বেলা শেষের পাঁচালী

শাহানারা হোসাইন

[ পূর্ব-প্রকাশিতের পর ]

পাড়ার বান্ধবীদের সাথে আমাদের সামাজিক সম্পর্কও গড়ে উঠেছিল। তাদের কোনো এক অনুষ্ঠান উপলক্ষে দাওয়াত করে খিঁচুড়ি ও মুরগীর মাংস খাইয়েছিলাম। আম্মার রান্না খেয়ে বান্ধবীরা সবাই খুব প্রশংসা করেছিল। আমাদের বান্ধবী মুক্তার মা আম্মার কাছে মুরগীর মাংস রন্ধন প্রণালী শিখতেও এসেছিলেন। আম্মা ও পাড়ার প্রতিবেশী মহিলাগণ সাধারণত গল্প করতেন বারান্দায় ও ছাদে দাঁড়িয়ে। আমাদের ছাদের উত্তর দিকে দরজা ছিল। এই দরজা খুলে মুক্তা, অলকা ও ডলিদের বাড়ীর ছাদে যাওয়া যেতো। আমরা ছাদের এই পথটিই বেশী ব্যবহার করতাম এবং ছাদে দাঁড়িয়ে গল্প করতাম। এক ছুটির দুপুরে আমাদের সখ হলো একটি নাটক করবো। নাটকের কাহিনী হিসেবে বেছে নেয়া হলো দয়মন্তী ও সত্যবানের উপাখ্যান। আমি দয়মন্তীর ভূমিকায় অভিনয় করেছিলাম। নাটকটি অভিনীত হয়েছিল আমাদের ছাদের চিলেকোঠায়।
দাদাভাই বদ্রীদাস টেম্পল স্ট্রীটের বাসার দোতলায় উত্তর দিকের একটি কক্ষে থাকতেন। তাঁর কাছে বহু বন্ধুবান্ধব আসতেন। মাঝেমাঝে তিনি বাসায় ফিরতেন না। আম্মাকে বলে যেতেন ইসলামিয়া কলেজের হোস্টেলে ফজলুর রহমান দাদাভাই-এর বাসায় থাকবেন। আমাদের দাদাভাই-এর পরম বন্ধু ফজলুর রহমান দাদাভাই ছিলেন ইসলামিয়া কলেজের ইংরেজী সাহিত্যের অধ্যাপক এবং কলেজের হোস্টেলের তত্ত্বাবধায়ক। মেধাবী ছাত্র হিসাবে এবং কৃতী শিক্ষক রূপে তাঁর বাঙালী মুসলিম সমাজে খ্যাতি ছিল। ফজলুর রহমান দাদাভাই-এর শ্বশুর গোফরান খান সাহেব সোহরাওয়ার্দী মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন। ইসলামিয়া কলেজের অধ্যাপক ও ছাত্র সমাজ সবাই ছিলেন খুব রাজনীতিসচেতন। এ সময় বেশ কয়েকজন তরুণ আমাদের বাসায় আসা যাওয়া করতেন-মনে হয় দাদাভাই-এর সাথে সমকালীন রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করতে। তাঁরা সবাই ইসলামিয়া কলেজেরই ছাত্র ছিলেন।
দাদাভাই যখন পৃথক মুসলিম জাতিসত্তার রাজনীতি নিয়ে বন্ধুবান্ধবদের সাথে আলোচনায় ব্যস্ত এবং আমাদের অন্য আত্মীয়রাও কেউ কেউ একই ধরনের চিন্তাভাবনা করছেন তখনও আব্বার বন্ধুজনদের অনেকেই হিন্দু সমপ্রদায়ের ছিলেন। পুলিশের চাকরীর ব্যস্ততার ফাঁকে আব্বা তাঁদের সাথে তাস খেলতেন এবং সবাইকে নিয়ে চা খেতেন। এই সময়কালেই তরুণ ও অরুণ সরকারের ছোট বোন কাজলের বিয়ে হয়। আমরা আব্বার এই দুই বন্ধুকে তরুকাকা ও অরুকাকা বলে ডাকতাম। তাদের ছোট বোন ছিল আমাদের প্রিয় কাজল পিসী। এই পিসীর বিবাহ উৎসব খুব জাঁকজমকের সাথে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। আম্মার সাথে আমরা দুই বোন এই বিয়ের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলাম।
কলকাতাসহ ভারতীয় উপমহাদেশের সর্বত্রই এই সময়কালে সামপ্রদায়িক বিষবাষ্প ছড়িয়ে পড়ছিল। আপা আর আমি দুজনেই তখন খুব ছোট ছিলাম-তবু বাড়ীর বড়দের আলাপ আলোচনা শুনে বুঝতে পারতাম সাম্প্রদায়িক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটা পরিবর্তনের হাওয়া বইছে। আমাদের আত্মীয়স্বজনেরা অনেকেই মুসলমানদের পৃথক জাতিতত্ত্ব বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল-কিছুটা দাদাভাইয়ের রাজনৈতিক বিশ্বাসের প্রভাবে, আর কিছুটা চলতি হাওয়ার পন্থি হয়ে। এখন অনুধাবন করি জাগতিক উন্নতির স্বপ্নেও তাঁরা মুসলিম লীগের রাজনৈতিক ধ্যান ধারণার দিকে ঝুঁকে পড়ছিলেন। এসব বিষয়ে আব্বা কখনোই নিজের অভিমত ব্যক্ত করতেন না, তাঁর সাথে মুসলিম লীগ ও কংগ্রেসের রাজনীতি নিয়ে কাউকে সেভাবে আলোচনা করতেও শুনি নি। তবে আমি বয়সে অনেক ছোট হলেও এটা বুঝতাম যে আব্বা ধার্মিক ব্যক্তি হয়েও ধর্মের সর্বজনীনতায় বিশ্বাস করতেন এবং ধর্মের বাহ্যিক আচার অনুষ্ঠান সম্পর্কে কখনোই অন্ধ ছিলেন না।
মানিকতলা থানার বাসায় যখন আমরা বাস করছিলাম তখন দেখতাম হিন্দিভাষী হিন্দু পুলিশ কনেস্টেবলরা আব্বাকে দেখলে মাথা একটু ঝুঁকিয়ে ‘রাম রাম বাবুজী’ সম্ভাষণে সম্মান জানাতো। আব্বাও হাত তুলে তাদের সম্ভাষণের স্বীকৃতি দিতেন। আব্বা বাঁশী বাজাতেন, গান শুনতে ভালোবাসতেন এবং সাহিত্যের প্রতি তাঁর অনুরাগ ছিল অসীম। আমাদের বাসায় আলমারীতে সযত্নে রক্ষিত ছিল রবিঠাকুরের গ্রন্থাবলী ও ইংরেজীতে লেখা বিশ্বসাহিত্যের অন্যান্য কালোত্তীর্ণ উপন্যাস ও কবিতার বই। আব্বা পুলিশ হেড কোয়ার্টার্সে তখন চাকরী করতেন, আগস্ট মাসের ভয়াবহ হিন্দু মুসলিম দাঙ্গার অশনি সংকেত আব্বা নিশ্চয় আগেই টের পেয়েছিলেন। জুন-জুলাই থেকেই আব্বাকে উদাস ও বিষণ্ন মনে অবসর সময়ে বসে থাকতে দেখতাম।
১৯৪৬ সালের আগস্ট মাসে যে ভয়াবহ সামপ্রদায়িক দাঙ্গা কলকাতায় হয়েছিল সে দাঙ্গার জন্য কে বা কোন রাজনৈতিক সংগঠন বেশী দায়ী এ নিয়ে বিতর্ক আজো মনে হয় শেষ হয় নি। তবে দাঙ্গা শুরু হবার বেশ কিছুদিন আগে থেকেই আমাদের পরিবারে রাজনীতি নিয়ে বেশ আলোচনা হতো এবং আম্মাও এ আলোচনায় মাঝে মাঝে যোগ দিতেন। ১৯৪৬ সালেই আম্মার সাথে মুসলিম লীগ আয়োজিত মহিলাদের এক রাজনৈতিক সভায় আপা ও আমি গিয়েছিলাম। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর তখন উপাধি ছিল কায়েদে আজম। এই কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর বোন ফাতিমা জিন্নাহকে সেই সভায় আমরা দেখেছিলাম। আমাদের সাথে আম্মার এক খালাতো বোনও ছিলেন। সভার স্থান বোধহয় ছিল কলকাতার মুসলিম ইন্সটিটিউট। সভার দিন তারিখ মনে নেই। তবে একথা মনে আছে ফাতেমা জিন্নাহ্‌ এই সভায় প্রদত্ত বক্তৃতায় দৃঢ় প্রত্যয়ের সাথে বলেছিলেন, ‘পাকিস্তান আমরা প্রতিষ্ঠিত করবোই!’ তাঁর ভাষণ উর্দুতে হলেও আত্মবিশ্বাস ও প্রত্যয়ী মনোভাব শুধু আমাদের আম্মা খালাকেই নয়-আমাদের দুই বোনকেও উদ্দীপিত করেছিল যদিও দ্বিজাতিতত্ত্ব, দেশবিভাগ এ সবের তাৎপর্য আমরা তখন নিশ্চয়ই বুঝতাম না!
