যুক্তরাষ্ট্র-সাম্রাজ্যের ত্রিভুজ এবং সামরিক ব্যয়

ফারুক চৌধুরী

জন বেলামি ফস্টার, হান্না হোলম্যান এবং রবার্ট ডব্লু ম্যাকচেসনি

সামরিক ব্যয়ের ওপর নির্ভরতার মাত্রার এবং সামরিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে পৃথিবীর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সংকল্পের দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র আজ প্রধান রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে অনন্য। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী পৃথিবীতে যুক্তরাষ্ট্রের মতো আর কোনো রাষ্ট্র বিশ্ব পরিধিতে এত ধ্বংসাত্মক হিসেবে দেখা দেয় নি, বিভিন্ন যুদ্ধে এত প্রাণও ধ্বংস করে নি। যুক্তরাষ্ট্রে ঘোষিত জাতীয় প্রতিরক্ষা ব্যয় ২০০১ সালের পর থেকে প্রকৃত ডলার মূল্যে প্রায় ৬০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ২০০৭ সালে দাঁড়ায় ৫৫ হাজার তিন শ কোটি ডলার। এটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশী। তবে, এ হার মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের (জিডিপি) শতাংশ হিসেবে পূর্ববর্তী দশকগুলোতে সংশ্লিষ্ট হারের চেয়ে কম। সরকারীভাবে প্রকাশিত বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পীস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এসআইপিআরআই বা সিপরি) জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ব্যয় বিশ্বে মোট সামরিক ব্যয়ের ৪৫ শতাংশ। কিন্তু, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ব্যয় এত বিশাল ও এত ঘোরপ্যাঁচের মধ্যে করা হয় যে, এই হিসেব সামরিক ব্যয়ের প্রকৃত ব্যাপকতা সামগ্রিকভাবে কম করে দেখায়। এ রচনাতেই আমরা দেখতে পাব যে, এ ব্যয় ২০০৭ সালে এক লাখ-কোটি ডলারে পৌঁছায়।১
বাহ্যিক দিক থেকে দেখায়, এ ব্যয় বিশ্বজোড়া সাম্রাজ্যের জন্য দরকারি খরচ। কিন্তু, অন্তর্গত দিক থেকে দেখলে দেখা যায় যে, এ সব খরচ একটি সাম্রাজ্যের ত্রিভুজকেই তুলে ধরে। এ ত্রিভুজে রয়েছে রাষ্ট্রের যোগান দেয়া অর্থে সামরিক উৎপাদন, তথ্য মাধ্যমে প্রচারণা এবং অর্থনৈতিক-কর্মসংস্থান ক্ষেত্রে প্রকৃত বা কাল্পনিক প্রতিক্রিয়া। এটি যুক্তরাষ্ট্রের সামাজিক ব্যবস্থার গভীরে গেঁথে বসেছে এবং নিজেই নিজেকে টিকিয়ে রাখছে। এ বিষয়টি সবার আগে তুলে ধরেন মাইকেল কালেকি।২
যুক্তরাষ্ট্র সমরবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের বর্তমান বিস্তারকে আজ অনেক বিশ্লেষকই এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের চালানো স্নায়ু যুদ্ধ থেকে অনেকাংশে আলাদা করে দেখেন। সচরাচর স্নায়ু যুদ্ধকে সোভিয়েট ইউনিয়নের হুমকির পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে গণ্য করা হয়। এ প্রেক্ষাপটে যুদ্ধ ও যুদ্ধ প্রস্তুতির দিকে চলতি চেষ্টাকে অসংখ্য ভাষ্যকারের কাছে মনে হয় যে, বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসবাদ সম্পর্কে উদ্বেগ প্রকাশ করা হলেও তার কোনো সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নেই এবং তা প্রধানত যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃবৃন্দের অযৌক্তিক ঔদ্ধত্যেরই ফসল। এমনকি, এরিক হবসবমের মতো অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন বামপন্থী ইতিহাসবিদও সমপ্রতি বিষয়টি দেখার ক্ষেত্রে সার্বিকভাবে এমন প্রেক্ষাপট গ্রহণ করেছেন। তিনি ২০০৮ সালে প্রকাশিত অন এম্পায়ার বইতে লিখেছেন :

খোলাখুলিই বলছি, ৯/১১র পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে যা ঘটেছে, আমি তার কোনো অর্থ খুঁজে পাই নি। এগারই সেপ্টেম্বর একদল রাজনৈতিক উন্মাদকে বিশ্বে এককভাবে আধিপত্য বজায় রাখার দীর্ঘ দিনের লালিত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করার সুযোগ দিয়েছে।...আজ এক র‌্যাডিক্যাল ডানপন্থী শাসক গোষ্ঠী বাইরের কিছু অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে, এবং আমেরিকার অনন্যতা, শ্রেষ্ঠত্ব ও ঘোষিত লক্ষ্যকে অস্বীকার করে যে জগৎ, তার বিরুদ্ধে ‘প্রকৃত আমেরিকানদের’ সমবেত করার চেষ্টা করছে।...কার্যত, আজ যুদ্ধের সবচেয়ে অনিবার্য বিপদ দেখা দিয়েছে ওয়াশিংটনে এক সরকারের বিশ্বজোড়া লিপ্সা থেকে, যে সরকারকে নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না এবং যে সরকার আপাতদৃষ্টে অযৌক্তিক আচরণ করছে।...নিজেকে বড় শক্তিধর হিসেবে ভাবার বাতিক থেকে যুক্তিসঙ্গত পররাষ্ট্র নীতি অনুসরণের পন্থায় ফিরে আসার বিষয়টি আমেরিকাকে শেখার জন্য সুযোগ-দেয়া আন্তর্জাতিক রাজনীতির সবচেয়ে আশু ও জরুরী কাজ।৩

এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি যুক্তরাষ্ট্রকে জর্জ ডব্লু বুশ ও নব্য রক্ষণশীল ‘রাজনৈতিক উন্মাদদের’ একটি চক্র সূচিত এবং অযৌক্তিকতাবাদের প্রভাবাধীনে বলে গণ্য করে এবং পরিণতিতে ‘নিজেকে বড় শক্তিধর হিসেবে ভাবার বাতিক থেকে যুক্তিসঙ্গত পররাষ্ট্র নীতিতে’ প্রত্যাবর্তনের আহ্বান জানায়। এভাবেই এ দৃষ্টিভঙ্গি সক্রিয় বৃহত্তর ঐতিহাসিক ও কাঠামোগত শক্তিগুলোকে খাটো করে দেখে। এসব শক্তিই স্নায়ু যুদ্ধ ও স্নায়ু যুদ্ধ-পরবর্তী সাম্রাজ্যবাদী পর্ব দুটিকে গ্রন্থিত করেছে। এ দৃষ্টিভঙ্গির বিপরীতে, আমাদের প্রত্যয় আছে যে, স্নায়ু যুদ্ধের গোড়ার বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের ‘সামরিক প্রতিপত্তি বৃদ্ধি’র উৎসগুলোর এবং এ যাবৎকাল যুক্তরাষ্ট্র সাম্রাজ্য ও অর্থনীতি গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে সামরিক প্রতিপত্তি বৃদ্ধি কেন্দ্রীয় হয়ে-ওঠার দিকে তাকালে আরো
বাস্তবসম্মত প্রেক্ষাপট পাওয়া যায়। উল্লেখ করা দরকার যে, যুক্তরাষ্ট্রের ‘সামরিক প্রতিপত্তি বৃদ্ধি’র বিষয়টি বলেন সি রাইট মিলস।৪

স্থায়ী যুদ্ধ অর্থনীতি এবং সামরিক কিনসীয়বাদ

বৈদ্যুতিক সামগ্রী তৈরীর বিশাল প্রতিষ্ঠান জেনারেল ইলেকট্রিকের সভাপতি ও ওয়্যার প্রোডাকশন বোর্ডের নির্বাহী সহ-সভাপতি চার্লস ই উইলসন ১৯৪৪ সালের জানুয়ারি মাসে যুক্তরাষ্ট্রের আর্মি অর্ডিন্যান্স এসোসিয়েশনে বক্তৃতা দেন। সেনা অস্ত্র সমিতিতে দেয়া এ বক্তৃতায় তিনি স্থায়ী যুদ্ধ অর্থনীতির পক্ষে ওকালতি করেন। উইলসন যে পরিকল্পনা পেশ করেন, সে-অনুসারে সেনাবাহিনীতে প্রধান প্রধান প্রতিটি কর্পোরেশনের একজন করে ‘লিয়াজোঁ’ বা যোগাযোগ রক্ষার প্রতিনিধি থাকবে, এদেরকে সংরক্ষিত বাহিনীতে কর্নেল মর্যাদা দেয়া হবে, সমর ও নৌবাহিনী সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর সহযোগিতায় সর্বাধিনায়ক হিসেবে প্রেসিডেন্ট-সূচিত একটি কর্মসূচির এটাই হবে ভিত্তি, বৃহৎ শিল্প-ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বা কর্পোরেশনগুলো ও সামরিক বাহিনীকে একটি একক ঐক্যবদ্ধ সশস্ত্র বাহিনী-শিল্প কমপ্লেঙে বা যৌগ সত্তায় গ্রন্থিত করাই হবে এ কর্মসূচির লক্ষ্য। তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন : ‘যুদ্ধের জন্য শিল্প-কারখানা ভিত্তিক ক্ষমতার আর ইতিমধ্যেই “শুরু হয়েছে” যে যুদ্ধ, তার জন্য গবেষণার কার্যক্ষমতার মজবুত ভিত্তির ওপরে আমাদের জাতীয় নীতিকে দাঁড় করানোর চেয়ে অধিকতর স্বাভাবিক ও যৌক্তিক আর কি হতে পারে? আমার মনে হয়, এর চেয়ে কম কিছু হলে তা হবে হঠকারিতা।’ উইলসন আভাসে উল্লেখ করেন যে, এ পরিকল্পনা অনুসারে কংগ্রেসের ভূমিকা সীমাবদ্ধ থাকবে প্রয়োজনীয় তহবিল সম্পর্কে ভোটাভুটির মধ্যে। এ ছাড়া, এই নব্য যুদ্ধ-রাষ্ট্রে শিল্প প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিকভাবে বাধা-বিঘ্নের মধ্যে ঠেলে না দিয়ে ‘বা অন্ধ গোঁড়ামি ভরা বিচ্ছিন্নতাবাদী’ কিনারায় ঠেলে দিয়ে ‘মৃত্যু ব্যবসায়ী’র ছাপ না এঁটে’ কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করতে দেয়া অত্যাবশ্যক।
এমনকি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার আগেই চার্লস ই উইলসন যুদ্ধের জন্য ‘শিল্প প্রতিষ্ঠানগত প্রস্তুতির অব্যাহত কর্মসূচির’ আহ্বান জানিয়ে সেই দৃষ্টিভঙ্গিই সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরছিলেন, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার সাথে সাথে পরবর্তী বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রে সংখ্যাল্পের শাসন ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য হয়ে ওঠে। এখানে বলা দরকার যে, চার্লস ই উইলসনকে কখনো কখনো ‘জেনারেল ইলেকট্রিক উইলসন’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। ‘জেনারেল মোটর্স উইলসনে’র সাথে তাকে গুলিয়ে না ফেলার উদ্দেশ্যেই এ নামে তিনি উল্লেখিত হন। গাড়ী তৈরীর বিশাল প্রতিষ্ঠান জেনারেল মোটর্সের সভাপতি চার্লস আরউইন উইলসনকে ‘জেনারেল মোটর্স উইলসন’ বলা হতো। তিনি প্রেসিডেন্ট আইজেনহাওয়ারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রীও ছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পূর্ববর্তী পর্বগুলোতে ধারণা করা হতো যে, ‘বন্দুক ও মাখনের’ মধ্যে বৈপরীত্য রয়েছে এবং এ দু’য়ের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা দরকার, এবং অর্থনীতির অন্যান্য খাতে খেসারত দিয়েই সামরিক ব্যয় ঘটতে পারে। তবে, নাৎসী জার্মানিতে অর্থনৈতিক প্রসারের ঘটনা থেকে অন্যতম শিক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে সামরিক ব্যয় ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করা হলে তা অর্থনীতিতে বিপুল তেজ সঞ্চার করতে পারে। জার্মানীর পরে দ্বিতীয় মহাসমরকালে খোদ যুক্তরাষ্ট্র অস্ত্রসজ্জিত হয়ে ওঠার অভিজ্ঞতাও এমন। দ্বিতীয় মহাসমরের প্রভাবে মাত্র দু’বছরে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ৭০ শতাংশ প্রসারিত হয়, অবশেষে উদ্ধার পায় মহামন্দা থেকে। এভাবেই স্নায়ু যুদ্ধের প্রথম দিককার বছরগুলোতে যেটার উদ্ভব ঘটে, সেটা পরবর্তী সময়ে ‘সামরিক কিনসীয়বাদ’ হিসেবে পরিচিতি পায়। এ মত অনুসারে কার্যকর চাহিদা বাড়িয়ে ও একচেটিয়া মুনাফাকে মদদ যুগিয়ে সামরিক ব্যয় যুক্তরাষ্ট্র পুঁজিবাদের পায়ের নীচে একটি ভিত্‌ যোগানোয় সাহায্য করতে পারে।৫
জন মেনার্ড কিনস তাঁর জেনারেল থিয়োরি অব এমপ্লয়মেন্ট, ইন্টারেস্ট এন্ড মানি বইতে যুক্তি দেন যে, অর্থনৈতিক স্থবিরতার সমাধান হচ্ছে সরকারী খরচের মাধ্যমে কার্যকর চাহিদা বাড়িয়ে তোলা। মন্দার মধ্যে, ১৯৩৬ সালে, বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত এ বইটি প্রকাশিত হয়। ‘সামরিক কিনসীয়বাদ’ হিসেবে পরিচিতি পেলো কিনসীয় মতবাদের যে জঘন্য রূপ, সেই মত অনুসারে সরকারী খরচ সামরিক ব্যয়ের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীভূত করা হলে কার্যকর চাহিদার প্রসার সব চেয়ে ভালভাবে ঘটানো যায়, আবার, বড় বড় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের ওপর নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া পড়ে খুব কম। কিনসের কনিষ্ঠ সহকর্মীদের অন্যতম জোন রবিনসন ‘দি সেকেন্ড ক্রাইসিস অভ ইকোনোমিক থিয়োরি’ শিরোনামে বক্তৃতায় বিষয়টি সমালোচনামূলকভাবে ব্যাখ্যা করেন। তিনি ১৯৭১ সালের ২৭ ডিসেম্বর আমেরিকান ইকোনোমিক এসোসিয়েশনে প্রতিমা চূর্ণতুল্য এ বক্তৃতা দেন। জোয়ান রবিনসন বলেন :

