খোলা দরওয়াজা : গিয়াসউদ্দিন আহমেদ

রেজাউদ্দীন চৌধুরী

মুক্তিযুদ্ধে শহীদ কয়েকজন বুদ্ধিজীবীর কাছাকাছি যাওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল, যাঁদের অন্যতম ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক গিয়াসউদ্দিন আহমেদ। গিয়াসউদ্দিন স্যারের উপর পাণ্ডিত্যপূর্ণ কোনো সন্দর্ভ লেখার ক্ষমতা আমার নেই। এমনকি মুক্তিযুদ্ধে গিয়াসউদ্দিন স্যারের ভূমিকা বা গিয়াসউদ্দিন স্যারের জীবনভিত্তিক রচনা লেখাও আমার জন্য দূরাশা। এ লেখা কিছুটা স্মৃতিচারণের মাধ্যমে এক অনন্যসাধারণ মানুষের প্রতি আমার শ্রদ্ধা নিবেদন, বাকীটা আমার আত্মগ্লানি প্রশমনের খানিক প্রয়াস।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী এক স্মৃতিচারণে তাঁর বন্ধু গিয়াসউদ্দিনের কৈশোরের এক স্কুল কাহিনীতে লিখেছিলেন-কি করে ক্লাসে শিক্ষকের উচ্চারণ ভুল ধরতে গিয়ে গিয়াসউদ্দিন ক্লাস থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। গিয়াসউদ্দিন শিক্ষককে বলেছিলেন-দরোজা নয়, স্যার, ওটা হবে দরওয়াজা। তারপর শিক্ষক নির্দেশিত সেই খোলা ‘দরওয়াজা’ দিয়েই বেরিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। সেই রচনার খোলা দরওয়াজা প্রতীকী হয়ে দাঁড়িয়েছিল আমার কাছে। লেখাটিতে এক চিত্রকল্প ফুটে উঠেছিল। দৃশ্যটি বাস্তবে আমি দেখি নি, কিন্তু কল্পনায় শুনেছিলাম তাঁর ভরাট গলায় ‘দরওয়াজা’ উচ্চারণের ব্যঞ্জনা, দেখেছিলাম সেন্ট গ্রেগরীজ স্কুলের শ্রেণীকক্ষের খোলা বিশাল দরওয়াজা দিয়ে দৃপ্ত পায়ে বেরিয়ে যাওয়া।
গিয়াসউদ্দিন স্যারের সাথে আমার পরিচয়ের পরিধি চার বছরের, ১৯৬৭ থেকে ১৯৭১। হাজী মোহাম্মদ মোহসীন হলের সিনিয়র আবাসিক শিক্ষক আর হিস্ট্রি সাবসিডিয়ারী ক্লাসে ইউরোপের ইতিহাসের শিক্ষক হিসেবে তাঁকে আমরা পাই। প্রথম থেকেই মজা লেগে যায় তাঁর সরস পড়ানোর স্টাইলে। বাইরে নানা ধরনের লোভের হাতছানি। ফার্স্ট ইয়ারের রঙীন দিনগুলি সাবসিডিয়ারী ক্লাসে বসে নষ্ট করে কোন গাধা? কিন্তু গিয়াসউদ্দিন স্যারের ক্লাস যেন থ্রি-ডি সিনেমা। তাঁর অপূর্ব বর্ণনা ভঙ্গিতে ইতিহাসের চরিত্রগুলি চোখের সামনে ফুটে উঠতো। যখন কোনো মজার ঘটনা আরো মজাদার ভাষায় ও ভঙ্গিতে বলে যেতেন, ছাত্রছাত্রীরা হাসির ফোয়ারা তুলতো। অন্য সময় বিশাল সাবসিডিয়ারী ক্লাস প্রায় নিশ্চুপ হয়ে