আমাদের ছোট ফুফুর বড় ছেলে শামসু ভাই দাঙ্গা সংঘটিত হওয়ার আগে একবার কলকাতায় আমাদের বাসায় বেড়াতে এসেছিলেন, খুব সম্ভব উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়ে। এবার আর তাঁকে আজাদ হিন্দ ফৌজের মার্চ পাস্টের গান গাইতে শুনি নি। তিনি এবার যে মার্চ পাস্টের গান গাইতেন তা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার স্বপ্নকেন্দ্রিক এবং গানগুলি উর্দু-বাংলা মেশানো শব্দে রচিত। যেমন,

লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান
কবুল মোদের জান পরাণ-
লেফ্‌ট, রাইট, লেফ্‌ট,
আওর ভি জোরসে নও জোয়ান
আনতে হবে পাকিস্তান!

তাঁর মুখে বারবার এ দু’টো লাইনও শুনতাম,

কান মে বিড়ি মু মে পান,
লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান।

শামসু ভাই এবং তার মতো বহু বুদ্ধিদীপ্ত মেধাবী তরুণের হৃদয় সেই সময় পাকিস্তানের স্বপ্নে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল। দু’একজন ব্যতিক্রমধর্মী চিন্তা অবশ্যই করতেন। তাদের নিয়ে সবাই উপহাস করতো। এমনকি মৌলানা আবুল কালাম আজাদের মতো নিষ্ঠাবান ধার্মিক মুসলমান নেতাকেও অনেক বাঙালী মুসলমান সমালোচনা করতেন।
ফেব্রুয়ারী মাসে ভারতে নৌবিদ্রোহ হয়। এই নৌবিদ্রোহী ছিলেন ভারতীয় নৌবাহিনীর হিন্দু মুসলমান সদস্য ও শিক্ষার্থীগণ। বিদ্রোহ শুরু হয় বোম্বাইয়ের নৌঘাঁটিতে। এরপর এই বিদ্রোহে করাচী ও মাদ্রাজ নৌ বন্দরের এবং কলকাতার উপকণ্ঠে অবস্থিত বেহালা মাঝের হাট নৌশিবিরের ভারতীয় শিক্ষার্থী ও সৈন্যগণও যোগদান করে। ফেব্রুয়ারীর নৌ বিদ্রোহে শ্রমিক জনতাও জড়িয়ে পড়েছিল। এই নৌবিদ্রোহের সময় ১৯৪৬-এর ১৬ই ফেব্রুয়ারী হতে ২২ শে ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত। ফেব্রুয়ারী নৌবিদ্রোহের কথা আমি সংবাদপত্রে পড়েছি এবং এ নিয়ে আমাদের বাসায় বড়দের আলোচনা করতেও শুনেছি। ভারতে ব্রিটিশ রাজত্বের দিন যে শেষ হয়ে আসছে একথা তখন মনে হয় শাসক সমপ্রদায় ও শাসিত জনতা উভয় পক্ষই বুঝতে পারছিল। নৌবিদ্রোহের পর একটি ব্রিটিশ মিশন ভারতীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সাথে আলোচনা করার উদ্দেশ্যে ভারতে আসেন। তাঁরা নীতিগত ভাবে ইতিমধ্যে মেনে নিয়েছিলেন যে ভারতবর্ষকে স্বাধীনতা প্রদান করা হবে। এই সম্পর্কে তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ১৯৪৬ সালের ১৫ মার্চ ব্রিটিশ পার্লামেন্টে ঘোষণাও করেছিলেন। তবে ক্ষমতা হস্তান্তরের জটিলতা নিরসনের জন্য ব্রিটিশ মন্ত্রী পরিষদের কয়েকজন সদস্য ক্যাবিনেট মিশন প্ল্যান নামে অভিহিত একটি খসড়া নিয়ে ১৯৪৬-এর ৩ এপ্রিল হতে ১২ মে পর্যন্ত ভারতের হিন্দু মুসলিম নেতাদের সাথে আলোচনা করেন। এই আলোচনা ব্যর্থ হয়। এই ব্যর্থতার জন্য কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগ, মহাত্মাগান্ধী, জওহরলাল নেহরু, জিন্নাহ, সবাই কমবেশী দায়ী-ইতিহাসের এটাই রায়। তবে কেবিনেট মিশন প্ল্যানের ব্যর্থতার পরিণাম বহুলাংশে কলকাতার আগস্ট ’৪৬এর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার জন্য দায়ী-যা পরে ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যত্র ছড়িয়ে পড়ে সৃষ্টি করে আতঙ্কপূর্ণ বিষাক্ত পরিবেশ, যে পরিবেশে সবাই নিরাপত্তাহীনতার শিকার হয় এবং সংঘটিত হয় ধর্মের নামে শতাব্দীর জঘন্যতম মানবতাবিরোধী হত্যাধ্বংসের যজ্ঞ।
ভারতীয় মুসলিম লীগ ওয়ার্কিং কমিটি ১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস বা উরৎবপঃ অপঃরড়হ উধু উদযাপনের জন্য ভারতবর্ষের মুসলমানদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন। বাংলার প্রাদেশিক মন্ত্রিসভার মুখ্যমন্ত্রী তখন জনাব হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। লীগ হাই কমান্ডের নির্দেশ যথাযথভাবে পালনের জন্য সোহরাওয়ার্দী ১৬ আগস্ট ছুটি ঘোষণা করেন। আব্বা সেদিন ভোর সাতটার মধ্যেই অফিসের পিকআপে লালবাজারে চলে গিয়েছিলেন। দাদাভাই ১৫ আগস্ট রাত হতে বাসায় ছিলেন না, তিনি ছিলেন মীর্জাপুর স্ট্রীটে ফজলুর রহমান দাদাভাই-এর বাসায়। বদ্রীদাস টেম্পল স্ট্রীটের বাসায় আম্মা আমাদের দুই বোনকে নিয়ে ছিলেন, আমাদের সাথে অবশ্য নওয়াব ভাই ছিলেন। কয়েকদিন আগে থেকেই কলকাতায় যে থমথমে ভাব বিরাজ করছিল তা যেন ১৬ আগস্টের সকাল থেকে আমি আরো বেশী অনুভব করছিলাম। আম্মা দোয়া দরুদ পড়ছিলেন। মানিকতলা বাজারে দোকান পাট বন্ধ করা নিয়ে ১৬ আগস্ট ভোরে গোলমাল শুরু হয়। মানিকতলার পর শোভাবাজার, শ্যামবাজার, বাগবাজার থেকে দাঙ্গা হাঙ্গামা ছড়িয়ে পড়ে দক্ষিণ কলকাতার ভবানীপুর, কালীঘাট ও টালীগঞ্জ এলাকায়।
সকালবেলা থেকেই আমরা দাঙ্গাহাঙ্গামার খবর পাচ্ছিলাম। আমাদের বাসার সংলগ্ন প্রধান জৈন মন্দিরটির সামনে হিন্দুস্থানী দারোয়ান বন্দুক নিয়ে পাহারা দিচ্ছিলো। তবে ঠিক আমাদের পাড়াতে কোনো দাঙ্গা হয় নি। কারণ এ পাড়ায় আমরাই একমাত্র মুসলিম পরিবার ছিলাম। বিকেল চারটার দিকে তালতলায় বসবাসকারী খালু যিনি গড়ের মাঠের মনুমেন্টের পাদদেশে প্রাদেশিক মুসলিম লীগের আহুত জনসভায় যোগদানের জন্য মুসলমানদের মিছিলে অংশ নিয়েছিলেন তিনি আমাদের বাসায় এলেন। তিনি আমাদেরকে জীবিত দেখে কাঁদতে লাগলেন। তাঁর এ অশ্রুপাত আনন্দের বিহ্বলতার। উত্তর ও দক্ষিণ কলকাতার বহু মুসলমান অঞ্চল বিকেল চারটার মধ্যেই হিন্দুদের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে এবং বহু জানমালের ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে বলে তিনি জানালেন। তাঁর তালতলার বাসায় খালাম্মাও তাঁদের একটি মাত্র কন্যা একা, তাই তিনি কিছুক্ষণ কথা বলে বাসায় চলে গেলেন। এই খালু আবার আম্মার সম্পর্কীয় মামাতো ভাই। খালু চলে যাওয়ার সময় আম্মা কাঁদছিলেন, আর আমরা দুই বোন অধোবদনে দাঁড়িয়ে ছিলাম। আম্মাকে আমি অতিসাহসী মানুষ ভাবতাম, তাই আম্মার কান্না আমার মনকে শঙ্কিত করেছিল!