সরকারের জন্য খরচের সবচেয়ে সুবিধাজনক উপায় হচ্ছে অস্ত্রের পেছনে খরচ করা। [এভাবেই] সামরিক-শিল্প কমপ্লেঙ কর্তৃত্ব হাতে তুলে নেয়। স্রেফ কর্মসংস্থান সমস্যার সমাধান করার উদ্দেশ্যে স্নায়ু যুদ্ধ ও কয়েকটি প্রত্যক্ষ যুদ্ধ তৈরী করা হয়েছিল বলে ধারণা করা যুক্তিসঙ্গত বলে আমি মনে করি না। তবে, এ ক্ষেত্রে এ সব যুদ্ধের প্রভাব ত’ পড়েছিলই। এ ব্যবস্থায় মুনাফা করে যে কর্পোরেশনগুলো, সেগুলোর এবং চাকরী পান যে শ্রমিকরা, তাদেরই যে কেবল সমর্থন ছিল ব্যবস্থাটির প্রতি, তা নয়; স্থবিরতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা হিসেবে সরকারী ঋণ-ব্যয়ের ওকালতি করতেন যে অর্থনীতিবিদরা, তাঁদেরও সমর্থন ছিল ব্যবস্থাটির প্রতি। বিশ্ব যুদ্ধ সমাপ্তির পরে গভীরতর স্তরে থাকা যে শক্তিগুলোই সামরিক ক্ষমতার মহা জয়চিহ্ন নিয়ে আসুক না কেন, সুষ্ঠু লগ্নির তত্ত্ব মেনে চললে সে শক্তিগুলো কোনোভাবেই এমন লাগাম ছাড়া চলতে পারতো না। এই বহুল কথিত কিনস-অনুসারীরাই একের পর এক প্রেসিডেন্টকে বুঝিয়েছেন যে, বাজেট ঘাটতিতে কোনো সমস্যা নেই এবং এর সুযোগ নিতে দিয়েছেন সামরিক-শিল্প কমপ্লেঙকে। আর, এভাবেই কিনসের মজাদার দিবাস্বপ্ন রূপ নিলো সন্ত্রাসের দুঃস্বপ্নে।৬

একচেটিয়া পুঁজিবাদে সামরিক কিনসীয়বাদের এই প্রবণতা সম্পর্কে প্রথম তত্ত্ব গড়ে তোলেন পোল্যান্ডের অর্থনীতিবিদ মাইকেল কালেকি। কিনসের জেনারেল থিয়োরির সার বিষয়গুলো খোদ কিনসেরও আগে আবিষ্কার করায় মাইকেল কালেকি সবচেয়ে বেশী খ্যাতি লাভ করেন। জোয়ান রবিনসন ওপরে উল্লেখিত বক্তৃতায় এটি উল্লেখ করেছেন। কালেকি ১৯৪৩ সালে ‘দি পলিটিক্যাল সাসপেক্টস অব ফুল এমপ্লয়মেন্ট’ শীর্ষক রচনায় এবং এর পরপরই লেখা অন্যান্য রচনায় যুক্তি দেখান যে, বেসামরিক সরকারের বর্ধিত ব্যয়ের প্রতি একচেটিয়া পুঁজির গভীর বৈরিতা রয়েছে। পণ্য বাজারে ও ব্যক্তি মুনাফার পরিধিতে বেসামরিক সরকারের বর্ধিত ব্যয় অনুপ্রবেশ করে বলেই এর প্রতি একচেটিয়া পুঁজির গভীর বৈরিতা। কিন্তু, সামরিক ব্যয়ের ক্ষেত্রে একইভাবে তা প্রযোজ্য নয়। সামরিক ব্যয়কে কায়েমি স্বার্থগুলো মুনাফা হটিয়ে দেয়ার বদলে মুনাফা বৃদ্ধি হিসেবে গণ্য করে। বর্ধিত সরকারী ব্যয়ের মাধ্যমে বৃহৎ কর্পোরেট পুঁজির বিপুল অর্থনৈতিক উদ্বৃত্ত আত্মীভূত করে নেয়াই যদি দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ-পরবর্তী যুক্তরাষ্ট্র পুঁজিবাদের পুঞ্জিভবনের মূল হয়ে থাকে, তা হলে তা প্রধানত নির্ভরশীল ছিল সামরিক ব্যয়ের, ১৯৫৬ সালে কালেকি যেটিকে বলেছিলেন ‘অস্ত্রনির্মাণ-সাম্রাজ্যবাদী কমপ্লেঙ’, ওপরে। এর ফলে উৎপাদিকা ক্ষমতার ‘উচ্চ মাত্রায় ব্যবহার’ ঘটে এবং ‘জাতীয় উৎপাদনে বড় ব্যবসা পুঞ্জিভবনের তুলনামূলক অংশবৃদ্ধির বিঘ্নকর প্রভাব কমে।’৭
কালেকির মতে সামরিক ব্যবস্থা-সমর্থিত পুঞ্জিভবনের এ নব আয়োজন নিজ শাসনের একটি প্রবল রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ভিত্‌ তৈরী করে। সামরিক ব্যবস্থা সমর্থিত পুঞ্জিভবনের এ নব আয়োজন ১৯৫০য়ের দশকের মধ্য ভাগে মার্কিন একচেটিয়া পুঁজির বৈশিষ্ট্য হয়ে ওঠে। সামরিক ব্যবস্থা-সমর্থিত পুঞ্জিভবনের এ আয়োজন নিজ শাসনের যে বুনিয়াদ তৈরী করে, তার ‘ভিত্তিমূলে ছিল নিম্নোক্ত [সাম্রাজ্যবাদী] তিনটি বাহু বা অংশ’ :

১. অস্ত্র তৈরী ও আনুষঙ্গিক কাজে ব্যয়ের মাধ্যমে এবং বিশাল সশস্ত্র বাহিনী ও বিপুলসংখ্যক সরকারী কর্মচারী লালন-পালন করার মাধ্যমে সাম্রাজ্যবাদ তুলনামূলকভাবে উচ্চতর মাত্রার কর্মসংস্থানে অবদান রাখে।
২. শাসক শ্রেণীর আয়োজনাধীনে কাজ করে গণ যোগাযোগ মাধ্যম এই অস্ত্র নির্মাণ সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার প্রতি জনসমর্থন নিশ্চিত করার লক্ষেও প্রচারণা চালায়।
৩. (শ্রমের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির ফলে) যুদ্ধের আগের তুলনায় উচ্চ মাত্রায় কর্মসংস্থান হয় এবং জীবনমান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয়, এবং এটা ব্যাপক জনসাধারণ কর্তৃক এই প্রচারণাকে আত্মীভূতকরণে সহায়তা করে।

এই সাম্রাজ্যবাদী ত্রিভুজে গণ যোগাযোগের ছিল একটি কেন্দ্রীয় অবস্থান। কালেকির যুক্তির একটি অত্যাবশ্যকীয় অংশ ছিল এটা যে, ‘যুক্তরাষ্ট্রে দৈনিক পত্রিকা, রেডিও, টেলিভিশনসহ গণ যোগাযোগ মাধ্যম বিপুলাংশে শাসক শ্রেণীর নিয়ন্ত্রণে।’ অন্যকেউ নন্‌, চার্লস ই (জেনারেল ইলেকট্রিক) উইলসনের মতো ব্যক্তি বলেন যে, তথ্য মাধ্যমের কাজ হচ্ছে জনমতকে সংবাদপত্র কর্তৃক শৃঙ্খলাবদ্ধ করে স্থায়ী যুদ্ধ প্রচেষ্টার সমর্থনে টেনে আনা (গুরুত্ব আরোপ সংযোজিত)।৮ উইলসন প্রতিরক্ষা মোতায়েন পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ১৯৫১ সালের ২৬ এপ্রিল আমেরিকান নিউজপেপার পাবলিশার্স এসোসিয়েশনে দেয়া বক্তৃতায় এ কথা বলেন।
এই প্রচেষ্টার ফল দাঁড়ায় ১৯৫০এর দশকের মধ্য-ভাগে মোটামুটি স্থিতিশীল সামরিকায়িত অর্থনীতি, যার মধ্যে এক সঙ্গে পাকানো বা মিশে থাকে সাম্রাজ্যবাদী, রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ও যোগাযোগের উপাদানগুলো, আর এ সব মিলে নব সামরিক-সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থাকে জোরদার করার কাজ করে। কালেকি বলেন যে, যুক্তরাষ্ট্রে ট্রেড ইউনিয়নগুলো ‘অস্ত্র নির্মাণ-সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার অপরিহার্য অংশ। ‘প্রকৃতিগতভাবে’ অন্যান্য পুঁজিবাদী দেশের শ্রমিকদের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রে শ্রমিকরা অধিকতর অচেতন নন এবং সে সব দেশের ট্রেড ইউনিয়ন নেতাদের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেড ইউনিয়ন নেতারা অধিকতর প্রতিক্রিয়াশীল নন। প্রকৃতপক্ষে, যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক ব্যবস্থা, নেহাতই, ঐতিহাসিক বস্তুবাদের নীতি অনুসারে, অর্থনৈতিক বিকাশের অবশ্যম্ভাবী পরিণতি এবং অগ্রসর পর্যায়ে একচেটিয়া পুঁজিবাদের অবকাঠামোর বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত।’ এই সমগ্র বিষয়টি সেটাই তুলে ধরে। এটিকেই হ্যারি ম্যাগডফ যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অর্থনীতি ও সাম্রাজ্যকে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করে তোলে, এমন সব ‘জাতীয় নিরাপত্তা ও ব্যবসা স্বার্থসমূহের একত্ব’, যা অত্যাবশ্যক, হিসেবে অভিহিত করেছিলেন।৯
কালেকির অনেক ভাবনাই পল বারান ও পল সুইজি ১৯৬৬ সালে তাঁদের মনোপলি ক্যাপিট্যাল বইতে আরো বিকশিত করেন। বারান ও সুইজি যুক্তি দেখান যে, একটি ব্যাপক সামরিক স্থাপনা গড়ে তোলার জন্য ১৯৫০এর ও ‘৬০এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রে গুটিকয়েককে নিয়ে গঠিত শাসক গোষ্ঠীকে চালিয়ে নিচ্ছে অন্তত পাঁচটি রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সাম্রাজ্যবাদী লক্ষ্য। এগুলো হলো : ১. দুনিয়াজুড়ে জেগে ওঠা বিপ্লবের ঢেউ রূপে, যাকে সরলভাবে সোভিয়েট ইউনিয়ন কেন্দ্রিক একক কমিউনিস্ট হুমকি হিসেবে দেখা হয়, বাইরের হুমকি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ব আধিপত্য ও পুঁজির সাম্রাজ্য রক্ষা; ২. বিস্তার ঘটানোর এবং বিদেশে অর্থনৈতিক সুযোগগুলোকে একচেটিয়াভাবে করায়ত্ত করার উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কর্পোরেশনগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক ‘নিরাপদ’ একটি মঞ্চ গঠন; ৩. সরকারী উদ্যোগে একটি গবেষণা ও বিকাশ খাত গড়ে তোলা, যে খাতে আধিপত্য থাকবে বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের; ৪. দেশের মধ্যে একটি অধিকতর আত্মতৃপ্ত জনসাধারণ গড়ে তোলা, যুদ্ধ ও যুদ্ধ প্রস্তুতির জাতীয়তাবাদী প্রভাব খাটিয়ে যাদেরকে করে তোলা হবে কম অসন্তুষ্ট; এবং ৫. চড়া মুনাফা এবং (ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জন্য) কম ঝুঁকিপূর্ণ সামরিক ব্যয় বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশের বিপুল উৎপাদিকা ক্ষমতা শুষে নেয়া আর এভাবে অর্থনৈতিক স্থবিরতা প্রতিরোধে সাহায্য করা। এ সব রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সাম্রাজ্যবাদী উপাদানের সম্মিলিত ফল হচ্ছে পৃথিবীতে এ যাবৎকালের বৃহত্তম, সবচেয়ে গভীরে গ্রন্থিত ও সবচেয়ে নাছোড়বান্দা ‘শান্তিকালীন’ সমর যন্ত্র।১০
কালেকির মতো বারান ও সুইজিও যুক্তি দেখান যে, যুক্তরাষ্ট্রে গুটিকয়েকের শাসন ব্যবস্থা ‘বেসামরিক [সরকারী] ব্যয়ের ওপরে কঠোর নিয়ন্ত্রণ’ বজায় রেখেছে। তাদের মতে বেসামরিক [সরকারী] ব্যয় জাতীয় আয়ের শতাংশ হিসেবে ‘১৯৩৯ সালের মধ্যে শেষ সীমায় প্রায় পৌঁছে যায়’ অথচ ‘সামরিক ক্ষেত্রে ছিল উদার হস্ত।’ তাই, বারুদ যোগানোতে সরকারী অর্থ ঢালার কাজটি অনেকাংশে চলে সাম্রাজ্যের সেবায় নিরত যুদ্ধ ও যুদ্ধ প্রস্তুতিতে ব্যয়ের মাধ্যমে। সামরিক ঘাঁটিগুলো ও অস্ত্র শিল্প যাতে সারা যুক্তরাষ্ট্রে ছড়িয়ে থাকে এবং অসংখ্য শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সামরিক ব্যয় থেকে যাতে লাভবান হয়, সেটা পেন্টাগন নিশ্চিত করে এবং এর মাধ্যমে অঙ্গরাজ্যগুলোতে ও ডিস্ট্রিক্টগুলোতে যে প্রভাব পড়ে, তার ফলে কংগ্রেসের সর্বাধিক সমর্থন পাওয়া যায়।১১
সামরিক ব্যয় ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি পরস্পরকে জোরদার করার কর্তব্যপরায়ণ এই চক্র প্রতিফলিত হয় সামরিক কিনসীয়বাদের মধ্যে। আর, যুক্তরাষ্ট্রে গুটিকয়েকের শাসন ব্যবস্থার সদস্যবর্গ এবং এ ব্যবস্থার গলগ্রহদের কাছে এ চক্র সমালোচনার বদলে উদযাপনের উপযুক্ত। হার্ভার্ডের অর্থনীতিবিদ সামনার স্লিকটার ১৯৪৯ সালের অক্টোবর মাসে ব্যাংক মালিকদের এক সম্মেলনে ব্যাখ্যা করেন যে, স্নায়ু যুদ্ধের ব্যয় যত দিন আছে, তত দিন গুরুতর অর্থনৈতিক মন্দার কথা ‘মনের মধ্যে ভাবতে পারা কঠিন।’ স্নায়ু যুদ্ধ ‘বিভিন্ন সামগ্রীক চাহিদা বৃদ্ধি করে উচ্চ মাত্রার কর্মসংস্থান টিকিয়ে রাখতে সহায়তা যোগায়, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি দ্রুততর করে এবং এভাবে জীবনমান উন্নয়নে দেশকে সাহায্য করে।...তাই, যুক্তরাষ্ট্রে আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে পুঁজিবাদকে আরো ভালভাবে কাজ করার জন্য রুশদের আমরা ধন্যবাদ দিতেই পারি।’
একইভাবে, ইউ এস নিউজ এন্ড ওয়ার্ল্ড রিপোর্ট (কোরিয়া যুদ্ধ শুরু হওয়ার এক মাস আগে) ১৯৫০ সালের ১৪ মে আপন পাঠকদের বলে :

