একটি মথ, একটি অর্কিড ও ডারউইনের ডায়েরী

খুররম মমতাজ

দ্বিশত জন্মবার্ষিকী স্মারক

সাত সাগর তেরো নদী পার হয়ে ডারউইনের জাহাজ ভিড়লো নাম না জানা ছোট্ট এক দ্বীপে। জাহাজ থেকে তীরে নামলেন ডারউইন। এগিয়ে গেলেন ঝোপঝাড় আর লতাপাতায় ভরা জঙ্গলের দিকে। চোখে পড়লো অচেনা ফুল, অজানা উদ্ভিদ আর নাম না জানা পোকামাকড়। এসবই তিনি একটি করে কুড়িয়ে নিলেন নমুনা হিসেবে। প্রতিটি নমুনার গায়ে লেবেল লাগিয়ে সযত্নে রেখে দিলেন কাঁধের ঝোলায়।
ফুল, পোকা, উদ্ভিদ কুড়োতে কুড়োতে এগিয়ে যাচ্ছিলেন ডারউইন। হঠাৎ তিনি থমকে দাঁড়ালেন। এটা কি? অপূর্ব সুন্দর এক অর্কিড। সাদা রঙ, দীর্ঘ বৃন্ত। অস্বাভাবিক দীর্ঘ। প্রায় এক ফুট লম্বা। এত দীর্ঘ কেন এর বৃন্ত? এত লম্বা ঠোঁটের পাখী তো নেই পৃথিবীতে। তাহলে এই অর্কিডের পরাগায়ণ কিভাবে হয়? ভাবতে ভাবতে অর্কিডের একটি নমুনা কুড়িয়ে ঝোলায় পুরলেন তিনি।
জাহাজে ফিরেও মন থেকে তাড়াতে পারলেন না প্রশ্নগুলো, মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেতে লাগলো। ডেকে এসে দাঁড়ালেন ডারউইন। পশ্চিম দিকে যাচ্ছে জাহাজ। পশ্চিমে কেন, এবার না দেশের ফেরার পালা, উত্তর দিকে যাওয়ার কথা! ক্যাপ্টেনকে জিজ্ঞেস করতে হবে। সমুদ্রের দিকে তাকালেন-সাঁঝের আকাশ, দূরের দিগন্ত আর জাহাজের পেছনে উড়ে আসা আলবাট্রস পাখিটিকে দেখতে দেখতে আবার পুরোনো ভাবনায় ফিরে গেল তাঁর মন। দীর্ঘ বৃন্তের সাদা অর্কিড...পরাগায়ণ...লম্বা ঠোঁটের পাখির কথা ভাবতে লাগলেন। তীব্র বেগে স্রোত কেটে এগোচ্ছে জাহাজ। কালো জলরাশি কোঁকড়ানো চুলের মতো ফুলে ফেঁপে ঘুরতে ঘুরতে চলে যাচ্ছে পিছনে। সেদিকেই তাকিয়ে ছিলেন ডারউইন। আচমকা পরাগায়ণ রহস্যের সমাধান পেয়ে গেলেন। হ্যাঁ মথ, নিশ্চয়ই মথ, অত বড় ঠোঁটের পাখি না থাকতে পারে, কিন্তু মথ থাকা অসম্ভব নয়। কোঁকড়ানো চুলের মতোই শুঁড়টিকে গুটিয়ে রাখতে পারে মথ। ডারউইন তাঁর ডায়েরীতে লিখলেন, ‘এমন মথ নিশ্চয়ই খুঁজে পাওয়া যাবে যার শুঁড়ের দৈর্ঘ্য অর্কিডের দৈর্ঘ্যের সমান। এমন মথ থাকতেই হবে। নইলে এই অর্কিডের পরাগায়ণ হতো না। অর্কিডটি বিলুপ্ত হয়ে যেত। এর টিকে থাকাই প্রমাণ করে এমন একটি মথ অবশ্যই আছে।’ লিখলেন তো ডারউইন। লেখার পর থেকে বহু জীববিজ্ঞানী হন্যে হয়ে খুঁজেছেন মথটিকে। কিন্তু কারও ভাগ্য সদয় হয় নি। মথটির দেখা মেলে নি।
বহু বছর পর লায়োনেল রথচাইল্ড নামে একজন ব্রিটিশ জীববিজ্ঞানী তার ক্যামেরা, তাঁবু-টাঁবু আরও নানারকম সরঞ্জাম নিয়ে হাজির হলেন মাদাগাস্কার দ্বীপে। উদ্দেশ্য নিজের ভাগ্যটাকে একটু যাচাই করে নেওয়া। এই দ্বীপেই ডারউইনের সেই দীর্ঘ বৃন্তের অর্কিড প্রচুর পরিমাণে ফুটে থাকে। গভীর রাতে মশা-প্রুফ পোশাক পরে জঙ্গলে চলে এলেন তিনি। অর্কিডের দিকে ক্যামেরা তাক করে রেকর্ডিং যন্ত্রের সুইচ অন করে দিলেন। তারপর অপেক্ষা করতে লাগলেন। মশা-প্রুফ পোশাক পরলে কি হবে, হাতে আর মুখে মশা কামড়াতে লাগলো। মশা মারতে মারতে শেষরাতের দিকে বেচারার ঝিমুনি এসে গিয়েছিল। ঢুল ঢুলু চোখে