শুনতো তাঁর বক্তৃতা। প্রায় বললাম এ কারণে যে, কেউ কেউ যৌবনের স্বভাবসুলভ মাদকতায় কিছু গোলমাল বা অবান্তর প্রসঙ্গ এনে সময়ক্ষেপণের চেষ্টা করতো। এ বিষয়ে দুষ্টের শিরোমণি ছিল আমাদের এক সতীর্থ। তাঁর স্বভাবসুলভ ঔদার্য্যে স্যার কখনই বিরক্তি প্রকাশ করেন নি। যাই হোক, ১৯৬৭-৬৮ হিস্ট্রি সাবসিডিয়ারী ক্লাস চলল। মাঝে মাঝে আমিও যে গিয়াসউদ্দিন স্যারের ক্লাস ফাঁকি দিইনি এমন নয়। একদিন গিয়াসউদ্দিন স্যারের ক্লাসে সেই সতীর্থটি রক্তবমি করলো। সারা ক্লাসে আতঙ্ক হৈ চৈ। বন্ধুটির সম্ভবতঃ আলসার ছিল। মাথা ব্যথার জন্য সে এসপিরিন জাতীয় কিছু খেয়েছিল ক্লাস শুরু হওয়ার আগে। সে দিন দেখেছিলাম স্যারের ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট। ছাত্রটিকে হাসপাতালে নেয়া এবং চিকিৎসা শুরু হওয়া পর্যন্ত সমস্ত কাজ নিজে তদারক করলেন তিনি। বন্ধুটি সুস্থ হলো, আবার ক্লাসে আসা শুরু করল।
হাজী মোহাম্মদ মোহসীন হলের প্রথম ব্যাচের আবাসিক ছাত্র হিসেবে আমাদের গর্ব ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ হলের (বর্তমান সূর্য সেন হল) পর দ্বিতীয় আধুনিক স্থাপত্যের ছ’তলা ভবন। এস এম হল ছেড়ে হবু সিএসপি (?) রা এবং এফ এইচ হল ছেড়ে হবু বিজ্ঞানীরা এবং বলা বাহুল্য কিছু হবু রাজনীতিবিদ ভীড় করলো মোহসীন হলে। আমিও ছ’তলায় সিট পেয়ে খুশীই ছিলাম। মাঝে মাঝে দেরীতে হলে ফেরা, বা হঠাৎ-আসা অতিথিদের নিয়ে আবাসিক শিক্ষকদের সাথে লুকোচুরি খেলতে নেহাৎ মন্দ লাগত না। এর মধ্যে আমার মেজ ভাই প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষকের চাকুরী পেয়ে ঢাকায় বাড়ী ভাড়া নিলো। আমার আর হলে থাকার প্রয়োজন নেই। আমি শুধু হল ছাড়লাম না, স্থায়ীভাবে সিট ছেড়ে দিয়ে সিকিউরিটি ডিপোজিট ফেরৎ নেয়ার জন্য আবেদন জানালাম। সিনিয়র হাউস টিউটর গিয়াসউদ্দিন স্যার তখন দায়িত্বে। তিনি বললেন-সিট ছেড়ে দেবে? ভেবে দেখো। পরীক্ষা সামনে, তখন কিন্তু সিট পাবে না।
- ছেড়েই দেবো স্যার। আমি বলি। আমার কাছে জামানতের পঞ্চাশ টাকা ফেরৎ পাওয়া তখন অনেক বেশী জরুরী।
তারপর যেমন হয়। বছরের প্রথম ছ’মাস, অর্থাৎ ১৯৬৯-এর জুলাই পর্যন্ত মহানন্দেই সেন্ট্রাল রোডের বাসায় কেটে গেল। কাছেই মোহসিন হল, রোজ হেঁটে গিয়ে হলে আড্ডা জমাই। দেখা হলে গিয়াসউদ্দিন স্যার হাসেন।
- হল তুমি ছাড়তে পারলে না?
