শ্রাবণী সেন

আনোয়ারুল করিম

পঁচিশ বছর আগের ঘটনা। তিন মাসের জন্য ভারতের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশ সম্পর্কে বক্তৃতা দেবার জন্য আমাকে আমন্ত্রণ জানান হয়েছিল। সেই সুবাদে ভারত ভ্রমণ। শীত যায় যায়। তেমন গরম পড়ে নি। ভ্রমণের জন্য চমৎকার সময়। কলকাতার একটি অতিথিশালায় থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল। সেখান থেকে ব্যাঙ্গালোর যেতে হবে। দু’টো বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা। হাওড়া স্টেশন থেকে ট্রেনে পথ পাড়ি দিতে হবে। ব্যাঙ্গালোরে আগে কখনও যাই নি। তবে অনেক সুনাম শুনেছি। সিটি অব গার্ডেনস নামেই খ্যাত এই শহর। দক্ষিণ ভারতের একটি গৌরবময় ভূখণ্ড। সকাল নয়টার দিকে ব্যাঙ্গালোরে পৌঁছলাম। কর্মকর্তারা স্টেশনে গাড়ী নিয়ে আমার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। তাঁরা একটি গেস্ট হাউজে নিয়ে এলেন আমাকে। বললেন, দশটার দিকে তৈরী থাকার জন্য। প্রোগ্রাম অনুযায়ী আমাকে নেবার জন্য লোক আসবে। গেস্ট হাউজে চা খাচ্ছি একলা। বাংলাদেশ থেকে দু’তিন সপ্তাহ হয়ে গেছে ভারতে এসেছি। বাড়ীর সঙ্গে দু’একবার ফোনে কথা হয়েছে। স্বজন থেকে দূরে। মনটা তাই একটু খারাপ। এখানে কলকাতার কোনো কাগজ আসে না। স্টেটসম্যান পত্রিকা কখনও কখনও পাওয়া যায়। ব্যাঙ্গালোর থেকে প্রকাশিত একটি ইংরেজী পত্রিকায় চোখ বুলাচ্ছিলাম। কখন যে দশটা বেজে গেছে জানি না। গেস্ট হাউজটা ছিল ফুলে ফুলে ভরা। আকাশে দু’এক খণ্ড হাল্কা ভাসমান মেঘ। রোদের তাপও তেমন নয়। আকাশের দিকে তাকিয়ে কিছু স্মৃতিচারণ করছিলাম। মহীশূরে আমার এক বন্ধু আছেন। ফোকলোরবিদ। তাঁর ওখানেও যেতে হবে। ইতিমধ্যে কলকাতার কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা করেছি। কলকাতা আমার পরিচিত। বন্ধু বান্ধবের সংখ্যাও বেশ। ঠিক সে সময়ে আমাকে চমকিয়ে একটি ডাক, ‘এই করীম, কেমন আছ? কখন পৌঁছালে? পথে অসুবিধা হয় নি তো?’
আশ্চর্য হলাম, এ বিদেশ বিভুঁইয়ে হিন্দী বা সাউথ ইন্ডিয়ান ইংরেজীতে কেউ হয়তো আমাকে সম্বোধন করবে এমনটিই স্বাভাবিক। কিন্তু একেবারে খাঁটি বাংলা ভাষায় সম্বোধনই শুধু নয়-তাতে বামা কণ্ঠ, তাও নামধরে ‘তুমি’ বলে সম্বোধন! হকচকিয়ে যাবার ব্যাপারইতো। তাকিয়ে দেখি একজন শ্যামাঙ্গিনী মিষ্টি মুখে আমার সামনে দাঁড়িয়ে। কিছু বুঝবার আগে আবার চমৎকার বাংলায় কথা বললেন তিনি, ‘কি, খুব চমকে গেছ বুঝি? এই বিদেশে তোমাকে নাম ধরে কে ডাকতে পারে, তাই না? কিসসু ভেবো না। আমি শ্রাবণী, শ্রাবণী সেন। তোমার প্রোটোকল অফিসার। তুমি আসছ জেনেই আমি এই দায়িত্বটা নিয়েছি। তা নইলে কোন এক সাউথ ইন্ডিয়ান এই দায়িত্বটা নিত।’ তাকিয়ে দেখলাম। চমৎকার শাড়ী পরে, মধ্যবয়স তখনও আসে নি তাঁর মধ্যে, এমন একটি মেয়ে আমার পাশে সোফায় বসে পড়লো। বেশ স্মার্ট, কিন্তু চেহারায় সুচিত্রা সেনের দীপ্তি। কথা বলার ঢঙও অনেকটা তেমনি। বললাম, ‘আপনি আমাকে নাম ধরে ডেকেছেন সে জন্য ধন্যবাদ। কিন্তু এত চমৎকার বাংলায় এই ব্যাঙ্গালোরে আমাকে এমন করে সম্বোধন! আশ্চর্য হবারই তো কথা!’
