তিক্ত ঔষধ, রুগ্ন চিকিৎসা ও জিম্মি জনগণ

এস কে এম মনজু-নুল হক

(গত সংখ্যার পর)


বাংলাদেশের ঔষধনীতি (১৯৮২)

ক) অতীত পটভূমি : মিথ্যা কারণ দেখিয়ে ঔষধের মূল্য নির্ধারণ, একই ঔষধ এক দেশে নির্মাতারা ব্যবহার উপযোগী নয় বলে নিষিদ্ধ করছে এবং অন্যদেশে তা চালু করছে, একই ঔষধের মূল্য পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে অযৌক্তিকভাবে কম বেশী করা হচ্ছে, গবেষণা ব্যয় বেশী দেখানো হচ্ছে, লাভের অংকে আয়কর ফাঁকি দেওয়ার জন্য অসম্ভব রকম কম দেখানো হচ্ছে, অপ্রয়োজনীয় ক্ষতিকারক ঔষধ প্রচলন করা হচ্ছে ইত্যাদি নানাবিধ কারণে বিভিন্ন দেশে এই সমস্ত অনিয়ম দূর করার জন্য ঔষধনীতি প্রচলনের প্রচেষ্টা নেয়া হয়েছে। কিন্তু যখনই ঔষধনীতি প্রচলন করার চেষ্টা করা হয়েছে তখনই ঔষধ শিল্পের মালিকরা এবং সেইসঙ্গে কিছুসংখ্যক চিকিৎসকরাও এর বিরুদ্ধাচরণ করে এসেছেন। তাঁদের সেই প্রতিরোধ, প্রচার ও প্রভাব এতই শক্তিশালী ছিল যে অনেক দেশেরই উদ্যোগী সরকার ঔষধনীতি প্রয়োগ করা হতে বিরত থাকতে বাধ্য হয়েছেন। আমরা নিজেদের ও পার্শ্ববর্তী কয়েকটি দেশ সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনায় কিছু ঘটনা তুলে ধরতে চাই যা জানলে বুঝতে অসুবিধা হবে না যে ঔষধনীতি প্রচলন করাটা অনন্ত সংগ্রামেরই অপর নাম।

বাংলাদেশ

ঔষধ সম্পর্কে যে কিছু করা আবশ্যক এই উদ্বেগ স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় মুদ্রিত হয় এ ভাবে-‘অনেক তথাকথিত ঔষধ নির্মাতারা আসলে এ দেশে কাঁচামাল আমদানী করে বোতলজাত করে মাত্র এবং তারা বিদেশী কোম্পানীর মূলতঃ এজেন্ট। ঔষধের মান নিয়ন্ত্রণ দুর্বল এবং নকল ঔষধের ছড়াছড়ি। তাই প্রয়োজন জীবনরক্ষাকারী ঔষধের, পর্যাপ্ত প্রয়োজনীয় ঔষধের, ঔষধ-নিয়ন্ত্রণ আইনের পর্যালোচনা এবং সংশোধনের।’
স্বাধীনতার পর পর প্রধানতঃ বৈদেশিক মুদ্রার অভাবের কারণে টিসিবি-এর মাধ্যমে সরাসরি ইউরোপিয়ান সোস্যালিস্ট দেশগুলি হতে বিনিময় ভিত্তিতে সস্তায় জেনেরিক নামে ঔষধ কেনা হত। কিন্তু তখনই এ সমস্ত ব্যাপারে বিদেশী ঔষধ কোম্পানীগুলি এবং ঔষধ আমদানীকারকরা তাদের ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার কারণে ক্ষুব্ধ হতে থাকে। তারা বিভিন্ন গুজব, বিশেষ করে সস্তায় নিম্নমানের ঔষধ আমদানী করা হচ্ছে ইত্যাদি প্রচার করতে থাকে। সে সময় দেশী-বিদেশী চাপের মুখে সরকার ঔষধ সম্পর্কে বেশী কিছু করার আর সুযোগ পায় নি।
এরপর ১৯৭৭/৭৮-এর দিকে ১৯৪০ সালের ঔষধ আইন পর্যালোচনা ও প্রয়োজনীয় সংশোধনের চেষ্টা করা হয় যাতে করে প্রয়োজনীয় ঔষধ তৈরী, ঔষধ কোম্পানীর স্বেচ্ছাচারিতা, ইত্যাদি বিষয়ে কঠোর আইন প্রণয়ন করা যায়। কিন্তু বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতি, বিদেশী ও স্থানীয় বড় বড় ঔষধ কোম্পানী যার সদস্য, সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং তারা যে শুধুমাত্র ঔষধ-আইন পরিবর্তন রোধে সক্ষম হয় তাই নয় বরঞ্চ তখনকার যিনি স্বাস্থ্যমন্ত্রী এবং এ ব্যাপারে যিনি সক্রিয় ও উদ্যোগী ছিলেন তাঁকে মন্ত্রিত্ব হতে অপসারণ করতেও সফল হয়।
ঠিক এই সময়কালে বহির্বিশ্বে জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট শাখাগুলির মাধ্যমে ঔষধনীতির সহায়ক কিছু কিছু পদক্ষেপ গৃহীত হয় যা উন্নয়নশীল দেশগুলির আগ্রহ বৃদ্ধি করতে সক্ষম হয়। এ ছিল শক্তিশালী বিরোধিতার মুখে উত্তম কিছু পদক্ষেপের স্বাক্ষর।

ভারত

ভারত দু’ভাবে ঔষধ বাজার নিয়ন্ত্রণ করার প্রয়াস পেয়েছে। প্রথমতঃ ১৯৭০ সালে ‘ভারতীয় পেটেন্ট আইন, ১৯৭০’ জারী করার মাধ্যমে কিছু ঔষধ সম্পর্কিত অধিকার সরকার সরাসরি সংরক্ষণ করেছে। এছাড়া পেটেন্ট সময়সীমাও কমিয়ে এনেছে যাতে করে পরবর্তীতে ঔষধের মূল্য কম রাখা যায়। অন্যদিকে ১৯৭৪ সালে হাথি কমিটির গঠন ও পরবর্তীতে এই কমিটির সুপারিশগুলি সরকার প্রয়োগ করার চেষ্টা করেছে। যেমন-অযৌক্তিক সংমিশ্রণের হাজার হাজার ঔষধের পরিবর্তে ১১৬টি মূল উপাদানের একক ঔষধের প্রচলন এবং পর্যায়ক্রমে এসব ক্ষেত্রে জেনেরিক নাম ব্যবহার করা। কিন্তু অন্যান্য দেশের মতই এখানেও বিরোধিতা। বহুজাতিক কোম্পানীগুলি শেষ পর্যন্ত হাইকোর্টের স্মরণাপন্ন হয়ে ১৯৮১ সালে একটি স্থগিতাদেশ লাভ করে যার ফলে হাথি কমিটির সুপারিশগুলি কার্যকর করা সম্ভবপর হয় নি।
পরবর্তীতে অবশ্য এই চিত্রে পরিবর্তন আসে। ১৯৮৬ সালে ুগবধংঁৎবং ভড়ৎ জধঃরড়হধষরংধঃরড়হ, ছঁধষরঃু ঈড়হঃৎড়ষ ধহফ এৎড়ঃিয ড়ভ উৎঁমং ্‌ চযধৎসধপবঁঃরপধষং ওহফঁংঃৎু রহ ওহফরধচ শিরোনামে একটি ঔষধনীতি প্রচলন করা হয়।
এই ঔষধনীতি পর্যায়ক্রমে সংস্কার করা হয় এবং এর যথাযথ প্রয়োগে সরকার তৎপর থাকে। অপ্রয়োজনীয় বা ক্ষতিকারক বিবেচিত হওয়ায় ৪৪ ধরনের (ঈধঃবমড়ৎরবং ড়ভ ঋড়ৎসঁষধঃরড়হ) ঔষধ বাতিল করা হয়। চিকিৎসকদের ব্যবস্থাপত্র যাতে যৌক্তিক হয় সে বিষয়ে সবিশেষ দৃষ্টি দেয়া হয়।
বিদেশী বিনিয়োগে উৎসাহ দেয়া হয় যাতে উন্নতমানের কারিগরি জ্ঞান দেশে বিস্তার লাভ করে। তবে কোন অবস্থাতেই তা’ শতকরা ৫১ ভাগের বেশী হতে পারবে না।
দেশীয় গবেষণা ও উন্নয়ন (জ ্‌ উ) পদ্ধতিতে নতুন কোন ঔষধ উদ্ভাবিত হলে সেই ক্ষেত্রে দশ বছরের জন্য পেটেন্ট-অধিকার কোম্পানীকে দেয়া হয়।
যেসমস্ত ঔষধের ক্ষেত্রে যথেষ্ট বাজার প্রতিযোগিতা আছে, অর্থাৎ কমপক্ষে পাঁচটি ইঁষশ চৎড়ফঁপবৎ অথবা ন্যূনতম দশটি ঋড়ৎসঁষধঃড়ৎং যথাক্রমে একই রাসায়নিক উপাদান বা ঔষধ তৈরী করে এবং কোন কোম্পানীই সর্বোচ্চ খুচরা বাজারের ৪০% শতাংশের বেশী অংশ নিয়ন্ত্রণ করে না সেসব ক্ষেত্রে ঔষধ / রাসায়নিক উপাদান ঔষধের নিয়ন্ত্রিত মূল্য তালিকার অন্তর্ভুক্ত হবে না। তবে এর অর্থ এই নয় যে, ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট গঠন করে ঔষধের দাম ইচ্ছামত বৃদ্ধি করা যাবে। কেননা বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই ঔষধের মূল্যের উচ্চ-সীমানা নির্ধারিত করা আছে, যা অতিক্রম করা যাবে না এবং প্রয়োজনে সরকার বাধ্য হলে মূল্যনির্ধারণী তালিকায় যে কোন ঔষধ বা রাসায়নিক উপাদান অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষমতা সংরক্ষিত রাখে। অর্থাৎ একদিকে নির্মাতাদের ব্যবসায়িক স্বার্থও যেমন রক্ষা করার চেষ্টা আছে তেমনি ভোক্তা স্বার্থও যাতে অন্যায় ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেদিকেও সতর্ক দৃষ্টি রাখা হয়েছে। এটাও বলা হয়েছে যে, কোম্পানীকে ঔষধের ব্যাপারে এড়ড়ফ গধহঁভধপঃঁৎরহম চৎধপঃরপবং বাধ্যতামূলক ভাবে পালন করতে হবে।
এই ঔষধনীতির ফলে কয়েক বছর পূর্বের হিসাব মতে ভারতে ২৫০টি বড় কোম্পানী এবং ৮,০০০-এর মত ক্ষুদ্র কোম্পানী প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এইসব কোম্পানী ৩৫০টির মতন বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান তৈরী করে যা দেশের ৭০% শতাংশ চাহিদা মেটায়, অন্যদিকে খুচরা ঔষধের প্রায় সব চাহিদাই মেটান সম্ভব হচ্ছে।