সরকারী পরিকল্পনাকারীরা অনুমান করেন যে, প্রায় অনন্ত সুসময়ের যাদু সূত্র তারা খুঁজে পেয়েছেন। তারা এখন ভাবতে শুরু করেছেন যে, অবিরাম গতির বিকল্প যদি কিছু না থাকতো। স্নায়ু যুদ্ধ হচ্ছে অনুঘটক। স্নায়ু যুদ্ধ হচ্ছে প্রবৃদ্ধি ঘটাতে বিনিয়োগের স্বয়ংক্রিয় এক ব্যবস্থা। একটি ছিপি ঘোরান, তা হলেই জনসাধারণ অস্ত্র খাতে আরো ব্যয় করার জন্য উচ্চ রবে দাবী জানাবে। আরেকটি ছিপি ঘোরান, উচ্চ রব থেমে যাবে। ট্রুমানের আস্থা, ধৃষ্টতার ভিত্তি হচ্ছে এই ‘ট্রুম্যান ফর্মুলা।’ প্রেসিডেন্টকে বলা হয়, সুসময়ের ট্রুম্যান যুগ ১৯৫২ সালেরও অনেক পরে পর্যন্ত বহাল থাকতে পারে। পুরো মাত্রায় কাজে লাগানো গেলে স্নায়ু যুদ্ধের চাহিদা প্রায় অসীম।

একই সময়ে ইউ এস নিউজ এন্ড ওয়ার্ল্ড রিপোর্ট ১৯৫৪ সালে ঘোষণা করে : “এইচ বম্ব বা হাইড্রোজেন বোমা ব্যবসা ক্ষেত্রে কোন অর্থ বহন করে? বড় বড় ফরমায়েশের... এক দীর্ঘ পর্ব। নয়া বোমার প্রতিক্রিয়া সামনের বছরগুলোতে বাড়তে থাকবে। একজন মূল্যায়নকারী বলেছেন ‘এইচ বম্ব মন্দা-চিন্তাকে জানালা দিয়ে উড়িয়ে নিয়ে গেছে।’ ” ইউ এস নিউজ এন্ড ওয়ার্ল্ড রিপোর্টের সম্পাদক ডেভিড লরেন্স ১৯৫৯ সালে আভাস দেন যে, যুক্তরাষ্ট্র “ ‘প্রথমে আঘাত হানতে পারে’ বলে প্রস্তাবকে তিনি ধীর-শান্তভাবে গণ্য করেছিলেন। ‘প্রথমে আঘাত হানতে পারার ধারণাটি ‘প্রতিরোধ’ যুদ্ধের চেয়ে ‘আগাম ব্যবস্থা গ্রহণ’ হিসেবে পরিচিতি পায়।”
দি আমেরিকান সেঞ্চুরি শব্দ জোড়া বলেছিলেন হেনরি লুস। তিনি ছিলেন টাইম-লাইফ সাম্রাজ্যের প্রধান, তথ্য মাধ্যম রাজ্যের যেন এক মোঘল অধিপতি। হেনরি লুস ১৯৫৭ সালের নভেম্বর মাসে ফরচুন পত্রিকাকে বলেন, ‘সোভিয়েট রাশিয়ার ক্ষমতা সামাল দিতে প্রয়োজনীয় যে কোনো প্রতিরক্ষা প্রচেষ্টার ভার নিতে পারবে’ যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু, ‘চুপিসারে এগিয়ে-আসা সমাজতন্ত্রের ফলে সৃষ্ট ভাঙ্গন এবং’ সামরিক ক্ষেত্রের বাইরে ‘অতিরিক্ত অর্থনৈতিক ক্ষেত্রগুলোতে সরকারী তৎপরতার অবিরাম সমপ্রসারণের মুখে অনির্দিষ্টকাল ধরে যুক্তরাষ্ট্রে টিকে থাকতে পারবে না।’ এ বক্তব্য সরাসরি কালেকির এবং বারান ও সুইজির যুক্তির সাথে মিলে যায়। তাঁরা বলেছিলেন যে, বেসামরিক ব্যয়ের ক্ষেত্রে ব্যবস্থাটি বজ্রমুষ্টি আর সামরিক ব্যয়ের ক্ষেত্রে দরাজ হাত।
অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি বৃদ্ধির ক্ষেত্রে সামরিক কিনসীয়বাদের সাফল্য সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে হার্ভার্ডের প্রভাবশালী অর্থনীতিবিদ সীমর হ্যারিস ১৯৫৯ সালে দি নিউ ইয়র্ক টাইমস ম্যাগাজিনে লেখেন : ‘আমরা ১৯৪১ সাল থেকে এখন পর্যন্ত বছরগুলোকে সামগ্রিকভাবে গণ্য করলে আবার দেখতে পাই যে, রেকর্ড স্তরের সমৃদ্ধির একটি পর্ব আর বিপুল সামরিক ব্যয় বরাদ্দের একটি পর্ব এক সঙ্গে মিলে গেছে।...প্রতি সাত ডলারের মধ্যে প্রায় এক ডলার গেছে যুদ্ধ ও যুদ্ধ প্রস্তুতিতে, এবং এ ব্যয় নিঃসন্দেহে অর্থনীতির জন্য ছিল একটি উদ্দীপক।’১২
স্নায়ু যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রধান পরিকল্পনা দলিলের মর্মবস্তুর কাছাকাছি ছিল সামরিক কিনসীয়বাদী দৃষ্টিভঙ্গি। দলিলটির পরিচয় এনএসসি-সিঙটি এইট। কোরিয়া যুদ্ধের অল্পকাল আগে ১৯৫০ সালের এপ্রিল মাসে যুক্তরাষ্ট্র জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ দলিলটি তৈরী করে সংশ্লিষ্টদের পাঠায়। এতে প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান সই করেন ১৯৫০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। তবে, দলিলটি ১৯৭৫ সালের আগে প্রকাশ করা হয় নি। এটি মুসাবিদা করেন পল নিৎসে। তিনি তখন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে নীতি পর্যালোচনা গ্রুপের প্রধান ছিলেন। এনএসসি-সিঙটি এইট দলিলটির প্রধান উদ্দেশ্য ছিল সোভিয়েট ইউনিয়নকে পিছু হাটিয়ে আগের অবস্থানে ফেরত পাঠানোর একটি রণনীতি প্রণয়ন করা। এ দলিলটি ইতিমধ্যেই বিপুল পর্যায়ে থাকা প্রতিরক্ষা ব্যয়কে ছাপিয়ে তা বিপুলভাবে বৃদ্ধির আহ্বান জানায় এবং দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে করেছিল, সেভাবে ‘জরুরী পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র যাতে মোট জাতীয় উৎপাদনের ৫০ শতাংশ’ সামরিক চেষ্টায় ‘নিয়োজিত করতে পারে,’ সেই সম্ভাবনা বিচার-বিবেচনা করে দেখে। এনএসসি-সিঙটি এইট ঘোষণা করে, ‘সার্বিকভাবে অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে,’

[সামরিক সমপ্রসারণের] কর্মসূচীটি জীবন মানের ক্ষেত্রে প্রকৃত অবনতি না-ও ঘটাতে পারে। কারণ, অতিরিক্ত সামরিক ও বৈদেশিক সহায়তা উদ্দেশ্যাবলী যে পরিমাণ সম্পদ শুষে নেবে, তার চেয়ে বেশী বৃদ্ধি পেতে পারে মোট জাতীয় উৎপাদন। কর্মসূচীটির অর্থনৈতিক প্রতিক্রিয়ার ফলে এটা ঘটতে পারে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আমাদের অভিজ্ঞতা থেকে সব চেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ শিক্ষাগুলোর অন্যতম হচ্ছে যে, আমেরিকান অর্থনীতি পূর্ণ দক্ষতার [পূর্ণ কার্যক্ষমতার] কাছাকাছি পর্যায়ে যখন সক্রিয় থাকে, তখন তা বেসামরিক ভোগ ছাড়াও অন্যান্য উদ্দেশ্যের জন্য বিপুল সম্পদ যোগাতে পারে এবং এরই পাশাপাশি দিতে পারে উঁচু জীবন মান। মূল্য পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সামঞ্জস্য ঘটিয়ে দেখা যায়, ১৯৩৯ সাল থেকে ১৯৪৪ সালের মধ্যে ব্যক্তিগত ভোগ ব্যয়সমূহ বৃদ্ধি পায় প্রায় এক-পঞ্চমাংশ...।১৩