যতদূর মনে পড়ে ১৬ আগস্ট আব্বা গভীররাতে পুলিশের গাড়ীতেই বাসায় ফিরেছিলেন। পরের দিন ভোরে আবার আব্বা লালবাজার চলে গেলেন। দাদাভাই ফিরলেন বিকেলে, সঙ্গে এক মুসলমান শরণার্থী পরিবার। তাদের বালিগঞ্জের বাসা হিন্দু দাঙ্গাকারীদের দ্বারা আক্রান্ত হওয়ায় তারা নিজ আবাসস্থল পরিত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। দাদাভাইয়ের সাথে তাঁদের পূর্বপরিচয় ছিল কিনা এবং কি যোগসূত্রে তাঁরা আমাদের হিন্দু এলাকায় অবস্থিত বাসায় নিরাপত্তার জন্য আশ্রয় নিয়েছিলেন তা আর এখন আমি মনে করতে পারছি না। ভদ্রলোক অবসরপ্রাপ্ত সামরিক অফিসার, তাঁর সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী, কন্যা ও স্ত্রীর মা। কয়েকদিন আমাদের বাসায় থাকার পর ধৎসু বংপড়ৎঃ এ তাঁরা অন্যত্র চলে যান।
কলকাতার এই মহাদাঙ্গায় ১৬ আগস্ট থেকে ২০ আগস্ট পর্যন্ত বহু লোক নিহত হয়। ২০ আগস্টের পর থেকে বিবদমান উভয়পক্ষের হতাহতের সংখ্যা হ্রাস পায়। এই দাঙ্গা প্রশমনে জনাব সোহরাওয়ার্দীর ভূমিকা সমকালীন সকল মুসলমানই প্রশংসা করেছেন। আমি বড় হয়ে সোহরাওয়ার্দীর বহু প্রশংসা আব্বার মুখে শুনেছি-বিশেষ করে তাঁর সাহস ও দানশীলতার। সোহরাওয়ার্দী অতুলনীয় সাহস ও সমাজসেবকের মানসিকতা দেখিয়ে কলকাতার মুসলমানদের প্রাণ ও ধনসম্পত্তি রক্ষার প্রচেষ্টা করেছিলেন এবং বহুলাংশে তাঁর প্রচেষ্টা সফলও হয়েছিল। তবে উরৎবপঃ অপঃরড়হ উধু ১৬ আগস্টে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করায় তিনি সমসমায়িক কালে এবং আজো অতিসমালোচিত। কলকাতার হিন্দু সমপ্রদায়ের বহু গুণীজনকে ১৯৪৫ হতে ১৯৪৭ পর্যন্ত সোহরাওয়ার্দীকে অতি সামপ্রদায়িক ব্যক্তি বলে নিন্দা করতে শুনেছি। আমি ছোট ছিলাম তবু বুঝতাম কলকাতার হিন্দু সমপ্রদায়ের নিকট তিনি অতিনিন্দিত ব্যক্তি, অন্যদিকে কলকাতার মুসলমান অধিবাসীদের নিকট তিনি ছিলেন তাঁদের জানমালের নিরাপত্তাদানকারী এক পরম শ্রদ্ধেয় ও আস্থাভাজন ব্যক্তিত্ব।
এই মহাদাঙ্গার কারণে আমরা কোনো অসুবিধা বা হয়রানির সম্মুখীন হই নি। আব্বার হিন্দু বন্ধুবান্ধব এবং আমাদের প্রতিবেশীগণ সবাই আমাদের দেখাশোনা করেছেন ও আম্মাকে অভয় দিয়েছেন। তবে আব্বা পুলিশ অফিসারের দায়িত্ব পালন করার জন্য প্রায় সময়ই বাইরে থাকতেন, সেই কাকডাকা ভোরে আব্বা অফিসের গাড়ীতে লালবাজার চলে যেতেন। যখন বাসায় ফিরতেন তখন আমরা দুই বোনই নিদ্রিত থাকতাম। দাদাভাই প্রায় সময় বদ্রীদাস টেম্পল স্ট্রীটের বাসায় থাকতেন না। এ সব কারণে আমরা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতাম না। ছোট হলেও আমি অনুধাবন করতাম একটা ভয়ভীতি ও সন্দেহের প্রবণতা কলকাতার আকাশে বাতাসে বিরাজমান। যদিও তরুকাকা, অরুকাকা এবং আব্বার অন্যান্য বন্ধুরা আমাদের নিরাপত্তার বিঘ্ন কোনোদিন হবে না বলতেন, তবু আব্বাকে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত দেখতাম এবং আম্মাকে ভীত ও শঙ্কিত মনে হতো। দাঙ্গা বন্ধ হলেও চোরাগুপ্তা হামলা কলকাতার এখানে সেখানে প্রায়ই হতো। সবচেয়ে বড় কথা, কলকাতার হিন্দু মুসলমান সমপ্রদায় একে অপরের ওপর বিশ্বাস ও আস্থা অনেকটাই হারিয়ে ফেলেছিল। যার পরিণামে বিনষ্ট হয়ে পড়েছিল বহু বর্ষের হিন্দু-মুসলিম প্রীতি ও সৌহার্দ্যের ঐতিহ্য। ১৯২৬ সালের হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার পর ১৯৪৬ সালেই কলকাতায় দাঙ্গা হয়। দুই দশক পর হিন্দু মুসলমানদের সম্পর্কের এ ধরনের হিংসাত্মক দিকে কেন মোড় নিলো এ বিষয়ে ঐতিহাসিকেরা অনেক কথাই লিখেছেন। তাঁরা দোষারোপ করেছেন শাসক ইংরেজদের বিভেদ ও শাসন করার নীতিকে তাঁরা অভিযুক্ত করেছেন রাজনীতিবিদদের, তাঁরা এই সামপ্রদায়িকতার শেকড় খুঁজে পেয়েছেন সাধারণ মানুষদের দারিদ্র্য, ধর্মান্ধতায় এবং অজ্ঞতায়। আমি ইতিহাস চর্চা করলেও এ বিষয়ে কিছু লিখতে বিরত থাকছি, কারণ আমি লিখছি আমার শৈশবকালের স্মৃতিকে ভিত্তি করে। ১৯৪৬ সালে আমার বয়স কম হলেও আমি ছিলাম এমন একটি বালিকা যে চার বছর বয়স থেকেই বাংলা সংবাদপত্র পড়ার চেষ্টা করেছে এবং বয়স বৃদ্ধি পাবার সাথে সাথে জীবন, মানবিক সম্পর্ক, পরিবেশ, স্বদেশ ও বিশ্বের কোথায় কি ঘটছে সে-বিষয়ে জানার আগ্রহ ও কৌতূহল বেড়েছে
অন্তহীনভাবে। দুই একটি তথ্য ও কয়েকটি সাল তারিখ ব্যতীত কলকাতায় ১৯৪৬ সালের মহাদাঙ্গা সম্পর্কে আমি এ রচনায় যা লিখেছি তা আমার হৃদয়ে সঞ্চিত স্মৃতির ভাণ্ডারে থেকেই নেয়া।
১৯৪৬ সালের আগস্ট মাসের শেষের দিকে আব্বা, আম্মা ও দাদাভাই সিদ্ধান্ত নিলেন বদ্রীদাস টেম্পল স্ট্রীটের বাসা বদল করে পার্ক সার্কাস এলাকায় চলে যাওয়ার। আপা, আমি এবং আমাদের বন্ধু ডলি, মুক্তা ও অলকা যাবার কয়েকদিন আগে থেকেই কাঁদছিলাম। এক বেদনাবিধুর অপরাহ্নে আমরা বদ্রীদাস টেম্পল স্ট্রীটের বাসা ছেড়ে চলে এলাম। তার আগে আম্মা প্রতিবেশিনীদের সাথে কথা বলে বিদায় নিলেন। সবার চোখই সেদিন ছিল অশ্রুসিক্ত। পুলিশের পাহারায় আমরা আচ্ছাদিত ভ্যানে করে পার্ক স্ট্রীটের একটি বাসায় দোতলায় উঠলাম। আমাদের পার্ক স্ট্রীটের বাসায় যাওয়ার সময়কালটা ছিল ১৯৪৬এর সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহ। দাঙ্গা শুরু হওয়ার পর থেকে আমাদের স্কুলে যাওয়া বন্ধ ছিল। আমরা দুই বোন পড়াশোনা করছি কিনা এ নিয়েও দাদাভাই বা আম্মা কোনো আগ্রহ প্রকাশ করতেন না। সেই পরেশনাথ মন্দির-বাগানে ফুলতোলা, বন্ধু অলকা, মুক্তা, ডলিদের নিয়ে যে সুখময় জীবন, প্রাত্যহিক জীবনের সেই স্বাভাবিক গতিধারা হঠাৎ করেই যেন আমাদের জন্য রুদ্ধ হয়ে গেলো। হিন্দু-মুসলমান, হিন্দুস্থান-পাকিস্তান-এ সবের তাৎপর্য কি আর আমি তখন বুঝতাম! তবু জীবনের গতিধারার আকস্মিক পরিবর্তনে কেমন যেন ভীতি বোধ করতাম, নিশ্চলতা যেন বুকের মধ্যে পাথরের মতো চেপে থাকতো। ইতিহাসের গতিধারা অনেক সময় এমনিভাবেই পরিবর্তিত হয় এবং এ পরিবর্তনের কারণ ও প্রকৃতি অবুঝ শিশু-কিশোরদের বোধগম্য না হলেও পরিবর্তনকারী ঘটনাবলী তাদের হৃদয়ে রেখে যায় অবিস্মরণীয় বহু স্মৃতি, যা পরিণত বয়সেও তাদের মনকে আলোড়িত করে।