হঠাৎ তিনি দেখলেন ফ্রেমের বামদিক দিয়ে বড়সড় একটা মথ উড়ে আসছে। মুহূর্তে তার ঘুম চটকে গেল। বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে দেখলেন মথটি দারুণ এক ম্যাজিসিয়ানের মতো গুটানো শুঁড়টিকে লম্বা করে ফেললো। তারপর কোকাকোলা খাওয়ার মতো করে অর্কিডের বৃন্তের গভীর থেকে মধু খেয়ে উড়ে চলে গেল। দৃশ্যটি ক্যামেরায় নিখুঁতভাবে ধারণ হয়েছে দেখে খুশিতে আত্মহারা হলেন বিজ্ঞানী। খুঁজে পাওয়ার পর নিয়ম অনুযায়ী মথটির একটি বৈজ্ঞানিক নাম দেওয়া হয়েছিল (ঢধহঃযড়ঢ়ধহ সড়ৎমধহরর ঢ়ৎধবফরপঃধ), তবে ‘ডারউইন মথ’ নামেই মথটি সবার কাছে পরিচিত হয়ে উঠলো। এভাবেই ডারউইনের ভবিষ্যদ্বাণীও সত্যি প্রমাণিত হলো।
এই ঘটনার কয়েক বছর পর ১৯১৬ সালে আইনস্টাইনও এক যুগান্তকারী ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। তাঁর ভবিষ্যদ্বাণীর সারমর্ম ছিল এই যে, মহাকাশে আলোকরশ্মি সূর্যের মতো বড় কোনো বস্তুর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বাঁকা হয়ে যাবে। ১৯১৯ সালে পূর্ণ-সূর্যগ্রহণের সময় হাতেকলমে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। আইনস্টাইনের ভবিষ্যদ্বাণী প্রমাণ হতে সময় লেগেছিল তিন বছর এবং অপেক্ষা করতে হয়েছিল একটি পূর্ণ-সূর্যগ্রহণের। আর ডারউইনের ভবিষ্যদ্বাণী প্রমাণ হতে সময় লাগলো একচল্লিশ বছর এবং ভাগ্যদেবীর একটু সদয় হাসি।
সেদিন জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে যুবক ডারউইন নিজেও কি ভেবেছিলেন ভাগ্যদেবী তাঁর প্রতি এতটা সদয় হবে? ভাবেননি বোধহয়। জাহাজে বিশ্বভ্রমণের সুযোগটাই তো তাঁর আরেকটু হলে ফস্কে যাচ্ছিলো। ডেকে দাঁড়িয়ে এসব কথাই ভাবছিলেন ডারউইন। তাঁর চিন্তায় ছেদ পড়লো। রবার্ট ফিটজরয় এসে দাঁড়ালেন ডেকে। তিনিই বিউগলের ক্যাপ্টেন। ডারউইন তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমরা আবার পশ্চিম দিকে যাচ্ছি কেন? দেশে ফিরবো না?’ হা-হা করে হাসলেন ক্যাপ্টেন, মুখ থেকে পাইপ সরিয়ে বললেন, ‘কেন ইয়ং ম্যান? দেশে অপেক্ষায় আছে নাকি কেউ?’ তারপর সিরিয়াস হয়ে বললেন, ‘হ্যাঁ, আরেকবার দক্ষিণ আমেরিকা ছুঁয়ে যাচ্ছি আমরা। ম্যাপে একটু ভুল আছে। সেটা শুধরে নিতে হবে। তাই আবার যাচ্ছি।’ পাইপে টান দিলেন ক্যাপ্টেন, আবার তরল হলো তার গলা। কৌতুকের সুরে বললেন, ‘তবে হ্যাঁ, ইংল্যান্ডে যদি কেউ অপেক্ষায় থাকে তোমার, কোনো রাজকন্যা...তাহলে এখনো বলো। জাহাজের মুখ ঘুরিয়ে উত্তর দিকে রওনা দেব আমরা। হা-হা-হা...।’
রাজকন্যা! ফ্যানীর মুখটা মনে পড়লো ডারউইনের। অনেকদিন পর মনে পড়লো তাকে, অনেক অনেকদিন পর। দীর্ঘশ্বাস গোপন করলেন তিনি। দেশ ছেড়ে চলে আসার প্রথম দিনটির কথা মনে পড়লো তাঁর। ভোঁ বাজিয়ে বন্দর ছেড়েছে জাহাজ, ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে গভীর সমুদ্রের দিকে। তীরে দাঁড়িয়ে আছে অনেক মানুষ। প্রিয়জনদের বিদায় জানাতে এসেছে। সার সার মানুষের ভীড়ে সাদা ফ্রক পরা ছিপছিপে এক তরুণী। হাত নাড়ছে। ডেকের রেলিং ধরে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে ডারউইনও হাত নাড়ছেন। বিষণ্ন চোখে শেষবার দেখে নিচ্ছেন দূরের তটরেখা, এক টুকরো সবুজ, অপস্রিয়মাণ সাদা অর্কিডের মতো ছিপছিপে একটি মেয়ে...।
