গল্প নয়

জয়নাল আবেদীন চৌধুরী

১৯৬৬ সালের ৩০ জানুয়ারী নতুন চাকরীতে যোগদান করলাম সিলেটের পিআইএ অফিসে। পরদিনই জেলা ব্যবস্থাপক কিছু বিশেষ নির্দেশনা দিলেন। এরমধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল আমিনুর রশীদ চৌধুরী সম্পর্কিত বিষয়। তিনি ছিলেন কয়েকটি চা-বাগানের মালিক এবং একটি স্থানীয় ইংরেজী ও একটি বাংলা পত্রিকার সম্পাদক ও মালিক। তিনি সিলেট জেলার একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং প্রায়ই বিমানযোগে দেশ ও বিদেশের বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণ করতেন। ইতিপূর্বে তাঁর বুকিং সংক্রান্ত বিষয়ে বেশ কিছু সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে, তাই ভবিষ্যতে যাতে অনুরূপ ঘটনার উদ্ভব না হয়, সে বিষয়ে ব্যবস্থাপক বিশেষভাবে সজাগ করে দিলেন।
সেদিনই একটি টেলেঙ বার্তা দেখতে পেলাম আমিনুর রশীদ চৌধুরী সম্পর্কিত। বার্তাটি এসেছে পি.আই.এর ফ্র্যাঙ্কফুর্ট অফিস থেকে। এর সারমর্ম হলো : আমিনুর রশীদ চৌধুরী তাঁর অত্যন্ত দামী লাইটারটি কোথাও হারিয়েছেন। ফ্র্যাঙ্কফুর্ট অফিস থেকে পি.আই.এর সকল অফিসে জানিয়ে দেয়া হলো যদি কেউ জিনিসটি পেয়ে থাকেন, তবে যেন প্রাপ্তি সংবাদটি ওই অফিসকে অবহিত করেন।
আমিনুর রশীদ চৌধুরী ভি.আই.পি নন, তিনি একজন সি.আই.পি. যাত্রী। কিন্তু ভি.আই.পি. যাত্রীদের থেকেও তাঁকে অধিক গুরুত্ব দেয়া হয়। ভি.আই.পি. যাত্রীদের মালপত্র সাধারণ যাত্রীদের মালপত্রের উপরে রাখা হয়, যাতে ফ্লাইট অবতরণের সাথে সাথে তা তাঁর কাছে দ্রুত হস্তান্তর করা যায়। আমিনুর রশীদ চৌধুরীর ক্ষেত্রে এরূপ ব্যবস্থা করতে গিয়ে একবার বিরাট বিড়ম্বনার সৃষ্টি হয়। লন্ডন যাত্রী আমিনুর রশীদ ঢাকা নেমে তাঁর মালপত্র পেলেন না, কারণ অতিসতর্কতা অবলম্বনের ফলে তা সিলেটেই রয়ে গিয়েছে। কী তুলকালাম কাণ্ডই না ঘটেছিল বিষয়টি নিয়ে! আর একবার তিনি ঢাকা যাওয়ার জন্য সরাসরি বিমানের টিকেট কিনেছেন লোকমারফত। অন্য দিকে নিজে তাঁর আত্মীয়ের মালিকানাধীন ট্রাভেল এজেন্সীকে সাময়িক বুকিং দিয়েছেন। পরে শেষোক্ত বুকিংটি তিনি ফোনে বাতিল করে দেন। সে অনুযায়ী এজেন্সীও ফোনে বিমানকে তাঁর বুকিং বাতিল করে দেয়। যদিও নিয়মানুযায়ী টিকেট উপস্থাপন না করলে তা বাতিল করা যায় না, আমিনুর রশীদের ক্ষেত্রে বিশেষ বিবেচনায় তা করা হয়ে থাকে। ফলে যা হবার হলো; রশীদ সাহেব টিকেট নিয়ে বিমান বন্দরে হাজির হলেন, অথচ যাত্রী-তালিকায় তাঁর নাম নেই, আর ফ্লাইটে কোনো আসনও খালি নেই। ঘটল বিমান বন্দরে তুলকালাম কাণ্ড।