এবার একটু ধমকের সুরে অনুযোগ মেয়েটির কণ্ঠে, ‘এই কি হচ্ছে। আমাকে আপনি করে বলছ কেন? তুমি করে বল। কতদিন ‘তুমি’ ডাক শুনিনি।’ আমি আরও আশ্চর্য হই। এবারে মেয়েটি হেসে বলে, ‘আমি বেশ বুঝতে পারছি, তুমি দারুণ অবাক হচ্ছো। আমি বাঙালী মেয়ে। জন্ম আমার বাংলাদেশে, কুষ্টিয়ায়। সেই যে খুব ছেলেবেলায় দেশ বিভাগ হতে দেখেছিলাম! বাবা-মা আমাদের দু’বোন এক ভাইকে নিয়ে প্রথমে কলকাতায় বেশ কিছুদিন তারপর বাবার চাকুরী সুবাদে দিল্লী। সে কি আজকের কথা। আস্তে আস্তে বাংলা বলার রেওয়াজ বন্ধ হয়ে গেল। ইংরেজী আর হিন্দী। বাড়ীতেও বাংলার চর্চা কমে গেল। দেশের মানুষের সঙ্গে দেখা নেই। কলকাতার বাঙালীদের সঙ্গে খুব কমই মেলামেশা। এরপর হঠাৎ একদিন আমার বিয়ে হয়ে গেল। না, না কোনো বাঙালী ছেলের সঙ্গে নয়। একেবারে অবাঙালী। ভারত সরকারের পদস্থ কর্মকর্তা। বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত। তাও বেশ কয়েক বৎসর। অসুখ-বিসুখে কাহিল। ছেলেমেয়েরা কেউ দেশে থাকে না। আমরাই কেবল দু’জন। ও আবার সবার সঙ্গে মিশতেও পারে না। বাড়ীতেই থাকে বেশীর ভাগ সময়। আমার থেকে প্রায় ১০/১২ বৎসর বড়। ওকে বললাম, বাড়ীতে দু’জন কি করব সারাদিন। একটা চাকুরী নেই। সেই থেকে এই চাকুরী। তবে তুমি আসছ জেনে তো আমি দারুণ খুশী। এত বৎসর পর একজন বাঙালীর সঙ্গে দেখা হবে। তাও আমার আদি বাসভূমি কুষ্টিয়ার। কত আনন্দের, বলতো’!