বিউগলের যাত্রা হলো শুরু। ডারউইন কিভাবে বিউগল জাহাজে ঠাঁই পেলেন তার একটা ইতিহাস আছে। ডারউইনের জন্মের চার বছর আগের ঘটনা। অক্টোবর, ১৮০৫ সাল। ফরাসীরা ইংল্যান্ড আক্রমণের পাঁয়তারা করছে। ইংলিশ চ্যানেলে টহল দিচ্ছে নেপোলিয়নের নৌবহর। ব্রিটিশ নৌবাহিনীও বসে নেই। অ্যাডমিরাল নেলসনের নেতৃত্বে তারা পাঠিয়ে দিয়েছে তাদের যুদ্ধজাহাজ। তুমুল যুদ্ধ হলো ট্রাফালগার উপসাগরে। যুদ্ধে পরাজিত হলেন নেপোলিয়ন। তাঁকে বন্দী করে পাঠিয়ে দেওয়া হলো সেন্ট হেলেনা দ্বীপে।
ফরাসী বিপ্লবের পর থেকেই ইউরোপের দেশগুলো বিশেষ করে ব্রিটেন ফ্রান্স এবং স্পেনের মধ্যে শক্তির রশি টানাটানি চলছিল। ট্রাফালগার যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে সেই রশি টানাটানির অবসান হলো। সাগরে-মহাসাগরে কায়েম হলো ব্রিটিশ নেভীর একাধিপত্য। যুদ্ধ জয়ের পর ব্রিটেন এবার মনোযোগ দিল ব্যবসা-বাণিজ্যের দিকে। প্রথমেই তাদের শকুনচোখ পড়লো দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোর উপর। কিন্তু দক্ষিণ আমেরিকা আর ব্রিটেনের অবস্থান দুই গোলার্ধে। মাঝখানে বিশাল আটলান্টিক মহাসাগর। বাণিজ্য করতে হলে আটলান্টিক পাড়ি দিতে হবে, যেতে হবে দক্ষিণ আমেরিকায়। সেজন্যে চাই নিখুঁত নির্ভুল মানচিত্র।
ব্রিটিশ নৌবাহিনীর সার্ভে ডিপার্টমেন্ট উঠে পড়ে লাগলো মানচিত্র তৈরীর কাজে। দক্ষিণ আমেরিকার মানচিত্র তৈরীর ভার পড়লো বিউগলের উপর। বিউগলের ক্যাপ্টেন ফিটজরয় নতুন এক প্রস্তাব দিলেন। তিনি বললেন, ‘বিউগল যখন যাচ্ছেই অত দূরে, তখন একজন প্রকৃতিবিদকে সাথে নিলে কেমন হয়? আমি ম্যাপ তৈরীর কাজ করবো, প্রকৃতিবিদ প্রকৃতি-বিজ্ঞানের ফিল্ডওয়ার্ক করবেন।’ প্রস্তাবটি অনুমোদন হয়ে গেল। ফিটজরয় খুশি হলেন এই ভেবে যে দীর্ঘ অভিযানে একজন শিক্ষিত ভদ্রলোকের সঙ্গ পাওয়া যাবে, গল্পগুজব করে সময়টা আনন্দে কাটানো যাবে।
শুরু হলো বিউগলের জন্য প্রকৃতিবিদ খোঁজা। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর হেন্সলোর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলো। তিনি খবর পাঠালেন প্রিয় ছাত্র ডারউইনের কাছে। ডারউইন তখন কেমব্রিজ থেকে সদ্য পাস করে বেরিয়েছেন। নানারকম পরিকল্পনা ঘুরছে তাঁর মাথায়। এর মধ্যে একটা হলো ক্যানারী আইল্যান্ডে গিয়ে জিওলজির ফিল্ডওয়ার্ক করা। ক্যানারী আইল্যান্ডে যাওয়ার প্রস্তুতি হিসেবে তিনি তখন ওয়েলসের পাহাড়ে-জঙ্গলে জিওলজির একটি কোর্স করছিলেন। প্রফেসরের ডাক পেয়ে তড়িঘড়ি ফিরে এলেন কেমব্রিজে। বিউগলে চড়ে দক্ষিণ আমেরিকা যাওয়ার প্রস্তাবে নেচে উঠলো তাঁর মন। কিন্তু বাদ সাধলেন ডারউইনের বাবা আর বোনেরা। অতদূরে ডারউইনকে যেতে দিতে তাঁরা রাজি নন। অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে তাঁদের রাজি করিয়ে ক্যাপ্টেনের সাথে দেখা করলেন ডারউইন। সেখানেও বাধা। তাঁকে দেখে ক্যাপ্টেনের মনে হয়েছিল এই যুবক দীর্ঘ সমুদ্র ভ্রমণের ধকল সহ্য করতে পারবে না। তবে তাঁর ভুল ভাঙতে দেরী হয় নি। কিছুদিনের মধ্যেই ক্যাপ্টেনের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব হয়ে গেল।