যুক্তরাষ্ট্র সামরিকবাদ এভাবেই প্রথমে ও সর্বাগ্রে পরিচালিত হয় বিশ্বব্যাপী ভূ-রাজনৈতিক এক লড়াই দিয়ে; তবে, একই সাথে তা যুক্তরাষ্ট্র অর্থনীতির জন্য আবশ্যিকভাবে নিখরচার (এমনকি লাভজনক)। যুক্তরাষ্ট্র অর্থনীতি আরো বন্দুক পেতে পারে, পেতে পারে আরো মাখনও। তাই, এটিকে যুক্তরাষ্ট্র সাম্রাজ্যের ও অর্থনীতির, উভয়েরই বিজয় হিসেবে দেখা হয়।
প্রেসিডেন্ট আইজেনহাওয়ার ১৯৬১ সালের ১৭ জানুয়ারী বিদায় ভাষণে যেটিকে ‘সামরিক-শিল্প কমপ্লেঙ’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন, সেটি সম্পর্কে তিনি যখন উদ্বেগ প্রকাশ করলেন, ততদিনে তা এত দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে যে, সেটা তৈরী করেছে চার্লস ই (জেনারেল ইলেকট্রিক) উইলসনের দূরদৃষ্টিতে দেখা স্থায়ী যুদ্ধ অর্থনীতি। উল্লেখ করা দরকার যে, এই সামরিক সমপ্রসারণে প্রেসিডেন্ট আইজেন হাওয়ার ভূমিকা পালন করেন। আইজেনহাওয়ারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী হিসেবে চার্লস আরউইন (জেনারেল মোটর্স) উইলসন ১৯৫৭ সালে উল্লেখ করেন যে, সামরিক আয়োজন-ব্যবস্থা অর্থনীতিতে তখন এমনভাবে গেঁথে বসেছে যে, তাকে কার্যত আর আগের অবস্থায় নেয়া যাবে না। তিনি বলেন : ‘এটির মধ্যে বহু আমেরিকানের একটি কায়েমী স্বার্থ রয়েছে : সম্পদ, ব্যবসা, চাকরি, কর্মসংস্থান, ভোট, পদোন্নতির ও এগিয়ে যাওয়ার নানা সুযোগ, বিজ্ঞানীদের জন্য মোটা বেতন, এবং এমন আরো।...আপনি যদি পাল্টানোর চেষ্টা করেন, আপনি সমস্যায় পড়বেন।...আপনি যদি গোটা ব্যবসা এখন বন্ধ করে দেন, তা হলে ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্য সমস্যায় পড়বে। কারণ, বিমান শিল্পের বিপুল অংশ ক্যালিফোর্নিয়ায়।’১৪ এখানে বলা দরকার যে, চার্লস আরউইন উইলসন ‘জেনারেল মোটর্সের জন্য যা ভালো, দেশের জন্যও তা ভালো’ মন্তব্য করে বড় ধরনের হৈ-চৈ তৈরী করেছিলেন এবং এ কারণেই তিনি সমধিক পরিচিত।
তাই, আইজেনহাওয়ার তাঁর বিদায় বক্তৃতায় ‘বিপুল অনুপাতে স্থায়ী অস্ত্রশিল্প’ সম্পর্কে যে উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং বলেন, ‘আমরা বছরে যুক্তরাষ্ট্রে সকল কর্পোরেশনের ছাক্কা আয়ের চেয়ে বেশী কেবল সামরিক নিরাপত্তার পেছনে ব্যয় করি।’১৫ এই বাস্তবতা হচ্ছে ইতিমধ্যেই প্রতিষ্ঠিত একটি বাস্তবতার বিলম্বিত স্বীকারোক্তি। বিগত বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র যে বিশাল সামরিক-শিল্প কমপ্লেঙ গড়ে তুলেছে, তার দরকার সরাসরি অর্থনৈতিক প্রসারের জন্য ততটা ছিল না (যদিও সামরিক কিনসীয়বাদ এর উদ্দীপক প্রতিক্রিয়ার কথা উল্লেখ করেছে), কিন্তু, বারান ও সুইজি যেভাবে গুরুত্ব দিয়ে বলেছেন, সেভাবেই বাস্তবতার কারণে সে প্রয়োজন ছিল। তাদের গুরুত্ব দিয়ে বলা বাস্তবতা হচ্ছে, সারা দুনিয়ায় জোরদার হতে-থাকা সশস্ত্র বিদ্রোহের মুখে ‘আমেরিকান সশস্ত্র বাহিনীর ক্রমবর্ধমান প্রত্যক্ষ ও ব্যাপক হস্তক্ষেপের’১৬ মাধ্যমে পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থা ও যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য ‘আরেকটু দীর্ঘকাল’ কেবল বজায় রাখা যাবে। ভেতরেই গড়ে-ওঠা এই সমগ্র সামরিক ব্যবস্থা পরিত্যাগ করা যাবে না সাম্রাজ্যকে পরিত্যাগ না করে। স্নায়ু যুদ্ধের শুরুর বছরগুলো থেকে আজ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র সামরিক শক্তির প্রধান গুরুত্ব হচ্ছে এই যে, এ শক্তি হয় সরাসরি নয় তো ভয় দেখানোর মাধ্যম হিসেবে পরোক্ষভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। সরাসরি ব্যবহারের ফলে মিলিয়ন-মিলিয়ন মানুষের মৃত্যু ঘটেছে। (এ ক্ষেত্রে কোরিয়া যুদ্ধ, ভিয়েতনাম যুদ্ধ, উপসাগরীয় যুদ্ধ, কসভো যুদ্ধ, আফগান ও ইরাক যুদ্ধ এবং কয়েক ডজন অপেক্ষাকৃত স্বল্পপরিধির সংঘাতে নিহতদের সংখ্যা গণ্য।)১৭
উনিশ শ পঞ্চাশের দশকে ও ষাটের দশকে এ বিকাশ ধারার সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বামপন্থী বিশ্লেষক কালেকি, বারান, সুইজি ও ম্যাগডফ গুরুত্ব দিয়ে বলেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ব্যয়ের কারণ পুঁজিবাদী সাম্রাজ্য; সোভিয়েট হুমকি মোকাবিলার প্রয়োজনে নয়। তাদের এ বিশ্লেষণ স্নায়ু যুদ্ধ সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রে প্রধান তত্ত্বটির উল্টো। এ ছাড়াও, সামরিক ব্যয়ের যে সুবিধা একচেটিয়া পুঁজি পেয়েছে, তা হচ্ছে এ ব্যয় একচেটিয়া পুঁজির টিকে থাকার নিশ্চয়তা দিয়েছে, অথচ বড় ধরনের সামাজিক আন্দোলনের সুযোগ থাকছে না। সোভিয়েট ইউনিয়নের পতনের পরে গত দেড় দশক এ মূল্যায়নের নির্ভুলতা প্রমাণ করেছে। স্নায়ু যুদ্ধ অবসানের পরে ‘শান্তি লভ্যাংশ’ নিয়ে যে উচ্ছ্বাস, সেটা সাম্রাজ্যের নতুন নতুন চাহিদার মুখে প্রায় তাৎক্ষণিকভাবে বাতাসে মিলিয়ে যায়। এ ছিল যুক্তরাষ্ট্র পুঁজিবাদের জন্য সত্যের মুখোমুখি দাঁড়ানোর এক সময়। যুক্তরাষ্ট্র পুঁজিবাদের সামরিক-সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থ যে কত গভীরে প্রোথিত, সেটা দেখিয়ে দেয় এ সত্য। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক খরচ কমছিল; কিন্তু তা ১৯৯০য়ের দশকের শেষ নাগাদ আবার বৃদ্ধি পেতে থাকে।
আজ, ‘এক মেরুর পৃথিবী’ বলে যে কথা বলা হচ্ছে, সে-পৃথিবীতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ব্যয় সাম্রাজ্যের প্রয়োজনে দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে; তা এতটাই বৃদ্ধি পেয়েছে যে, অবশিষ্ট গোটা বিশ্বের মোট সামরিক ব্যয়ের চেয়ে তা বেশি। সামরিক ব্যয়ের ক্ষেত্রে শীর্ষ স্থানে থাকা আরো ১০টি দেশের অধিকাংশই হয় যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র, নয় ত কনিষ্ঠ অংশীদার। এ তথ্য খেয়াল রাখলে দেখা যাবে যে, সামরিক ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ঊর্ধ্বমুখী যাত্রা আরো প্রবল। কেবল বিশ্ব সাম্রাজ্যের বাস্তবতা (এক দেশের মধ্যকার সমাজ-রাজনীতি গঠন প্রকৃতিতে এর প্রতিক্রিয়া) এমন সর্বব্যাপী ধ্বংসাত্মক শক্তিকে ব্যাখ্যা করতে পারে। আটল্যান্টিক মান্থলির সংবাদদাতা রবার্ট কাপলান ২০০৫ সালে গর্বের সাথে ঘোষণা করেন : ‘একবিংশ শতাব্দী শুরু হওয়ার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র সামরিক বাহিনী গোটা পৃথিবী আত্মসাৎ করেছে; মুহূর্তের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক বাহিনী পৃথিবীর সব চেয়ে অখ্যাত এলাকাগুলো সৈন্য দিয়ে ভাসিয়ে দিতে প্রস্তুত।’১৮

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ব্যয়ের গোলক ধাঁধাঁ

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী পর্বে সামরিক-সাম্রাজ্যবাদী কমপ্লেঙের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গীকারের মাত্রা পরিমাপের সব চেয়ে সরাসরি উপায় হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ব্যয়ের পরীক্ষা-নিরীক্ষা। তবে, এটা সহজ কাজ নয়। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ব্যয় এক গোলক ধাঁধা, এতে রয়েছে অসংখ্য কানা গলি। এ ধরনের ব্যয়ের নির্ভরযোগ্য উপাত্ত সূত্র হিসেবে প্রায় সব বিশ্লেষক গ্রহণ করেছেন অফিস অব ম্যানেজমেন্ট এন্ড বাজেট (ওএমবি) প্রকাশিত হিস্টোরিক্যাল টেবলস্‌। এটি তৈরী হয় কেন্দ্রীয় বাজেটের সাথে সাথে। হিস্ট্রোরিক্যাল টেবলস্‌ ফর ফিসকাল ইয়ার টু থাউজেন্ড নাইনে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ২০০৭ সালের খরচ উল্লেখিত হয়েছে ৫২৯.৮ বিলিয়ন ডলার (ওএমবি টেবিল ৩.২ সারি ০৫১); এর সাথে আনবিক ইন্ধন প্রতিরক্ষা তৎপরতা ও প্রতিরক্ষা সংশ্লিষ্ট তৎপরতা যোগ করলে মোট জাতীয় প্রতিরক্ষা ব্যয় দাঁড়ায় ৫৫২.৬ বিলিয়ন ডলার (সারি ০৫০)। এই অংকটিকে স্বীকৃত সামরিক ব্যয় গণ্য করা যায়। কারণ, এই অংকটিকেই যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় প্রতিরক্ষা ব্যয় হিসেবে জানানো হয় এবং ন্যাটো ও স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (সিপরি) এই সংখ্যাটিই (সামান্য পার্থক্যসহ) ব্যবহার করে।১৯
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় প্রতিরক্ষা ব্যয়ের আরেকটি, অধিকতর পূর্ণাঙ্গ হিসাব পাওয়া যায়। এ হিসাবটি ইউ এস ন্যাশনাল ইনকাম এন্ড প্রডাক্ট একাউন্টসে (নিপা) অন্তর্ভুক্ত। জাতীয় আয় ও উৎপাদন সংশ্লিষ্ট এ হিসাব বিবরণীটি এমনই এক সূত্র, যাতে থাকে সার্বিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র অর্থনীতির মোট সমূহের চূড়ান্ত হিসাব (দ্রষ্টব্য ১ নম্বর ছক)। মোট জাতীয় প্রতিরক্ষা ব্যয় হিসাবে ২০০৭ সালের ক্ষেত্রে নিপায় উল্লেখিত হয়েছে ৬৬২ বিলিয়ন ডলার। এই অংকটি ওইমবি’তে উল্লেখিত অংকের চেয়ে ১০০ বিলিয়ন ডলারের বেশী। এ পার্থক্যের ব্যাখ্যা হিসেবে এ তথ্যটি বিবেচ্য : যুক্তরাষ্ট্র বাজেটে উল্লেখিত অংকের ক্ষেত্রে যে হিসাবগুলো গণ্য হয় না, জাতীয় প্রতিরক্ষা সংশ্লিষ্ট হিসাবে, নিপা সেই তথ্যগুলো গণ্য করে। এগুলো হচ্ছে : সরকার কর্তৃক স্থির পুঁজি ব্যবহার, সামরিক ও বেসামরিক অবসর কল্যাণ সুবিধাসমূহে তহবিল স্বল্পতা পূরণে সাময়িকভাবে অর্থ প্রদান (এটি বাজেটের হিসাবে অন্যত্র ‘আন্তঃসরকার লেনদেন’ অভিধায় অন্তর্ভুক্ত), এবং (বাজেটে যেভাবে থাকে, সেভাবে) নগদ ভিত্তিতে খরচের বদলে সরবরাহের ভিত্তিতে (পুঞ্জিত) ব্যয়।২০
এ কারণে, ওএমবি’র উপাত্তের চেয়ে নিপায় উল্লেখিত অংক সামরিক বাহিনীর জন্য ব্যয় করা অর্থনৈতিক সম্পদসমূহ অধিকতর নির্ভুলভাবে তুলে ধরে। এতে ‘পূর্ণ ব্যয় বাজেট হিসাবের’ ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়। অর্থনীতিবিদ ও শান্তি গবেষক ইয়রগেন ব্রয়ার উল্লেখ করেছেন : ‘জাতীয় প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত যে উপাত্ত আমাদের হাতে রয়েছে’।

ছক ১. যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ব্যয়, ২০০৭ (বিলিয়ন ডলারে)

ক. স্বীকৃত খ. প্রকৃত
জাতীয় প্রতিরক্ষা (ওএমবি) ৫৫২.৬ জাতীয় প্রতিরক্ষা (নিপা) ৬৬২.২
মহাকাশ (৫০%) ৯.১
বিভিন্ন দেশের সরকারকে
দেয়া মঞ্জুরি (৮০%)ক ২৯.০
ভেটেরানস্‌ কল্যাণ ৪০.০
সামরিক চিকিৎসা খরচ প্রদানখ ১২.১
সামরিক বাহিনী বাবদ সুদগ ২৫০.১
মোট ৫৫২.৬ মোট ১,০০২.৫
জিডিপি’র শতাংশ ৪.০ জিডিপির শতাংশ ৭.৩