আমি দারুণ উৎসাহিত হলাম। আমার জেলার মেয়ে। এই বিদেশে এমনভাবে পরিচিত হব-ডযধঃ ধ ংঃৎধহমব পড়রহপরফবহপব! বললাম, ‘আমার দারুণ ভালো লাগছে। আমি ভাবতেই পারি নি আপনি বাঙালী এবং বাংলাদেশের মেয়ে, তাও আবার আমার জেলার। সব কিছুই যেন অবিশ্বাস্য।’ এবার মেয়েটি ক্ষেপে গেল, ‘এই ছেলে, কি হচ্ছে, সেই তখন থেকে ‘আপনি’ ‘আপনি’ করছ যে? ‘তুমি’ করে বল, প্লিজ। আমার পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছি অনেক ক’বছর। ভাইবোন দেশের বাইরে-লন্ডনে। বাবা-মা দু’জনেই গত হয়েছেন। বুঝতেই পারছ, আমার মনের অবস্থা। তোমার সি.ভি পড়েছি। ইংরেজী সাহিত্যের অধ্যাপক। বাউল-লালনকে নিয়ে গবেষণা করেছ। কিন্তু তোমার তো এমন অহঃর-জড়সধহঃরপ হবার কথাতো নয়, মশায়। কখনও মেয়েদের সঙ্গে তোমার প্রেম হয় নি?’ হেসে বললাম, ‘বাব্বা, অনেক হয়েছে, আমি ঘাট মানলাম। এখন বল, তুমি কেমন আছ? কেমন চলছে তোমার সংসার।’ বলল, ‘সে-কথাতো আগেই বলেছি। থাক, সে সব কথা। কুষ্টিয়ার মোহিনী মিলের একটি বাড়ীতে আমার জন্ম। ঠাকুর্দা মোহিনী মিলে চাকুরী করতেন। তিনি অবসর নিলে বাবা চাকুরী পান।’ আমি বললাম ‘বল কি? এত কাছের-অথচ এত দূরে তুমি।’ বললে, ‘জানো, আমার বয়স যখন প্রায় দশ বৎসর, তখন কুষ্টিয়া ছেড়েছি। আচ্ছা বলতো, বিদ্যাপীঠ স্কুলটা এখনও কি আছে? ওখানেই আমার প্রাথমিক শিক্ষা। দোতালা একটা ক্লাবঘর ছিল আমাদের বাড়ীর কাছে। এক পাশে ছিল টেনিস মাঠ। এই ক্লাব ঘরে প্রতি বৎসর অনুষ্ঠান হতো। কলকাতা থেকে নামী-দামী শিল্পীরা যেতেন। বেশ জম-জমাট ছিল মোহিনী মিলস তখন। স্টেশনের পাশেই ছিল রবীন্দ্রনাথের একটি কুঠিবাড়ী, একেবারে মোহিনী মিলস-এর প্রাচীর ঘেঁষে। আচ্ছা বলতো, বাড়ীটি কি এখনও আছে?’ আমি বললাম, ‘আছে, তবে তা অন্যের দখলে। গেটে নামফলকে এখনও অবশ্য লেখা আছে টেগোর এন্ড কোম্পানী। পাশেই যজ্ঞেশ্বর ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ। ওই বাড়ী থেকে রবীন্দ্রনাথ নানা ব্যবসাও করেছেন।’
শ্রাবণী বললো, ‘হ্যাঁ বাবা ঠাকুর্দার মুখে নানা গল্প শুনেছি। একবার গড়াই ব্রিজের কাছে রবীন্দ্রনাথের বোট প্রায় উল্টে গিয়েছিল। আচ্ছা বলতো, রবীন্দ্রনাথ তখন মারা গেলে কি হতো! আমরা কি বিশ্বকবি পেতাম! আচ্ছা শিলাইদহের খবর বলতো। আমরা গড়াই পেরিয়ে বেশ কয়েকবার শিলাইদহে গিয়েছি গরুর গাড়ীতে। একবার নদী পথে গিয়েছিলাম। গড়াই দিয়ে পদ্মা। তারপর শিলাইদহ। কি দারুণ মজা হতো। নদীতে ইলিশ পড়তো। খুব সস্তা ছিল ইলিশ সে সময়ে। আচ্ছা বলতো, সাঁড়ার ব্রিজ কি ঠিক হয়েছে? খবরে শুনিছিলাম, তোমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ব্রিজটার ক্ষতি হয়ে গেছে।’ বুঝলাম, শ্রাবণী হার্ডিঞ্জ ব্রিজের কথা বলছে। বললাম, ‘দেশ স্বাধীন হবার পর পরই ভারত সব ঠিক করে দিয়েছিল। পাকিস্তানী সৈন্যদের রুখতে ভারতই বোমাবাজী করে ব্রিজের একাংশ ক্ষতি করে দিয়েছিল। যুদ্ধের পর সংস্কার শেষে ব্রিজটি চালু হবার সময় একটা বিরাট ভোজসভা হয়েছিল ব্রিজের উপর রেলওয়ে কমপার্টমেন্টে। লালনগবেষক হিসেবে আমাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।’
শ্রাবণী থামতেই চায় না। বললে, ‘আচ্ছা বলতো, কুষ্টিয়া হাই স্কুলটি কি এখনও আছে? ওখানে আমার দাদা পড়তো। একটা মাত্র প্রধান রাস্তা-হাই রোড। কেমন হয়েছে রাস্তাটা এখন?’ আমি বললাম, ‘রাস্তাটার নাম বদলে নবাব সিরাজুদ্দৌলা রোড রাখা হয়েছে এখন। সংক্ষেপে এন এস রোড।’ শ্রাবণী রেগে বললো, ‘এটা তোমরা ঠিক করোনি। পুরনো ঐতিহ্য ধরে রাখার প্রয়োজন ছিল। আচ্ছা বলতো, মোহিনী মিলের কেমন অবস্থা? শুনেছি, তোমরা ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় এটা ‘শত্রু সম্পত্তি’ ঘোষণা করেছিলে? এটাও ঠিক করোনি। মিলটা তো তোমরাই ধ্বংস করে ফেললে গো। মোহিনী বাবুর পরে কানু বাবু তো ভালোই চালাচ্ছিলেন, হাজার হাজার শ্রমিক কাজ করতো। আচ্ছা বলতে পারবে, কানু বাবুর ছেলে দুলালদা’র কথা। আমাদের কয়েক বৎসরের বড়। শুনেছি, কলকাতায় আর একটা মিল করেছিলেন কানু বাবু। দুলালদা নিজে দেখাশুনা করতেন। ডোভার লেনে দুলালদা’র এক কাকা বাবু থাকতেন। আমরা যখন চলে আসি তখন উনিও চলে আসেন। বাবার সাথে অনেকদিন যোগাযোগ ছিল। মোহিনী মিলের পাশে ছেঁউড়ে গ্রামে লালন ফকিরের মাজার ছিল। আমাদের সময় তেমন কিছু বুঝি নি। সিভিতে দেখলাম তুমি তাঁর ওপর কাজ করেছ। এখানে বাঙালী সংস্কৃতির কোনো ছিটেফোঁটাই নেই। তাই তোমাকে দেখে আমার ফেলে আসা দিনগুলির কথা মনে পড়ল। যাক, চলো এখন, আর সময় নেই। প্রোগ্রামে যেতে হবে।’ ঘড়িতে তাকিয়ে দেখলাম সাড়ে দশটা। বুঝলাম, শ্রাবণী সতর্ক।
শ্রাবণীর সাথে প্রোগ্রাম শেষ করলাম। বিকেলে ‘বৃন্দাবন গার্ডেন্স’ দেখাতে নিয়ে যাবে আমাকে। দুপুরে আমার রেস্ট হাউজে দু’জনে খেলাম। আগামীকার সকালে মুম্বাই যেতে হবে। সেখানে দুটো বক্তৃতা। বিকেলে কিছুপথ ট্রেনে গেলাম আমরা। আমাদের কমপার্টমেন্টে একজন তরুণ দম্পতিও ছিল। বেশ বোঝা যাচ্ছিল তারা প্রেমিক-প্রেমিকা। শ্রাবণী বললো, ‘তুমি কি কখনও প্রেম করেছ?’ আমি বললাম, ‘তোমার কি মনে হয়?’ শ্রাবণী বললো, ‘আমার প্রথম দেখায় মনে হয়েছে, তুমি একটা নিরেট হাঁদা। ‘তুমি’ বলতেই তোমার এতো সংকোচ। মেয়েদের সঙ্গে কথা বলবে কি করে? আচ্ছা বলতো, ঔড়যহ উড়হহবএর ওই কবিতার দুটো লাইনের কথা। ্তুঐড়ষফ ুড়ঁৎ ঃড়হমঁব ধহফ ষবঃ সব ষড়াব্থ অথবা ঞ.ঝ ঊষরড়ঃ এর খড়াব ংড়হম ড়ভ চৎঁভৎড়পশ কবিতা, যেখানে লেখা রয়েছে-

্তুখবঃ ঁং মড় ঃযবহ, ুড়ঁ ধহফ ও
ডযবহ ঃযব বাবহরহম রং ংঢ়ৎবধফ ড়ঁঃ ধমধরহংঃ ঃযব ংশু
খরশব ধ ঢ়ধঃরবহঃ বঃযবৎরুবফ ঁঢ়ড়হ ধ ঃধনষব.্থ

‘ওই যে গো জীবনানন্দ দাশ, এই সন্ধ্যেবেলাকে অনুবাদ করেছেন ‘শিশিরের শব্দের মতো সন্ধ্যা আসে’।’ আমি অবাক হয়ে শুনছিলাম। আমাকে পেয়ে ও যে এতটা প্রগলভ হবে-ভাবি নি। হঠাৎ একটা প্রশ্নে আমি হকচকিয়ে গেলাম। শ্রাবণী বললো, ‘আমার সঙ্গে প্রেম করতে পারবে?’ আমি উত্তর না দিতেই ও আবার বললো, ‘তুমি একটা আস্ত হাঁদারাম, তোমার দ্বারা কিস্‌সু হবে না-তা বেশ বুঝেছি।’ আমি বললাম, ‘প্রেম কি এতই সহজ, যখন তখন বুঝি তা করা যায়?’ শ্রাবণী হেসে বললো, ‘বাহ, বেশ তো মুখ খুলছে তোমার। এবার হৃদয়টা একটু খুলে দাও না বাপু।’ এই হিন্দী ভাষার দেশে অবাঙালীদের সাথে কথা বলে প্রাণ কি ভরে? স্বামীটিও তো অবাঙালী, ও বাঙালী মেয়ের অনুভূতি আর কতটুকু বোঝে? ওরা বিয়ে করে দেহের জন্য। এটুকু পেলেই ওরা সন্তুষ্ট। ক্লাবে যাচ্ছে, মদ খাচ্ছে। সেখানেও মেয়েদের সাথে মিশছে। রাত্রে বুঁদ হয়ে বাড়ী ফিরছে-তার পর ঘুম। এই তো এদের জীবন।’ আমি বললাম, ‘তোমার তো বেশ দুঃখ আছে, তা হলে।’ শ্রাবণী হেসে বললো, ‘আরে না না। আমি তো বেশ সুখী। এত বড় একজন মানুষ। অঢেল অর্থ। একটি নারীর যা প্রয়োজন তার আর কিছু বাকি আছে নাকি! আর আমার স্বামীধন অসাধারণ নির্লিপ্ত। বাগান আর বই এবং সন্ধ্যায় ক্লাব-এই নিয়েই তার দিন যায়।’
আমি বললাম, ‘আচ্ছা এবার বলতো, তুমি কি কখনও প্রেমে পড়েছিলে?’ এবারে হঠাৎ শ্রাবণী বেশ গম্ভীর হয়ে পড়ল। বললো, ‘তোমাকে তো বলেছি, আমরা প্রথম দিকে কলকাতায় ছিলাম। সেখানে একটি ছেলেকে ভালোবেসে ফেলেছিলাম। সেও আমাকে খুব ভালোবাসতো। কিন্তু ওর ছিল দরিদ্রের সংসার। বাবা-মা আর পাঁচভাই বোন। ভালমতো খাবারও তেমন জুটতো না। ও চমৎকার গান গাইতে জানতো। ওকেই মন দিয়েছিলাম। আচ্ছা, তোমার কি জসীমউদ্‌দীনের ওই কবিতার কথা মনে আছে? আমার খুব ভালো মনে নেই।

মনটা কি বুঝি কুমড়োর ফালি
যখন তখন যাহারে তাহারে বিলান যায়!’