অনেক বাধাবিপত্তি পেরিয়ে বিউগলের যাত্রা শুরু হয় ২৭ ডিসেম্বর ১৮৩১ সালে। দিন দশেক পরে আফ্রিকার পশ্চিম উপকূলের ছোট ছোট দ্বীপগুলোর কাছে পৌঁছে গেল জাহাজ। এগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে ডারউইনের স্বপ্নের ক্যানারী দ্বীপ। কিন্তু এত কাছে এসেও দ্বীপে নামতে পারলেন না ডারউইন। কারণ তখন ইংল্যান্ডে কলেরা শুরু হয়েছে। সাবধানতার কারণে ক্যানারী দ্বীপের কর্তৃপক্ষ বিউগলের যাত্রীদের জাহাজেই কোয়ারেন্টাইন করে রাখলো, দ্বীপে নামতে দিল না। ডারউইনের ডায়েরী থেকে জানা যায় দ্বীপে নামতে না পেরে খুবই হতাশ হয়েছিলেন তিনি।
আরেকটু দক্ষিণে সান্তিয়াগো দ্বীপ। এখানেই তিনি প্রথম একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূতাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণ করেন। পাহাড়ের গায়ে প্রায় পঁয়তাল্লিশ ফিট উঁচুতে তিনি দেখলেন সামুদ্রিক ঝিনুকের একটি স্তর। এটা দেখে তার মনে নানারকম প্রশ্ন উঁকি দিতে লাগলো। তাহলে কি সমুদ্রের তলদেশ একসময় ওখানে ছিল, অত উঁচুতে? নাকি ভূপৃষ্ঠই ক্রমশঃ উঁচু হয়ে যাচ্ছে আমাদের অলক্ষ্যে? পৃথিবীর ভূভাগ যে সত্যিই নড়াচড়া করে এবং ভূপৃষ্ঠ যে সত্যিই খুব ধীরে ধীরে উঁচুতে উঠে যায়, প্লেট-টেকটোনিঙ (চষধঃব ঞবপঃড়হরপং) তত্ত্বের বদৌলতে, একালের ভূ-বিজ্ঞানীরা একথা এখন ভালোভাবেই জানেন। হিমালয়ের চূড়া প্রতি বছর কত সেন্টিমিটার উুঁচ হচ্ছে, সেটা মাপার নিখুঁত যন্ত্রও এখন তৈরী হয়ে গেছে। কিন্তু ডারউইনের সময় গতিশীল পৃথিবীর ধারণা করাটা খুব সহজ ছিল না। অবশ্য ডারউইন নিজে এই ধারণাটির প্রবক্তা নন। চার্লস লাইয়েল-এর চৎরহপরঢ়ষবং ড়ভ এবড়ষড়মু বইটি পড়ে এরকম ধারণার সঙ্গে আগেই তাঁর পরিচয় হয়েছিল। সান্তিয়াগো দ্বীপে ধারণাটির স্বপক্ষে বাস্তব প্রমাণ পেয়ে তিনি খুব অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। যে দুটি বই ডারউইনকে বিউগলে চড়ে বিশ্বভ্রমণে প্ররোচিত করেছিল, তার একটি হচ্ছে এই বই। অন্যটি আলেকজান্ডার ভন হুমবোল্টের চবৎংড়হধষ ঘধৎৎধঃরাবং বইটি। এ বইটি হুমবোল্টের দক্ষিণ আমেরিকা ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখা।
আটলান্টিক পার হয়ে বিউগল পৌঁছে গেল ব্রাজিলের উপকূলে। প্রথম কয়েকটা দিন রেইন ফরেস্টে ঘোরাঘুরি করে কাটালেন ডারউইন। কাছেই সালভাদর শহর। এখানেই প্রথম দাস প্রথা নিজের চোখে দেখার তিক্ত অভিজ্ঞতা হলো তাঁর। সেদিন সন্ধ্যায় ডিনারের টেবিলে দাসপ্রথার ভালো-মন্দ নিয়ে ক্যাপ্টেনের সঙ্গে তর্ক বেধে গেল। ডারউইন ডায়েরীতে লিখেলেন, ‘ফিটজরয়ের সঙ্গে ঝগড়া হয়ে গেল। রেগে গেলে লোকটা আবোল-তাবোল বকে। দাসপ্রথার পক্ষে যুক্তি দিচ্ছিলেন ক্যাপ্টেন।... আমার কথা শুনে ফিটজরয় একেবারে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন।’ এই জ্বলে ওঠা এতদূর গড়িয়েছিল যে ফিটজরয় ডারউইনের সঙ্গে এক টেবিলে বসে ডিনার করা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। অবশ্য দিনকয়েক পরে নিজের ভুল স্বীকার করে তিনি ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং তাঁদের সম্পর্ক আবার আগের মতো স্বাভাবিক হয়ে যায়।
ব্রাজিলের উপকূল বরাবর মন্টেভিডিও, বুয়েনোস আয়ার্স, ফোর্ট আর্জেন্টিনা, রিও ডি জেনেরো এরকম অনেক জায়গায় নোঙর করেছিল জাহাজ। সারাটা সময় ডারউইন ব্যস্ত ছিলেন জীবজন্তুর ফসিল, উদ্ভিদ, পোকামাকড় সংগ্রহের কাজে। এগুলোর মধ্যে ছিল বড় বড় ইঁদুর জাতীয় প্রাণী, অতিকায় আর্মাডিলোর খোলস, অস্বাভাবিক বড় একটি শ্লথ, নাম না জানা প্রাণীর বড় বড় দাঁত, আরও অনেক কিছু। ফসিলগুলোর মধ্যে এমন সব প্রাণীর ফসিলও ছিল যাদের কথা মানুষ আগে কখনো শোনেনি। ফসিল-বিজ্ঞান বিষয়ে ডারউইন তেমন কিছু জানতেন না। কিন্তু তাঁর কৌতূহলী মনে প্রশ্নের পর প্রশ্ন জমা হতে লাগলো। যে সব প্রাণীর ফসিল পাওয়া যাচ্ছে তাদের আর দেখা যায় না কেন? পরিবেশের পরিবর্তন হওয়ার কারণে কি তারা অবলুপ্ত হয়ে গেছে? পরিবেশ কি সত্যিই এতটা বদলে যায় সময়ের সাথে সাথে? ছোট ছোট যে আর্মাডিলো ইদানিং শিকার করে নিয়ে আসা হচ্ছে ডিনারের জন্য, সেগুলো কি ফসিল হয়ে যাওয়া অতিকায় আর্মাডিলোর বংশধর, নাকি ক্ষুদ্র সংস্করণ? যদি ক্ষুদ্র সংস্করণ হয়ে থাকে তাহলে অতিকায় আকৃতি থেকে তারা এত ক্ষুদ্র হলো কিভাবে? এরকম হাজারো প্রশ্ন তাঁর মনে উঁকি দিতে লাগলো, যার উত্তর কেউ তখন জানতো না। কোনো বইতেও পাওয়া যায় না। ডারউইন তাঁর সংগ্রহের সব নমুনা আর ফসিলগুলো বাঙ বোঝাই করে কেমব্রিজে প্রফেসর হেন্সলোর কাছে পাঠিয়ে দিলেন।
একদিকে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান অন্যদিকে বিচিত্র সব অভিজ্ঞতায় জীবনের ঝুড়ি ভরে উঠতে লাগলো তরুণ অভিযাত্রীর। ফোর্ট আর্জেন্টিনা দেখতে গিয়েছিলেন তিনি। সঙ্গে ছিলেন ক্যাপ্টেন ফিটজরয় ও একজন গাইড। দুর্গ দেখার অভিজ্ঞতাটা বিশেষ সুখের হয় নি। দুর্গের সেনাপতি ছিল খুঁতখুঁতে টাইপের এক মেজর। ডারউইনের হাতে ছিল ছোটখাটো দু’একটা যন্ত্র। মেজর ভাবলো লোকটা বিদেশী গুপ্তচর, দুর্গের ছবি তুলতে এসেছে। ডারউইনকে সে বন্দী করার হুকুম দিয়ে দিল। ফিটজরয় ছিলেন দুর্গের ছাদে। খবর পেয়ে ছুটে এলেন তিনি। অনেক কষ্টে মেজরকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে ডারউইনকে মুক্ত করা হলো।
জাহাজ চলেছে দক্ষিণ দিকে। যেতে যেতে একেবারে দক্ষিণ আমেরিকার লেজের কাছে পৌঁছে গেল বিউগল। এবার বাঁক নিয়ে প্রশান্ত মহাসাগরে পড়বে। এমন সময় ঝড় উঠলো, ভয়াবহ ঝড়। দমকা বাতাসে ফুলে উঠলো সাগর, ফুঁসে উঠলো ঢেউ, ঢেউয়ের পরে ঢেউ। ভাসিয়ে নিয়ে চললো বিউগলকে। ক্যাপ্টেন তীরে ভিড়ানোর চেষ্টা করলেন জাহাজ, সফল হলেন না। অগত্যা উত্তাল সাগরে কোনোমতে ভেসে থাকার চেষ্টা করলে লাগলো বিউগল। এভাবে কয়েক সপ্তাহ ধরে চললো সিরিজ ঝড়। যে কোনো সময় ডুবে যাওয়ার ঝুঁকি নিয়ে স্রোতের টানে ভেসে চললো বিউগল। একসময় ঝড় থামলো, শান্ত হলো প্রকৃতি। তখন আবার নোঙর ফেললো জাহাজ।