শ্রীলংকা

১৯৭০ সালে শ্রীলংকা ঔষধবাজার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও একজন সংসদ সদস্য সমন্বিত একটি কমিটির উপর ঔষধনীতি প্রণয়নের দায়িত্ব দেয়া হয়। তাঁরা দেখলেন, পাঁচটি বহুজাতিক কোম্পানী দেশের ৭৫% ঔষধ বাজারজাত করে। বাজারে বহু অপ্রয়োজনীয় ঔষধের ছড়াছড়ি। এই কমিটি বলল সমস্ত কাঁচামাল এবং তৈরী ঔষধ সরকারী ট্রেডিং কর্পোরেশনের মাধ্যমে বিক্রয় করতে হবে, পেটেন্ট আইনের সংস্কার করতে হবে, বাণিজ্যিক (ব্র্যান্ড) নামের পরিবর্তে জেনেরিক নাম ব্যবহার করতে হবে ও সরকার-প্রণীত প্রয়োজনীয় ঔষধের তালিকা অনুযায়ী ঔষধ প্রস্তুত করতে হবে এবং ঔষধের বাণিজ্যিক প্রচার নিষিদ্ধ করতে হবে-শুধুমাত্র সরকার এ দায়িত্ব পালন করবে।
বলাবাহুল্য এটা ছিল ঔষধ সাম্রাজ্যের মনোপলির বিরুদ্ধে জনমুখী এক বিপ্লবাত্মক সংস্কার যা মানতে ঔষধ কোম্পানীগুলি একেবারেই রাজী ছিল না। তারা বিভিন্নভাবে সরকারী এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, প্রচার করতে লাগল। রাষ্ট্রদূতরা তাদের প্রভাব বিস্তার করতে লাগলেন। আমেরিকান রাষ্ট্রদূত প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে জানালেন এই ব্যবস্থার ফলে তাঁর দেশ হতে শ্রীলংকায় খাদ্য-সাহায্য প্রেরণ এক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হবে। শ্রীলংকার জন্য এটা ছিল এক মারাত্মক বিপদ, কেননা সে-দেশে তখন দারুণ খাদ্যাভাব বিরাজমান। সুতরাং সরকারকে পিছু হটতে হল। যদিও এটা করা মানে ঔষধের জন্য আরও বেশী বৈদেশিক অর্থ ব্যয় করা এবং ফলশ্রুতিতে খাদ্য সাহায্যের উপর ক্রমাগত নির্ভরশীল হওয়া।
পরবর্তীতে শ্রীলংকা ঔষধনীতি প্রণয়নে উদ্যোগী হয়। ২০০৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে ঝৎরষধহশধহ ঘধঃরড়হধষ উৎঁম চড়ষরপু নামে একটি খসড়া সরকার প্রকাশ করে। এই খসড়া আরও সমৃদ্ধ করার লক্ষ্যে তারা সবার মতামত চান। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার নীতিমালা অনুসরণ করে এই ঔষধনীতি রচিত হয়। আশা করা যায় দেরিতে হলেও এতদিনে শ্রীলংকা তাদের ঔষধনীতি প্রচলন করেছে। এখন দেখার বিষয় এ নীতি কতখানি প্রয়োগ হয়।