আমি অবাক হলাম, দেখলাম ওর চোখের কোণে অশ্রু। আমি প্রসঙ্গ বদলালাম। বললাম, ‘শ্রাবণী তোমার সাথে প্রেম নয়, বন্ধুত্ব। এটা আজীবন থাকবে। আমরা দু’জন দু’সমপ্রদায়ের। কিন্তু আমরা দু’জনাইতো মানুষ! তোমাদের ধর্মে ‘রাখি বন্ধন’ আছে। এসো না বন্ধুত্বের বন্ধনে আমরা আবদ্ধ হই।’ শ্রাবণী হেসে বললো, ‘ঠিক আছে তাই হবে।’ দেখলাম, গল্পে গল্পে অনেক সময় কেটে গেছে। বৃন্দাবন গার্ডেন্স অত্যন্ত সুন্দর এবং দীর্ঘ। তাই ঘোরা সম্ভব হলো না। কিন্তু মনের ভিতর যে গার্ডেন্স তৈরী হলো-তাতো সারা জীবন সঙ্গে থাকবে। তারপর রাতে ফিরে এলাম ব্যাঙ্গালোরে। শ্রাবণী হঠাৎ একটা ফাইভ স্টার হোটেলে নিয়ে এল আমাকে। বললো, ‘এখানে আজ রাতে আমরা ডিনার করবো।’ একটা টেবিলে আমরা দু’জনা বসলাম। আমি এক ফাঁকে আমার পার্স দেখার জন্য ওয়াশিং রুমে এলাম। দেখলাম খুব সামান্য টাকা আছে আমার সঙ্গে। গেস্ট হাউজে ব্রিফ কেসে টাকা রয়ে গেছে। মনে হঠাৎ ভয় ঢুকে পড়ল। এত বড় হোটেল। আজকের ডিনারের টাকাটা আমাকে দিতে হলে তো বড় বিপদ হবে। ওকে কি করে বলবো যে আমার কাছে তেমন টাকা নেই। মনে পড়লো, ক্লাসে সমারসেট মম-এর লেখা ঞযব খঁহপযবড়হ পড়াতাম। ছেলেমেয়েরা খুব মজা করে আমার পড়া শুনতো। আমি নিজেই সেখানে লেখক-নায়ক হয়ে যেতাম। কিন্তু আজ আমি দারুণ বিব্রতবোধ করলাম। টেবিলে ফিরে এসে দেখি শ্রাবণী অনেক কিছুর অর্ডার দিয়েছে। সেসবের দিকে তাকিয়ে আমি আরও ঘাবড়ে গেলাম। আমার মুখের দিকে তাকিয়ে শ্রাবণী বললো, ‘কি ব্যাপার, তোমার মন খারাপ কেন?’ আমি বললাম, ‘কাল সকালে তো চলে যেতে হবে। তোমার জন্য তো কষ্ট হবে।’
শ্রাবণী হেসে বললো, ‘তোমার দুঃখের থেকে আমার দুঃখই বেশী হবে। তুমি তো আবার দেশে ফিরে গিয়ে স্বজনদের সঙ্গে মিশে যাবে। তখনতো আর আমার কথা আদৌ মনে থাকবে না। বরং আমার কষ্টটাই থাকবে। এখন আমি বড় একা। এমন করে মনের কথা ভাগাভাগি করে নেবার আর তো কেউ নেই।’ ও বললো, ‘নাও খাওয়া শুরু করোতো! এই ওয়েটার, আমাদের জন্য আরো কিছু আনো তো। খাবার মেন্যুটা দাও।’ আমি তখন রীতিমত আরও ভয় পেয়ে গেছি। যদি খাবারের বিল আমাকেই দিতে হয়? অন্ততঃ ভদ্রতা করে একবার বলতেও তো হবে। বললাম, ‘শ্রাবণী, এত তো খাওয়াই যাবে না। আর আমি তো রাতে রুটি খাই। দেখছোতো একটু মোটা হয়ে গিয়েছি।’
শ্রাবণী হেসে বললো, ‘রাখো তো সব। খাবার সামনে রেখে এসব কথা বলতে নেই।’ কিন্তু সত্যি বলতে কি আমার খাবারের প্রতি আর আগ্রহ নেই। শ্রাবণী একেকটা আইটেম তুলে দিচ্ছে, আর বারবার বলছে ‘খাও তো।’ বুঝতে পারছিলাম, আমি ঘামছি। কিন্তু কথা বলতে হচ্ছে। খেতেও হচ্ছে। বুঝছি, না-খেয়েও তো উপায় নেই। ভালোই লাগছিল। এরপর খাওয়া শেষে ওয়েটার বিল নিয়ে এল। বিল দেখে আমার ভিমরী খাবার যোগাড়। এতো টাকা আমি কোথা থেকে দেব। ঞযব খঁহপযবড়হ এর নায়কের কথা মনে পড়লো। অবশ্য শ্রাবণী নিঃসন্দেহে সে গল্পের নায়িকার মতো হবে না। তার ওপর সে বাঙালী। তবু ভদ্রতার খাতিরে বিলটা টেনে নিলাম নিজের কাছে। শ্রাবণী হা হা করে উঠল। ‘করো কি, করো কি। আজ তুমি আমার গেস্ট। তোমাকে আমার বাড়ীতে নিয়ে যেতে পারলাম না। আর এইটুকু করতে পারবো না?’ এবারে আমি সাহস করে বলতে চাইলাম, ‘দেখ মেয়ে, এ দায়িত্ব তোমার হতে পারে না। তা হলে আমার পৌরুষ থাকলো কোথায়?’ কিন্তু শেষটায় তা আর বলতে পারলাম না ভয়ে। যদি শ্রাবণী বলে, ‘এতো বলছ, তা হলে তুমিই বিলটা দিয়ে দাও। তখন...।’
তাকিয়ে দেখি শ্রাবণী হাসছে। বললো, ‘দেখ করীম, আমি এখন ভারতীয়। তুমি আমাদের অতিথি। যেনতেন অতিথি নও, একেবারে জাতীয় অতিথি। তারপরে আমি বাঙালী এবং তোমার জেলার মেয়ে। এটা কি মানায়?’ শ্রাবণী এবার সরাসরি আমার হাত ধরে ফেলেছে। ‘চল, এবার যাওয়া যাক। অনেক কথাইতো বলে ফেললাম। এমন করে কাউকে এতদিন বলতে পারি নি। আমার ভেতরে যে বাঙালীসত্তা আছে, এতদিন পরে তা তোমার সান্নিধ্যে এসে জেগে উঠল! তুমি মুসলমান আমি হিন্দু। কিন্তু উভয়েইতো বাঙালী। আমি ভারতীয়-এটা আমার বহিরঙ্গে, সেখানে তুমি বিদেশী। কিন্তু অন্তরে? দেশ ভাগ হয়েছে ঠিকই। কিন্তু অন্তরতো আর ভাগ হয় নি। সেখানে যেটুকু মিল তো থাকবেই।’
বললাম, ‘এতক্ষণতো সব তুমিই একাই বলে গেলে। আমাকে কিছু বলতে দাও।’ আমার মুখে তর্জনী চেপে বললো, ‘তোমাকে কিস্‌সু বলতে হবে না। এবার আমাকে বিদায় দাও।’ বললাম, ‘কিছুদিন আগে শান্তিনিকেতনে গিয়েছিলাম। সেখানে বক্তৃতা ছিল আমার। বাংলাদেশের স্বনামধন্য একজন সংগীত শিল্পীও সেখানে নজরুলের গান গাইতে এসেছিলেন। ২০/২৫টি গান গাইবার পর একজন মধ্যবয়সী ভদ্রমহিলা অনুষ্ঠানের মাঠ থেকে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘নজরুলের অনেক গান গেয়েছেন আপনি, সব গান ভালো লেগেছে আমাদের। কিন্তু একটি গান আপনাকে আজ গাইতেই হবে। আমার ক্যান্সার হয়েছে, আমি কতদিন বাঁচব জানি না। আপনার কণ্ঠে নজরুলের এই গানটি শুনে আমি নিশ্চিন্তে মরতে চাই। ‘আমার যাবার সময় হলো দাও বিদায়।’ সমস্ত অনুষ্ঠান স্তব্ধ। শিল্পী গাইলেন। মনে হলো নজরুলের সব দরদ বুঝি তাঁর কণ্ঠে ঝরে পড়ছে। তোমার আমার দেখা হয়তো এখানেই শেষ। হয়তো আর কোনোদিন তোমার সাথে দেখা হবে না। নজরুলের এই গানটি আমি তোমাকেই উপহার দিয়ে গেলাম।’ দেখলাম শ্রাবণী কাঁদছে। আমার বেশ কষ্ট হলো ওর জন্য। এত অল্প সময়ের মধ্যে এমনভাবে সে নিজেকে মেলে ধরবে-ও নিজেও হয়তো ভাবে নি। একটি ট্যাঙি ক্যাব ডেকে ওকে বিদায় দিলাম। চোখ মুছতে মুছতে ও চলে গেল। আমি ফিরে এলাম গেস্ট হাউজে।