আমিনুর রশীদ চৌধুরীর বিমান পথের যাত্রা কখনো সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হতে দেখা যায় নি। হাজারও সতর্কতা অবলম্বনের পরও তাঁর যাত্রাপথে বিঘ্ন ঘটতেই থাকত। অথচ এর বিপরীত চিত্র দেখা যেত অপর এক যাত্রীর ক্ষেত্রে। তাঁর নাম এ.এন.সাহা। সাহাবাবুর প্রায়ই ঢাকা যাওয়ার প্রয়োজন হতো শনিবার; আর শনিবারের ফ্লাইট অনেক পূর্ব থেকেই লন্ডনগামী যাত্রীদের বুকিং দ্বারা পূর্ণ থাকত, কারণ ওই দিনের ফ্লাইটের সাথে ঢাকা থেকে লন্ডনগামী ফ্লাইটের ভালো সংযোগ থাকত। সাহাবাবু ছিলেন একজন সাধারণ ব্যক্তি। আচার-ব্যবহারের তিনি ছিলেন অত্যন্ত মার্জিত ও অমায়িক। আসন নিশ্চিত করার ব্যাপারে তিনি কখনো তদ্বির কিংবা বিশেষ অনুরোধ করতেন না। তিনি যথারীতি অপেক্ষমান তালিকার টিকেট সংগ্রহ করে সরাসরি বিমান বন্দরে উপস্থিত হতেন এবং সুষ্ঠুভাবেই ভ্রমণ করতেন। কখনো তাঁকে বিমান বন্দর থেকে ফিরে আসতে কিংবা কোনো বিড়ম্বনার শিকার হতে দেখা যায় নি।
শনিবারের ফ্লাইটটি সিলেট থেকে ঢাকা যেত শমশেরনগর হয়ে। আটত্রিশটি আসনের মধ্যে আটাশটি পূর্ণ হতো সিলেট থেকে এবং অবশিষ্ট দশটি আসন সংরক্ষিত থাকত শমশেরনগর থেকে আরোহণকারী যাত্রীদের জন্য। এই পদ্ধতির কারণে একবার এ.এন. সাহার যাত্রা সম্পন্ন হয়েছিল অনেকটা অলৌকিক ঘটনার মাধ্যমে। সাহাবাবু যথাসময়ে সিলেট বিমান বন্দরে উপস্থিত হলেন। তাঁর নাম ছিল অপেক্ষমান যাত্রী-তালিকার দশ নম্বর ক্রমিকে। সিলেট থেকে যাত্রার জন্য যে আটাশজন যাত্রী নিশ্চিত টিকেটধারী ছিলেন, তাদের মধ্যে মাত্র দু’জন ছিলেন অনুপস্থিত। কাজেই ক্রমিক নম্বর এক ও দুইকে বোর্ডিং কার্ড দেয়া হলো। সাহাবাবুকে যথারীতি জানানো হলো যে, কোনো সম্ভাবনা নেই। কিন্তু তিনি নির্বিকার। এমন সময় হঠাৎ সংবাদ এল যে, খারাপ আবহাওয়ার কারণে ফ্লাইট শমশেরনগর হয়ে যাবে না, সিলেট থেকে সরাসরি ঢাকা যাবে। এবার সাহাবাবু সহ সকল অপেক্ষমান যাত্রীকে গ্রহণ করার পরও দুটো আসেন খালি থাকল।
আমি পৌনে চারবছর সিলেট পিআইএ অফিসে কর্মরত অবস্থায় কখনো আমিনুর রশীদ চৌধুরীর বিমান-ভ্রমণ নির্বিঘ্ন হতে দেখিনি, আর বিঘ্ন ঘটতে দেখিনি সাহাবাবুর ভ্রমণের ক্ষেত্রে।
এর বহুদিন পরের কথা। ১৯৮৩ সালের জানুয়ারী থেকে ১৯৮৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত আমি কর্মরত ছিলাম বাংলাদেশ বিমানের কলকাতা অফিসে। সে অফিসের রাজকুমার নামক একজন পিয়ন ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের লটারীর টিকেট কিনত নিয়মিত। গড়ে প্রতি মাসেই সে প্রথম অথবা দ্বিতীয় পুরস্কার পেত। এভাবে সে অনেক অর্থ-সম্পদের মালিক হলো। এ সমস্ত পুরস্কারের টাকা সংগ্রহ করতে এবং অন্যান্য কারণে সে প্রায়ই ছুটি নিত অথবা অফিসে অনুপস্থিত থাকত। তাছাড়া সে আসত হুগলী থেকে। ট্রেন বিলম্বের কারণ দেখিয়ে সে প্রায়ই দেরীতে অফিসে উপস্থিত হতো। একদিন তাকে ডেকে আমি জিজ্ঞেস করলাম