ফিলিপাইনস

প্রেসিডেন্ট কোরাজন একিনো-এর সময়ে ১৯৮৮ সালে ফিলিপাইনস জেনেরিকস এ্যাক্ট (চযরষরঢ়ঢ়রহবং এবহবৎরপং অপঃ ড়ভ ১৯৮৮) সর্বসম্মতিক্রমে সংসদে গৃহীত হয়। এই ঔষধনীতি অনুমোদিত হওয়ার পূর্বে দীর্ঘ দুই বছর ধরে এর উপর বহু আলোচনা হয়। এইসব আলোচনা সভায় ৬১টি বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন। দু’টি বড় ধরনের জাতীয় সেমিনার হয়, সেখানে প্রায় ২৪-২৫টি নিবন্ধের (চড়ংরঃরড়হ চধঢ়বৎং) উপর দীর্ঘ আলোচনা হয়। এছাড়া ছোট ছোট অনেক আলোচনা সভাও বিভিন্ন সময়ে অনুষ্ঠিত হয়। এর প্রতিটি পদক্ষেপে চিকিৎসাশাস্ত্রের কর্তাব্যক্তিদের সম্পৃক্ত করা হয়। মোট কথা সংশ্লিষ্ট সবাইকে অবহিতকরণ ও সম্পৃক্তকরণ-এর মধ্য দিয়ে জাতীয় ঔষধনীতি প্রণয়ন করা হয়। শুধু তাই নয়, ৫৪ জন আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ যারা বিশ্ববাংক, জাতিসংঘ ও ইউরোপিয়ান কম্যুনিটি হতে এসেছেন তাঁদেরকে খসড়া নীতিমালা রচনা ও উৎকর্ষবিধানে নিযুক্ত করা হয়। কিন্তু এতকিছুর পরও চিকিৎসকরা এর বিরোধিতা শুরু করেন। ফিলিপাইনস মেডিকেল এ্যাসোসিয়েশন ও বহুজাতিক কোম্পানীরা সরকারের এই ঔষধনীতি আইনের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে মামলা দায়ের করে। এই মামলা সুপ্রীম কোর্ট পর্যন্ত গড়ায় এবং সেখানে সরকার জয়লাভ করে।
কিন্তু আদালতে জয়লাভ আর জীবনযুদ্ধে জয়লাভ করা যে এক নয় সেটাই প্রমাণিত হল ফিলিপাইনস-এ। ব্র্যান্ডের বদলে জেনেরিক নাম চালু করা হলেও ঔষধের মূল্য কমলো না। কেননা সে দেশে মূল্য নিয়ন্ত্রণের কোন সঠিক পদ্ধতি সরকার প্রণয়ন করেন নি। তদুপরি বিজ্ঞাপন ও প্রচারের উপর সরকারী কোন নিয়ন্ত্রণও ছিল না। ফলে জেনেরিক নামের চাইতে ব্রান্ডের নামের ঔষধের প্রচার টি,ভি, রেডিও, খবরের কাগজে বেশী প্রাধান্য পেল। অন্যদিকে কোম্পানীর ঔষধ-প্রতিনিধিরা ব্র্যান্ড নামেই ঔষধের গুণকীর্তন অব্যাহত রাখতে লাগলেন। যদিও চিকিৎসকরা জেনেরিক নামেই ব্যবস্থাপত্র লিখলেন কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই জেনেরিক নামের ঔষধ বাজারে পাওয়া গেল না। যাও পাওয়া গেল তার মূল্যও ব্র্যান্ড নামের ঔষধের চাইতে বেশী বা একই মূল্য। ফলে জেনেরিক নামে ঔষধ তৈরী ও বিক্রয় করার সরকারী প্রচেষ্টা ঔষধ কোম্পানীদের কূটকৌশলে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।
সত্তর দশকের মাঝামাঝি সময় হতে আনকটাড, ইউনিডো, ইউনিসেফ, এবং বিশেষ করে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা প্রয়োজনীয় ঔষধ সম্পর্কে কিছু উৎসাহব্যঞ্জক পদক্ষেপ গ্রহণের দিকে এগিয়ে আসে। অবশ্য বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার কর্মকর্তারা জানতেন যে স্বাস্থ্য-সম্পর্কিত বিষয়গুলি যদি ধনী দেশের বাণিজ্য ও শিল্পনীতির পরিপন্থী হয় তাহলে এক চরম যুদ্ধক্ষেত্র তৈরী হবে। তাঁরা ভাল জানতেন বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার বার্ষিক বাজেটের অর্ধেকেরও বেশী অর্থায়ন করে বিশ্বের মাত্র বড় বড় ছয়টি ঔষধ কোম্পানী (আমেরিকা, জার্মানী, জাপান, ফ্রান্স, ব্রিটেন ও ইটালীর) এবং আমেরিকা একাই বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা-এর বাজেটের প্রায় এক চতুর্থাংশ অংশ বহন করে।১ তাঁরা এও জানেন যে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা-এর আইনগত কোন ক্ষমতা নেই কাউকে বাধ্য করার, তারা শুধু সুপারিশই করতে পারেন। সেই সুপারিশ মানা না-মানা সংশ্লিষ্ট সরকারের সম্পূর্ণ ইচ্ছাধীন।
পূর্বেও তৃতীয় বিশ্বের ঔষধ সমস্যা নিয়ে হাজার হাজার পাতার কাগজ লেখা হয়েছে, অসংখ্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে ‘বিশ্বস্বাস্থ্য এ্যাসেম্বলি’ (ডড়ৎষফ ঐবধষঃয অংংবসনষু) কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হল বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা। ১৯৭৫ সালে বিশ্বস্বাস্থ্য এ্যাসেম্বলিতে এক বক্তৃতায় ডা. হলডান মাহলার উন্নত এবং উন্নয়নশীল বিশ্বের মধ্যেকার ঔষধ বাজারজাতকরণের রীতিকে অনৈতিক ও স্বাস্থ্যের ক্ষতিকারক বলে নিন্দা করলেন।২
তিনি জানালেন ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন কেমন ভাবে ঔষধের মান নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা ও ফলপ্রসূতা সম্পর্কে অবদান রেখে চলেছে। তিনি প্রত্যয়ের সঙ্গে বললেন ‘এখন প্রয়োজন জাতীয় ঔষধনীতি প্রণয়ন ও প্রচলনে বিভিন্ন দেশকে সাহায্য করা। এটা কেবলমাত্র কারিগরী একটি বিষয় নয়, বরঞ্চ রাজনৈতিক এবং নৈতিক বিষয়। বিভিন্ন দেশের সরকারের যেমন এ ব্যাপারে দায়িত্ব আছে, ঠিক তেমনি বিশ্বের ঔষধ কোম্পানীগুলিরও সামাজিক দায়বদ্ধতা আছে এটা উপলব্ধি করার যে, কেমন করে প্রয়োজনীয় ঔষধের প্রাপ্যতা যোগান দেয়া এবং ভবিষ্যতে আরও উন্নত ঔষধ তৈরী করা যায়।’৩
ইতোমধ্যে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা ‘দুই হাজার সালে সবার জন্য স্বাস্থ্য’ কর্মসূচীর আওতায় কিছু এ্যাকশন প্রোগ্রাম গ্রহণ করে। যদিও প্রায় চার বছর পর এক সভায় মূল্যায়ন করে দেখা গেল ধনী দেশগুলির অসহযোগিতার কারণে সে কর্মসূচীর অনেক কিছুই বাস্তবায়ন সম্ভব হয় নি কিন্তু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রণীত মাত্র ২২৫টি অত্যাবশকীয় ঔষধের (ঊংংবহঃরধষ উৎঁমং) তালিকা সারা বিশ্বের ঔষধনীতি প্রণয়নের ব্যাপারে একটি মাইলফলক হয়ে রইল। এক সমীক্ষায় জানা গেল দরিদ্র দেশগুলি তুলনামূলক ভাবে তাদের বাজেটের একটি বড় অংশ শুধুমাত্র ঔষধ কিনতেই ব্যয় করে, যা কিনা ধনী দেশগুলির তুলনায় অনেক বেশী। উদাহরণস্বরূপ বাংলাদেশ (১৯৮২) তার স্বাস্থ্য বাজেটের প্রায় ৪০% ঔষধ ক্রয়ে ব্যয় করে থাকে, অথচ ব্রিটেনে ব্যয় করে মাত্র ১০%। মজার ব্যাপার হল এই বিপুল ব্যয় দরিদ্রদের জন্য খুব কমই কাজে লাগে। তাই বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা পরামর্শ দিল যে, প্রধানতঃ তৃতীয় বিশ্বের উচিত ঔষধ আমদানী, তৈরী এবং বিপণন ব্যাপারে ২২৫টি প্রয়োজনীয় ঔষধের তালিকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা, কেননা এই ঔষধগুলি দ্বারা সাধারণ এবং মারাত্মক অসুখ নিরাময় করা সম্ভব। বস্তুতঃ ডা. মাহ্‌লার একবার বলেছিলেন, ‘গ্রাম এবং বস্তিবাসীদের জন্য মাত্র অনুর্ধ্ব ৩০ ধরনের ঔষধ দিয়েই আশ্চর্যজনক কাণ্ড ঘটানো সম্ভব।’৪
অপ্রয়োজনীয়, ক্ষতিকারক বা অকার্যকর ঔষধ কঠোর ভাবে নিয়ন্ত্রণ বা বাতিল করলে অর্থের যে সাশ্রয় হবে সেই অর্থ দিয়ে দরিদ্ররা তাদের জন্য অত্যাবশ্যক ঔষধ কিনতে পারবে-এই ছিল বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার উপদেশ। কিন্তু উপদেশ তো দূরের কথা সত্তর দশকের মাঝামাঝি বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা যে অত্যাবশ্যক ঔষধের তালিকা প্রণয়ন করে সেটা সংগ্রহ করতে কয়েক বছর লেগে যায় এ দেশের একজন চিকিৎসকের যিনি প্রথম থেকেই এ ব্যাপারে উৎসাহী ছিলেন। এই ছিল তৃতীয় বিশ্বের দরিদ্র দেশের অবস্থান। আন্তর্জাতিক প্রকাশিত কাগজপত্র সংগ্রহ করতেও অনেক বাধা অতিক্রম করতে হয়। এমনকি দাপ্তরিক ভাবে একটি তালিকা সংগ্রহ করতে বাংলাদেশের বিশেষজ্ঞ কমিটি সমর্থ হয় খসড়া ঔষধনীতি সরকারের কাছে হস্তান্তরের পর, যদিও ভাগ্যক্রমে ১৯৭৮ সালেই ব্যক্তিগত উদ্যোগে একটি তালিকা বিদেশ হতে সরাসরি জোগাড় করা হয় যা খসড়া প্রতিবেদন তৈরীতে সহায়তা করে।

১৯৮২ সনের ঔষধনীতির মূল কথা

ঔষধনীতি প্রণয়নে সরকার সর্বপ্রথম ২৭শে এপ্রিল ১৯৮২ সনে ৮ জনের একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করেন। এই কমিটিতে বহুজাতিক ঔষধ কোম্পানীর কোন প্রতিনিধিকে সঙ্গত কারণেই অন্তর্ভুক্ত করা হয় নি। অভিজ্ঞতা বলে তারা তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থের বাইরে আর কিছু দেখতে চায় না এবং একই কারণেই বাংলাদেশ মেডিক্যাল এ্যাসোসিয়েশনের কর্তাব্যক্তিদের কমিটিতে রাখা সম্ভবপর হয় নি। কেননা তখনকার বিএমএ প্রেসিডেন্ট প্রফেসর ফিরোজা বেগম বহুজাতিক ঔষধ কোম্পানী ফাইজারের ম্যানেজমেন্ট বোর্ডের একজন ডাইরেক্টর ছিলেন এবং জেনারেল সেক্রেটারী, বিএমএ ডা. সারোয়ার আলীও ঐ একই কোম্পানীর একজন সহকারী মেডিক্যাল ডাইরেক্টর ছিলেন। অবশ্য উল্লেখ্য যে, কমিটির অন্য ছয়জন সদস্যই বিএমএ-র সাধারণ সদস্য ছিলেন।
প্রথম দিনের আলোচনা সভায় এই কমিটি তিনটি সিদ্ধান্ত নেয় :

১. প্রকাশিত বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্যাদি পর্যালোচনা করা হবে। কোন ঔষধ বাতিলের সিদ্ধান্ত নিতে হলে সকল সদস্যের ঐকমত্যের প্রয়োজন হবে।
২. খসড়া প্রতিবেদনটি যুক্তিনির্ভর হবে, আকারে ছোট কিন্তু স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং যতদূর সম্ভব বৈজ্ঞানিক দুর্বোধ্য শব্দ পরিহার করতে হবে যাতে সহজে বোধগম্য হয়।
৩. খসড়া প্রস্তুতের সময় সকল রকম গোপনীয়তা রক্ষা করতে হবে।

বিশেষজ্ঞ কমিটি ঐকমত্যে সিদ্ধান্ত নেয় যে, একক উপাদান নিয়ে তৈরীই ঔষধ উত্তম। বিকল্প হিসেবে বিভিন্ন উপাদানের সংমিশ্রণে ঔষধ শুধু ব্যয়ই বৃদ্ধি করে না বরঞ্চ এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বেড়ে যায় এবং ঔষধের স্থায়িত্ব হ্রাস পায়।
বিশেষজ্ঞ কমিটি বিভিন্ন নামের নিবন্ধীকৃত বাজারে প্রচলিত ৪১৭০টি ঔষধ পরীক্ষা করে দেখতে পায় এগুলি মাত্র ১৫০টি উপাদানের তৈরী। এর মধ্যে ১৭০৭ টি ঔষধই অপ্রয়োজনীয়, বেশীর ভাগই ক্ষতিকারক এবং উন্নত বিশ্বে ইতিমধ্যেই নিষিদ্ধ।
কমিটি প্রচলিত ঔষধের বিজ্ঞানভিত্তিক গুণাগুণ এবং দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থার প্রেক্ষিতে ১৬টি মাপকাঠি নির্ধারণ করেন যার ভিত্তিতে ঔষধের মূল্যায়ন করে। এই ১৬টি মাপকাঠির মধ্যে ১২টি বিজ্ঞান ও চিকিৎসাশাস্ত্র ভিত্তিক এবং অবশিষ্ট ৪টি বাংলাদেশের সরাসরি স্বার্থে নির্ধারিত হয়। ১৪ নং মাপকাঠি বিদেশী কোম্পানীকে এ্যানটাসিড ও ভিটামিন্‌স তৈরী হতে বিরত রাখে, যাতে তারা তাদের অভিজ্ঞতা ও অর্থ দ্বারা দেশের জন্য প্রয়োজনীয় ও জীবনরক্ষাকারী ঔষধ তৈরী করতে বাধ্য হয়। অন্যদিকে দেশীয় কোম্পানীগুলি অল্প পুঁজি ও স্বল্প অভিজ্ঞতায় সহজে তৈরী করা যায় এমন ভিটামিন্‌স ও এ্যানটাসিডের বাজারে যাতে প্রবেশ করতে পারে সেটাও লক্ষ্য ছিল এই সিদ্ধান্তের।

