন। হালতুননবী পুঁথি রচনায় অনুপ্রেরক হিসেবে সাদেক আলী আরবি ও ফারসিতে রচিত কিছু গ্রন্থের উল্লেখ করেছেন।
বিভিন্ন তথ্য থেকে জানা যায় এ-ই পুঁথি কবি পরিণত বয়সে ১৮৫৫ সনে রচনা করেন। বলা বাহুল্য যে, হালতুননবী সিলেটী নাগরী সাহিত্যের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় ও বহুলপঠিত গ্রন্থ। হয়তো বলা হবে বর্তমান সময়ের প্রেক্ষিতে এসব পুঁিথসাহিত্যের কোন মূল্য নেই। কিন্তু ভাষার বিবর্তন, সমাজ-কাঠামো ও সে-সময়ের সাধারণ মানুষের জ্ঞানচর্চায় সৃষ্টিশীলতা জানার জন্য এসব সাহিত্যের প্রয়োজন রয়েছে। উল্লেখযোগ্য যে, হালতুননবীর প্রকাশনা কেবলই নাগরী সাহিত্যের উপাদান হিসেবে মূল্যবান নয়। সিলেট অঞ্চলের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য জানা ও বোঝার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশনা। সে-ই বিচারে কেতাব হালতুননবীর মূল্যায়ন বিবেচনার দাবি রাখে। আরেকটি বিষয় হলো, একটি প্রাচীন জনপদের গণমানুষ তাদের মনের ভাব প্রকাশ করতে স্বতন্ত্র একটি লিপি উদ্ভাবন করেছিল। মানুষ-সময়-সমাজ-ধর্ম-শাসন-শাসক-শ্রেণী-ভূগোল ও সভ্যতার বিবর্তন চিন্তায় এ-ই সৃজনশীল জ্ঞানচর্চার প্রসঙ্গ অত্যন্ত গুরুত্ববহ। এ কারণেই নাগরী লিপিতে লিখিত পুঁথি-পুস্তকের আবেদন কখনো শেষ হবার নয়। এজন্য বলার অপেক্ষা রাখে না যে, সিলেটী নাগরী লিপি ও সাহিত্য বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। একটি ভাষার সাহিত্য শুধু সাহিত্যের ইতিহাসের উপাদান হিসেবে গুরুত্ব বহন করে না। এর সংগে ওই জাতির সাংস্কৃতিক পরিচয়কে শনাক্ত করে। বস্তুত, কেতাব হালতুননবী পুঁথিসহ অন্যান্য নাগরী সাহিত্য সিলেটের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের স্বাতন্ত্র্যকেই চিহ্নিত করে।
উল্লেখযোগ্য যে, এ-ই স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে মুগ্ধ হয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন ‘মমতাবিহীন কালস্রোতে/ বাংলার রাষ্ট্রসীমা হতে/ নির্বাসিতা তুমি/সুন্দরী শ্রীভূমি।’ সিলেট প্রাচীন কাল থেকেই বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীর বসবাসের জন্য আকর্ষণীয় জনপদ হিসেবে পরিচিত। এ-ই জনপদে পর্যায়ক্রমে আর্য, অস্ট্রিক, মঙ্গোল ও দ্রাবিড় নৃগোষ্ঠীর বসতি গড়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন জায়গা হতে সেমেটিক ও উত্তর-পশ্চিম ভারত থেকে আগত জাতি-গোষ্ঠীর মিশ্রণে সৃষ্টি হয় সিলেটের সমাজ-কাঠামো, ভাষা ও সংস্কৃতি। সিলেট অংশত উর্বর ও সৌন্দর্যস্নাত হওয়ার কারণে বিভিন্ন কাল পরিসরে এ অঞ্চলে বিভিন্ন ভাষাভাষী গোষ্ঠীর মানুষের আগমন ঘটে। ফলে সংঘাত-সংযোগ-সমন্বয়ের মাধ্যমে এ অঞ্চলের সাংস্কৃতিক ইতিহাস হয়েছে সমৃদ্ধ।