জুলাই মাসে আমার ভাই ঠিক করলেন বাসা ছেড়ে দেবেন। আমার বাবা-মা ছোট ভাইবোনেরা নারায়ণগঞ্জের বাসায়। দু’জায়গায় বসতি রাখা আর্থিক কারণে আমাদের জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল না।
- হলে আবার সিট পাওয়া যায় কি না দ্যাখ। বলেই মেজ ভাই নারায়ণগঞ্জের বাসায় গিয়ে উঠলেন। বললেই কি আর হলে সিট পাওয়া যায়? কাজেই আমিও মেজ ভাইয়ের পিছু পিছু নারায়ণগঞ্জের বাসায় গিয়ে উঠলাম। আন্দোলন তখন নেই। ক্লাস, লাইব্রেরী, ব্রিটিশ কাউন্সিল করে ক্লান্ত রোজ একবার হলে গিয়ে খোঁজ নিই। না, সিট এখন পাওয়া যাবে না, গিয়াসউদ্দিন স্যার জানান। কিছুদিন যেতে আমার নাভিশ্বাস উঠলো। বন্ধুদের সাথে আড্ডা দূরস্থান, লেখাপড়া তখন আমার মাথায় উঠেছে। সামনে সাবসিডিয়ারী পরীক্ষা। এমন সময় আমার বন্ধু ফরিদ জানালো, সে সিঙ্গল সিটেড রুম পেয়ে গেছে এবং দু’এক দিনের মধ্যে সেখানে উঠে যাবে। আমি তার ছেড়ে যাওয়া সিটে উঠে আসতে পারি। পারমিশন গিয়াসউদ্দিন স্যারের কাছ থেকে পরে নিয়ে নিলেই চলবে। রাতে হল পরিদর্শনে এসে আমাকে দেখে অবাক হন অন্য হাউজ টিউটর, তুমি সিট পেয়েছ? - না স্যার। - কাল অফিসে দেখা করো। গম্ভীর গলায় তিনি বলেন।
পরদিন গিয়াসউদ্দিন স্যারের সাথে দেখা করি। স্যার খুবই রাগ করেন।
- তুমি এখনই সিট ছাড়।
- আমার নামে সিটটি বরাদ্দ দিয়ে দিন স্যার। এটাতো খালিই পড়ে আছে।
- তুমি আগে সিট ছাড়।
- সিট ছাড়লে আমার নামেই এটা বরাদ্দ দেবেন তো স্যার?
- কথা দিতে পারব না, তুমি আগে সিট ছাড়।
কোনো ফয়সালা হয় না। আমার আর গিয়াসউদ্দিন স্যারের মধ্যে শুধু কথার চালাচালি চলে। আমি সিট ছাড়ি না। ক্লাস, লাইব্রেরী, ব্রিটিশ কাউন্সিল, বন্ধুদের সাথে আড্ডা সবই চলতে থাকে। রাত দশটার পর হাউজ টিউটরের হাজিরা পরিদর্শনও চলে। তাঁরা কিছুই আমাকে বলেন না। গিয়াসউদ্দিন স্যারের সাথেও দেখা হয়। তিনিও কিছুই বলেন না। শুধু যখনই সিট বরাদ্দ চাই স্যার বলেন, আগে সিট ছাড়।
- সিট ছাড়লে বরাদ্দ পাবোতো স্যার?
- সেটা এখন বলতে পারব না।
অতএব, আমার সিট ছাড়া হয় না। আমি অপারগ। নারায়ণগঞ্জ থেকে আমার লেখাপড়া হবে না। আমার খারাপ লাগে, তবুও জোর করে সিট দখল করে রাখি। আমি মাসলম্যান নই, কোনো রাজনৈতিক পার্টি, এমনকি ছাত্র রাজনীতির সাথে আমার সরাসরি যোগাযোগ নেই। একশ পাঁচ পাউন্ড ওজন নিয়ে ইউওসিটি’তেও আমি ঢুকতে পারি নি। দু’একজন ক্লাসের বন্ধু-বান্ধবী হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করে-তুমি নাকি হলে সিট দখল করে রেখেছ?