ঔষধ তেরীর ১৬টি মাপকাঠি

১. এক এ্যান্টিবায়োটিকসের সঙ্গে অন্যকোন এ্যান্টিবায়োটিক্‌স বা করটিকস্টিরয়েড বা অন্যকোন দ্রব্যের সঙ্গে সংমিশ্রণ করে ঔষধ তৈরী করা নিষিদ্ধ। শিশুদের জন্য ক্ষতিকারক এ্যান্টিবায়োটিক্‌স যেমন টেট্রাসাইক্লিন তরল আকারে তৈরী করা যাবে না।
২. এনালজেসিকসের কোন প্রকার সংমিশ্রণ তৈরী করা যাবে না, কেননা এর কোন থেরাপিউটিক সুবিধা নাই। বরঞ্চ এটা বিষক্রিয়াতে সাহায্য করে যা বিশেষ করে কিডনির জন্য ক্ষতিকারক। লৌহ, ভিটামিন্‌স বা মদের সঙ্গে সংমিশ্রণ করে এনালজেসিকস ঔষধ তৈরী নিষিদ্ধ।
৩. কডেইন কোন সংমিশ্রণে ব্যবহার করা যাবে না, কেননা এটা নেশা সৃষ্টি করে।
৪. সাধারণ ভাবে কোন সংমিশ্রণ ঔষধ তৈরী করা যাবে না, যদি না কোন প্রকারেই কোন একক উপাদানের ঔষধ পাওয়া না যায় অথবা চিকিৎসার জন্য কোন একক উপাদানের ঔষধ মূল্যের দিক দিয়ে যৌক্তিক কিছু নয়। অবশ্য কিছু কিছু ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম থাকবে যেমন, চোখ, চর্ম, শ্বাস-প্রশ্বাস সংক্রান্ত ঔষধ, ম্যালেরিয়ার জন্য ঔষধ এবং ভিটামিন্‌স ও সালফার ড্রাগ ইত্যাদি।
৫. একমাত্র ভিটামিন বি-কমপ্লেঙ ব্যতীত সব ধরনের ভিটামিন্‌স একক উপাদানে আলাদা ভাবে তৈরী করতে হবে। অবশ্য বি-কমপ্লেঙ ভিটামিন্‌সে বি-১২ সংমিশ্রণ করা যাবে না। বি-১২ সব সময়েই একক উপাদানে ইঞ্জেকশন হিসাবে তৈরী করতে হবে। বি-কমপ্লেঙের উপাদানগুলি পৃথক ভাবেও তৈরী করা যাবে। কিন্তু বি-ভিটামিন্‌স-এর সঙ্গে অন্যকোন উপাদান যেমন খনিজ ইত্যাদি সংমিশ্রণ করা যাবে না। এসব ট্যাবলেট, ক্যাপসুল বা ইঞ্জেকশন রূপে তৈরী করা যাবে। ভিটামিন্‌স তরল আকারে তৈরী করা যাবে না কেননা এতে খরচ বেশী পড়ে এবং ঔষধের অপব্যবহার হয়। তবে শিশুদের জন্য তরল মাল্টিভিটামিন্‌স তৈরী করা যাবে, কিন্তু এতে কোন বি-১২, ই, কে অথবা খনিজ মেশান যাবে না।
৬. কোন কাশের সিরাপ, কাশের লজেন্স, গ্রাইপ ওয়াটার, এ্যালকালিস ইত্যাদি তৈরী করা বা আমদানী নিষিদ্ধ। কেননা এইসব ঔষধে আদৌ খুব অল্প পরিমাণে ঔষধিগুণ থাকে। এইসব ঔষধ আমাদানীতে শুধু আমাদের বৈদেশিক টাকার অপচয় হয়।
৭. টনিক, এনজাইম সিরাপ এবং তথাকথিত শক্তিবর্ধক ঔষধ প্রভূত পরিমাণে বিক্রয় হয় মূলতঃ ক্রেতার অজ্ঞতার কারণে। প্যানক্রিয়াটিন এবং ল্যাকটজ ব্যতীত অন্য ঔষধের কোন কার্যকারিতা নেই। কাজেই এখন হতে এ ধরনের ঔষধের আমদানী বা তৈরী সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। অবশ্য প্যানক্রিয়াটিন ও ল্যাকটজ একক উপাদান হিসাবে আমদানী বা তৈরী করা যাবে।
৮. কিছু কিছু ঔষধ গঠনের দিক দিয়ে অন্যঔষধের তুলনায় খুব অল্প পরিমাণে ভিন্ন, কিন্তু রোগ নিরাময় ক্ষমতা একইরূপ। এর ফলে ডাক্তার ও রোগী উভয়েই বিভ্রান্ত হন। এ ধরনের ঔষধ তৈরী নিষিদ্ধ।
৯. যেসমস্ত ঔষধে অতিঅল্প মাত্রায় কিংবা আদৌ কোন ঔষধীগুণ নেই বরঞ্চ কখন কখন তা ক্ষতিকারক এবং যা অপব্যবহারে-দুষ্ট সেসমস্ত ঔষধ নিষিদ্ধ করা হবে।
১০. সমস্ত প্রেসক্রিপশন-রাসায়নিক ও গ্যালেনিক্যাল (এধষবহরপধষ) মিশ্রণ যা ব্রিটিশ ফার্মকোপিয়া বা ফার্মাসিউটিক্যাল কডেঙ-এর সাম্প্রতিক সংস্করণে উল্লেখিত নাই তা নিষিদ্ধ হবে।
১১. নির্দিষ্ট কিছু ঔষধ, যদিও তাদের গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং অপব্যবহারের সম্ভাবনা অজানা নয়, তবুও ঝুঁকি সত্ত্বেও তাদের নিরাময় করার ক্ষমতার জন্য, নিয়ন্ত্রণাধীন ব্যবহারের জন্য স্বল্প পরিমাণে তৈরী করার অনুমতি দেয়া হবে। এই ঔষধগুলি শুধুমাত্র বিশেষজ্ঞ-ডাক্তাররাই প্রেসক্রাইব করতে পারবেন।
১২. সমপ্রকৃতির কিংবা প্রায় কাছাকাছি কোন বিকল্প ঔষধ যা এদেশেই তৈরী করা যায় সে ধরনের কোন ঔষধ আমদানী করা যাবে না। এটা করা হচ্ছে দেশীয় শিল্পকে রক্ষা করার স্বার্থে। অবশ্য যদি কোন ঔষধ চাহিদার তুলনায় স্বল্প মাত্রায় উৎপাদিত হতে থাকে তবে কোন কোন ক্ষেত্রে এই নিষেধের ব্যত্যয় ঘটান হবে।
১৩. ঔষধ তৈরীর মৌল কাঁচামাল যদি যথেষ্ট পরিমাণে দেশেই উৎপাদিত হয় তবে সেটা বা তাঁর বিকল্প কাঁচামাল আমদানী করা যাবে না।
১৪. বহুজাতিক কোম্পানীগুলি যারা এদেশে ঔষধ সরবরাহ করছেন তাদেরকে প্রশংসা করতেই হয়। তাদের উন্নতমানের মেসিনপত্র ও কারিগরী জ্ঞান যাতে গুরুত্বপূর্ণ ও নতুন ধরনের ঔষধ তৈরীতে নিয়োজিত থাকতে পারে সেজন্য এন্টাসিড ও ভিটামিনস-এর মতন সাধারণ ঔষধগুলি তৈরীর দায়িত্ব কেবলমাত্র দেশী কোম্পানীদের হাতেই থাকবে। বহুজাতিক কোম্পানীকে অবশ্য একক উপাদানে ভিটামিন ইঞ্জেকশন তৈরীর অনুমতি দেয়া হবে।
১৫. কোন বিদেশী ব্র্যান্ড ঔষধ লাইসেন্সের মাধ্যমে এদেশে কোন কারখানায় উৎপাদন করা যাবে না, যদি সেই ঔষধ বা সেই ধরনের ঔষধ এদেশে তৈরী বা সহজলভ্য হয়। কেননা এই নিয়মের ফলে ঔষধের অহেতুক মূল্য বৃদ্ধি হয় এবং বিদেশে রয়ালটিও পাঠাতে হয়। এই নীতির আলোকে সমস্ত চালু লাইসেন্স চুক্তি পুনর্মূল্যায়ন করা হবে।
১৬. কোন বহুজাতিক কোম্পানী যাদের নিজস্ব কোন কারখানা এদেশে নাই কিন্তু বাংলাদেশে অবস্থিত কোন কারখানায় টোলের বিনিময়ে ঔষধ তৈরী করতে চায়-সেসমস্ত কোম্পানীকে অনুমতি দেয়া হবে না।