আমরা সেপ্টেম্বরে পার্ক স্ট্রীটের মনোরম পরিবেশে অবস্থিত একটি বাড়ীর দোতলায় এসে উঠেছিলাম। বাসাটা বেশ বড়। তিন দিকেই বারান্দা। আমীর আলী পার্ক পেরিয়ে ডান দিকের বড় রাস্তা দিয়ে বেশ কিছু দূর হেঁটে এ বাসায় যেতে হতো। বাসার চারদিকই ছিল সবুজ বৃহৎ বৃক্ষের সারি এবং শ্যামল তৃণে ঢাকা গোল বা চৌকোনা চত্বর। আমীর আলী পার্ক বাসাটির একটু দূরেই অবস্থিত, তাছাড়া আমাদের বাসার প্রায় সংলগ্নই ছিল ছোট আরেকটি পার্ক। বড় বড় সবুজ বৃক্ষ বিশাল ডালপালা মেলে দিয়ে এ স্থানটিকে যেন শ্যামস্নিগ্ধ স্নেহের ছায়া দিয়ে আবৃত করে রেখেছিল। পার্ক সার্কাসের সম্ভ্রান্ত মুসলমান এলাকা। তাই এখানে বিকেলে বেড়াতে যাওয়া সম্পর্কিত কোন নিষেধ ছিল না। আব্বা তখন খুব ব্যস্ত থাকতেন। অবসর সময়ে দাদাভাই ও আম্মার সাথে কথা বলতেন। যে সমস্যা নিয়ে তাঁদের মধ্যে আলোচনা হতো সেটা ছিল বাসা নিয়েই। পার্ক স্ট্রীটের এই বাসাতে আমরা সাময়িকভাবে থাকার জন্য এসেছিলাম। আমাদের স্থায়ীভাবে থাকার জন্য সুন্দর ও ভদ্র পরিবেশে এবং মুসলমান এলাকায় বাড়ী খুঁজে পেতে হবে-কারণ সামপ্রদায়িক দাঙ্গা বন্ধ হলেও হিন্দু মুসলমান সমপ্রদায়ের মধ্যে বৈরীভাব ও উত্তেজনা তখনো বিরাজ করছিল।
সমকালীন সর্বভারতীয় উত্তেজনাপূর্ণ রাজনৈতিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে কলকাতায় সপরিবারে বাস করা খুব একটা নিরাপদ নয় বলে অনেকেই মনে হয় ভাবছিলেন। আগস্টের মহাদাঙ্গায় কলকাতায় বহু লোক নিহত হয়েছিল এবং ধনসম্পত্তির ক্ষয় ক্ষতির পরিমাণ ছিল বিপুল। উত্তর কলকাতায় মানিকতলায় অবস্থিত বদ্রীদাস টেম্পল স্ট্রীট অঞ্চল দাঙ্গা উপদ্রুত অঞ্চল ছিল না। তাই কলকাতার দাঙ্গায় যে রক্তপাত এবং লুটপাট ও ধ্বংসের যজ্ঞ হয়েছিল তা আমরা চোখে দেখিনি। তবে অনেক ভীতিপূর্ণ ঘটনা সম্পর্কে বড়দের আলোচনা করতে শুনতাম। একজন পুলিশ অফিসারের দায়দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আব্বা নিশ্চয় এই ধ্বংস, হত্যা, হিংসা ও লুণ্ঠনের অনেক কিছুই দেখেছেন। আব্বা তখন ক্যালকাটা পুলিশের হেড কোয়ার্টার্স লালবাজারে কর্তব্যরত অফিসার। দাদাভাই ছিলেন ইসলামিয়া কলেজের ছাত্র ও শিক্ষক সমাজের রাজনীতির সাথে জড়িত। তাই ১৯৪৬ সালের দাঙ্গার পরবর্তীকালীন কলকাতার সামপ্রদায়িক পরিস্থিতি সম্পর্কে তারও অনেক কিছু জানা ছিল। তাছাড়া কলকাতায় তখন নানা উত্তেজনাপূর্ণ গুজবের ছড়াছড়ি। আমরা পার্ক স্ট্রীটের বাসায় থাকাকালীন সময়কালে সেপ্টেম্বরে কলকাতায় কয়েকদিন অতিবর্ষণ হলো। এ নিয়েও কত ধরনের গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল। যেমন কলকাতার রাস্তাঘাটে পানি জমে গেছে-কারণ দাঙ্গার কারণে নিহতদের দেহ গলে পচে পানি নিষ্কাশনের ড্রেনগুলি প্রায় অকেজো হয়ে গেছে। আমাদের বাসায় যে সব আত্মীয়স্বজন আসতেন তাঁদের মুখে এসব ভীতিজনক ঘটনা শুনে আম্মা ভয় পেয়ে যেতেন। আপা আর আমিও বুঝতাম যে কলকাতার পরিবেশ ও পরিস্থিতি হঠাৎ করেই অনেক পাল্টে গেছে। আমাদের অবচেতন মনে এ বোধও তখন নিশ্চয় হতো যে শৈশবের ‘নানা রঙের দিনগুলি’ আর কোনোদিনই ফিরে আসবে না।
আমরা সবাই একত্রে থাকতে পারি এমন কোনো বাসা সেই উত্তেজনাপূর্ণ ও অস্বাভাবিক সামপ্রদায়িক পরিস্থিতিতে পাওয়া যাচ্ছিল না। তাই শেষ পর্যন্ত আব্বা আম্মা ও দাদাভাই সিদ্ধান্ত নিলেন যে আম্মা ও আমরা দুইবোন কিছুদিনের জন্য ব্রাহ্মণবাড়িয়া চলে যাবো। নিরাপদ এলাকায় ভালো একটি বাসা পেলেই আমরা আবার কলকাতায় ফিরবো। ’৪৬ এর সেপ্টেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহ বা চতুর্থ সপ্তাহে আমরা শিয়ালদা স্টেশন থেকে ট্রেনে উঠে নানাবাড়ী ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পথে রওয়ানা দিলাম। আমাদের সাথে ছিলেন তালতলার খালাম্মা, খালু, তাদের মেয়ে আনু এবং নওয়াব ভাই। আব্বা ও দাদাভাই কলকাতায় রয়ে গেলেন। তাঁরা দু’জনই সরকারী চাকুরে, তাদেরতো ছুটি নেই। পার্ক স্ট্রীটের বাসা ছেড়ে স্টেশনে যাওয়ার পথে আমার মনে খুব কষ্ট হচ্ছিলো। জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাসের তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত সময়কালে একদিনও স্কুলে যাই নি। পার্ক স্ট্রীটের বাসায় আসার আগে কলকাতার পথঘাট কেমন তা যেন ভুলে গিয়েছিলাম। দাঙ্গা শুরু হওয়ার কয়েকদিন পূর্ব থেকেই বাসার উন্মুক্ত ছাদে আপা এবং আমি মুক্তা, অলকা ও ডলির সাথে বিকেলবেলা ঘুরে বেড়াতাম, আমাদের ভাগ্যে শুধু তখনি মুক্ত আলোবাতাস কিছু সময়কালের জন্য জুটতো। আমরা কথা বলতাম, হাসতাম, কিন্তু আগের উচ্ছলতা আমাদের কথায় ও হাসিতে ছিল না। মাথার উপরে নীল আকাশ, অদূরেই জৈনমন্দিরগুলির পুষ্পউদ্যান ও জলাশয়। কিন্তু আমরা কেউই তখন বাড়ীর বইরে যেতাম না। তাই পার্ক স্ট্রীটের বাসায় মাত্র কয়েকটি সপ্তাহ থাকলেও সে বাসায় থাকার স্মৃতিগুলি আমার হৃদয়কে আন্দোলিত করে। পার্ক স্ট্রীটের বাসায় থাকাকালীন দিনগুলিতে আমি আবার শঙ্কাহীন চিত্তে বাড়ীর বাইরে বের হয়ে প্রকৃতির সৌন্দর্য চোখ ভরে দেখেছি। আমার চঞ্চল মনে যেন শান্তির পরশ বুলিয়ে দিতো পার্ক স্ট্রীটের সবুজ বৃক্ষশোভিত পরিচ্ছন্ন পরিবেশ। আমি অনুভব করতাম ‘কোথাও আমার হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা-মনে মনে...।’
কলকাতা থেকে নানাবাড়ী ব্রাহ্মণবাড়িয়া ঠিকমতই পৌঁছালাম। নানানানী ও ছোট মামা আমাদের দেখে চিন্তামুক্ত হলেন এবং সাদরে গ্রহণ করলেন। আমার দৃষ্টিহীন নানী আমাকে জড়িয়ে ধরে কিছুক্ষণ অশ্রুবর্ষণও করলেন। নানা প্রতিদিন তাঁর বাড়ী মোড়াইল এলাকা থেকে শহরে গিয়ে বাজার করে আনতেন। ছোট মামী সকাল থেকে সন্ধ্যে পর্যন্ত সারাদিনই প্রায় রান্না ঘরে ব্যস্ত থাকতেন। তাঁর রান্নার কাজে সহায়তা করতো নানার গ্রামের বাড়ী-থেকে-আনা একটি অল্পবয়সী পরিচারিকা। মামী খুব ভালো রাঁধুনী ছিলেন। এখনো মনে পড়ে কত ধীরস্থির ভাবে তিনি রান্নাঘরে বসে কাজ করতেন, চুলার আগুনে তাঁর সুন্দর মুখ ও গা থেকে ঘাম ঝরতো, মাঝে মাঝে শাড়ীর আঁচল দিয়ে ঘর্মাক্ত মুখ ও গ্রীবার ঘাম মুছতেন। তাঁর জীবন ব্যস্ত থাকতো রাঁধা ও আমাদের খাদ্য পরিবেশনের কাজে। সকালে ঘুম থেকে উঠে নানানানীর সাথে বসে গরম পিঠা খেতাম। তারপর আপা, খোজেদা আপা এবং আমি গৃহশিক্ষকের কাছে কিছুক্ষণ পড়তাম। পড়াশোনা করে আমি আমার চেয়ে বয়সে বেশ ছোট মামাতো দুই বোনের সাথে খেলাধুলা বা গল্প করতাম। এ দুই বোন ছিল ছোট মামীর যজম সন্তান। সকাল দশটার দিকে নানানানীর সাথে আমরা নানারকম সুস্বাদু ব্যঞ্জন দিয়ে ভাত খেতাম। আবার জোহরের নামাজের পর ভাত খেতে হতো। সন্ধ্যেবেলায় আমরা পড়াশোনা করতাম। একটু রাত হতেই আবার ভোজনপর্ব শুরু হতো। নানাবাড়ীতে অতিথি সব সময় আসতেন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া ছিল তখন মহকুমা শহর। নানার সপ্তকন্যার শ্বশুরালয়ের