যে, এ পর্যন্ত সে লটারীতে মোট কত টাকা পেয়েছে। সে জবাবে জানান, চল্লিশ লাখেরও বেশী। তখনকার বিনিময় হার অনুযায়ী সেটি বাংলাদেশী টাকায় এক কোটির মতো। অর্থাৎ, রাজকুমার তখন বাংলাদেশী একজন কোটিপতির সমতুল্য ধনবান। আমি রাজকুমারকে বললাম যে এত টাকার মালিক হওয়ায় তার পক্ষে হুগলি থেকে কলকাতা আসা-যাওয়া করে পিয়নের চাকরী করা মোটেই শোভা পায় না। সে যদি চাকরীতে ইস্তফা দেয় তবে তাদের দেশেরই একজন বেকার যুবকের কর্মসংস্থান হবে, আর আমরাও তার অনিয়মিত হাজিরার যন্ত্রণা থেকে রেহাই পাব। জবাবে সে জানাল যে, এক বছর আগে তার জ্যোতিষী বলেছে যে, তাকে আরও পাঁচ বছর এই চাকরী করতে হবে, অন্যথায় তার বড়রকমের অনিষ্ট হবে। কাজেই, তাকে আরও চার বছর চাকুরী না-করে উপায় নেই।
একদিন হারাধন নামের অন্য এক পিয়ন আমার কাছে এলো নালিশ জানাতে। সে নাটকীয় কায়দায় শুরু করল, ‘স্যার, এটা কেমন বিচার?’ আমি চমকে উঠলাম। মনে করলাম, সে বোধ হয় বিমান কর্তৃপক্ষের কোনো অবিচার সম্পর্কে কিছু বলবে। আমি বিষয়টি জানতে চাইলাম। সে শুরু করল, ‘রাজকুমার ও আমি উভয়েই নিয়মিত লটারীর টিকেট কিনি। রাজকুমার প্রতিবারই প্রথম অথবা দ্বিতীয় পুরস্কার পেয়ে যাচ্ছে, অথচ আমি এ পর্যন্ত কোনো ছোট পুরস্কারও পেলাম না। এর অর্থ কি? এ কেমন বিচার?’ জবাবে আমি বললাম, ‘এ ব্যবস্থা তো প্রাচীনকাল থেকেই চলে আসছে; রাজকুমারগণ হয় ধন-সম্পদের মালিক, আর হারাধনেরা থাকে সর্বহারা হয়ে।’ সে আমাকে এর প্রতিকার কী, তা জিজ্ঞেস করল। আমি তাকে পরামর্শ দিলাম তার নাম পরিবর্তন করে ধনঞ্জয় রাখতে। সে সম্মত হলো না, বলল, ‘বাবা-ঠাকুরদা’র দেয়া নাম কি বদলানো যায়?’
একদিন রাজকুমার আমাকে হুগলি নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দিল। বলল যে, কোনো এক রবিবার খুব সকালে কলকাতা এলে আমাকে তার হুগলির বাড়িতে নিয়ে যাবে। সে একটি মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছে। মন্দিরটি ছোট, কিন্তু খুব সুন্দর। সেটি সে আমাকে দেখাবে। আরও একটি দ্রষ্টব্য স্থানের কথা সে বলল, সেটি হলো ফুরফুরা শরীফের পীর সাহেবের দরগাহ্‌। এর দূরত্ব তার বাড়ি থেকে সামান্য। সেটিও আমি দর্শন করতে পারব। আমি তাকে জানালাম যে তার মন্দিরের প্রতি আমার কোনোরূপ আকর্ষণ নেই। সে যদি মন্দির প্রতিষ্ঠা না করে গ্রামের ছেলেমেয়েদের শিক্ষার উন্নয়নের উদ্দেশ্যে কোনো বিদ্যালয় কিংবা পাঠাগার স্থাপন করত, তবে আমি অত্যন্ত আনন্দের সাথে তা দেখতে যেতাম। আর ফুরফুরার পীরসাহেবের দরগার প্রতি আমার ভক্তি শ্রদ্ধা শূন্যের কোঠায়। অতএব, আমার হুগলি যাওয়ার কোনো ইচ্ছা নেই।