রিওতে থাকতেই দেশের চিঠি পেলেন যাত্রীরা। ডারউইনও একটা চিঠি পেলেন। তার বোন ক্যাথারিন লিখেছে চিঠিটা। অনেক খবরের সাথে ছোট্ট একটা খবর, ‘তোমার প্রাক্তন প্রেমিকা ফ্যানী ওয়েনের বিয়ে হয়ে গেছে এক ধনী ব্যবসায়ীর সঙ্গে।’ ডেকে এসে দাঁড়ালেন ডারউইন। ঝকঝকে দিন, সুন্দর নীল আকাশ কাঁচের মতো চকচক করছে। রেলিং-এ ঝুঁকে নীচের দিকে তাকালেন তিনি। প্রশান্ত মহাসাগরের সবুজ জলরাশি, ফ্যানীর চোখের মতোই সবুজ...স্বচ্ছ...। দীর্ঘশ্বাস সামলে নিয়ে পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করলেন তিনি। এটা ফ্যানীর স্মৃতি, তারই দেয়া উপহার। ভাঁজ খুলতেই একপাশে ফ্যানীর ছবি-সবুজ দুটো সরল চোখ মেলে হাসিমুখে তাকিয়ে আছে কিশোরী এক মেয়ে। স্মৃতিকাতর হলেন ডারউইন। স্মৃতির সাগরে ভাসতে ভাসতে কখন হাত ফস্কে টুপ করে পড়ে গেল মানিব্যাগ টেরও পেলেন না তিনি। দু’ফোঁটা চোখের জলও মিশে গেল প্রশান্ত মহাসাগরের অথৈ লোনা জলে। তীব্র বেগে ছুটে চললো জাহাজ গ্যালাপ্যাগোস দ্বীপের দিকে।
গ্যালাপ্যাগোস দ্বীপপুঞ্জ। ছোট-বড় অনেকগুলো দ্বীপ নিয়ে গঠিত এই দ্বীপপুঞ্জ। ডারউইন তাঁর ডায়েরীতে লিখলেন, ‘এ যেন অন্য এক জগৎ। এখানকার অধিকাংশ উদ্ভিদ আক্ষরিক অর্থেই স্থানীয়। অন্য কোথাও এদের দেখা যায় না।’ এখানে বিউগল প্রায় মাসখানেক অবস্থান করেছিল। গ্যালাপ্যাগোস থেকে ডারউইন যেসব নমুনা সংগ্রহ করেছিলেন তার মধ্যে ছিল নানারকম উদ্ভিদ, পোকামাকড়, তেরো প্রজাতির ফিঞ্চ পাখি এবং দুই প্রজাতির কচ্ছপ। তিনি লক্ষ্য করেছিলেন একেক দ্বীপের ফিঞ্চের ঠোঁটের দৈর্ঘ্য এবং আকৃতি একেকরকম। একেক দ্বীপে একেকরকম খাবার পাওয়া যায় বলেই এমনটা ঘটেছে। যে দ্বীপে শস্য দানা সুলভ, সেখানকার ফিঞ্চের ঠোঁট চড়ুই পাখীর মতোই স্বাভাবিক দৈর্ঘ্যের। এই ঠোঁট শস্য দানা খাওয়ার উপযোগী। আবার যে দ্বীপের ফিঞ্চ ফুলের মধু খেয়ে অভ্যস্ত, তাদের ঠোঁট হামিংবার্ডের ঠোঁটের মতো সরু এবং লম্বা। ব্যাপারটা ডারউইনকে ভাবিয়ে তুললো। তিনি ধারণা করলেন শুরুতে মূল ভূখণ্ড থেকে কোনো এক প্রজাতির ফিঞ্চ উড়ে এসে এখানে বসতি গেড়েছে। তারপর ভিন্ন ভিন্ন দ্বীপের ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে মূল প্রজাতি থেকে ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতির উদ্ভব হয়েছে।
তিনি অধ্যাপক হেন্সলোকে লিখলেন, ‘অনেক কিছু সংগ্রহ করেছি। তার মধ্যে বহু প্রজাতির উদ্ভিদ আছে। এখানে এখন ফুল ফোটার সময়। তাই ফুল সহ বিভিন্ন গাছের ডালপালার নমুনা সংগ্রহ করতে পেরেছি। এছাড়া পাখীগুলোর বৈশিষ্ট্য সত্যিই লক্ষ্য করার মতো, এগুলো আমাকে দারুণভাবে কৌতূহলী করে তুলেছে।’ স্থানীয় লোকেরা গ্যালাপ্যাগোসের কচ্ছপ সম্পর্কেও মজার একটা তথ্য দিল। তারা জানালো কচ্ছপের পিঠের খোলসের প্যাটার্ন দেখেই তারা বলে দিতে পারে কচ্ছপটা কোন্‌ দ্বীপের বাসিন্দা। বিউগল অভিযানের ইতিহাসে গ্যালাপ্যাগোস দ্বীপপুঞ্জের ভূমিকা বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে আছে। কেননা এখানেই প্রথম বিবর্তনবাদের মূল সূত্রগুলো ঘন কুয়াশায় ঢাকা আলোকরশ্মির মতো আবছাভাবে ধরা দিয়েছিল ডারউইনের তীক্ষ্ণ অন্তর্দৃষ্টিতে।