ক : এখানে বিভিন্ন দেশের সরকারকে দেয়া মঞ্জুরি রক্ষণশীলভাবে বিবেচনা করা হয়েছে যে, সামরিক বাহিনীর জন্য ৮০%। যেমন, বাজেটে আন্তর্জাতিক বিষয় অংশে ২০০৭ সালে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সহায়তা হিসেবে ব্যয় হয় ৮ বিলিয়ন ডলার, ১৬ বিলিয়ন ডলার খরচ হয় আন্তর্জাতিক উন্নয়ন ও মানবিক সহায়তায়, এর অধিকাংশই সাম্রাজ্য সংক্রান্ত ব্যয়।
খ : এর অন্তর্ভুক্ত ‘অন্যান্য’ সরকারী সমাজকল্যাণ ধরনের এক-তৃতীয়াংশ (নিপা, টেবিল ৩.১২), বিইএ’র সংজ্ঞা অনুসারে এর মধ্যে রয়েছে ‘অনেকাংশে অ-লাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলোকে অর্থ প্রদান, ছাত্রদের সাহায্য, সামরিক বাহিনী থেকে অসরপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের ও তাদের ওপর নির্ভরশীলদের অসামরিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা বাবদ দেয়া অর্থ।’
গ : ধরে নেয়া হয় যে, ছাক্কা সুদ পরিশোধের ৮০ শতাংশ যায় সামরিক বাহিনী বাবদ। এ হার প্রধান প্রধান বিশ্লেষকের অন্যান্য অনুমানের চেয়ে কম। ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইন্সটিটিউটের রবার্ট হিগস্‌ জাতীয় ঋণের ৯১.২% সামরিক বাহিনীর জন্য বলে গণ্য করেন। দ্রষ্টব্য : যঃঃঢ়র//িি.িরহফবঢ়বহফবহঃ.ড়ৎম/হবংিৎড়ড়স/ধৎঃরপষব.ধংঢ়?রফ+১৯৪১; জেমস সাইফার তাঁর অতিসামপ্রতিক এক অনুমিত হিসাবে ৮১% গণ্য করেছেন। দ্রষ্টব্য : জেমস এম সাইফার ‘ফ্রম মিলিটারি কিনসীয়ানিজম টু গ্লোবাল-নিও লিবার‌্যাল মিলিটারিজম’, মান্থলি রিভিউ, ৫৯, সংখ্যা ২ (জুন, ২০০৭) : ৪৭, ৫৪
সূত্র : নিপা, ওএমবি, বাজেট ফর ফিসকাল ইয়ার টু থাউজেন্ড নাইন, হিস্টোরিক্যাল টেবলস্‌, ছক নম্বর ৩.১, ৩.২,২১

যে উপাত্ত রয়েছে, তার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে নিপা উল্লেখিত সংখ্য সবচেয়ে ব্যাপক এবং ধারণাগত দিক থেকে পূর্ণাঙ্গ। কারণ, এ সব সংখ্যার ভিত্তি অর্থনীতিবিদদের জাতীয় আয় হিসাব কাঠামো; বাজেট পর্যালোচনা ও অনুমোদনের জন্য অনুরোধ জানাতে রাজনীতিবিদদের প্রয়োজন এসব সংখ্যার ভিত্তি নয়।’২২
জাতীয় প্রতিরক্ষা ব্যয় সংক্রান্ত নিপার দেয়া অংক যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ব্যয়ের একটি নির্ভুল হিসাব করার সমস্যাটির আংশিক সমাধান করে মাত্র। অন্যান্য অর্থনৈতিক ভাগে বা ক্যাটাগরিতে লুকিয়ে রাখা সামরিক ব্যয় এবং মোট নিপা জাতীয় প্রতিরক্ষা ব্যয়ে অন্তর্ভুক্ত হয় নি, এমন অংকও যোগ করতে হবে নিপা-উল্লেখিত অংকের সাথে। নিপায় উল্লেখিত অন্যান্য উপাত্ত বিবেচনা করে নিপায় উল্লেখিত জাতীয় প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত অংকে এ বিষয়গুলো যোগ করা দরকার : বিভিন্ন দেশের সরকারকে দেয়া অর্থনৈতিক মঞ্জুরি; মহাকাশ; সামরিক বাহিনী থেকে অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের ও তাদের ওপর নির্ভরশীলদের অসামরিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা বাবদ খরচ পরিশোধ; ভেটেরান বা সাবেক সৈনিক, নাবিক, প্রমুখের কল্যাণ বাবদ ব্যয়; এবং জাতীয় ঋণের মধ্যে সামরিক ব্যয় বাবদ অংশের ছাক্কা সুদ প্রদান।
ভেটেরান কল্যাণ ও ছাক্কা সুদ পরিশোধ ছাড়া ওপরে উল্লেখিত সবকয়টি খাতই ন্যাটো ও সিপরির সামরিক ব্যয় সংক্রান্ত সংজ্ঞাসমূহে স্বীকৃত। ভেটেরান কল্যাণ ও ছাক্কা সুদ পরিশোধকে ‘লব্ধ ব্যয়’ হিসেবে উপরোক্ত সংজ্ঞাসমূহের অন্তর্ভুক্ত করা হয় নি। কিন্তু, যেহেতু লব্ধ ব্যয়সমূহ সামরিক ব্যয়সমূহের গুরুত্বপূর্ণ অংশ (এবং অন্য কয়েকটি লব্ধ ব্যয় মৌলিক উপাত্তে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে), তাই আমরা ভেটেরান কল্যাণ এবং বিগত যুদ্ধসমূহ ও সামরিক সমপ্রসারণ বাবদ ছাক্কা সুদ পরিশোধকে এর অন্তর্ভুক্ত করেছি। অন্যান্য বিশ্লেষক সামরিক ব্যয়ের হিসাব যেভাবে করেছেন, তার সাথে সঙ্গতি রেখেই এটা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এটা আরো অর্থবহ হয়ে উঠেছে এ কারণে যে, অর্ধ শতাব্দীর বেশী কাল ধরে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক প্রতিষ্ঠানের উত্থানের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাম্রাজ্যগত লব্ধ ধারা আমরা বিচার-বিশ্লেষণ করছি।২৩
আমরা ১ নম্বর ছকে যেসব অংক উল্লেখ করেছি, সেগুলো দেখিয়ে দেয় যে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৃত সামরিক ব্যয় ২০০৭ সালে দাঁড়ায় ১ ট্রিলিয়ন বা ১ লাখ কোটি ডলার। এর সাথে তুলনীয় ২০০৭ সালে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া অন্যসব দেশের মোট প্রতিরক্ষা ব্যয়, যা সিপরি উল্লেখ করেছে ১.৩ ট্রিলিয়ন ডলার। এ হিসাব সুস্পষ্টভাবেই কম করে দেখানো হয়েছে।২৪
যুক্তরাষ্ট্রের ২০০৭ সালের মোট সামরিক ব্যয় সংক্রান্ত ওপরের হিসাবের সাথে এ সংক্রান্ত অন্যান্য সমালোচকের দেয়া হিসাবের মিল আছে। তারা বাজেটে বিভিন্নভাবে লুকিয়ে-রাখা সামরিক ব্যয়ের বিভিন্ন অংশ যোগ করার বিকল্প ও অত্যন্ত শ্রমসাধ্য প্রক্রিয়া অনুসরণ করে হিসেবটি বের করেছেন। অর্থনীতিবিদ জেমস সাইফার ২০০৭ সালের জুন মাসে মান্থলি রিভিউতে প্রকাশিত এক নিবন্ধে ২০০৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ব্যয় ৯২৯.৮ বিলিয়ন বলে হিসেব করেন। তিনি এ হিসেব করার ক্ষেত্রে বাজেটভিত্তিক পন্থা অনুসরণ করেন। ব্লোব্যাক, সরোজ অভ এম্পায়ার এবং নেমেসিস নামে সাম্রাজ্যবিরোধী বই ত্রয়ের লেখক চালমার জনসন অতিসমপ্রতি দাবী করেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের ২০০৮ অর্থ বছরের বাজেটে সকল সামরিক ব্যয় যোগ করলে মোট পরিমাণ দাঁড়ায় ‘অন্তত ১.১ ট্রিলিয়ন ডলার।’২৫
দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধ-পরবর্তীকালের পর্বটিকে সামগ্রিকভাবে গণ্য করে জিডিপির শতাংশ হিসাবে প্রকৃত সামরিক ব্যয়ের মাত্রা অনুমান করার ক্ষেত্রেও ওপরে উল্লেখিত আমাদের পন্থা অনুসৃত হয়েছে।২৬ এসব অংক অনুসারে ২০০৭ সালে মোট সামরিক ব্যয় ছিল জিডিপির ৭.৩ শতাংশ। এ হার হচ্ছে ১৯৯৭ সালের পরে সর্বোচ্চ। এর বিপরীতে ওএমবি জাতীয় প্রতিরক্ষা ব্যয়ের যে হিসাব দিয়েছে, তাতে বিভ্রান্তিকরভাবে ২০০৭ সালে সামরিক ব্যয়কে জিডিপির ৪ শতাংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে (দ্রষ্টব্য : ১ নম্বর ছক)।
কেন্দ্রীয় সরকারের মোট ব্যয়ের অনুপাতে সামরিক ব্যয় খুঁজে বের করা গুরুত্বপূর্ণ। এটা করার জন্য আমরা কেন্দ্রীয় ব্যয় পরিমাপ থেকে সামাজিক সুবিধা, চিকিৎসা পরিচর্যা, ও অন্যান্য স্থানান্তর অর্থ প্রদানকে এই হিসাববহির্ভূত রাখার স্বীকৃত পদ্ধতি অনুসরণ করেছি। কারণ, স্থানান্তর অর্থ প্রদান স্বয়ং-অর্থ যোগানকারী। তাই, আয়করভিত্তিক সাধারণ তহবিল থেকে অর্থ নেয়া হয় না বা জাতীয় ঋণে যোগ করে না। স্থানান্তর অর্থ প্রদান ব্যতিরেকে কেন্দ্রীয় ব্যয়ের শতাংশ হিসেবে প্রকৃত সামরিক ব্যয় ১৯৮৮ সালে রিগ্যান পর্ব অবসানের পর থেকে প্রতি বছর কমেছে। সে সময় এটা ছিল ৬৮ শতাংশ। এটা কমতে থাকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত। তখন এটা হ্রাস পায় ৪৯ শতাংশে। এ হার ছিল সে সময় পর্যন্ত অর্ধ-শতাব্দীর মধ্যে নিম্ন পর্যায়ে। এর পর থেকে ব্যয়ের এ ধারা পাল্টায়, তা বৃদ্ধি পায় ৫২ শতাংশে। এটা স্বাভাবিকভাবেই কেন্দ্রীয় ব্যয়ের শতাংশ হিসেবে স্বীকৃত জাতীয় প্রতিরক্ষা ব্যয়ের সমান্তরালে চলতে থাকে; তবে সমান্তরালে চললেও মাত্রাটি ছিল উচ্চতর। স্বীকৃত জাতীয় প্রতিরক্ষা ব্যয় ২০০৭ সালে ছিল কেন্দ্রীয় ব্যয়ের (স্থানান্তর অর্থপ্রদান ব্যতিরেকে) মাত্র ২৯ শতাংশ। এটা কেন্দ্রীয় বিভিন্ন ব্যয় বরাদ্দে সামরিক ব্যয়ের অংশ যথাযথরূপে তুলে ধরে না।