একদিন এক ভদ্রলোক আমার কাছে এলেন বিমানের একটি টিকেট ও একটি মেডিকেল সার্টিফিকেট নিয়ে। টিকেটটি ভদ্রলোকের লন্ডন প্রবাসী শ্যালকের। লন্ডন-কলকাতা-লন্ডন পথের কমমূল্যের ওই ছয়মাস মেয়াদী ফিরতি অংশের মেয়াদ ছিল জুন মাসের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত। তখন চলছিল এপ্রিল মাস। অর্থাৎ, এর মেয়াদ আছে আরও দু’মাস। মেয়াদ উত্তীর্ণ হবার পর এটি ব্যবহার করতে হলে বেশ বড় অঙ্কের অর্থ গচ্চা দিতে হবে। তবে শুধু অসুস্থতার কারণে এটির মেয়াদ বৃদ্ধি করা যায়। তাই, এই ডাক্তারী সনদের অবতারণা। আমি সনদটি পরীক্ষা করে তাঁকে প্রশ্ন করলাম, ‘এটি যিনি ইস্যু করেছেন, তিনি কি ডাক্তার না জ্যোতিষী? কারণ, তিনি সনদে উল্লেখ করেছেন যে, আগামী তিনমাসের মধ্যে তাঁর এই রোগীর আরোগ্য লাভ করার সম্ভাবনা নেই এবং আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে তিনি বিমান যোগে লন্ডন যাত্রার জন্য উপযুক্ত হবেন। এ সমস্ত বক্তব্য দেখে আমার মনে হচ্ছে যে, তিনি বরঞ্চ একজন জ্যোতিষী।’ আমার এরূপ মন্তব্য শুনে তিনি অপ্রস্তুত হলেন এবং কোনো জবাব খুঁজে পেলেন না। তখন তাঁকে আমি অনুরোধ করলাম বিষয়টি খুলে বলতে, যাতে আমি তাঁকে সাহায্য করতে পারি। এরপর তিনি বিস্তারিত বললেন।
তাঁর শ্যালক বহুবছর যাবত লন্ডন প্রবাসী। সেখানে সে ভালোবেসে বিয়ে করেছিল এক ইউরোপীয় মেয়েকে। কিন্তু সে বিয়ে টেকে নি। এখন সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, গুরুজনদের সম্মতি নিয়ে স্বধর্মে স্ববর্ণে বিয়ে করবে শুভদিন দেখে। অভিভাবকগণ কলকাতার এক মেয়ে নির্বাচন করেছেন, যার একবার ভালোবাসার বিয়ে হয়েছিল এক খ্রিস্টান ছেলের সাথে, অভিভাবকদের অসম্মতিসত্ত্বেও। সে বিয়ে টেকেনি। উভয়পক্ষ একমত হয়ে তারিখ ঠিক করেছেন আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহে। কারণ, এর আগে কোনো শুভদিন নেই। সবকিছু শুনে আমি রাজকুমারকে ডাকলাম। বললাম, ‘তোমার কাছে তো বেশ কিছু পাঁজি পুথি, পঞ্জিকা ইত্যাদি আছে। তুমি ভালোভাবে দেখে খুব অল্প সময়ের মধ্যে বিয়ের জন্য একটি শুভদিন বের কর।’ ভদ্রলোককে অনুরোধ করলাম, রাজকুমারের অনুসন্ধান কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে। রাজকুমার অনেক চেষ্টার পর নিকটতম তারিখ পেল মে মাসের শেষ দিকে। সে পঞ্জিকার বর্ণনা অনুযায়ী সেটি যে শুভদিন, তা ভদ্রলোককে বুঝিয়ে দিল। সে বিষয়টিতে খুব উৎসাহ পেল। যাতে অন্যান্য আত্মীয় স্বজনের কোনো সন্দেহ না থাকে, সেজন্য সে পঞ্জিকাটির নাম, এর প্রকাশকের ঠিকানা এবং প্রাপ্তিস্থান লিখে দিল। ভদ্রলোকের নামঠিকানাও সে লিখে রাখল। পরবর্তীতে রাজকুমার খবর নিয়েছিল যে, ওই তারিখেই ওই যাত্রীর শুভ বিবাহ সম্পন্ন হয়েছিল, তাই টিকেটের মেয়াদ বৃদ্ধির কোনো প্রয়োজন হয় নি।