সারা পৃথিবী ঘুরে বিউগল স্বদেশে ফিরে এলে ১৮৩৬ সালে। জাহাজ থেকে নেমেই গৃহকাতর ডারউইন সোজা বাড়ীর দিকে রওনা দিলেন। তিনি যখন বাড়ীতে পৌঁছালেন তখন গভীর রাত। অত রাতে কাউকে ডাকাডাকি না করে বাড়ীর এক কোণায় রাতটা পার করে দিলেন তিনি। সকালে নাস্তার টেবিলে হঠাৎ তাকে দেখে সবাই অবাক। বাড়িময় শোরগোল পড়ে গেল। দীর্ঘ পাঁচ বছর পর বাড়ী ফেরার উচ্ছ্বাসটুকু কেটে গেলে ডারউইন তাঁর বিউগল অভিযানের ডায়েরী, নোটবুক এবং জীবজন্তুর নমুনাগুলো নিয়ে বসলেন। অভিযানের সময় যে প্রশ্নগুলো তাঁর মনে দেখা দিয়েছিল তার উত্তর খুঁজতে গিয়ে নতুন আরেক অভিযান শুরু করলেন তিনি। এবারের অভিযানটি শারীরিক নয়, বুদ্ধিবৃত্তিক।
দক্ষিণ আমেরিকার ফসিল এবং গ্যালাপ্যাগোসের ফিঞ্চ পাখী দেখার পর জীবজগৎ যে ক্রমাগত বিবর্তিত হচ্ছে এ ব্যাপারে নিশ্চিত হয়েছিলেন ডারউইন। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো ধারণাটি ডারউইনের নিজস্ব নয়। তার আগে আরও অনেকে, যেমন ফরাসী প্রকৃতিবিদ ল্যামার্ক, এমনকি ডারউইনের দাদা ইরাসমাস ডারউইনও এরকম ধারণার কথা লিখেছিলেন। ডারউইনের কৃতিত্ব এখানেই যে তিনি এর স্বপক্ষে প্রচুর তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করেছেন। এবং এইসব তথ্যপ্রমাণের উপর ভিত্তি করে বিবর্তন কিভাবে, কোন্‌ প্রক্রিয়ায় ঘটে চলেছে তার একটি গ্রহণযোগ্য বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছিলেন। যে বিশেষ প্রক্রিয়ায় প্রকৃতিতে বিবর্তন ঘটে চলেছে, ডারউইন তার নাম দিলেন ্তুঘধঃঁৎধষ ঝবষবপঃরড়হ্থ অথবা ‘প্রাকৃতিক নির্বাচন’। সহজ সরল ভাষায় একে ্তুংঁৎারাধষ ড়ভ ঃযব ভরঃঃবংঃ্থ অথবা ‘যোগ্যতমের বেঁচে থাকা’ বলা যেতে পারে। অর্থাৎ প্রকৃতিতে যে বেশী যোগ্য সে-ই টিকে থাকবে, অন্যেরা লুপ্ত হয়ে যাবে। গ্যালাপ্যাগোসের নানারকম ঠোঁটওয়ালা ফিঞ্চ পাখীগুলোই এর চমৎকার উদাহরণ। যেমন : যে দ্বীপে ফুলের মধু সুলভ সে দ্বীপে দীর্ঘ ঠোঁটযুক্ত ফিঞ্চ টিকে থেকেছে, হ্রস্ব ঠোঁটের ফিঞ্চগুলো লুপ্ত হয়ে গেছে। আবার যে দ্বীপে শস্য দানা বেশী পাওয়া যায়, সেখানে ঘটেছে উল্টোটা। সে দ্বীপে হ্রস্ব ঠোঁটের ফিঞ্চগুলোই টিকে গেছে, লুপ্ত হয়ে গেছে দীর্ঘ ঠোঁটের ফিঞ্চ।
বিরুদ্ধবাদীরা অবশ্য এই যুক্তি মেনে নেয় নি। বিজ্ঞানীদের মধ্যে যারা রক্ষণশীল তারা এবং গির্জার প্রতিনিধি পাদ্রীরা ডারউইনের বিবর্তনবাদের প্রবল বিরোধিতা করেছেন। তারা বলেছেন বিবর্তনের মাধ্যমে এটা ঘটে নি। ঈশ্বর নানারকম ঠোঁটওয়ালা ফিঞ্চগুলোকে ওভাবেই সৃষ্টি করেছেন এবং ওগুলোকে ভিন্ন ভিন্ন দ্বীপে পাঠিয়ে দিয়েছেন। তাদের মতে, জীবজগৎ আদিকাল থেকে যেমন ছিল, এখনও তাই আছে এবং অনন্তকাল ধরে তেমনই থেকে যাবে যেমনভাবে ঈশ্বর তাদের সৃষ্টি করেছেন। এক কথায় জীবজগৎ অপরিবর্তনশীল।