লোকদের তাই নানাবাড়ীতে আসা এবং তাদের সমাদরের সাথে বিশেষ করে আহার পরিবেশন ছিল দৈনন্দিন স্বাভাবিক ঘটনা। তাই আমার ছোট মামীর প্রতিদিনের জীবন ছিল ‘রাঁধার পরে খাওয়ানো আর খাওয়ানোর পরে রাঁধা’ নিয়েই ব্যস্ততা। তিনি তাঁর সন্তানদের পরিচর্যা করারও খুব একটা সময় পেতেন না। তাঁর দুই কন্যা ও কোলের পুত্র সন্তানের সেবাযত্ন ও ভালোমন্দ তত্ত্বাবধান নানা ও বাড়ীর অন্য লোকেরাই করতেন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যখন থাকতাম তখন রাতে ঘুমাবার আগে নানীর বড় পালঙ্কে শুয়ে আমরা আনন্দের সাথে নানীর বলা রূপকথা ও লোককাহিনী শুনতাম। ১৯৪৬ সালের আগে থেকেই আমার বই পড়ার প্রতি একটা আকর্ষণ সৃষ্টি হয়েছিল। নানার বাড়ীতে যে সব বই ছিল অবসর সময়ে সেগুলি পড়তাম। আব্বার কাছ থেকে উপহার পাওয়া ঠাকুরমার ঝুলি বইটি ছিল আমার খুব প্রিয়, সেই বইটি বারবার পড়তাম। আব্বার উপহার দেয়া আরেকটি প্রিয় বই ছিল রোমাঞ্চকর কিশোর উপন্যাস শতাব্দীর শব, লেখক অখিল নিয়োগী, এই বইটিও নানা বাড়ীতে ১৯৪৫ সালে রেখে গিয়েছিলাম। শতাব্দীর শব উপন্যাসটির নায়ক সত্যশিব একটি অশুভ শক্তির হুমকি উপেক্ষা করে তার ইতিহাস অনুসন্ধান অব্যাহত রেখেছিলেন। গ্রন্থটির প্রধান ঘটনাস্থল বাংলাদেশের সুপ্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান পাহাড়পুর। ইতিহাস জানার কৌতূহল ও তীব্র আগ্রহ শতাব্দীর শব বইটিই আমার মনে উদ্রেক করেছিল। আর আমার নানীর কথিত রূপকথা ও লোককাহিনী এবং ঠাকুরমার ঝুলি-তে বর্ণিত গল্পগুলি আমার হৃদয়কে করছিল মরমী, কল্পনাপ্রবণ ও স্বপ্নবিলাসী। সেই সাথে আমার মনের অবচেতন সত্তায় এই দৃঢ় বিশ্বাসও অঙ্কুরিত হয়েছিল যে, শুভ শক্তি ও সত্যেরই জয় হয়। ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে জানার আগ্রহও আমার মনে ধীরে ধীরে সূচিত হয়েছিল। এই প্রসঙ্গে আরেকটি আত্মোপলব্ধির কথাও প্রকাশ করছি।
শৈশবে শোনা ও পড়া এই সব লোককাহিনী ও রূপকথার উপাখ্যানগুলিতে মেয়েদের জীবনের যে করুণ কাহিনী বর্ণিত হয়েছে বহুলাংশে তার পরোক্ষ প্রভাবে আমি নারীবাদে বিশ্বাসী হয়েছি। মেয়ে হয়ে জন্ম গ্রহণ করলেই পরের ঘরে যেতে হবে, নৃপতি চাইলেই দুয়োরানীকে নির্বাসনে পাঠিয়ে দেবেন, দুয়োরানীর ও তার সন্তানদের নির্বাসিত জীবনের অন্তহীন দুর্দশা ও কষ্টের উপাখ্যান, এসবই আমাকে পরিণত বয়সে করেছে সর্বজনীন মানবাধিকারে বিশ্বাসী ও নারীবাদী। তাই এখন মনে হয় আমার পূর্বমাতা দৃষ্টিশক্তিহীন নানীর আমার মানবতাবাদী ও নারীবাদী হয়ে উঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। বহু রূপকথা ও লোককাহিনী বলে তাঁর নিজের অজান্তেই তিনি আমাকে প্রভাবিত করেছেন প্রতিবাদী হতে, গতানুগতিক চিন্তাধারায় ভেসে না গিয়ে ভিন্নভাবে চিন্তা করতে। আমার নানী রুষ্ট হলে কথা বলতেন না। স্বামী পুত্রদের প্রতি অভিমান হলেও নীরবে শুধু অশ্রুবর্ষণ করতেন। তাঁর বলা গল্পকাহিনী ছিল পিতৃতন্ত্র ও পুরুষের প্রভুত্বের জয়জয়কারের উপাখ্যান, তাঁর চোখের জলের অবিরল ধারায় ছিল নারীর অসহায়ত্বের প্রকাশ। সময়ের প্রবহমানতার সাথে সাথে তাই আমার হৃদয়ে এই সত্যের উপলব্ধি হয়েছে যে, মানুষের উপর মানুষের প্রভুত্ব অন্যায় ও পীড়ন, নারী হয়ে জন্মেছি বলে আমি নিজেকে অসহায় ভাববো না, কারণ আমিও মানুষ। এই সব উপলব্ধি আমার হৃদয়ে সুস্পষ্ট রূপ নিয়েছে এই কারণে যে আমার আম্মা ঐকান্তিকভাবে চেষ্টা করেছেন আমাদের শিক্ষিত করতে, আমার আব্বা উৎসাহ দিয়েছেন উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য এবং আমার ও আপার বিদ্যা যেন শুধু পুথিপড়া বিদ্যা না হয় সেই দিকে লক্ষ্য রেখে বই উপহার দিয়েছেন বাংলা পড়া শিখতেই।
আব্বা ও দাদাভাই কলকাতাতেই ছিলেন। আম্মাকে তাই খুব উদ্বিগ্ন ও আনমনা দেখতাম। কলকাতার সামপ্রদায়িক পরিস্থিতি নিয়ে নানানানী ও অন্যান্য আত্মীয়স্বজনেরাও চিন্তিত ছিলেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কোনো দাঙ্গা হাঙ্গামা হয় নি। তবু বহু রকম জনরব শোনা যেতো। হিন্দু মুসলমানদের মধ্যে দাঙ্গাকে বুঝাতে সবাই ‘রায়ট’-এই ইংরেজী শব্দটিই ব্যবহার করতো। আমরা দুই বোনই তখন ছোট ছিলাম তবু আব্বা ও দাদাভাই-এর জন্য আমরা দুজনই চিন্তা করতাম। এদিকে ১৯৪৬ সালের অক্টোবর মাসে নোয়াখালীতে সামপ্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হয়। নোয়াখালীর দাঙ্গার খবর পেয়ে মহাত্মা গান্ধী সেখানে নভেম্বর মাসে আসেন এবং কয়েক সপ্তাহ নোয়াখালীতে থাকেন। গান্ধী নোয়াখালীতে আসবেন, এই সংবাদ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সর্বস্তরের জনগণই জানতো। আজো মনে পড়ে মহাত্মা গান্ধী যে ট্রেনের যাত্রী হয়ে নোয়াখালী গিয়েছিলেন সেই ট্রেনে তাঁর সাথে ছিল অনেক লোক, ট্রেনের ছাদে উঠে ও দরজায় দাঁড়িয়ে ঝুলন্ত অবস্থায় তারা মহাত্মার সহযাত্রী হয়েছিল। নানাবাড়ীর পূর্ব দিকের বড় দীঘিটির পাড়ে দাঁড়িয়ে আমারা মহাত্মা গান্ধীকে বহনকারী ট্রেনটিকে ও ট্রেনের অসংখ্য যাত্রীদের দূর থেকে দেখছিলাম। নোয়াখালীতে যখন দাঙ্গা চলছিল তখন বিহারেও এক ভয়াবহ সামপ্রদায়িক দাঙ্গা সংঘটিত হয় এবং এ দাঙ্গায় বহু মুসলমান প্রাণ হারায়। ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে লোকমুখে বিহারে মুসলমানদের হত্যার বহু ঘটনা শোনা যেতো। বুঝতাম সবাই আতঙ্কিত, ব্যথিত ও ক্রুদ্ধ।
১৯৪৬ সালে বিভাগ-পূর্ব বাংলা তথা সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশে সামপ্রদায়িক সৌহার্দ্য, প্রীতি, সহমর্মিতা যেন সম্পূর্ণ বিনষ্ট হয়ে যাচ্ছিল। যার পরিণামে দয়ামায়া, মমতা এবং মানবতাবোধ হারিয়ে অনেকেই হিংসায় উন্মত্ত হয়ে উঠেছিল। রাজনীতি বা মানুষে মানুষে হানাহানির তাৎপর্য বোঝার মত বয়স, বুদ্ধি ও শিক্ষা আমার তখন ছিল না। তবু অস্থির লাগতো। আমার জন্মের একটি দশকের মধ্যে বিশ্বযুদ্ধ, মন্বন্তর তারপর এই সামপ্রদায়িক দাঙ্গাহাঙ্গামা-এ সব নিশ্চয়ই আমার মনকে প্রভাবিত করেছিল। শুধু যে আমি সংশয়বাদী হয়ে মানুষের ন্যায়নীতি বোধের উপর আস্থা হারাইনি এবং মাঝে মাঝে নৈরাশ্যের আঁধারে মন আচ্ছন্ন হলেও আমি যে সাধারণভাবে আশাবাদী থেকেছি ও মানুষের মানবিক মূল্যবোধের উপর আস্থাশীল ছিলাম তার কারণ আমার পূর্ব মাতা ও পূর্ব পিতাগণের নিকট হতে উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি শান্ত, সুন্দর জীবনদর্শনে দৃঢ় বিশ্বাস এবং মানবতাবোধের উপর অগাধ আস্থা!