একদিন অত্যন্ত দুশ্চিন্তাগ্রস্ত এক ভদ্রলোক আমাকে বিনয়ের সাথে তাঁকে সাহায্য করতে বললেন। তাঁর ঢাকা ফিরে যাবার জন্য বুকিং আছে তিনদিন পর, কিন্তু হঠাৎ জরুরী খবর এসেছে যে পরদিনই তাঁকে ফিরতে হবে। ব্যর্থ হলে বড় রকমের বিপর্যয় ঘটবে। তিনি আমাকে বললেন, ‘ভাই, আমাকে বিপদ থেকে উদ্ধার করুন।’ আমি তাঁকে জানালাম যে ওই দিনের ফ্লাইট ওভারবুক্‌ড। তবে তাঁর বিশেষ প্রয়োজনের কথা চিন্তা করে অনুরোধ করলাম, ঘণ্টা দু’য়েক পর খবর নিতে। অন্য কোনো কাজ না থাকাতে ভদ্রলোক বিমান অফিসে বসেই নীরবে অপেক্ষা করতে লাগলেন।
কিছুক্ষণপর ওই ফ্লাইটের একটি আসন বাতিল হওয়ার কারণে তাঁর আসন নিশ্চিত করা সম্ভব হলো। তিনি আমাকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করলেন এবং আস্তে করে জানালেন যে, এক সময় তিনি বাংলাদেশের একজন মন্ত্রী ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর আমলে তিনি ছিলেন পূর্তমন্ত্রী। পাসপোর্টে দেখলাম, তাঁর নাম মতিউর রহমান, পেশা ব্যবসা। তখন আমার কল্পনার দৃষ্টিতে ভেসে উঠল একজন মন্ত্রীর ভ্রমণকালীন দৃশ্য। যদি তিনি মন্ত্রিত্ব থাকাকালীন সময়ে কলকাতা এসে থাকেন, তবে নিশ্চয় ব্যক্তিগতভাবে তাঁর বিমান অফিসে আসার প্রয়োজন পড়ে নি। যথাসময়ে তাঁর ট্যুর প্রোগ্রাম চলে গিয়েছে ডেপুটি হাই কমিশনারের কাছে। তিনি নিজে বিমান বন্দরে উপস্থিত হয়ে মন্ত্রীমহোদয়কে অভ্যর্থনা জানিয়েছেন। তাঁর কলকাতা অবস্থানকালীন সময়ে তাঁর জন্য একটি গাড়ী বরাদ্দ থাকত, একজন অফিসারকে দায়িত্ব দেয়া হতো তাঁর ব্যক্তিগত বাজার সদাই এবং অফিসিয়াল কাজকর্মে সার্বক্ষণিক সাহায্য করার জন্য। বুকিং পরিবর্তন ইত্যাদি কাজের জন্য দূতাবাসের লোকজনই বিমান অফিসে যাতায়াত করতেন। পরিশেষে বিদায় সংবর্ধনা দেয়ার জন্য ডেপুটি হাইকমিশনার নিজে তাঁকে বিমান বন্দরে গিয়ে বিদায় জানাতেন। কিন্তু আজ তাঁকে একাই চলতে হচ্ছে। এক হিসাবে তিনি এখন স্বাবলম্বী হয়েছেন।
অনেকদিন আগে কোনো এক দৈনিক পত্রিকায় একটি প্রবন্ধ পড়েছিলাম, যাতে লেখক একজন প্রাক্তন মন্ত্রীর মানসিক বেদনা এবং পরিবর্তিত করুণ পরিস্থিতির শৈল্পিক বর্ণনা দিয়েছিলেন। আমি তা খুব উপভোগ করেছিলাম। কিন্তু আজ মতিউর রহমান সাহেবের অবস্থা দেখে আমার মনে এক অভিনব চিত্র ভেসে উঠল। আমার মনে হলো, তিনি যেন একটি বন্ধন থেকে মুক্তি পেয়েছেন। এখনকার চশমা তাঁর রঙিন নয়, স্বচ্ছ কাচের তৈরী। এখন তিনি স্বাধীন ও স্বাবলম্বী। একা এবং ইচ্ছামতো চলতে পারেন। তা’ছাড়া ব্যক্তি হিসাবে তিনি মহত্ত্ব ও ন্যায়পরায়ণতা অর্জন করেছেন। তিনি যে একজন প্রাক্তনমন্ত্রী, সে পরিচয় তিনি কাজ সম্পন্ন হওয়ার আগ পর্যন্ত দেন নি। তাই, তাঁর মন্ত্রিত্ব থেকে সাধারণের সারিতে ফিরে আসার বিষয়টি মোটেই পতনের নয় বরঞ্চ উন্নয়নের।