চৌদ্দশতকে সিলেটে মুসলমানদের আগমন হলেও তাঁরা প্রথম থেকেই এ নাগরীলিপি উদ্ভাবন করেন নি। কিন্তু স্থানীয় জনগণের সঙ্গে ভাব বিনিময়, প্রশাসনিক যোগাযোগ ইত্যাদির প্রয়োজনে একটি সর্বজনবোধ্য ভাষার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। আগতরা স্থানীয় ভাষা বুঝতে অক্ষম ছিল। ইতিহাসের সত্য হলো এর মধ্যে ক্ষমতার পালাবদলের কিছু ঘটনাবলিও সংঘটিত হয়। ইতিহাসের ঘটনা যা-ই হোক নাগরী লিপি ও সাহিত্য চর্চা এ অঞ্চলের মানুষের সৃষ্টিশীলতার পরিচয় বহন করে। এক্ষেত্রে সৈয়দ মুর্তাজা আলীর বক্তব্য স্মরণীয়- ‘সিলেট জেলার পূর্বাঞ্চলে, সদর, করিমগঞ্জ মহকুমায়ও এক সময় সিলেটী নাগরী পুঁথির প্রচার ছিল। পুরুষদের তুলনায় নারীরা এই লিপি বেশি ব্যবহার করতেন। অনেক অশিক্ষিত মুসলমান যারা বাংলা অক্ষর লিখতে পারত না-তারা শুধু নাগরী লিপিতেই তাদের নাম দস্তখত করতে পারত।’
সিলেটী নাগরী লিপির উদ্ভব ও ব্যবহার নিয়ে অনেকেই গবেষণা করেছেন এবং নিজস্ব মতামতও ব্যক্ত করেছেন। এঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন জর্জ আব্রাহাম গ্রিয়ারসন, অচ্যুতচরণ তত্ত্বনিধি, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, সুকুমার সেন, আহমদ হাসান দানী, নগেন্দ্রনাথ বসু, যোগেশচন্দ্র ঘোষ, বি সি অ্যালেন, পদ্মনাথ ভট্টাচার্য বিদ্যাবিনোদ, মৌলভী আশরাফ হোসেন সাহিত্যরত্ন, শিবপ্রসন্ন লাহিড়ী চৌধুরী, প্রমুখ। তাঁদের তাত্ত্বিক ও তার্কিক মন্তব্য থেকে নাগরী লিপির উৎস ও বিকাশে যে-সব সিদ্ধান্ত-সূত্র আমরা পেয়ে থাকি, তা হলো :
(ক) প্রাচীনকালে সিলেটে সংস্কৃত-প্রভাবিত বাংলা ভাষার প্রচলন ছিল। সিলেটে আগত মুসলমানগণ সে ভাষা বুঝতে সক্ষম ছিলেন না। তাঁরা ধর্মীয় রীতিনীতি প্রচারে ও আচার পালনে বিদ্যমান ভাষাকে সুবিধাজনক মনে করেন নি। এ ছাড়াও ব্রাহ্মী লিপি থেকে উৎসজাত কুটিল লিপির যুক্তাক্ষর ও ভাষার সাধুরীতির ব্যবহার মুসলামানদের কাছে দুর্বোধ্য মনে হয়েছিল। তবে তাঁরা নিজেরা আরবি ফারসি উর্দু ভাষা বুঝতেন ও ব্যবহার করতেন। স্থানীয় মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের উপযুক্ততার নিরিখে তাঁরা একটি মিশ্র ভাষারীতির প্রয়োজনীয়তা বোধ করেন। সে আলোকে বাংলা ও দেবনাগরী লিপির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্থানীয় ভাষা ব্যবহারের জন্য মুসলমানরা যুক্তাক্ষর ও জটিলতাবর্জিত যে লিপি সৃষ্টি করেন তা-ই সিলেটী নাগরী।