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সেবার প্রায় দুই মাস ছিলাম। আমি ছোট বোনদের সাথে ঘুরে বেড়াতাম, বই পড়তাম, পড়াশোনাও করতাম। আপা আমাদের খালাতো বোন খোদেজা আপার সাথেই অবসর সময় অতিবাহিত করতো। খোদেজা আপার ইতিমধ্যে বিয়ে হয়েছে, তাঁর মায়ের দ্বিতীয় শ্বশুরবাড়ীর এক নিকট আত্মীয়ের সাথে। স্বামী রেল বিভাগে চাকরী করেন, চাকরীর স্থান আসামের লামডিং। উভয়পক্ষই নিয়মিতভাবে একে অন্যের কাছে পত্র লিখতেন। আমরা যখন ঠাকুরমার ঝুলি বা কোন রোমাঞ্চকর উপন্যাস পড়ি খোদেজা আপা তখন পড়েন বেহেশতি মেওয়া-যে-বইয়ে রয়েছে স্বামীর সাথে স্ত্রীর সম্পর্কের বিষয়ে নানা উপদেশ। বইটি খোদেজা আপার সুটকেসে লুকানো থাকতো। নানী, আম্মা খালারাও তাকে সংসার ও স্বামীর সাথে কিভাবে চলতে হবে সে বিষয়ে অনেক কথা বলতেন। আপা মাঝেমাঝে এসব কথা দাঁড়িয়ে শুনতো। তবে ওর মুখ দেখে এটা বুঝতে পারা যেত শিশুর মতো সরল মনে এ সব আলাপ আলোচনার মর্মার্থ একটুও বোধগম্য ছিল না।
যতদূর মনে পড়ে ১৯৪৬ সালের অক্টোবরে বড় মামা ডক্টর মমতাজ উদ্দিন আহমেদ সপরিবারে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পিতৃগৃহে এক সপ্তাহ ছিলেন। তাঁকে স্থানীয় জনসাধারণ ও অভিজাত সমাজ মনে করতো ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রত্ন, সমাজের গৌরব। তাই বড় মামার সাথে আমরাও বহু পরিবারে অতিথি হিসাবে আমন্ত্রিত হয়েছিলাম। শহরের সিনেমা হলে আমরা কাননবালা ও জহর গাঙ্গুলী অভিনীত ‘যোগাযোগ’ সিনেমাটিও দেখেছি। বড়মামার সমাদর হিন্দু মুসলিম সব সমাজেই ছিল। নানা তো মামা আসার কয়েকদিন আগে থেকেই বাড়ী ঘর পরিষ্কার করার ব্যবস্থা করলেন। বাড়ীর উঠানের ও সবজী বাগানের ঘাস ও অগাছাও কাটা হলো। বসার ঘরে চেয়ার টেবিল সুন্দর করে সাজানো হলো, কারণ বড় মামার সাথে তো ব্রাহ্মণবাড়িয়া অঞ্চলের বহু গুণী মানী লোক দেখা করতে আসবেন। একটি ঘরে টেবিল চেয়ার পেতে খাবার ব্যবস্থা করা হলো, টেবিলে বিছানো হলো শুভ্র চাদর। ছোট মামা ঐগঠ কোম্পানীর গ্রামোফোন বা কলের গানে বাজানোর জন্য নতুন গানের রেকর্ড ও পিন কিনে আনলেন।
নানা বড় মামীকে বলতেন তার গৃহের রানী। তাই বড় ছেলের বধূর যত্ন ও আয়াসের জন্য তিনি নানা রকম ব্যবস্থাই করেছিলেন। এবার ছোট মামীকে রান্নার কাজে সহায়তা করতে আম্মাও রান্নাঘরে ব্যস্ত থাকতেন। মহাধুমধাম ও আনন্দের মধ্যে সাতটি দিন চলে গেলো। বিদায় বেলায় বড় মামা তাঁর মাকে জড়িয়ে ধরে দোয়া চাইলেন, নানী তখন শুধু বিরামহীনভাবে অশ্রু বর্ষণ করছেন। বড় মামী, বিশেষ করে যাকে সংবর্ধনা দিতে সকল আয়োজন নানা করেছিলেন, তিনি ভাবলেশহীন মুখে নানানানীকে সালাম করে ঘর থেকে বের হয়ে গেলেন। তিনি যাবার আগে নানার সাথে কথা বললেন। ছোট জা ও আম্মা তাঁকে সালাম করার পর তাদের সাথেও হেসে কথা বললেন। কিন্তু নানীর সাথে তাঁর আর কোনো কথা হলো না। মামাতো ভাই বোনেরা নানীকে জড়িয়ে ধরে আদর ও সালাম করলো। নানী তাদের জড়িয়ে ধরে শুধু কাঁদতেই লাগলেন। নানীর রোদনভরা এই মুহূর্তগুলিতে বড় মামার মুখ ছিল মলিন। তিনি ছিলেন নানানানীর বহু আকাঙ্ক্ষিত পুত্র সন্তান এবং তাঁকে ইংরেজী শিক্ষায় শিক্ষিত করতে গিয়ে নানাকে সমাজের অনেক বিরোধিতার সম্মুখীন হতে হয়েছে, এবং নানী তাঁর সোনারূপার অলঙ্কার একটি একটি করে খুলে নানার হাতে বিক্রয় করতে তুলে দিয়েছেন। কিন্তু কি কারণে জানি না নানী কোন দিনই বড় পুত্রবধূকে আপন বলে গ্রহণ করতে পারেন নি এবং বড় মামামামীর সংসারে তিনি দু’চার দিনের জন্য যেতে হলেও আপত্তি জানিয়েছেন। জ্যেষ্ঠপুত্রের সন্তানদের কাছে না-পাওয়ার দুঃখ অবশ্য মাঝে মাঝে তিনি ব্যক্ত করতেন। আর তাঁর সকল স্নেহ ভালোবাসা ঢেলে দিতেন ছোট মামার সন্তানদের উপর। তাঁর এই পৌত্র পৌত্রীদের প্রতি ভালোবাসা অনেক সময় অযৌক্তিক দিকে মোড় নিতো। তারা অন্যায় করলেও তাদের মা অর্থাৎ ছোট মামীর কোনো কিছু বলার যে অধিকার আছে সেটা তিনি পরোক্ষভাবে যেন অস্বীকার করতেন। বড় মামীকে তিনি কিছু বলতে পারতেন না, সেই অসন্তোষ প্রকাশিত হতো ছোট মামীর সাথে তার ব্যবহারে। অনেকটা একারণেই তিনি ছোট মামীর উপর অসন্তুষ্ট থাকতেন। অবশ্য নানীর কালে শাশুড়ী-মাতাগণই ছিলেন পুত্রবধূদের দণ্ডমুণ্ডের বিধাতা। শাশুড়ীর হুকুম মতই তাদের চলতে হতো। বড়পুত্রবধূর শীতল আচরণে তিনি বিস্মিত ও ক্রুদ্ধ হলে তাতে বোধহয় অবাক হবার কিছু নেই। তবে বেচারী ছোট মামীর উপর দিয়ে তিনি যে ঝাল মেটাতেন সেটা আমরা ছোট হলেও বুঝতাম। অবশ্য আমার স্বল্পভাষী ও ভদ্র নানী যে ছোট পুত্রবধূকে স্বরবে বকাঝকা করতেন তা নয়, তাঁর অসন্তোষ ফুটে উঠতো তার মুখের অভিব্যক্তিতে এবং ব্যবহারে। যেমন, ছোট মামী দুধের বাটি থেকে তার পাতে দুধ ঢেলে দিতে গেলে তিনি ঝামটা মেরে বলতেন, ‘দুধ দিয়ো না, দুধ ভাত আমি আজ খাবো না।’ এসব ঘটনার ক্ষেত্রে নানাকে দেখতাম ভারসাম্য রক্ষাকারীরূপে সক্রিয়। তিনি ছোট মামী দূরে চলে গেলে কলা আর দুধ নানীর পাতে দিয়ে তাঁকে খাওয়াতেন।
নভেম্বর মাসের শেষের দিকে নওয়াব ভাই আমাদের লক্ষ্মীপুরে নিয়ে যেতে এলেন। আম্মা, আপা ও আমি তাঁর সাথে সেখানে চলে গেলাম। নানী কাঁদলেন। নানাও মলিন মুখে বিদায় দিলেন। খালাতো বোন, মামাতো বোনদের চোখেও সেদিন ছিল অশ্রু। আমরা কাঁদছিলাম। কিন্তু তাদের সবার মত আপার ও আমার মনে হচ্ছিল লক্ষ্মীপুর আমাদের পৈত্রিক বাড়ী, সেটা আমাদের স্থায়ী আবাসস্থল, সেখানেতো আমাদের যেতে এবং থাকতে হবেই! নানার বাড়ীতে সবার আদর যত্নের মধ্যে থাকলেও এখানে আমার নিজেকে পরগাছা মনে হতো। লক্ষ্মীপুর গ্রাম থেকে কেউ এলেই আমাদের দুই বোনকে ডেকে বলা হতো, ‘হাস্না-ঝর্ণা, তোমাদের বাড়ী থেকে লোক এসেছে।’ আমাদের খবরাখবর নিতে লক্ষ্মীপুর থেকে কেউ আসতে দেরী হলে আমরা মামা-মামী ও অন্যান্যদের মুখে অভিযোগ শুনতাম, ‘আহা! বাপের বাড়ী থেকে এদের খোঁজ খবর কেউ নেয় না।’ আবার যেহেতু আব্বা আম্মা অপুত্রক ছিলেন তাই এ ধরনের উক্তিও শুনতাম যে ‘হাস্না-ঝর্ণার ভাই নেই, ভবিষ্যতে বাপের বাড়ীর উপর ওরা কি ভরসা করতে পারবে?’ তবে সাধারণভাবে নানার বাড়ী সবাই আব্বার পরিবারের খুব প্রশংসা করতো। বলতো, ‘হাসনা-ঝর্ণাদের বাড়ীর সবাই খুব ভদ্র ও নম্র, আর এদের বাপচাচা ফুফুরা সাহেবদের মত ফর্সা!’