ঠিক করি সাবসিডিয়ারী পরীক্ষার পর সিট ছেড়ে দেব। এর মধ্যে নভেম্বরের মাঝামাঝি আমার বার্ষিক জ্বর এলো। তখন প্রতিবছর জ্বর হওয়া আমার নৈমিত্তিক রুটিনের অংশ ছিল। সেদিন রাতে প্রচণ্ড জ্বর, সম্ভবত ১০৪ ডিগ্রী ফারেনহাইটের উপর। বন্ধুরা-ফরিদ, দেলওয়ার, আলী আকবর মাথায় পানি ঢালছিল। ঘোরের মধ্যে যখনই চোখ মেলি, দেখি গিয়াসউদ্দিন স্যার মাথার কাছে দাঁড়িয়ে। কার কাছ থেকে থার্মোমিটার আনা হয়েছিল জানি না। কিছুক্ষণ পর পর দেখি স্যার আমার মুখে থার্মোমিটার দিয়ে জ্বর দেখছেন।
কাছেই চেয়ার ছিল, স্যার চেয়ারে না-বসে দাঁড়িয়ে ছিলেন। কেউ তাঁকে বসতে বলেছিল কি না জানি না। জ্বরের মধ্যেও আমার মনে হয়েছিল এতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা ঠিক নয়, স্যারের বসা উচিৎ। কিন্তু আমি কথা বলতে পারছিলাম না।
ভোর ছ’টায় আমার বাবা গাড়ী নিয়ে হাজির। তখন জ্বর কমে গেছে, কিন্তু শরীর ভীষণ দুর্বল। গিয়াসউদ্দিন স্যার আমার বাবার পাশে দাঁড়িয়ে। বললেন, আমি তো ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। রাত বারোটায় ফরিদের কাছ থেকে ফোন নম্বর নিয়ে তোমার বাবাকে ফোন করলাম।
তিন বন্ধু আর গিয়াসউদ্দিন স্যার আমাকে গাড়ীতে তুলে দিলেন। চোখ দেখে বোঝা যায় সারা রাত তাঁরা কেউ ঘুমান নি।
- ভালো হয়ে এসো। স্যার বললেন। তিনি কি আবার ফিরে আসতে বললেন? ঠিক বুঝতে পারি না।
সে দফা জ্বর আর জ্বর, পরবর্তীতে বিশ্রাম নিয়ে ভয়ে ভয়ে তিন সপ্তাহ পরে হলে ফিরে এসে দেখি আমার সিট তেমনি ফাঁকা পড়ে আছে। কেউ দখল করে নি, স্যারও কাউকে বরাদ্দ দেন নি। আমি আবার হলে উঠে আসি। কেউ কিছু বলে না। গিয়াসউদ্দিন স্যার স্বাস্থ্য সম্বন্ধে খোঁজ নেন, হলে ওঠা নিয়ে কিছু বলেন না। আমার সাহস বাড়ে। আবার একদিন গিয়াসউদ্দিন স্যারকে ধরি।
- সিটটা আমার নামে বরাদ্দ দিয়ে দিন না স্যার, খালিই তো পড়ে আছে?
- তুমি আগে সিট ছাড়ো।
- ছাড়লে সিটটা আমাকেই দেবেন তো স্যার?
- সে টা আমি আগে বলতে পারব না।
কাজেই সিট ছাড়া আর আমার হয় না।
১৯৭১ সালের নভেম্বর মাস। আমি তখন ধানমন্ডি ৩২ নম্বর রোডে বাবা-মা ভাইবোনের সাথে। হল বহুদিন হলো ছেড়েছি। মার্চের ২৯ তারিখে আমাদের বাসায় পাক সেনাদের তাণ্ডবের পর নারায়ণগঞ্জের বাসাও আমরা ছেড়েছি। অনার্স ফাইনালের ছয় পেপার পরীক্ষার পর মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। আমি বিশ্ববিদ্যালয় ধারে কাছে যাওয়া বন্ধ করে দিই। ইতিমধ্যে ফাইনাল পরীক্ষার বাকী দুই পেপার এবং ভাইবা পরীক্ষাও হয়ে যায়। আমি আরো অনেকের মতো পরীক্ষা দিই না, কারণ আমরা পরীক্ষা বয়কট করেছি। যারা মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিল তারাও বলা বাহুল্য পরীক্ষা দেয় নি, কিন্তু আমি তখন ঢাকা শহরে বন্ধুদের