তাঁর মতবাদ যে গির্জার মতবাদের বিরুদ্ধে যাবে এ বিষয়ে প্রথম থেকেই ডারউইন সচেতন ছিলেন। এই কারণে বিবর্তনবাদের পুরো ধারণাটি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার পরেও তা প্রকাশ করার ব্যাপারে বহু বছর ধরে তিনি দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ভুগছিলেন। এরকম সময় আলফ্রেড ওয়ালেস নামে এক তরুণ প্রকৃতিবিদ তাঁকে একটি প্রবন্ধ পাঠান। ডারউইনের মতোই ওয়ালেসও তখন নানা দেশ ঘুরে জীবজন্তুর ফসিল এবং নমুনা সংগ্রহ করছিলেন। এবং তিনিও ডারউইনের মতোই এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিলেন যে বিবর্তনের মধ্যে দিয়েই প্রাণীজগৎ বর্তমান অবস্থায় এসে পৌঁছেছে। ওয়ালেসের প্রবন্ধ পাওয়ার পর ডারউইন কিছুটা আতঙ্কিত হলেন এই ভেবে যে, তাঁর গত বিশ বছরের পরিশ্রমের ফসল প্রায় ছিনতাই হতে চলেছে। খুব বড় আকারের একটা বই লেখার ইচ্ছা ছিল তাঁর। সেই ইচ্ছা আপাততঃ স্থগিত রেখে তিনি তড়িঘড়ি করে তাঁর তত্ত্বের সারমর্মটি লিখে ফেললেন। এই সারমর্মের পরিবর্তত ও পরিবর্ধিত রূপই ঞযব ঙৎরমরহ ড়ভ ঝঢ়বপরবং নামে প্রকাশিত হয় ১৮৫৯ সালে। আজ থেকে দেড়শ বছর আগে।
গ্রেগর মেন্ডেলের পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে হাঁটি হাঁটি পা পা করে জেনেটিক বিজ্ঞানের যাত্রা শুরু হয়েছিল। ডারউইন তখনো বেঁচে ছিলেন। কিন্তু এই বিজ্ঞানের অবিশ্বাস্য অগ্রযাত্রা তিনি দেখে যেতে পারেন নি। এই অগ্রযাত্রায় ডি.এন.এ (উ.ঘ.অ) এবং ডি.এন.এ দ্বারা গঠিত জীন (মবহব)-এর আবিষ্কার উজ্জ্বল মাইলফলকের মতো হয়ে আছে। ইদানিং জীনবিজ্ঞানীরা বিবর্তনের পক্ষে একের পর এক অকাট্য প্রমাণ হাজির করছেন। যে পাখীর ঠোঁট নিয়ে এত কথা, এত বিতর্ক, সেই পাখীর ঠোঁটের অদলবদলের জন্য দায়ী যে জীনটি তাকেও বিজ্ঞানীরা শনাক্ত করেছেন। কিছুকাল আগে ‘হিউম্যান জেনোম প্রজেক্ট’ (ঐঁসধহ এবহড়সব চৎড়লবপঃ) নামে দীর্ঘমেয়াদি একটি প্রজেক্টও তাঁরা শেষ করেছেন। সর্বাধুনিক প্রযুক্তিতে সমৃদ্ধ প্রজেক্টটির শেষে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বিজ্ঞানীরা বলেছেন : বিবর্তনের মধ্য দিয়েই পৃথিবীতে জীববৈচিত্রের সৃষ্টি হয়েছে এবং মানুষ আর দশটা প্রাণীর মতোই এই বিবর্তনের অধীন। ডারউইন ঠিক এই কথাটিই বলেছেন বহুকাল আগে।
আজ থেকে দুইশ’ বছর আগে জন্মেছিলেন চার্লস ডারউইন। এ বছর, ২০০৯ সালে তাঁর জন্মের দ্বিশতবার্ষিকী উদযাপিত হচ্ছে সারা বিশ্বে। লন্ডনের দক্ষিণে যে গ্রামটিতে বসে ঞযব ঙৎরমরহ ড়ভ ঝঢ়বপরবং বইটি লিখেছিলেন তিনি, সেখানে সারা বছর জুড়ে ‘ডারউইন মেলা’ চলছে। পৃথিবীর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়েও এর ঢেউ লেগেছে। সভা, সমিতি, সেমিনার, প্রদর্শনী এবং আলোচনার মধ্য দিয়ে স্মরণ করা হচ্ছে তাঁকে। কোথাও কোথাও সারা বছর ধরে চলবে ডারউইন স্মরণোৎসব।
আমরাও বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি এই মহান বিজ্ঞানীকে।