নিষিদ্ধ ঔষধের তালিকা

কমিটি তিন ধরনের ঔষধের তালিকা প্রস্তুত করে যা নির্দিষ্ট মেয়াদান্তে নিষিদ্ধ হিসেবে বিবেচিত হবে।
প্রথম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয় সেসব ঔষধ যেগুলো চিকিৎসা শাস্ত্রমতে ক্ষতিকর, যেমন নোভালজিন, মেঙাফর্ম, বিভিন্ন নামের টেট্রাসাইক্লিন সিরাপ, এনাবোলিক স্টেরয়েড সিরাপ ইত্যাদি। এসব ঔষধ অবিলম্বে নিষিদ্ধ করা এবং তিন মাসের মধ্যে বাজার থেকে তুলে নিয়ে নষ্ট করে ফেলার সুপারিশ করা হয়।
দ্বিতীয় তালিকায় রাখা হয় বিভিন্ন উপাদানের অযৌক্তিক সংমিশ্রণে তৈরী ঔষধ, অর্থাৎ সংমিশ্রিত উপাদানের কোন না কোনটায় যৌক্তিকতা বা উপযোগিতা নেই। এসব মিশ্রণ বাতিল করে শুধুমাত্র দরকারী উপাদান দিয়ে নতুন করে ঔষধ বানাতে পরামর্শ দেয়া হয়-সময় ছয় মাস। ছয় মাসের মধ্যে তৈরী মজুদ বিক্রি করে ফেলার জন্য যথেষ্ট সময়।
তৃতীয় তালিকায় রাখা হয় দু’ধরনের ঔষধ-(ক) যেসব ঔষধের ঔষধিগুণ খুবই সামান্য বা নাই বললেই চলে সেসব, আর (খ) ঔষধিগুণ সম্পন্ন কিন্তু তৈরী করেছে এমন বহুজাতিক কোম্পানী বাংলাদেশে যাদের কারখানা নেই। স্থানীয় কোন একটি ঔষধের কারখানাকে ঠিকাদারী দিয়ে সেখান থেকে নিজেদের কোম্পানীর নামে ঔষধ বানাচ্ছে অথচ স্থানীয়ভাবে এসব ঔষধ অন্যান্যরা উৎপাদন করছে কিংবা আমদানী হয়ে আসছে। এইসব ঔষধ বাতিলের জন্য সময় দেয়া হয় ছয় মাস।

কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ

বিশেষজ্ঞ কমিটির প্রস্তাবে আরও বলা হয় ভিটামিন বা এন্টাসিডের মত সহজ ঔষধ বিদেশী কোম্পানীগুলোর বানানোর এখতিয়ার থাকবে না। সহজ টেকনোলজির এসব ঔষধ বানানোর অধিকার থাকবে কেবল দেশী কোম্পানীর। ভিটামিন ইঞ্জেকশন দেশী ও বিদেশী কোম্পানী তৈরী করতে পারবে। এই তালিকার মুখ্য উদ্দেশ্য হচ্ছে জাতীয় ঔষধ শিল্পকে বিদেশী প্রতিযোগিতা ও বিদেশী পুঁজির অনুপ্রবেশের মুখে অসহায় অবস্থায় বিলুপ্ত হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করা।
ঔষধের পেটেন্ট তৃতীয় বিশ্বের স্বার্থের পরিপন্থী বলে নামের পেটেন্ট সংরক্ষণ প্রথা বাতিল করণের জন্য বিশেষজ্ঞ কমিটি অভিমত দেয়। অবশ্য যদি কেউ ঔষধের কোন কাঁচামাল তৈরীর ফ্যাক্টরী বাংলাদেশে স্থাপন করে তা’হলে কাঁচামাল তৈরির পদ্ধতির পেটেন্ট নির্ধারিত সীমিত সময়ের জন্য সংরক্ষণে বিশেষজ্ঞ কমিটি মত দেয়।
দেশের জনসাধারণকে সুলভমূল্যে উচ্চমানের ঔষধ সরবরাহের উদ্দেশ্যে বিশেষজ্ঞ কমিটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সুপারিশ করে। দেশী অথবা বিদেশী প্রতিটি ঔষধ কোম্পানীকে প্রতিযোগিতামূলক আন্তর্জাতিক বাজার দরে কাঁচামাল আমদানী করতে হবে। বিদেশে লাভ পাচারের উদ্দেশ্যে তথাকথিত উচ্চমানের ভাঁওতা দিয়ে পিতৃ কোম্পানী থেকে কাঁচামাল আমদানী করতে দেয়া বাঞ্ছনীয় নয়, কারণ অধিকাংশ ক্ষেত্রে পিতৃ কোম্পানী কাঁচামাল তৈরী করে না এবং যদি বা করে কাঁচামালের উল্লেখিত দর কৃত্রিম চড়াদাম মাত্র।
প্রথম পর্যায়ে ৪৫টি অত্যাবশকীয় ঔষধকে পর্যায়ক্রমে বাণিজ্যিক নামের পরিবর্তে জেনেরিক নামে উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের জন্যও কমিটি সুপারিশ করে।
১৯৮৩ সালের মধ্যেই দেশে উৎপাদিত প্রতিটি ঔষধের কার্যকারিতা, প্রতিক্রিয়া ও মূল্য উল্লেখ করে একটি ন্যাশনাল ফর্মুলারী সম্পাদনার জন্যও কমিটি সুপারিশ করে। বিশেষজ্ঞ কমিটি এও উপলব্ধি করে যে, শুধু আইন প্রণয়নই যথেষ্ট নয়, যদি না সেটা পুরোপুরি প্রয়োগ করা যায়। এ জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী প্রশাসন পরিদপ্তর। আর তা করতে হলে চাই প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পর্যাপ্ত কর্মী ও অর্থ। সব দেশেই প্রশাসন পরিদপ্তরের আয়ের একটি প্রধান উৎস হচ্ছে ঔষধের নিবন্ধীকরণ ফি। উন্নত দেশে প্রতি ৩-৫ বৎসর পর প্রতিটি নিবন্ধীকরণ নবায়ন করতে হয়। উদাহরণস্বরূপ ব্রিটেনে একটি নতুন ঔষধের নিবন্ধীকরণ ফি প্রায় এক লক্ষ পঞ্চাশ হাজার টাকা এবং পরবর্তী নবায়নের সময় ঐ ঔষধের মোট বিক্রির ০.২৮%, তবে পাঁচ হাজার টাকার কম নয় হিসাবে নবায়ন ফি দিতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশে এর ঠিক বিপরীত অর্থ্যাৎ এখানে লাভের হার অস্বাভাবিক অথচ ঔষধের নিবন্ধীকরণ ফি ছিল তখন মাত্র ১২০ টাকা। এই কমিটি তাই প্রতিটি ঔষধের নিবন্ধীকরণ ফি পাঁচ হাজার টাকা এবং কয়েক বৎসর পর পর নবায়ন করার পদ্ধতি চালু করার সুপারিশ করে।
বিশেষজ্ঞ কমিটি রাতদিন পরিশ্রম করে ১১মে ১৯৮২ সালে স্বাস্থ্য মন্ত্রীর কাছে তাদের প্রতিবেদন পেশ করে। রিপোর্টটি ২৯শে মে ১৯৮২ সালে প্রধান সামরিক প্রশাসক ও তাঁর মন্ত্রী পরিষদ কর্তৃক অনুমোদিত হয়। সরকারী ভাবে ১২ই জুন ১৯৮২ সালে ঔষধ (নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাদেশ জারী করা হয়।

আয়ুর্বেদিক, ইউনানী ও হোমিওপ্যাথিক ঔষধ

আয়ুর্বেদিক, ইউনানী ও হোমিওপ্যাথিক ঔষধগুলি যাতে এ্যালোপ্যাথিক ঔষধের মতন একই আইনের আওতায় আনা যায় সে জন্য সরকার ১৯৮৩ সালে ২৭ ফেব্রুয়ারী ১৩ সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করে। আয়ুর্বেদিক, ইউনানী ও হোমিওপ্যাথিক হতে তিনজন বিশেষজ্ঞ এই কমিটির অন্তর্ভুক্ত হন এবং ড্রাগ প্রশাসনের ডাইরেক্টর ড. নুরুল আনোয়ারকে এই কমিটির আহবায়ক করা হয়।
এই কমিটি সনাতনী ঔষধ প্রস্তুতকারীদেরকে তাদের ঔষধ কারখানার অবস্থান এবং ফর্মুলেশন চেয়ে পাঠালে ১,৩৩০ ঔষধ প্রস্তুতকারী ৭৬,৪৩৪টি ঔষধের ফর্মুলেশন জমা দেয়। অনুসন্ধান করে কমিটি মাত্র ২৭০টি ঔষধ প্রস্তুতকারীর দেখা পায়-যদিও তাদের কারখানাগুলি সেকেলে এবং অনেক সরঞ্জামই তাদের নেই। কমিটি ১৬টি নিবন্ধীকৃত ডিসটিলারীর সন্ধান পায় এবং আরও কয়েকটি ডিসটিলারীর অস্তিত্ব আছে যেগুলি নিবন্ধীকরণ করা হয়নি। এই কোম্পানীগুলি প্রায় ২৫,০০০ ধরনের ঔষধ তৈরী করত। কমিটি ৪৩১টি ঔষধের জন্য সুপারিশ করে।
কমিটি এও দেখতে পায় যে, হোমিও ঔষধে ১০% হতে ২০%, এবং আয়ুর্বেদিকে ৪২% এ্যালকোহলের সংমিশ্রণ থাকে। কমিটি সব ধরনের ঔষধের জন্য সর্বাধিক ৫% এ্যালকোহল সংমিশ্রণের সুপারিশ করে। কর্তৃপক্ষ এসব সুপারিশ গ্রহণ করে এবং উচ্চ এ্যালকোহল মিশ্রিত ঔষধগুলি তিন মাসের মধ্যে ধ্বংস করার নির্দেশ দেয়। তাদেরকে ছদ্ম নামে এ্যালোপ্যাথিক ঔষধ তৈরী বন্ধ করারও আদেশ দেয়।
মৃত্যুসঞ্জীবনী সুরা ও মৃত্যুসঞ্জীবনী সুধা নামে উচ্চ এ্যালকোহল মিশ্রিত দুইটি ঔষধের বিক্রয় তখন তুঙ্গে ছিল। কোম্পানীগুলি এই ঔষধ বিক্রির জন্য প্রায় অলৌকিক নিরাময় ক্ষমতা দাবী করত। যদিও বাস্তব ক্ষেত্রে দেখা গেছে নেশার জন্যই মূলতঃ তরুণ সমাজে এর চাহিদা ছিল প্রচুর। এর ফলে কোম্পানীগুলি যথেষ্ট মুনাফা করত যার খুব কমই জনগণের স্বার্থে ব্যয়িত হত।
স্বভাবতঃই এই ঔষধগুলি নিষিদ্ধ হওয়ায় প্রবল আপত্তি ওঠে এবং এ্যালোপ্যাথিক কোম্পানীর মতই তারাও ঔষধনীতির বিরোধিতা শুরু করে।