আমাদের বাড়ী লক্ষ্মীপুরে জলপথে প্রায় আট দশ ঘণ্টা নৌকার যাত্রী হয়ে পৌঁছলাম। বড় চাচা ও চাচী উষ্ণ স্নেহের সাথেই আমাদের গ্রহণ করলেন। কিন্তু এবার তাঁরা দুজনেই বেশ বিষাদগ্রস্ত ছিলেন। কারণ আমরা যাওয়ার কয়েক মাস আগেই তাঁদের বড় মেয়ে জাহানারা ওরফে জানু আকস্মিকভাবে কলেরায় আক্রান্ত হয়ে দশ বছর পার না হতেই মরণলোকে চলে গেছে। এই বোনটি আমার চেয়ে মাত্র কয়েক মাসের বড় ছিল, তাই চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার ফলে ওর অনুপস্থিতিতে আমি শূন্যতা বোধ করছিলাম। দাদাবাড়ীতে থাকতে এবার আমার ভালো লাগছিলো না। বড় নির্জন মনে হতো গ্রামের পরিবেশ। তাছাড়া ইতিমধ্যে নগর জীবনের অনেক সুবিধার সাথে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম। তাই ছোট শহর ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে অবস্থিত নানাবাড়ীর পরিবেশের সাথে নিজেকে আমি বেশী মানিয়ে নিয়েছিলাম। মেজো চাচী ও তাঁর ছেলেমেয়েরা ছিল বিহারের জামশেদপুরে। জানুর মৃত্যুর ফলে বড় চাচা, বড় চাচী এবং তাঁদের মেয়ে গওহর এবং ছেলেদের হাসিখুশী ভাবটা যেন অনেকটাই অন্তর্হিত হয়ে গিয়েছিল। এবার দাদাবাড়ীতে থাকাকালীন সময়কালে মনে রাখার মতো ঘটনা ছিল সালেহা নাম্নী একটি সুন্দরী ও সরল মেয়ের সাথে আমার সই পাতানো। ও ছিল গ্রামের দক্ষিণ পাড়ার খাঁ বাড়ীর মেয়ে। আমাদের বাড়ীর পাশের স্কুলটিতে ও পড়তে আসতো, সেখানেই ওর সাথে দেখা ও অন্তরঙ্গতা। এরপর ওর সই পাতানোর প্রস্তাব পেয়ে বড় চাচী ও আম্মার অনুমোদন নিয়ে আমি ওর সই হলাম। আমার সই স্কুল ছুটি হলে প্রায়ই আমাকে তিতাস নদীর তীরে অবস্থিত ওদের বাড়ীতে নিয়ে যেতো। ওদের বাড়ীতে গেলেই ওর মা আমাকে গরম ভাত ও মাছের ভাজি দিয়ে সুস্বাদু খাবার খাওয়াতেন। আমরা দুই সই মাটির একই সানকীতে খেতাম। সালেহা আমার সাথে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত যোগাযোগ রেখেছিল। অবশ্য ১৯৫৪-এর অনেক আগেই ওর বিয়ে হয়ে গিয়েছিল।
১৯৪৬ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে লক্ষ্মীপুর থাকাকালীন সময়কালে আমি দুই একবার কৃষ্ণনগর গিয়েছিলাম। কৃষ্ণনগর ছিল আমাদের গ্রামের উত্তর দিকে তিতাসের শাখা পাগলা নদীর তীরে। কৃষ্ণনগরের পাশেই ছিল সুর সম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দীন খাঁর গ্রাম শিবপুর। কৃষ্ণনগরে সাপ্তাহিক হাট বসতো। তাছাড়া কয়েকটি নিত্যব্যবহার্য দ্রব্যের বিক্রয়ের দোকানও সেখানে ছিল। একটি দর্জির দোকান ছিল সে কথাও মনে পড়ে। পাগলা নদীর তীরে অবস্থিত ছিল কৃষ্ণনগরের জমিদার বাড়ী, দেশবিভাগের পূর্বকাল পর্যন্ত তাদের প্রবল প্রতাপ ছিল। শুনেছি আমাদের পূর্বপুরুষেরা এই জমিদার বাড়ীতে হিসাব রক্ষার কাজ করতেন, তাই তাঁদের পদবী হয় সরকার। জমিদার বাড়ীর বিরাট দীঘি ও দীঘির পাড়ের শান বাঁধানো ঘাট এবং চালতা গাছগুলির কথা আমার আজো মনে পড়ে। আরো স্মরণে আসে পাগলা নদীর খরস্রোত ও উত্তাল ঢেউয়ের দৃশ্য। খরস্রোতা পাগলা নদীর উত্তাল ঢেউ দেখে আমি ভয় পেতাম। আমি সাঁতার জানতাম না, হয়তো তাই আমার বালিকা মনে এই দুর্ভাবনা হতো যে পাগলা নদীর ঢেউ আমাকে ডুবিয়ে দেবে।
বড় হয়ে দাদাবাড়ীর এলাকার গ্রামগুলির নামের মধ্যে আমি যেন বেশ তাৎপর্য খুঁজে পেয়েছি। আমাদের গ্রামের নাম ছিল লক্ষ্মীপুর, তার উত্তর পাশের গ্রামগুলির নামের মধ্যে রয়েছে কৃষ্ণনগর, শিবপুর। পূর্ব পাশের গ্রামগুলির নামের মধ্যে আমার মনে আছে ইব্রাহীমপুর ও রসুলাবাদ গ্রামের নাম। মেঘনার তীরে অবস্থিত নবীনগর এখন উপজেলা শহর। আর মহকুমাশহর ব্রাহ্মণবাড়িয়া এখন জেলা শহর। এই সব নাম জেনে আমার মনে হয় এখানে মধ্যযুগ হতেই হিন্দু মুসলমানদের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ছিল। আমি যে কালের কথা লিখছি তখন এই গ্রামগুলি ত্রিপুরা জেলার অন্তর্গত ছিল-পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার কয়েক বৎসর পর জেলাটির নতুন নামকরণ হয় কুমিল্লা জেলা।
১৯৪৭ সাল শুরু হওয়ার আগেই আমরা কলকাতায় ফিরে আসি। আমাদের এবারের বাসাটি ছিল পার্ক সার্কাসের ২নং কর্নেল বিশ্বাস রোডে। বহুতল বিশিষ্ট এই ভবনটিতে বেশ কয়েকটি ফ্ল্যাট ছিল। তিনটি রাস্তার সংযোগস্থলে ছিল ভবনটির অবস্থান। পূর্ব দিকে কয়েকটি রাস্তা পার হয়ে দেখা যেতো ময়মনসিংহের মহারাজার বাড়ী ‘শশী লজ’। এর আশেপাশেই ছিল পার্ক সার্কাসের কাঁচাবাজার। আমাদের দক্ষিণ পূর্বমুখী ফ্ল্যাটটিতে তিনটি কক্ষ, দুটি বারান্দা ও দুটি বাথরুম ছিল। আলোবাতাস পূর্ণ এই আধুনিক ফ্ল্যাটটি আমার ভালো লেগেছিল। আমাদের ফ্ল্যাটটির অবস্থান ছিল দোতলায়। এই দ্বিতলের পূর্বে ও উত্তরে আরো দুটি ফ্ল্যাট ছিল। পূর্বের ফ্ল্যাটটিতে এক দম্পতি থাকতেন, তাদের ছিল দুটি সন্তান, একটি ছেলে, একটি মেয়ে। মেয়েটির নাম সেতারা। ও আমার চেয়ে বয়সে কিছু ছোট। ওদের দাদাদাদী ছিলেন ধনী এবং কলকাতাতেই থাকতেন। পিতৃগৃহে না থেকে এই দম্পতি পৃথক বাসায় কেন থাকতেন এ নিয়ে বেশ আলোচনা হতো। উত্তর দিকের ছোট্ট ফ্ল্যাটটিতে এক মধ্যবয়সী ইহুদী মহিলা তার তরুণ ছেলে নিয়ে থাকতেন। ছেলেটি ছিল মায়ের একমাত্র সন্তান। সেই ছেলে মাঝে মাঝে বেহালা বাজাতো। আপা ও আমি ঐ মহিলার সাথে কখনো কখনো কথা বলতে যেতাম। তিনি আমাদের আদর করে টিনে রাখা খাদ্য খেতে দিতেন। আম্মা আবার ঐ ইহুদী মহিলার কাছে যাওয়া পছন্দ করতেন না। বলতেন, ‘ইহুদীরা মন্দ লোক, তারা আমাদের রসুলের শত্রু।’
কর্নেল বিশ্বাস রোডের বাসায় আসার পর স্কুল জীবন আবার শুরু হলো। এবার আমরা দুবোন ভর্তি হলাম পার্ক সার্কাস এলাকায় অবস্থিত আঞ্জুমান-এ মফিদুল ইসলাম গার্লস হাই স্কুলে। সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস হাই স্কুলের সাথে আমাদের ১৯৪৬ সালের গ্রীষ্মকাল থেকে কোনো যোগাযোগ ছিল না। আর লর্ড সিনহা রোডে অবস্থিত স্কুলটি বাসা থেকে অনেক দূরেও ছিল। এতদূর যাওয়া আসা করা ১৯৪৭ সালের বিরাজমান কলকাতার সামপ্রদায়িক উত্তেজনা ও সংঘাতময় পরিবেশে ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। মনে হয় তাই আব্বা, আম্মা ও দাদাভাই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন আমরা দুই বোন আঞ্জুমান গার্লস হাই স্কুলে পড়বো। এ স্কুলে কোন খেলার মাঠ বা উন্মুক্ত স্থান ছিল না। একটি বহুতল ও বিশাল দালানে ক্লাসরুম ও অফিস কক্ষ ছিল। সকাল ৯-৪৫ মিনিটে আমরা ছাদে বা দোতলার প্রশস্ত ও লম্বা বারান্দায় সমবেত হয়ে দাঁড়িয়ে সমস্বরে ভক্তিমূলক হামদ বা নাত গাইতাম, তারপর লাইন করে নিজ নিজ শ্রেণীকক্ষে চলে যেতাম। আমরা যে সব গান গাইতাম তার মধ্যে কয়েকটি গানের লাইন এখনো মনে আছে। দয়াময় বিধাতার মহাত্ম্য স্মরণ করে আমরা গাইতাম,

হে খোদা দয়াময় রহমানুর রহীম,
হে বিরাট, হে মহান, হে অনন্ত অসীম।...