যুক্তরাষ্ট্র আজ সাম্রাজ্যের ত্রিভুজ

ওপরে উল্লেখিত তথ্য আমাদের মূল প্রশ্ন সম্পর্কে কোন কথা বলে? হবসবম এবং অন্যরা যেভাবে যুক্তি দেন যে, বর্তমান পর্বে যুক্তরাষ্ট্র সমরবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের প্রসার ‘এক দল রাজনৈতিক উন্মাদের’ কাজের পরিণাম, যারা ওয়াশিংটনে ক্ষমতায় আরোহণ করেছে ও ‘আপন শ্রেষ্ঠত্বের ধারণার বাতিকে’ ভরপুর একটি ‘র‌্যাডিক্যাল ডানপন্থী শাসকবর্গ’ গঠন করেছে, তা কি যুক্তিসঙ্গত? যুক্তরাষ্ট্র সাম্রাজ্যের বর্তমান পর্যায়ের ব্যাখ্যা করার জন্য এ বক্তব্য স্পষ্টভাবেই অপর্যাপ্ত। বুশ সরকারের শীর্ষ কর্তাদের প্রায়শ নব্য-রক্ষণশীল প্রকৃতির প্রতি প্রতিষ্ঠানের বৃহত্তর অংশের সমর্থন ছাড়াও আফগানিস্তান ও ইরাক যুদ্ধে, সার্বিকভাবে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে, বিপুল সমরসজ্জায়, ইত্যাদিতে তাদের প্রতি ছিল এ অংশের সমর্থন।
এটা নিশ্চিত যে, ২০০০ সালে আল গোরের নেতৃত্বে ডেমোক্রাটিক পার্টির সরকার গঠিত হলে যুক্তরাষ্ট্র সাম্রাজ্যের স্বার্থগুলো রক্ষার চেষ্টা করা হলেও আফগানিস্তান ছাড়াও ইরাকের সাথে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে জড়াতো কি-না, তা একেবারে নিশ্চিত নয়। বুশ সরকারের মাথায় যুদ্ধপ্রিয় একদল নব্য-রক্ষণশীল বসে থাকার বিষয়টি একেবারে শুরু থেকেই চোখে পড়ে। যুধ্যমান উদ্দেশ্য এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে ক্ষমতার চক্রের ভেতর থেকে দৃঢ় সমর্থনের অভাব তাদের কমই ঘটেছে। দু’রাজনৈতিক দল, কংগ্রেস, বিচার বিভাগ, তথ্য মাধ্যম এবং সার্বিকভাবে কর্পোরেশনগুলো জোরালো সমর্থন জুগিয়েছে। মতভেদের বিষয়গুলো বহুলাংশে ছিল সৈন্যসংখ্যা, বলপ্রয়োগের মাত্রা, মিত্রদের সাথে সম্পর্ক, (আংশিক বা পূর্ণাঙ্গ) সেনা প্রত্যাহারের তারিখ, প্রধান প্রধান ‘যুদ্ধ ক্ষেত্রে’ কত সংখ্যক সৈন্য মোতায়েন হবে, ইত্যাদি। অধিকতর মৌলিক প্রশ্নগুলো, এমনকি নির্যাতন করার বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। বড় ধরনের ভিন্ন মত প্রধানত এসেছে সমাজের নীচের অংশ থেকে।
এসব দেখিয়ে দেয় যে, সমপ্রসারিত সমরবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র সমাজের অন্তত ঊর্ধ্ব স্তরের গভীরে প্রোথিত। একটি সাম্রাজ্যবাদী মহা রণনীতির অংশ হিসেবে আধিপত্য সমপ্রসারণে সার্বিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যগ্রতারই প্রতিফলন এটা। এই সাম্রাজ্যবাদী মহা রণনীতির মধ্যে রয়েছে বিশ্বের নানা জায়গায় সশস্ত্র বিদ্রোহী শক্তিগুলোকে ও ‘দুর্বৃত্ত রাষ্ট্রগুলোকে’ পেছন দিকে ঠেলে দেয়া, এবং কনিষ্ঠ অংশীদারদের অনুগত রাখা। ইরাকে যুদ্ধকে সবচেয়ে ভালোভাবে বুঝতে পারা যায়, যদি এ যুদ্ধকে দেখা হয় গোটা পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে ও ওই অঞ্চলের তেলের ওপরে যুক্তরাষ্ট্রের ভূ-রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ আবার জারি করার একটি চেষ্টা হিসাবে। এ উদ্দেশ্যের প্রতি প্রতিষ্ঠানের উভয় রাজনৈতিক পক্ষেরই সমর্থন রয়েছে। এ উদ্দেশ্যটি যুক্তরাষ্ট্রের মহা আধিপত্য পুনঃপ্রতিষ্ঠার বৃহত্তর লক্ষ্যের অংশ।২৭ যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় বাজেটের (সামাজিক সুবিধা, চিকিৎসা পরিচর্যা ও অন্যান্য স্থানান্তর অর্থ প্রদান ছাড়া) ৫০ শতাংশের বেশী এবং গোটা জিডিপি’র ৭ শতাংশ হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল সামরিক ব্যয়। এই বিপুল সামরিক ব্যয় বাহ্যিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্রাজ্যগত মহা রণনীতির প্রয়োজনের মধ্যে প্রোথিত। এ ব্যয় অবিরাম চাপ তৈরী করে চলেছে যুক্তরাষ্ট্র ব্যবস্থার ওপরে এবং সে চাপ ব্যবস্থাটিকে নিয়ে যাচ্ছে (বাজেট ও বাণিজ্য ঘাটতির হিসাবে) ব্যবস্থাটির সীমায়।
সোভিয়েট ইউনিয়ন না থাকায় সামপ্রতিক দশকগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র সাম্রাজ্যবাদে রূপান্তরিত হয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রকে দিয়েছে তাৎক্ষণিক ক্ষমতা (বিশেষভাবে সামরিক ক্ষেত্রে)। এর সাথে যোগ হয়েছে, আপাতদৃষ্টে বিপরীত মনে হলেও, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক আধিপত্যের ক্ষেত্রে যুগব্যাপী অধঃগতির চিহ্নগুলো। দীর্ঘ মেয়াদে অধঃগতির আভাসগুলোর সাথে সাথে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতা সাময়িক বৃদ্ধির এই দ্বৈত বাস্তবতা গোটা ক্ষমতা-অভিজাতবর্গকে জরুরীভাবে ‘নব্য আমেরিকান শতাব্দী’র আহ্বান জানানোর এবং অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক শক্তি পুনঃঅর্জনে বিপুল সামরিক ক্ষমতা ব্যবহারে ওয়াশিংটনের চেষ্টার দিকে নিয়ে গেছে। ওয়াশিংটনের এ চেষ্টার উদাহরণ হচ্ছে পারস্য উপসাগরীয় তেল অঞ্চল। যুক্তরাষ্ট্র সামপ্রতিক বছরগুলোতে পৃথিবীর সর্বত্র সামরিক ঘাঁটিগুলো ও তৎপরতা বিপুলভাবে প্রসারিত করেছে। প্রায় ৭০টি দেশে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি রয়েছে। (যৌথ মহড়াসহ) বিভিন্ন কাজে যুক্তরাষ্ট্রের সৈন্য রয়েছে এর দ্বিগুণসংখ্যক দেশে। অর্থাৎ, ওয়াশিংটন যে কেবল সামরিক বাহিনীর পেছনে ও ধ্বংসাত্মক অস্ত্র তৈরিতেই অর্থ ব্যয় করছে, তা নয়; বিশ্বের চারধারে স্থায়ী উপস্থিতিও গড়ে তুলছে। এ স্থায়ী উপস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা/ অন্তর্ঘাত চালানো/ দ্রুত মোতায়েন করার সুযোগ ওয়াশিংটনকে দেয়।২৮
যুক্তরাষ্ট্র সমরবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের নব উত্থানকে কতিপয়ের ‘আপন শ্রেষ্ঠত্বের ধারণার বাতিক’ হিসেবে বাতিল না করার আরো কারণ হিসেবে আমাদের যুক্তি কালেকি উল্লেখিত সাম্রাজ্যগত ত্রিভুজকে পুনরুল্লেখ করছে। এ ত্রিভুজই সাম্রাজ্যবাদের বিরোধীদের সামনে থাকা প্রধান উভয় সঙ্কটাবস্থা। যুক্তরাষ্ট্র সাম্রাজ্যকে সেবা করার জন্য একটি বিশাল সামরিক প্রতিষ্ঠান সৃষ্টির বিষয়টি সামরিক-কিনসীয় ধারণা অনুসারে ছিল অর্থনৈতিক স্থবিরতা মোকাবিলার লক্ষ্যে দৃশ্যত-পূর্ণ-কর্মসংস্থানের কর্মনীতি। তথ্য মাধ্যমের (জেনারেল ইলেকট্রিক উইলসন জোরাজুরি করেছেন, এর কাজ স্থায়ী যুদ্ধ অর্থনীতির সমর্থনে জনমতকে ‘শৃঙ্খলাবদ্ধ করে’ টেনে আনা) সাহায্যে দ্বিতীয় মহা সমর-পরবর্তী যুক্তরাষ্ট্র পুঁজিবাদের বৈশিষ্ট্যসূচক ভিত্তি স্থাপিত হয়। ভিয়েতনাম যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনের বিকাশ এবং স্নায়ু যুদ্ধের অবসান সাম্রাজ্য ত্রিভুজের বিপর্যয় তুলে ধরে। এটা জিডিপির শতাংশ হিসেবে সামরিক ব্যয়ের ক্ষেত্রে সাময়িক হ্রাসের মাধ্যমে ফুটে উঠেছে। প্রতিবার, ১৯৭০য়ের দশকের শেষ ভাগে/ ১৯৮০র দশকের প্রথম দিকে এবং আবার ১৯৯০য়ের দশকের শেষ ভাগে/২০০০ দশকের প্রথম দিকে, সামরিক ব্যয়ের ক্ষেত্রে এ ধরনের সাময়িক মন্থরতার পরেই দেখা দিয়েছে সামরিক পুনরুত্থান।২৯
কালেকির বিবেচনায় সাম্রাজ্যগত ত্রিভুজে দুর্বল গ্রন্থিটি হচ্ছে গণমাধ্যম প্রচারণা ব্যবস্থা। এটা সুস্পষ্টভাবে দেখা যায়। গণমাধ্যম প্রচারণা ব্যবস্থার কাজ ছিল জনসাধারণের কাছে স্থায়ী যুদ্ধ অর্থনীতির ধারণাটি বিক্রি করা। কারণ, জনসাধারণ বোধগম্যভাবেই আরো যুক্তিসঙ্গত, ন্যায়সঙ্গত ও সমতাপূর্ণ নানা পথ অনুসরণ করতে পারতেন। কোরিয়া যুদ্ধ বা ভিয়েতনাম যুদ্ধের ক্ষেত্রে যা হয় নি, ইরাক যুদ্ধের (এ যুদ্ধের আগে উপসাগরীয় যুদ্ধের সময়ের মতো) আগে যুক্তরাষ্ট্রে যুদ্ধবিরোধী এক ব্যাপক আন্দোলন হয়। এ আন্দোলন অন্যপথ অন্বেষায় জনসাধারণের সম্ভবত সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের ইচ্ছার প্রকাশ। এই অন্যপথ সমরবাদ ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী। যুক্তরাষ্ট্র সমর পুঁজিবাদের প্রয়োজনের সেই মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্র সমর পুঁজিবাদ উদ্ধারে এগিয়ে আসে একচেটিয়া তথ্য মাধ্যম। লুসের সময়ের চেয়ে একচেটিয়া তথ্যমাধ্যম আজ অনেক বেশী সংহত। এখন এটিকে কার্যত একচেটিয়া লগ্নি পুঁজি থেকে আলাদা করে দেখা যায় না। একচেটিয়া তথ্যমাধ্যম এখন স্রেফ হয়ে উঠেছে একচেটিয়া লগ্নি পুঁজির প্রকাশ্য কণ্ঠ। আমাদের একজন লিখেছেন, ‘সংবাদপত্র [অল্পকালের মধ্যে] বুশ সরকারের কাছ থেকে হালুয়া-রুটি খাওয়া শুরু করে।’৩০
অর্থনৈতিক স্থবিরতা, আর্থিক সঙ্কট, ক্ষয় হতে থাকা আধিপত্য, আসন্ন পরিবেশগত ধস আর গণমানুষের সমর্থনপুষ্ট নতুন নতুন বিদ্রোহের এ পর্বে ওয়াশিংটন আবারো একচেটিয়া তথ্যমাধ্যমের সমর্থন জোটাতে সমর্থ হয়। সার্বিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রে গুটি কয়েকের শাসনব্যবস্থার প্রতিনিধিত্ব করে ওয়াশিংটন। সাম্রাজ্যবাদী প্রচেষ্টার সমর্থনে জনমতকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করে টেনে আনার কাজে একচেটিয়া তথ্যমাধ্যমের এই সমর্থন জোটানো হয়। এটা করা হয় যুদ্ধোন্মাদনা জাগিয়ে। এ কাজটি করা সম্ভব করে তোলে স্বচ্ছন্দ গতিতে চলমান, ব্যক্তি মালিকানাভিত্তিক প্রচারণাব্যবস্থা, যা আগে থেকেই ছিল। মূল ধারার তথ্যমাধ্যমে বৈধ বিতর্কের মাত্রা সীমিত রাখার লক্ষ্যে এ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়। এ ব্যবস্থায় এমনকি শান্ত, ভীরু, উদারবাদী পাণ্ডিত্যচর্চার দূর সীমানাও কঠোরভাবে গণ্ডীবদ্ধ করা হয় অভিজাত বিতর্কের অনুমোদিত সীমারেখার মধ্যে। সামরিক-সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার অস্তিত্ব সম্পর্কে আজ মৌলিক ভিন্ন মতও, তা যতই সুচিন্তিত বা তথ্যসমৃদ্ধ হোক না কেন, সুনিশ্চিতভাবেই এ চৌহদ্দির মধ্যে ঠাঁই পায় না। ব্যতিক্রম আছে। তা হচ্ছে, ব্যঙ্গ-পরিহাস করার জন্য মাঝে-মধ্যে ভিন্ন মতকে টেনে আনা হয়। এ সব বিচারে আমাদের ব্যবস্থাটি নিশ্চিতভাবে একটি ‘সামরিক-শিল্প-তথ্য মাধ্যম কমপ্লেঙ।’৩১
যা-ই হোক, এই সাম্রাজ্যগত ত্রিভুজ এখন ক্রমবর্ধমানভাবে নিজের নানা দ্বন্দ্বের মুখোমুখি হচ্ছে। বারান ও সুইজি চার দশকেরও বেশী আগে মনোপলি ক্যাপিট্যাল বইতে যে-কথা বলেছিলেন, আজ যুক্তরাষ্ট্র সামরিক ব্যবস্থা সেভাবেই দু’টি প্রধান অভ্যন্তরীণ বাধার সম্মুখীন। প্রথমটি হচ্ছে, সামরিক ব্যয়ের ধরন প্রযুক্তি-নিবিড়; তাই, কর্মসংস্থান জোরদার করার ক্ষেত্রে সামরিক ব্যয়ের যে ভূমিকা ছিল, সেটা কমছে। তাঁরা বইটিতে লিখেছিলেন, ‘নির্মম পরিহাস যে, আজকের বিপুল সামরিক ব্যয় বরাদ্দ হয়ত এমনকি বেকারত্ব বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্যভাবে অবদান রাখছে : নতুন অনেক প্রযুক্তি, যেগুলো সামরিক গবেষণা ও প্রযুক্তি বিকাশের উপজাত, বেসামরিক উৎপাদনেও প্রয়োগযোগ্য; আর বেসামরিক উৎপাদনের ক্ষেত্রে সেগুলো উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির ও শ্রমের চাহিদা হ্রাসের প্রতিক্রিয়া ঘটাতে পারে।’ দ্বিতীয় বাধাটি হচ্ছে, ‘সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করার ক্ষমতাসম্পন্ন অস্ত্রে’র বিস্তার এবং অধিকতর শক্তিশালী অস্ত্র ব্যবহারের বিধ্বংসী প্রতিক্রিয়া স্থায়ী যুদ্ধ অর্থনীতির বিরুদ্ধে সমাজের সর্বস্তরে ক্রমবর্ধমান বিদ্রোহ ঘটাতে পারে বলে আশা করা যায়। বিশ্বব্যাপী বর্বরতার (বা এর চেয়েও খারাপটি হচ্ছে নির্মূল করার) বিপদ জনগণ যতই বুঝবেন, বিদ্রোহে আশা ততই বৃদ্ধি পাবে।৩২
আজ ওয়াশিংটনের যুদ্ধযন্ত্র ইরাকে ও আফগানিস্তানে বালিতে-পাথরে আটকে যাচ্ছে; অথচ, এ যুদ্ধযন্ত্রের বিপুল ভারও একে শেষ সীমায় পৌঁছানোর পথে বাধা দিতে পারছে না। যুক্তরাষ্ট্রের এখনো বিপুল ধ্বংস করার ক্ষমতা থাকলেও উদ্দেশ্য পূরণে যেখানে ইচ্ছা যখন ইচ্ছা বাহিনী মোতায়েনের ক্ষমতা তাৎপর্যপূর্ণভাবে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। স্নায়ু যুদ্ধের তুঙ্গ পর্বে জন এফ কেনেডি প্রথমবারের মতো তুলে ধরেছিলেন প্যাঙ আমেরিকানার স্বপ্ন। ক্ষয়মান যুক্তরাষ্ট্র-আধিপত্যের বছরগুলোতে সেই স্বপ্ন হয়ে উঠেছে পঙ আমেরিকানার দুঃস্বপ্ন। যুদ্ধ প্রচারণা বিস্তারের ক্ষেত্রে একচেটিয়া তথ্যমাধ্যম সামপ্রতিক বছরগুলোতে যে ভূমিকা নিয়েছে, সেটা তথ্যমাধ্যম সংস্কার আন্দোলনের দ্রুত বিকাশে অবদান রেখেছে। এই তথ্যমাধ্যম সংস্কার আন্দোলন যুক্তরাষ্ট্রে যোগাযোগ কেন্দ্রীভূত হওয়াকে এখন চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।৩৩
এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে, বৈষম্য, অর্থনৈতিক স্থবিরতা, আর্থিক সঙ্কট, দারিদ্র্য, অপচয় ও পরিবেশ-অবক্ষয়ের অবাধ্য সমস্যাগুলোর সম্মুখীন যে সমাজ, অথচ, এরই পাশাপাশি, বছরে এক লাখ কোটি ডলার সামরিক ব্যয়, খুব সম্ভবত অন্যসকল দেশের সম্মিলিত সামরিক ব্যয়ের চেয়ে অনেক বেশী, করে নিজের বিশ্ব অবস্থান ও সামাজিক ব্যবস্থাকে সমর্থন যোগায়, সে-সমাজ পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত। একে পাল্টানো আমাদের কাজ।