ঔষধের মূল্য নিয়ন্ত্রণ

১৯৮৭ সনে জাতীয় ঔষধনীতির শর্ত অনুসারে সরকার চার সদস্যের একটি মূল্য নির্ধারণ কমিটি গঠন করে। এই কমিটি প্রতিটি ঔষধের মূল্য নির্ধারণে নিম্নোক্ত ভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। প্রতিটি ঔষধের ১০০% মূল্য কাঁচামাল আমদানি, প্যাকেজ, ট্যাঙ, পরিবহন খরচ, ইত্যাদির উপর নির্ভরশীল। এ ব্যতীত ৫০% হতে ২২৫ % অতিরিক্ত মূল্য ১০০% মূল্যের উপর আরোপিত হয় নিম্নরূপে :

ক. পুনরায় মোড়কজাত করার জন্য ৫০% অতিরিক্ত যোগ করা হয়।
খ. খাওয়ার ঔষধ যেগুলি এন্টিবায়োটিক্‌স, ক্রিম ও মলম ইত্যাদি ধরনের নয় সেগুলির ক্ষেত্রে ১০০% অতিরিক্ত যোগ করা হবে।
গ. খাওয়ার এন্টিবায়োটিক্‌স, দ্রবণীয় বড়ি, আবড়িত বড়ি, সাপজিটর, ভ্যাজাইনাল বড়ি, ইত্যাদি ১২৫% অতিরিক্ত অর্জন করবে।
ঘ. যেসমস্ত ঔষধের জন্য টার্মিনাল বিশুদ্ধকরণ প্রয়োজন হয় এবং হরমোন জাতীয় ঔষধ, ইত্যাদি ক্ষেত্রে ১৭৫% অতিরিক্ত যোগ করা হবে।
ঙ. যেসমস্ত ঔষধের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ এসেপটিক সুবিধার প্রয়োজন সেখানে ২২৫% অতিরিক্ত যোগ হবে।

এ ছাড়া বিক্রয় শুল্ক, ভ্যাট, ইত্যাদি যোগ করার পর সর্বোচ্চ খুচরা বিক্রয় মূল্য নির্ধারণ করার ব্যবস্থা রাখা হয়।
যেসমস্ত ঔষধ কোম্পানীর মান নিয়ন্ত্রণের উত্তম ব্যবস্থা আছে এবং যাদের গুণগত মানসম্পন্ন ঔষধ তৈরীর ঐতিহ্য আছে তাদের জন্য অতিরিক্ত ১০% মূল্য যোজনের সুবিধা দেয়ার সুপারিশ রাখা হয়। যেসমস্ত কোম্পানী নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ ডাক্তারী গবেষণার জন্য কোন বিশ্ববিদ্যালয় বা ডাক্তারী গবেষণা কাউন্সিলকে দান করবে তাদেরকে আরও ১০% অতিরিক্ত মূল্য যোগ করার সুবিধা দেয়া হবে।
একটি মূল্য উপ-কমিটি গঠনের ব্যবস্থা রাখা হয়, ঔষধনীতিতে যা ছয় মাস অন্তর কাঁচামাল আমদানী ও প্যাকেজের মূল্য, ডলার মূল্য ও শুল্কের তারতম্য বিচার করে ঔষধের মূল্য নিয়ন্ত্রণ করবে।
১৯৮৯ সালে অতিরিক্ত মূল্য প্রদান বিষয়টি আরও বৃদ্ধি করা হয়। ‘ক’ শাখার ঔষধের জন্য ৫০% হতে ৬০%, ‘খ’ শাখার ঔষধের জন্য ১০০% হতে ১২৫%, ‘গ’ শাখার জন্য ১২৫% হতে ১৩০%, ‘ঘ’ শাখার জন্য ১৭৫% হতে ১৮০%, ‘ঙ’ শাখার জন্য ২২৫% হতে ২৪০ % অতিরিক্ত মূল্য বৃদ্ধি করা হয়।
এত কিছুর পরও ঔষধ কোম্পানীগুলি এই মূল্য নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি মোটেও মেনে নিতে পারল না। বিভিন্ন প্রকারে তারা এর বিরোধিতা করতে থাকল। এরই প্রতিধ্বনি দেখি বিশ্বব্যাংকের ১৯৯২ সালের ৮ই জুনের একটি চিঠিতে যা বাংলাদেশ সরকারকে লেখা হয়েছে। যে চিঠিতে লেখা ছিল : “বেশীর ভাগ ঔষধেরই মূল্য নির্ধারিত হয় প্রতিযোগিতামূলক বাজার কৌশল দ্বারা, সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য দ্বারা নয়। সবার জন্য একই মূল্য নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা বিশেষ করে ভাল কোম্পানীকে ক্ষতিগ্রস্ত করে কেননা গুণগত মান সংরক্ষণ ও ভাল ঔষধ তৈরীর ঐতিহ্যের জন্য তারা যথেষ্ট অর্থ ব্যয় করে থাকে। অনেকের মত আমরাও বিশ্বাস করি যে, অনিয়ন্ত্রিত মূল্য ব্যবস্থা মানেই ঔষধের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধি নয়, কেননা প্রতিযোগিতামূলক বাজার অবকাঠামোর জন্য তা সম্ভব নয়।” এফবিসিসিআই (ঋইঈঈও-ঋড়ৎবরমহ ওহাবংঃড়ৎং ঈযধসনবৎ ড়ভ ঈড়সসবৎপব ্‌ ওহফঁংঃৎু)-এর দাবীও তাই, ঔষধের উপর হতে সব ধরনের মূল্য নিয়ন্ত্রণ প্রত্যাহার করতে হবে।
কিন্তু আমরা ভুলে যাই পাশ্চাত্যের দেশগুলিতেও মূল্য নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা রাখতে সেখানকার সরকার বাধ্য হয়েছে। ঔষধে মুনাফা অর্জনই যখন একমাত্র লক্ষ্য হয় উৎপাদনকারীর, জনগণের স্বাস্থ্য ও আর্থিক সামর্থ্য যখন বিবেচনায় স্থান পায় না তখন সরকারকে জনস্বার্থেই কঠোর হতে হয়। কানাডায় মূল্য নিয়ন্ত্রণের জন্য গঠিত হয়েছে প্যাটেন্টেড মেডিসিন প্রাইসেস রিভিউ বোর্ড। ১৯৯৩ সালে আমেরিকাতেও প্রবর্তিত হয় প্রেসক্রিপশন ড্রাগ প্রাইস রিভিউ বোর্ড। কোম্পানীগুলি তাদের ঔষধের মূল্য, মূল্যের বৃদ্ধি, গবেষণা ও উন্নয়ন ব্যয়, উৎপাদন ও বাজারজাত ব্যয় ইত্যাদি বিষয়ে সরকারকে জানাতে বাধ্য থাকবে।
যুক্তরাজ্যেও একই কারণে ফার্মাসিউটিক্যালস প্রাইস রেগুলেশন স্কীম-এর প্রয়োগ করা হয়েছে যাতে করে ঔষধের মূল্য সরকার নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে। পাকিস্তানে ১৯৯৩ সালের মাঝামাঝি একই ধরনের ঔষধের সর্বোচ্চ মূল্য সরকার কর্তৃক নির্ধারিত করা হয়েছে, যাতে দেশী বিদেশী কোন কোম্পানীই একই ধরনের ঔষধের মূল্য পৃথক পৃথক ব্র্যান্ড নাম দেখিয়ে বিভিন্ন মূল্যে আর বিক্রয় করতে পারবে না।
বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচারিত হয়ে থাকল যে ঔষধনীতির ফলে বাতিলকৃত ঔষধগুলি পার্শ্ববর্তী দেশ হতে বাংলাদেশে চোরাচালানী হয়ে আসছে। দি মর্নিং সান এবং দি পালস্‌ তাদের বিরোধিতা জোরদার করে তুললো। ‘প্রায় ২৫-৩০ মিলিয়ন ডলারের মূল্যের ঔষধ প্রতি বছর চোরাচালানী হয়ে বাংলাদেশে আসছে এবং যা ৫-৬ গুণ বেশী মূল্যে বিক্রি হচ্ছে।’৫
ঔষধ কোম্পানীগুলি এই হিসেবের সঙ্গে একমত পোষণ করে বলল যদি বাতিল ঔষধগুলি তাদেরকে তৈরী করার অনুমতি দেয়া হয় তাহলে সরকার শুধু ২০ মিলিয়ন ডলারই রাজস্ব হিসাবে আয় করত। বিএএসএস এর তখনকার প্রেসিডেন্ট বললেন, ‘স্থানীয় কোম্পানীগুলি শুধু ক্ষতিগ্রস্তই হচ্ছে না বরঞ্চ এই নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশ বিপুল পরিমাণে রাজস্ব হতে বঞ্চিত হচ্ছে।’৬
এইসব বিরোধিতা সত্যিকারভাবে মোটেই যুক্তিনির্ভর নয়। এটা অনেকটা এই ধরনের কথা, দেশে আফিম/গাঁজা তৈরী নিষিদ্ধ তাই চোরাচালানী হচ্ছে, ফলে সরকার রাজস্ব হারাচ্ছেন, কাজেই দেশে আফিম/গাঁজা উৎপাদন করা হোক। নিশ্চয়ই কোন দেশের সরকার রাজস্ব আয়ের জন্য হিরোইন উৎপাদনে উৎসাহ যোগাবেন না। নিষিদ্ধ কাশির ঔষধ ফেনসিডিল এখনো বিশাল আকারে চোরাচালানী হয়ে আসছে যা মূলতঃ নেশা হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তাহলে কি দাবী করব এই ঔষধ দেশে উৎপাদন করা হোক, যাতে সহজমূল্যে তরুণরা এই ঔষধ পাবে অন্যদিকে সরকারও রাজস্ব পেতে থাকবে। আর ব্যবসায়ীরা তো মুনাফা অর্জন করবেই, না হলে দেশের আর্থিক উন্নয়ন হবে কী ভাবে?