কোন দিন আবার অন্য গান গাইতাম। যেমন,

পাবিনারে তুই পাবি না খোদারে
ব্যথা দিয়ে তার মানুষের প্রাণে।...
এতিমের প্রাণে জ্বালালে আগুন
নবীজীর প্রাণ জ্বলে শতগুণ।
কাহারো সুখের পথে কাঁটা হলে
তোর আশা পূরা হবে না জাহানে।...
ব্যথা দিয়ে তার মানুষের প্রাণে।...

এই স্কুলে আমার ক্লাসে লিলি নামের আমার দুই সহপাঠী ছিল। একজনের নাম ছিল জাহানআরা লিলি। আরেকজনের পুরো নাম ছিল শামছুন্নাহার লিলি। পরবর্তীতে এদের সাথে ঢাকার কামরুন্নেছা স্কুলে ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আবার একই ক্লাসে পড়েছি। শামছুন্নাহার লিলি ইডেন কলেজেও আমার সতীর্থ ছিল। আরো দুটি মেয়ের সাথে আমার বন্ধুত্ব হয়েছিল, তাদের নাম আলমআরা ও নার্গিস। দেশ বিভাগের পর আলমআরাদের পরিবার কলকাতাতেই থেকে যায়। আর কলকাতা ছেড়ে চলে আসার পর নার্গিসের কোন খবর আমি আর পাই নি, যদিও নার্গিসই ছিল আমার অতিপ্রিয় বান্ধবী! আলমআরার সাথে আমার ফোনে প্রায়ই কথা হতো। আমি ওকে চিঠিও লিখতাম। চিঠিতে ওকে সম্বোধন করতাম, ‘ভাই আলমআরা’, দাদাভাই আবার আমার ওকে লেখা একটি চিঠি দেখে ফেলেছিলেন। ও ফোন করলে দাদাভাই আমাকে ডেকে বলতেন, ‘তোর ভাই আলমআরা ফোন করেছে!’ তখন ফাউন্টেন পেন-এর ব্যবহার বেশ প্রচলিত হয়। ফাউন্টেন পেন, যা ঝরনা কলম নামেও আখ্যায়িত হতো, আব্বা আমাদের দুই বোনকে কিনে দিতেন। আমি পেন দিয়ে লিখতে গিয়ে খাতায় কালি ফেলতাম, কখনো কখনো নিব ভাঙতাম। আব্বা এসময় একবার একটা পাইলট পেন কিনে দিয়েছিলেন। আমি সেটা ভেঙে ফেলায় আম্মা খুব ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন। কিন্তু আব্বা এ বিষয়ে আমাকে কিছু বলেন নি, যদিও পেনটি ভাঙার পর আমি কয়েকদিন ভয়ে ভয়ে ছিলাম যে আব্বা আমাকে তিরস্কার করবেন। আমাদের লেখাপড়া ও স্বাস্থ্যের প্রতি আগ্রহ ও যত্ন অভিভাবকদের ১৯৪৭ সালে একটু কম ছিল। সমকালীন কলকাতার বিরাজমান অস্থিরতা ও সামপ্রদায়িক অসমপ্রীতিমূলক মানসিকতার কারণে যে সহিংস ও অনিশ্চয়তার পরিবেশ উদ্ভূত হয়েছিল তা মানুষের জীবনে নিরাপত্তার অভাব সৃষ্টি করেছিল-যা ছোট হলেও আমি উপলব্ধি করতাম, এবং এই নিরাপত্তার অভাব বোধের প্রভাব সাংসারিক জীবনের সম্পর্ক এবং দৈনন্দিন আচার আচরণেও পড়েছিল।

পার্ক সার্কাসের কর্নেল বিশ্বাস রোডের ফ্ল্যাটে বাস করতে আসার পর হঠাৎ করে আপা আর বাইরে খেলতে যেতো না। এই সময়ে ফ্রক পরা বাদ দিয়ে আপা সালওয়ার কামিজ এবং শাড়ী পরা শুরু করেছিল। ওর বয়স তখন বারো বছরও হয় নি। আকস্মিকভাবে পোশাক পরিচ্ছদের এই পরিবর্তন এবং বাইরে না-বেরুতে পারার সীমাবদ্ধতা ও কিভাবে নিয়েছিল আমি জানি না, তবে এগুলি আমার ভালো লাগেনি। এমনিতেই ওর সাথে আমার দূরত্ব ক্রমশঃই প্রসারিত হচ্ছিল, ওর জীবনের উপর চাপিয়ে দেয়া এই সব অনুশাসন আমাদের দুই বোনের মধ্যে মানসিক যোগাযোগ আরো কমিয়ে দিল। আপা খুব সুন্দরী ছিল এবং হঠাৎ করে ও বেশ বড়ও হয়ে গিয়েছিল। কলকাতার পরিস্থিতিতে যে নিরাপত্তার অভাব ছিল প্রধানত সে কারণেই নিশ্চয়ই বেশ ও পরিচ্ছেদের পরিবর্তন সম্পর্কিত অনুশাসন এবং বাইরে না যাওয়ার নিয়ম ওর উপর আম্মা ও দাদাভাই জারী করেছিলেন। স্কুলবাসে চড়ে আমরা দুই বোন স্কুলে যেতাম। তাছাড়া আম্মা, দাদাভাই ও আব্বার সাথে আপা বাইরেও বেড়াতে যেতো। কিন্তু অভিভাবক ছাড়া আপা আর কোথায়ও যেতো না। মনে পড়ে আব্বা আপা ও আমাকে নিয়ে পার্ক সার্কাসের কাঁচা বাজারে কয়েকবার মাছ ও শাকসবজী কিনতে গিয়েছিলেন। আব্বা তখন একটি পুরনো মডেলের অঁংঃরহ চৎবভববঃ গাড়ী চালাতেন, ওই গাড়ীতে চড়েই তাঁর সাথে বেড়াতাম। দাদাভাই-এর সাথেই আপা ও আমি বেশী বেড়াতাম। এর প্রধান কারণ বোধ হয় ছিল আম্মার ঘরকন্নার কাজ নিয়ে ব্যস্ততা এবং আব্বার পুলিশ অফিসারের দায়িত্ব পালনে
ব্যস্ততা।
পার্ক সার্কাসের বাসাতেও মাঝে মাঝে আত্মীয়স্বজন গ্রামের বাড়ী থেকে নানা প্রয়োজনে আসতো। আমার ছোট ফুফুর ছেলে শামছু ভাই তখন শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ছাত্র। তিনি প্রায় প্রত্যেক রোববারে আসতেন। নওয়াব ভাই আমাদের বাসাতেই থাকতেন। আম্মার পার্ক সার্কাসের বাসাতেও বেশী অবসর ছিল না। তাই দাদাভাই-এর সাথেই আমাদের বেশী বাইরে যাওয়া হতো। দাদাভাই আমাদের নিয়ে রেস্টুরেন্টে খেতেন, ফজলুর রহমান দাদাভাইয়ের শ্বশুর ও মন্ত্রী নোয়াখালীর খানবাহাদুর আব্দুল গোফরানের বড়েয়া রোডের বাসায় যেতেন এবং তৎকালীন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী এ কে ফজলুল হকের উদ্যোগে ১৯৩৯ সালে প্রতিষ্ঠিত আমীর আলী পার্কে বেড়াতেন। লেডী ব্রেবোর্ন কলেজেও দাদা ভাই আমাদের নিয়ে যেতেন। আমাদের তিনি বলতেন মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করলে এই কলেজে পড়তে পারবো। আমাদের এক দূরসম্পর্কের আত্মীয়া হস্টেলে থেকে তখন এই কলেজে পড়ছিলেন। দাদাভাই তার স্থানীয় অভিভাবক ছিলেন। আমরা দাদাভাই-এর সাথে ওই ভদ্রমহিলাকে দেখতে যেতাম।
[ চলবে ]