তথ্যসূত্র

১. অফিস অব ম্যানেজমেন্ট এন্ড বাজেট (ওএসবি), বাজেট ফর ফিসকাল ইয়্যার, টু থাউজেন্ড নাইন, হিস্টোরিক্যাল টেবলস্‌, টেবিল ৩.২; স্টকহোম পীস রিসার্চ ইন্সটিটিউট (সিপরি), সিপরি ইয়ারবুক টু থাউজেন্ড এইট; সামারি, যঃঃঢ়://ুবধৎনড়ড়শ২০০৮.ংরঢ়ৎর.ড়ৎম/ভরষবং/ঝওচজওণই০৮ ংঁসসধৎু.ঢ়ফভ, ১০-১১; সিপরি, মিলিটারি এঙপেন্ডিচার ডাটাবেজ (যুক্তরাষ্ট্র), যঃঃঢ়://সরষবীফধঃধ.ংরঢ়ৎর.ড়ৎম/ ৎবংঁষঃ.ঢ়যঢ়৪। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ব্যয় সংক্রান্ত সিপরি উপাত্ত (প্রকৃত সামরিক ব্যয় বৃদ্ধি সংক্রান্ত হিসাবের এবং আন্তর্জাতিক তুলনার জন্য এ ক্ষেত্রে সংগৃহীত) প্রান্তিকভাবে মাত্র (প্রায় ৫ শতাংশ) ওএমবি’র উপরোক্ত টেবিল বা ছকে দেয়া উপাত্তের চেয়ে বেশী। স্পষ্টভাবে বোঝা যায়, সিপরির উপাত্তের ভিত্তি এসব উপাত্ত। ওএমবি ২০০৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মোট জাতীয় প্রতিরক্ষা ব্যয় হিসাবে ৫৫২.৬ বিলিয়ন ডলার উল্লেখ করে, এ ক্ষেত্রে সিপরি উল্লেখিত অংক হচ্ছে ৫৭৮.৩ বিলিয়ন ডলার। উল্লেখ করা দরকার যে, সিপরি উল্লেখিত উপাত্তের ভিত্তি যুক্তরাষ্ট্র জাতীয় প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত স্বীকৃত ব্যয়ের একই বা অনুরূপ নামমাত্র অংক হলেও তা ‘যুক্তরাষ্ট্রের সরকারী উপাত্তের চেয়ে’ অধিকতর হার উল্লেখ করে। ‘এর কারণ, ডলারের স্থির মূল্যে রূপান্তর পদ্ধতি। সিপরি সকল দেশের ক্ষেত্রে মূল্য রূপান্তরের জন্য কনজুমার প্রাইস ইনডেঙ (সিপিআই) ব্যবহার করলেও যুক্তরাষ্ট্রের সরকারী অংক সামরিক-সুনির্দিষ্ট ডিফ্লেটর দিয়ে রূপান্তর করা হয়। তাই, সিপরি উপাত্ত ভোগ্য সামগ্রী ও সেবায় ব্যয় করা অংকের চেয়ে সামরিক বাজেটের ক্রয় ক্ষমতার প্রবণতা দেখায় আর যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি উপাত্ত সামরিক সামগ্রী ও সেবার জন্য এর ক্রয় ক্ষমতার প্রবণতা দেখায়। নামমাত্র পরিবর্তন দুটি ধারার জন্যই এক।’ সিপরি ইয়ারবুক, ২০০৭, ২৭৫
২. মাইকেল কালেকি, দি লাস্ট ফেজ ইন দি ট্রান্সফর্মেশন অভ ক্যাপিট্যালিজম, (নিউ ইয়র্ক, মান্থলি রিভিউ প্রেস, ১৯৭২), ৯৬
৩. এরিক হবসবম, অন এম্পায়ার : আমেরিকা, ওয়ার, এন্ড গ্লোবাল সুপ্রিমেসি (নিউ ইয়র্ক, প্যানথিয়ন, ২০০৮), ৫৭-৫৯
৪. সি রাইট মিলস, দি পাওয়ার এলিট (নিই ইয়র্ক, অঙফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, ১৯৫৬), পৃ ১৯৮। উল্লেখ করা দরকার যে, যাকে ‘গুপ্ত সমিতি তত্ত্ব’ বলা যায়, সেটা কেবল হবসবমই তুলে ধরেন নি, এ বিষয়ে আলোচনার জন্য দ্রষ্টব্য জন বেলামি ফস্টার, নেকেড ইম্পেরিয়ালিজম (নিউ ইয়র্ক, মান্থলি রিভিউ প্রেস, ২০০৬), ১৩, ১৮, ১০৭-০৮, ১১৭-২০
৫. ‘ডব্লু পি বি এইড আর্জেস ইইউ এস টু কিপ ওয়্যার সেট-আপ’, নিউ ইয়র্ক টাইমস, ২০ জানুয়ারী, ১৯৪৪; চার্লস ই উইলসন, ‘ফর দি কমন ডিফেন্স,’ আর্মি অর্ডন্যান্স ২৬, সংখ্যা ১৪৩ (মার্চ-এপ্রিল, ১৯৪৪) : ২৮৫-৮৮; ফ্রেড জে কুক, ‘জাগারনাট; দি ওয়্যারফেয়ার স্টেট,’ বিশেষ সংখ্যা, দি নেশন, ২৮ অক্টোবর, ১৯৬১; জনাথন ফেল্ডম্যান, ইউনিভার্সিটিজ ইন দি বিজিনেস অভ রিপ্রেশন (বস্টন : সাউথ এন্ড প্রেস, ১৯৮৯), ১৪৯-৫০। চার্লস ই (জেনারেল ইলেকট্রিক) উইলসন ‘স্থায়ী যুদ্ধ অর্থনীতি’ অভিধাটি আক্ষরিকভাবে ব্যবহার করেন নি, যা তার ১৯ জানুয়ারী, ১৯৪৪ সালে দেয়া বক্তৃতায় বলা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। বরং, তিনি যুদ্ধের জন্য একটি ‘শিল্পগত প্রস্তুতির কর্মসূচি’র কথা বলেন, যে কর্মসূচী হবে ‘স্থায়ী ও অবিরাম।’ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি ও সামরিক ব্যয় সম্পর্কে দ্রষ্টব্য রবার্ট এল হেইলব্রোনার, দি মেকিং অভ ইকোনোমিক সোসাইটি (এঙ্গেলউড ক্লিফস্‌, নিউ জার্সি : প্রেনটিস হল, ১৯৮০), ১৬০
৬. জোন রবিনসন, কন্ট্রিবিউশন টু মডার্ন ইকোনোমিঙ (অঙফোর্ড : বাসিল ব্ল্যাকওয়েল, ১৯৭৮), ৮-৯। যুক্তরাষ্ট্রে একের পর এক সরকারে সামরিক কিনসীয়বাদের ভূমিকার বিবরণের জন্য দ্রষ্টব্য লিন টারজেওন, বাস্টার্ড কিনসিয়ানিজম (ওয়েস্টপোর্ট; কানেকটিকাট : গ্রিনউড প্রেস, ১৯৯৬)
৭. কালেকি, পূর্বোক্ত, ৭৫-৮৩, ৯৫-৯৭; সামরিক ব্যয় সংক্রান্ত কালেকির বিশ্লেষণ মূলত নাৎসি জার্মানীর অর্থনীতিতে অস্ত্র বাবদ ব্যয়ের গুরুত্ব সম্পর্কে তার বিশ্লেষণ থেকে নেয়া এবং এর পরে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী পুঁজিবাদী অর্থনীতির দেশগুলোতে সামরিক ব্যয় যে ভূমিকা পালন করবে, সে ব্যাপারে মৌলিক যুক্তি তৈরি করা হয়।
৮. ঐ; কুক, পূর্বোক্ত, ২৯২
৯. কালেকি, পূর্বোক্ত, ৯৭; হ্যারি ম্যাগডফ, দি এজ অব ইম্পেরিয়ালিজম (নিউ ইয়র্ক, মান্থলি রিভিউ প্রেস, ১৯৬৯), ১৮৫
১০. বারান ও সুইজি, মনোপলি ক্যাপিট্যাল (নিউ ইয়র্ক : মান্থলি রিভিউ প্রেস, ১৯৬৬), বইতে ‘সমরবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ’ শীর্ষক ধ্রুপদ অধ্যায়ে (পৃ. ১৭৮-২১৭) সমরবাদের বিকাশ সম্পর্কে আলোচনাকালে এ পাঁচটি কারণ, সারবিষয়গত দিক থেকে এভাবে সাজানো হয়েছে, উল্লেখ করেন। উল্লেখ করা দরকার যে, তাদের যুক্তি মূলত ছিল সাম্রাজ্যের জন্য সামরিক ব্যয় এবং উদ্বৃত্ত শুষে নেয়া ও কেবল অবশেষে দীর্ঘ মেয়াদে স্থবিরতা প্রতিহত করার ক্ষেত্রে এর সামষ্টিক অর্থনৈতিক সুবিধা নিয়ে। সামরিক ব্যয় সংক্রান্ত যুক্তির একই কাঠামো (সাম্রাজ্য প্রথমে, এর পরে অর্থনীতি) পাওয়া যায় হ্যারি ম্যাগডফ, ইম্পেরিয়ালিজম : ফ্রম দি কলোনিয়াল এজ টু দি প্রেজেন্ট (নিউ ইয়র্ক : মান্থলি রিভিউ প্রেস, ১৯৭৮), ১৯৮-২১২ তে। এর পরে ল্যারি গ্রিফিন, জোয়েল ডেভাইন ও মাইকেল ওয়ালেস, প্রমুখ সমালোচক অভিজ্ঞতাবাদী পদ্ধতি অনুসরণ করে মনোপলি ক্যাপিট্যালে উল্লেখিত যুক্তি যাচাই করার চেষ্টা করেন। তাঁরা মনোপলি ক্যাপিট্যালে উল্লেখিত যুক্তিকে “ ‘হাস্যকর সারল্যপূর্ণ’ মডেল...যা বলে যে, জাতীয় উৎপাদনের যতটুকু সামরিক ব্যয় শুষে নেয়, তা বেকারত্বসহ মোট অর্থনৈতিক অবস্থার ওপর নির্ভরশীল হতে হবে” বলে অভিহিত করেন। এ বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তারা সুস্পষ্টভাবেই তাদের উদ্ভাবিত ‘হাস্যকর সারল্য পূর্ণ মডেলে’র সমালোচনা করছিলেন। নির্মম পরিহাস এটাই যে, এই হাস্যকর সারল্যপূর্ণ মডেলটি প্রত্যাখ্যান করার পরে এই লেখকরাই উপসংহারে পৌঁছান যে, ক্রমহ্রাসমান একচেটিয়া মুনাফার মুখে যুক্তরাষ্ট্র রাষ্ট্রটি সামরিক ব্যয় বৃদ্ধির মাধ্যমে উদ্বৃত্ত শুষে নেয়ার ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করে। তাদের এ দৃষ্টিভঙ্গি বারান ও সুইজির যুক্তির অনেক কাছাকাছি। তবে, সামষ্টিক অর্থনীতিতে সাম্রাজ্যের ওপরে বারান ও সুইজি যে গুরুত্ব দিয়েছিলেন, উপরোক্ত লেখকদের উপসংহারে সে গুরুত্ব দেয়া হয় নি। দ্রষ্টব্য : ল্যারি জে গ্রিফিন, জোয়েল এ ডেভাইন এবং মাইকেল ওয়ালেস, ‘মনোপলি ক্যাপিট্যাল, অর্গানাইজড্‌ লেবার, এন্ড মিলিটারি এঙপেন্ডিচার ইন দি ইউনাইটেড স্টেটস, নাইনটিন ফরটি নাইন টু নাইনটিন সেভেনটি সিঙ,’ এমেরিকান জার্নাল অব সোসিওলোজি, এইটি এইট সাপ্লিমেন্ট (১৯৮২) : এস ১১৩-এস ১৫৩