সরকারী ও বেসরকারী স্বাস্থ্য খাতে পার্থক্য

ঔষধ ব্যবসায়ী মহলের আর একটি দাবী তা’ হল নিয়ন্ত্রণ শুধু সরকারী স্বাস্থ্য খাতেই থাকুক, কিন্তু বেসরকারী খাতে ঔষধ তৈরী, বিক্রয়, আমদানি, মূল্য নির্ধারণ ইত্যাদি বিষয়ে হস্তক্ষেপ কেন? বিএএসএস-এর একজন সাবেক প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘সরকারী স্বাস্থ্যকেন্দ্রেই শুধু অত্যাবশকীয় ঔষধ (এসেনসিয়াল ড্রাগ) দেয়া হোক। কিন্তু বেসরকারী সংস্থার চিকিৎসক যা লিখবেন সেই ঔষধই অত্যাবশকীয় (এসেনসিয়াল), সেটাই আমার জন্য জীবন রক্ষাকারী”।৭
খুব আশ্চর্য দাবী সন্দেহ নেই। কী ভাবে একজন রোগী সরকারী ও বেসরকারী খাতের এই পৃথকীকরণ হতে নিজেকে রক্ষা করবে তার কোন ব্যবস্থা নেই। আর বাস্তবে তা কি সম্ভব? একজন রোগী তো সব দোকানেই যাবেন। সব ডাক্তারের কাছেও যেতে পারেন-না কি? এ সম্পর্কে নাইজেরিয়ার স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সুন্দর একটি উত্তর আছে। কেননা সে দেশেও অত্যাবশকীয় ঔষধ শুধুমাত্র সরকারী স্বাস্থ্য কেন্দ্রে সীমাবদ্ধ থাকুক এ দাবী উঠেছিল। তাঁর জবাব ছিল, ‘ঔষধ ব্যবহৃত হয় রোগের জন্য, কোন খাতের জন্য নয়। যদি আপনারা প্রমাণ করতে পারেন যে, বেসরকারী খাতের লোকজনের অসুখ সরকারী খাতের লোকজনের অসুখের চাইতে পৃথক তাহলে আমরা ঔষধের তালিকা সংশোধন করতে সম্মত আছি। যদি সব ঔষধই একই সঙ্গে বেসরকারী কেন্দ্রে রাখেন তাহলে কি করে তাদের আলাদা রাখা সম্ভব। যে কেউ বেসরকারী কেন্দ্রে গিয়ে যে কোন ঔষধ কিনতে চাইতে পারে।’৮
১৯৯৩ সালে (৬ই মাঘ, ১৩৯৯) ১৯শে জানুয়ারী সংবাদ এক সম্পাদকীয়তে লিখল, ‘বাজারে প্রাপ্ত কোন ঔষধ রোগ নিরাময়কারী কিংবা শুধু মানসিক শান্তির জন্য রোগী মূল্যবান ঔষধ বলে অপ্রয়োজনীয় ঔষধ সেবন করে তা নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক কোন বিবেচনায় ঔষধের ব্যবস্থাপত্র লেখেন। ঔষধনীতির নামে শুধু কোন কোন শ্রেণীর ঔষধ অপ্রয়োজনীয় কিংবা পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে এই আশংকায় ঢালাওভাবে ঔষধ রোগীর জন্য তৈরী বন্ধ করে রোগী বা দরিদ্র দেশবাসী উপকৃত হয়নি। সরকারের তোষামোদকারী কিছু চিকিৎসক লাভবান হয়েছেন কিংবা স্বীয় ব্যবসায়ী স্বার্থ উদ্ধার করেছেন কেউবা। দেশবাসীর অভিজ্ঞতা ভিন্নরূপ, তা হল নিম্নমানের ঔষধে দেশ ছেয়ে গেছে।’ উল্লেখ্য যে, এই লেখাটির শিরোনাম ছিল ‘নিষিদ্ধ ঔষধ তৈরীর অনুমতি প্রসঙ্গে।’ এর আগের বছর ১৫ই অগ্রহায়ণ ১৩৯৮ ‘ঔষধের বাজারে নৈরাজ্য এবং বহুজাতিক কোম্পানী’ শীর্ষক এক সম্পাদকীয়তে সংবাদ লিখেছিল, ‘এই নীতির ফলে ভূঁইফোড় ঔষধ কোম্পানীর ছড়াছড়ি। বাজার নিম্নমানের ঔষধে সয়লাব। রোগীদের জান নিয়ে টানাটানি। দেশী ঔষধের প্রতি ডাক্তারদের আস্থার অভাব। ঔষধের উৎপাদন পদ্ধতি ও মান সম্পর্কে যারা খবরদারী করবেন সরকারের সেই ড্রাগ প্রশাসন বাজারে ঔষধের মান নিশ্চিত করতে ব্যর্থ। দেশে উৎপাদিত ঔষধের বাজারে নৈরাজ্য।’
(১৯৯৩) সালে এক সাক্ষাৎকারে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন যে, পূর্বতন সরকারের ঔষধনীতির ফলে ঔষধ শিল্পে উন্নতি না হওয়ায় চোরাচালানের মাধ্যমে ঔষধ আসছে। এরশাদ সরকারের ঔষধনীতির খপ্পরে পড়ে দেশের নয়টি বহুজাতিক ঔষধ কোম্পানীর দুইটি পাততাড়ি গুটিয়েছে। বাকী সাতটি কোম্পানীর মধ্যেও নাকি পাততাড়ি গুটাবার চিন্তাভাবনা চলছে। বাজার অর্থনীতির স্বার্থে তারা (বহুজাতিক কোম্পানী) চাইছেন মূল্য নিয়ন্ত্রণনীতির অবসান। তাদের সবচেয়ে বড় অভিযোগ হলো তাদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ, যা নাকি আইনের পরিপন্থী।
এদিকে ১২ই অক্টোবর ১৯৯৩ সালে ‘বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতি’ কর্তৃক আয়োজিত এক সেমিনারে প্রধান অতিথি অর্থমন্ত্রী তাঁর ভাষণে বললেন, ‘বিগত সরকারের আমলে প্রণীত ঔষধনীতি ঔষধ শিল্পের মারাত্মক ক্ষতি করেছে। যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব বর্তমান ঔষধনীতির পরিবর্তে একটি নতুন ঔষধনীতি প্রণয়ন ঔষধ শিল্পের উন্নয়নের জন্য জরুরী। ঔষধের মূল্য নিয়ন্ত্রণ নয়, ঔষধের মুক্তবাজার চালু করতে হবে।’ একই সঙ্গে ১৯৯৩ সালের ৩০শে অক্টোবর ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অফ কমার্স এ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের কর্তাব্যক্তিগণ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে বহুজাতিক ঔষধ কোম্পানীদের বিভিন্ন সমস্যার কথা বলেন এবং একই সঙ্গে ঔষধনীতির সংশোধন দাবী করেন।
১৯৯৪ সালের গোড়া দিকে হয়তোবা একাধিক প্রচার, প্রভাব, লবিং এর ফলশ্রুতি হিসাবে সরকার ১১৭টি ঔষধকে নিত্যব্যবহার্য ঔষধ হিসাবে নির্ধারিত করে এবং এর বাইরের সকল ঔষধের মূল্য নিয়ন্ত্রণ প্রত্যাহার করে নেয়, যা ছিল ১৯৮২ সালের গৃহীত ঔষধনীতির বরখেলাপ। “তালিকাবহির্ভূত ঔষধের মূল্য তালিকা নির্ধারণের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কোম্পানীকে দেয়া হয়। ফলে নানা অজুহাতে অনেকটা প্রতিযোগিতা-মূলকভাবে বাড়তে থাকে ঐসব ঔষধের দাম। একই ঔষধের, কেবল কোম্পানীর ভিন্নতর কারণে দাম দাঁড়ায় ভিন্ন ভিন্ন। নিত্যব্যবহার্য ঔষধ হিসাবে যে তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে তাতেও রয়েছে নানা গরমিল। অনেক ঔষধ রয়েছে যেগুলোকে সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে নিত্যব্যবহার্য তালিকার বাইরে রাখা হয়েছে।”৯
ঔষধনীতির উপর আর এক কুঠারাঘাত হয় ১৯৯৪ সালের নভেম্বর মাসে। এক সরকারী আদেশে বলা হয়, ‘ঔষধ উৎপাদনের কাঁচামাল, মোড়ক সামগ্রী এবং তৈরী ঔষধ আমদানীর উপর থেকে বিধিনিষেধ ও নিয়ন্ত্রণ প্রত্যাহার করা হয়েছে। এখন থেকে দেশে পর্যাপ্ত পরিমাণে উৎপাদিত হয় না এমন ঔষধ অবাধে আমদানি করা যাবে।১০
কিন্তু সরকারী এ সব সিদ্ধান্তের প্রতিবাদও হতে লাগল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসী বিভাগের বিশ জন শিক্ষক বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর স্বার্থকে অগ্রাহ্য করে উৎপাদনকারীদের ব্যবসায়িক স্বার্থে ৮২ সালের ঔষধ নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশকে লংঘন করে নিষিদ্ধ ঘোষিত ৮টি ঔষধের পুনঃ উৎপাদন ও বিক্রির অনুমতি দেয়ার সরকারী সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তাঁরা আরো বলেন, মুক্তবাজার অর্থনীতির নামে ঔষধের মূল্য নিয়ন্ত্রণ বাতিল ঔষধ উৎপাদনকারীদের ব্যবসায়িক স্বার্থ ছাড়া কোনোভাবেই বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর স্বার্থ সংরক্ষণ করে না।’১১
এদিকে ঔষধ প্রশাসন কিছু কিছু নিষিদ্ধ ঔষধ তৈরীর অনুমতি দিল। এই আদেশের বিরুদ্ধে একটি সংবাদপত্র লিখল, ‘মাস পাঁচেক আগে ড্রাগ কন্ট্রোল কমিটি এক নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বি-ভিটামিন তরল আকারে উৎপাদন ও বাজারজাত করার অনুমতি দেয়। ২০০ মিলি বোতলজাত ঔষধের খুচরা বিক্রয়মূল্য হয় ৪৩ টাকা। অথচ আগে থেকে এর সমান কার্যক্ষমতাসম্পন্ন ঔষধ-ক্যাপসুল বাজারে ছিল যার মূল্য ছিল মাত্র ৭ টাকা। এতে করে সাধারণ মানুষকে এক শিশি ঔষধ কিনতে বাড়তি ৩৩ টাকার মাশুল জোগাতে হচ্ছে।’১২
বস্তুতঃ ১৯৯৩ সনের মাঝামাঝির পর থেকে বিভিন্নভাবে জানা গেল যে, সরকার ঔষধনীতির বড় রকমের পরিবর্তনে প্রায় স্থিরসিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। বিভিন্ন গুজব ছড়িয়ে পড়ল এইভাবে যে, ঔষধনীতি বাতিল বা বড় ধরনের সংশোধন এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। কেউ কেউ জানালেন বিষয়টি রাষ্ট্রীয়ভাবে ঘোষণার জন্য তারিখ পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। এরই প্রেক্ষিতে ১৯৯৩ সনের ২৮শে অক্টোবর বাংলাদেশে অবস্থিত ইউনিসেফ, বিশ্বব্যাংক এবং বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার তিন প্রধান যৌথ স্বাক্ষরে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ সচিবকে এক পত্র লেখেন। যার মূল বক্তব্য ছিল, “সংবাদপত্রে প্রকাশিত সাম্প্রতিক খবরাখবর দৃষ্টে প্রতীয়মান হয় যে, বাংলাদেশ সরকার ঔষধনীতির সংশোধনের কথা চিন্তা করছে। সংবাদপত্রের ভাষ্যমতে এ প্রকার ধারণার কারণ ঔষধনীতির কিছু কিছু ব্যাপারে সরকারের অসন্তোষ এবং অন্যদিকে ঔষধ শিল্পে নতুন পুঁজি বিনিয়োগ ও মুক্তবাজার নীতির প্রয়োজনীয়তা। অবশ্য এ কথা অনস্বীকার্য যে মাঝে মাঝে এ ধরনের নীতির পরিমার্জন করা প্রয়োজন কিন্তু এ কথাও স্মরণযোগ্য যে, আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা একমত যে, এই ঔষধনীতি এই দেশের স্বাস্থ্য বিষয়ে এক ইতিবাচক প্রভাব রচনা করেছে এবং সেইসঙ্গে ঔষধশিল্পের অর্থনীতিতে এক সহায়তামূলক অবস্থার সৃষ্টি করেছে। এই ঔষধনীতি বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি, সবার জন্য স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এক উজ্জ্বল নেতৃত্বের সৃষ্টি করেছে।”
হয়তোবা ঔষধনীতির পক্ষে দেশে বিদেশে বক্তব্য সৃষ্টি হওয়ায় সরকার শেষ পর্যন্ত ঔষধনীতির আমূল সংস্কারের পথ পরিহার করে। কিন্তু এক শ্রেণীর স্বার্থান্বেষী মহলের প্রভাবে শেষ পর্যন্ত এমন ধরনের পন্থা অবলম্বন করে যা ঔষধনীতির
অস্তিত্বের প্রতি এক বিরাট হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।
১৯৯৭ সালেও ঔষধনীতির প্রতি বিরোধিতা থেমে থাকেনি। সরকারের একজন প্রভাবশালী মন্ত্রী এক সেমিনারে বলেন, পূর্ববর্তী স্বৈরাচারী সরকারের ঔষধনীতি বাতিল করতে হবে। ঔষধ কোম্পানীগুলিও বিরত হয়নি তাদের বিরোধিতা হতে। “জানা গেছে ঔষধ প্রস্তুতকারীদের একটি অংশ প্রথমে নিয়ন্ত্রিত তালিকা পুরোপুরি বাতিল করার প্রস্তাব দিয়েছিল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে। এ নিয়ে গত আগস্টে মন্ত্রণালয়ের একটি বিশেষ বৈঠকও হয়। ঐ বৈঠকে নিয়ন্ত্রিত তালিকা বাতিল না করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ওয়াকেফহাল সূত্র জানায়, ঔষধ প্রস্তুতকারকরা এই তালিকা থেকে
অন্ততঃ ভিটামিন শ্রেণীর ঔষধগুলো বের করে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। আর বাদবাকী ঔষধের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছেন।”১৩
বিবর্তনের মধ্য দিয়েই ঔষধনীতিকে এগিয়ে নিতে হবে। সেজন্য পরিমার্জন, পরিবর্ধন অবশ্যই দরকার, কিন্তু বাতিল ঘোষণা দিয়ে একে ধ্বংস করার মধ্য দিয়ে জনস্বার্থ রক্ষিত হবে না। একে বাঁচানোর জন্য জনগণকে সচেতন থাকতে হবে দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে।
[ চলবে ]