(খ) সিলেটী নাগরী লিপির ব্যবহার শুধু মুসলমানদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। এ-ই লিপি বাংলা লিপির বিকল্প হিসেবে প্রচলিত এক স্বতন্ত্র লিপি মাত্র। আঠার ও উনিশ শতকে সিলেটের বাইরে কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোণা, ময়মনসিংহ ও কাছাড় অঞ্চলে এ লিপি প্রচার ও প্রসার লাভ করেছিল।
(গ) দেবনাগরী লিপি হিন্দু সমপ্রদায়ের জনগণ ব্যবহার করতেন। ফলে ধর্ম প্রচার ও ধর্মীয় মাহাত্ম্য প্রচারের কাজে আলাদা লিপির প্রয়োজনীয়তার পরিপ্রেক্ষিতে সিলেটী নাগরী লিপির উদ্ভব। প্রসংগত, ভারতবর্ষে মুসলমানরা আরবি-ফারসি মিশ্রিত লিপিতে হিন্দি চর্চার চেষ্টার ফলে উর্দু ভাষার উৎপত্তি হয়েছিল। সিলেটে মুসলমানদের অভিবাসনের পর সে চেতনা ও চর্চার পরিণাম হচ্ছে সিলেটী নাগরী লিপি।
(ঘ) বাংলা, কাইথী, দেবনাগরী ও আরবি-এ চার লিপির প্রভাবে উদ্ভাবিত হয় সিলেটী নাগরী। এর বর্ণ সংখ্যা ৩২টি। গবেষকরা দেখিয়েছেন সিলেটী নাগরীর সঙ্গে দেবনাগরী ও কাইথি লিপির অধিক সংখ্যক বর্ণের সাদৃশ্য রয়েছে। এ লিপিতে রচিত সাহিত্য পড়া ও পৃষ্ঠা গণনা করা হয় ডান দিক থেকে বাম দিকে।
(ঙ) এর উৎপত্তিকাল খুব প্রাচীন না হলেও নাগরী সাহিত্যের বৈশিষ্ট্যের বিচারে বলা যায় এ লিপি চালু হয়েছে সতের শতকে।
বস্তুত, আঠার ও উনিশ শতকে সিলেটী নাগরী চর্চা ব্যাপক প্রসার লাভ করে। উনিশ শতকের শেষ পর্বে সিলেটে ও কলকাতায় নাগরী লিপির ছাপাখানাও প্রতিষ্ঠিত হয়। ফলে ভারতবর্ষের অন্যান্য অঞ্চলেও নাগরী পুঁথি ও লিপির প্রচার ঘটে। পাকিস্তান আমলেও কিছু চর্চা ছিল গ্রামাঞ্চলে। একাত্তর সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় নাগরী লিপির ছাপাখানা বিধ্বস্ত হলে এর শেষ চিহ্নটি হারিয়ে যায়। প্রসংগত, নাগরী লিপিতে সিলেটের বাংলা উপভাষার চর্চা করা হয়েছে। এ লিপি এখন আর কেউ ব্যবহার করে না।
এ-ই বিস্মৃতপ্রায় গ্রন্থ প্রকাশে উদ্যোগ গ্রহণ করে সফল হয়েছে উৎস প্রকাশন। কম্পিউটারে ব্যবহার উপযোগী নাগরী লিপির ফন্ট তৈরি করে, নাগরী লিপিতেই কেতাব হালতুননবী গ্রন্থ প্রকাশ করেছে। এ-ই গ্রন্থে নাগরী লিপির পাশাপাশি দেওয়া হয়েছে বাংলা লিপ্যন্তরে পুঁথির পাঠ। পরিশিষ্ট অংশে উল্লেখ করা হয়েছে বিভিন্ন শব্দের প্রমিত বাংলায় ব্যবহৃত অর্থ। ফলে, পাঠকের এ-ই পুঁথি পাঠ করতে কোনো সমস্যা হবে না। এ-ই গ্রন্থের মাধ্যমে সিলেটী নাগরী লিপি ও ভাষা-সাহিত্যের সঙ্গে পরিচিত ও এ প্রসঙ্গে জানার সুযোগ হলো। এ দুরূহ কাজটি সম্পন্ন করেছেন নাগরী বিশেষজ্ঞ লিপ্যন্তর-কারক প্রকৌশলী আবদুল মান্নান। এ-ই বইটি বাংলা সাহিত্যের প্রকাশনায় উল্লেখযোগ্য সংযোজন বলে আমরা মনে করি।