১১. বারান ও সুইজি, মনোপলি ক্যাপিট্যাল, ১৫৯, ১৬১, ১৭৭, ২০৮-১১। বেসামরিক সরকারের বিভিন্ন ক্রয় জিডিপির শতাংশ হিসেবে শেষ সীমায় পৌঁছায় ১৯৩৯ সালে বলে বারান ও সুইজি চার দশকের বেশী আগে যে যুক্তি দেন, তাকে পরবর্তী ঘটনা প্রবাহ সমর্থন করে। বেসামরিক সরকারের ক্রয় ১৯৩৯ সালে ছিল জিডিপির ১৩ শতাংশ; এ হার ১৯৬০ সাল থেকে এখন পর্যন্ত গড়ে ছিল ১৪ শতাংশ (এবং ২০০৬ সালেও ছিল ১৪ শতাংশ) ইকোনোমিক রিপোর্ট অভ দি প্রেসিডেন্ট, টু থাউজেন্ড এইট, ২২৪, ২৫০
১২. স্লিকটার, লুস, ইউ এস নিউজ এন্ড ওয়ার্ল্ড রিপোর্ট, লরেন্স এবং হ্যারিসের উপরোক্ত উদ্ধৃতিগুলো নেয়া হয়েছে কুক, ‘জাগারনাট’, ২৮৫, ৩০০-০১ থেকে। আরো দ্রষ্টব্য : ফ্রেড এইচ কুক, দি ওয়ারফেয়ার স্টেট (নিউ ইয়র্ক : কোলিয়ার বুকস, ১৯৬২), বারান এবং সুইজি, মনোপলি ক্যাপিট্যাল, ২০৭-১৩
১৩. যুক্তরাষ্ট্র জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ, এনএসসি-সিঙটি এইট, এপ্রিল, ১৯৫০, ‘সেকশন ডি : দি রিমেইনিং কোর্স অব একশন,’ যঃঃঢ়://িি.িভধং.ড়ৎম/রৎঢ়/ড়ভভফড়পং/হংপ-যংঃ/হংপ-৬৮.যঃস; জেমস এম সাইফার, “দি বেসিক ইকোনোমিঙ অব ‘রিয়ারিং আমেরিকা,’” মান্থলি রিভিউ, ৩৩ সংখ্যা, ৬ নভেম্বর, ১৯৮১) : ১২-১৩; নওম চমস্কি, ‘দি কোল্ড ওয়্যার এন্ড দি সুপারপাওয়ার্স,’ মান্থলি রিভিউ, ৩৩ সংখ্যা, ৫ (নভেম্বর, ১৯৮১) : ৪-৫
১৪. কুক, জাগারনাট, ২৭৭, ২৯৯ তে উদ্ধৃত চার্লস আরউইন উইলসন
১৫. কুক, উপরোক্ত, ২৭৬-৭৯ তে উদ্ধৃত আইজেনহাওয়ার
১৬. বারান এবং সুইজি, মনোপলি ক্যাপিট্যাল, ২০৫
১৭. যুক্তরাষ্ট্র স্বীয় উদ্দেশ্য পূরণে প্রত্যক্ষ হুমকি হিসাবে পারমাণবিক অস্ত্র কিভাবে অবিরাম ব্যবহার করে, তার ধ্রুপদ যুক্তি দিয়েছেন ড্যানিয়েল এলসবার্গ, ‘কল টু মিউটিনি,’ ই পি থম্পসন এবং ড্যান স্মিথে সম্পাদিত প্রোটেস্ট এন্ড সার্ভাইভ (নিউ ইয়র্ক : মান্থলি রিভিউ প্রেস, ১৯৮১) বইতে, র-ীীাররর
১৮. রবার্ট কাপলান, ইম্পেরিয়াল গ্রান্টস (নিউ ইয়র্ক : র‌্যানডম হাউজ, ২০০৫), ৩
১৯. ইয়রগেন ব্রয়ার, ‘ইউনাইটেড স্টেটস মিলিটারি এঙপেন্ডিচার’ উল্ফর‌্যাম এল্‌সনার সম্পা. আর্মস, ওয়্যার, এন্ড টেরোরিজম ইন দি গ্লোবাল ইকোনোমি টুডে (হামবুর্গ : এল আই টি ভারলাগ, ২০০৭), ৬১-৬৬
২০. বেঞ্জামিন এ ম্যানডেল এবং ম্যারি এল রয়, ‘ফেডারেল বাজেট এস্টিমেটস ফর ফিসকাল ইয়ার টু থাউজেন্ড সেভেন,’ সার্ভে অভ কারেন্ট বিজিনেস (বুরো অব ইকোনোমিক এনালাইসিস), মার্চ, ২০০৬, ১৩
২১. এ টেবিল বা ছকের নকশায় ধারণাটি নেয়া হয়েছে সাইফার, “বেসিক ইকোনোমিঙ অব ‘রিআর্মিং এমেরিকা’ ” থেকে।
২২. ব্রয়ার, ‘ড্যাটা, মডেলস, কোএফিসিয়েন্টস : দি কেস অভ ইউনাইটেড স্টেটস মিলিটারি এঙপেন্ডিচার,’ কনফ্লিক্ট ম্যানেজমেন্ট এন্ড পীস সায়েন্স ২৪ (২০০৭), ৫৮; ব্রয়ার, “ইউনাইটেড স্টেটস মিলিটারি এঙপেন্ডিচার্স,” ৬৭
২৩. সিপরি, সিপরি ইয়ারবুক, টু থাউজেন্ড থ্রি (অঙফোর্ড : অঙফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, ২০০৩), ৩৬৫; ব্রয়ার, ‘ইউনাইটেড স্টেটস মিলিটারি এঙপেন্ডিচার্স, ৬৬ এবং ‘ড্যাটা, মডেলস, কোএফিসিয়েন্টস,’ ৫৬। দ্রষ্টব্য : আমরা হোমল্যান্ড সিকিউরিটি সংক্রান্ত অংক আমাদের হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করি নি। বেসামরিক প্রতিরক্ষা কর্মসূচিগুলোকে সিপরি ও ন্যাটো অন্তর্ভুক্ত করে না। সে অনুসারেই আমরা করি নি।
২৪. সিপরি ইয়ারবুক, টু থাউজেন্ড এইট, সারসংক্ষেপ, ১০-১১
২৫. জেমস সাইফার, ‘ফ্রম মিলিটারি কিনসিয়ানিজম টু গ্লোবাল নিওলিব্যার‌্যাল মিলিটারিজম,’ মান্থলি রিভিউ ৫৯, সংখ্যা ২ (জুন, ২০০৭) : ৪৫-৪৮; চালমার্স জনসন, ‘হোয়াই দি ইউনাইটেড স্টেটস রিয়্যালি গান ব্রোক,’ লা মঁদে ডিপ্লোম্যাটিক, ফেব্রুয়ারী, ২০০৮
২৬. এ নিবন্ধে সকল উপাত্ত দেয়া হয় নি, তবে সমগ্রটিতেই উপরোক্ত পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়েছে
২৭. সার্বিকভাবে এ সংক্রান্ত যুক্তির জন্য দ্রষ্টব্য : ফস্টার, নেকেড ইম্পেরিয়ালিজম (নিউ ইয়র্ক, মান্থলি রিভিউ প্রেস, ২০০৬), বিশেষভাবে ১০৭-২০
২৮. ফস্টার, ঐ, ৫৫-৬৬; চালমার্স জনসন, দি সরোজ অভ এম্পায়ার (নিউ ইয়র্ক : হেনরি ইল্ট, ২০০৪), ১৫১-৮৫
২৯. তুলনামূলক অধঃগতির পর্বের পরে উভয় ক্ষেত্রেই সামরিক পুনরুজ্জীবন ঘটেছে ডেমোক্র্যাটিক দলীয় সরকারগুলোর ক্লান্তিকর শেষ ভাগে : ১৯৭০য়ের দশকের শেষ ভাগে কার্টার সরকারের ও ১৯৯০য়ের দশকের শেষ ভাগে ক্লিনটন সরকারের আমলে এবং তা গতি পায় এ সরকার দ্বয়ের পরে আসা রিপাবলিক্যান দলীয় সরকারগুলোর আমলে : ১৯৮০র দশকে রিগ্যানের সরকার ও ২০০০য়ের দশকের শুরুতে জর্জ ডব্লু বুশ সরকারের আমলে।
৩০. রবার্ট ডব্লু ম্যাকচেসনি, দি পলিটিক্যাল একোনোমি অব দি মিডিয়া (নিউ ইয়র্ক: মান্থলি রিভিউ প্রেস, ২০০৮), ১০৫, ১০৮
৩১. নর্মান সলোম্যান, ‘দি মিলিটারি-ইন্ডাস্ট্রিয়াল মিডিয়া কমপ্লেঙ,’ এঙট্রা, জুলাই-আগস্ট, ২০০৫, যঃঃঢ়://িি.িভধরৎ.ড়ৎম/রহফবী.ঢ়যঢ়?ঢ়ধমব-২৬২৭
৩২. বারান এবং সুইজি, মনোপলি ক্যাপিট্যাল, ২১৩-১৭
৩৩. দ্রষ্টব্য জন বেলামি ফস্টার এবং রবার্ট ডব্লু ম্যাকচেসনি, ‘ভূমিকা,’ ফস্টার এবং ম্যাকচেসনি সম্পা., পঙ এমেরিকানা : এঙপোজিং দি এমেরিকান এম্পয়ার (নিউ ইয়র্ক: মান্থলি রিভিউ প্রেস, ২০০৪), ৭-১০; ম্যাকচেসনি, দি পলিটিক্যাল ইকোনোমি অব দি মিডিয়া, ৪৯১-৫০০
জন বেলামি ফস্টার মান্থলি রিভিউর সম্পাদক এবং ওরেগন বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজতত্ত্বের অধ্যাপক। হান্না হোলম্যান ওরেগন বিশ্ববিদ্যালয়ে ডক্টরেট ছাত্র। রবার্ট ডব্লু ম্যাকচেসনি উরবানা-চ্যাম্পেনে ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ে গটগসেল এনডোড প্রফেসর। তাঁর বইগুলোর মধ্যে রয়েছে দি পলিটিক্যাল ইকোনোমি অব মিডিয়া (মান্থলি রিভিউ প্রেস, ২০০৮), কমিউনিকেশন রেভোলিউশন (নিউ প্রেস, ২০০৭), দি প্রবলেম অব দি মিডিয়া (মান্থলি রিভিউ প্রেস, ২০০৪) এবং রিচ মিডিয়া, পুওর ডেমোক্রাসি (ইউনিভার্সিটি অভ ইলিনয়, ১৯৯৯)।
এ নিবন্ধের লেখকেরা নিবন্ধটি রচনায় সাহায্য করার জন্য ফ্লেড ম্যাগডফ এবং আর জোনাকে ধন্যবাদ জানান।
ইংরেজী নিবন্ধটি এনালিটিক্যাল মান্থলি রিভিউর অক্টোবর, ২০০৫ (বর্ষ ৬, সংখ্যা ৭) এ প্রকাশিত হয়।