তথ্যসূত্র

১. ডঐঙ চৎড়ঢ়ড়ংবফ চৎড়মৎধসসব ইঁফমবঃ, এবহবাধ,১৯৮০
২. জবঢ়ড়ৎঃ নু ঃযব উ.এ ঞবিহঃু-বরমযঃ ডড়ৎষফ ঐবধষঃয অংংবসনষু
৩. জবঢ়ড়ৎঃ নু ঃযব উ.এ ঞবিহঃু-বরমযঃ ডড়ৎষফ ঐবধষঃয অংংবসনষু
৪. ঞযব সবধহরহম ড়ভ যবধষঃয ভড়ৎ ধষষ নু ঃযব ুবধৎ ২০০০, ডড়ৎষফ ঐবধষঃয ঋড়ৎঁস, ঠড়ষ-২-ঘড়-১, ডঐঙ, ১৯৮১.
৫. ইধহমষধফবংয ইষঁহফবৎ : ঞযব উৎঁম চড়ষরপু, ঞযব গড়ৎহরহম ঝঁহ,১১ উবপ.১৯৯১.
৬. চযধৎসধপবঁঃরপধষং খড়ড়শরহম অনৎড়ধফ, উযধশধ ঈড়ঁৎরবৎ, অঢ়ৎরষ,১৯৯২.
৭. উৎঁম ঙৎফরহধহপব ধিং ধ ফবঃবৎৎবহঃ ঃড় যবধষঃযু মৎড়ঃিয ড়ভ ওহফঁংঃৎু, ঞযব চঁষংব, ২৪ঃয ঔঁহব-৭ ঔঁষু, ১৯৯২.
৮. অহ ওহঃবৎারব িডরঃয ঘরমবৎরধ্থং গরহরংঃবৎ ড়ভ ঐবধষঃয, ঊংংবহঃরধষ উৎঁমং গড়হরঃড়ৎ, ঘড়-১২, ১৯৯০ (ডঐঙ)
৯. দৈনিক জনকন্ঠ, ২৬ নভেম্বর, ১৯৯৪
১০. দৈনিক সংবাদ, ১৪ নভেম্বর, ১৯৯৫
১১. দৈনিক জনতা, ২৫ এপ্রিল, ১৯৯৫
১২. দৈনিক জনকন্ঠ, ২৫ সেপ্টেম্বর, ১৯৯৩
১৩. দৈনিক ভোরের কাগজ, ২৯শে সেপ্টেম্বর, ১৯৯৭