সাথে মুক্তিযুদ্ধের রাজা উজির মারা গল্প করে আর গল্প শুনে ছায়া যোদ্ধার ভূমিকা পালন করছিলাম। সম্ভবতঃ স্বাভাবিক কাপুরুষতা আমাকে যুদ্ধে যেতে দেয় নি। এমন সময় একদিন বাসা থেকে বের হতে ৩২ নম্বর সড়কের মুখে গিয়াসউদ্দিন স্যারের সাথে দেখা। স্যার একা রিকশায়। পায়ের কাছে সম্ভবতঃ চট বা কাপড়ের বস্তা জাতীয় কিছু। কি আছে ভালো করে দেখি নি। স্যার স্বভাবসুলভ হাসেন-এদিকে থাক নাকি এখন? বত্রিশ নম্বর সড়কের প্রায় শেষ মাথায় কবি সুফিয়া কামালের বাড়ী। দূর থেকে দেখি স্যারের রিকশা ৩২/৩১ নম্বর সড়কের ক্রসিং পেরিয়ে আরো পশ্চিমে বাঁক নিয়ে অদৃশ্য হয়ে যায়।
এরপর কয়েকবারই একইভাবে একই রাস্তায় তাঁর সাথে দেখা হয়। এক বন্ধু বলেছিল গিয়াসউদ্দিন স্যার মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বিভিন্ন সাহায্য সামগ্রী সংগ্রহ করে কবি সুফিয়া কামালের বাসায় পৌঁছে দেন। এ সবই আমার শোনা কথা। তবে এমন অবস্থায় স্যারকে দেখে আমারও বিশ্বাস জন্মেছিল স্যার কিছু একটা করছেন। ঢাকা শহরে তখন মাঝে মাঝেই গেরিলা আক্রমণ চলছে। যারা করছে তাদের কথাও শুনছি। কিন্তু আমার সাহস হয় না এগিয়ে যাওয়ার। যুদ্ধের এ পর্যায়ে ওরা কি আমাকে নেবে? এমনকি গিয়াসউদ্দিন স্যারকে বলতে পারি নি, ‘স্যার আমি কি কোনো কাজে লাগতে পারি?’ আমার যা সাহসে কুলায় তাই আমি করতাম। প্রতি সপ্তাহে ‘রক্তে আনো লাল’ নাম দিয়ে ডজন খানেক কার্বন কপি মুক্তিযুদ্ধের সংবাদ বুলেটিন সাদা খামে ভরে ঢাকা স্টেডিয়ামে নিরীহদর্শন বাঙালী পথচারীর মধ্যে বিলি করাতাম। করাতাম মানে একজন টোকাই (অবশ্য তখনো রনবী’র বিখ্যাত টোকাই নামকরণ হয় নি) কে গুলিস্তানের কামানের কাছে পাকড়াও করে একটা সিকি দিয়ে এই কাজে পাঠাতাম। দূর থেকে আমি আর ফরিদ নজর রাখতাম। তারপর চট করে একটা বাসে উঠে পড়তাম।
ডিসেম্বরের ৩ তারিখ ভোর রাত থেকে বিমান আক্রমণ শুরু হলো। পাকিস্তানী স্যাবর জেট গুলি দু’দিন যুদ্ধ যুদ্ধ খেলার নমুনা দেখালো, তৃতীয় দিন ঢাকার আকাশ থেকে উধাও হলো তারা। শুধু ভারতীয় বিমান যখন খুশী আসে, ইচ্ছে মতো বোমা ফেলে, কিন্তু টার্গেটের বাইরে নয়। এ্যাক এ্যাক বিমান বিধ্বংসী কামান গুলো শুধু ক্যাট ক্যাট শব্দ করে। শহরের কোথাও পাকিস্তানী সৈন্য চোখে পড়ে না, শুধু কালো পোশাকের মিলিশিয়া। আমরা শহরময় ঘুরে বেড়াই। এর মধ্যে একদিন এলিফ্যান্ট রোডের মোড়ে স্যারের সাথে দেখা। আমাকে দেখে খুব হাসছিলেন। স্যারের হাসি দেখে আমার মনে হচ্ছিল বাংলাদেশের বন্ধ দরওয়াজার অর্গল খুলে গেছে। সেদিন সম্ভবতঃ ডিসেম্বরের ৮ বা ৯ তারিখ। আমার সাথে গিয়াসউদ্দিন স্যারের শেষ দেখা।
১৬ ডিসেম্বর নিয়াজী আত্মসমর্পণ করলো। বিজয় আনন্দে রাস্তায় বেরিয়ে এসেছে অগণিত মানুষ। তবু এর মধ্যে স্থানে স্থানে আটকা পড়া কিছু পাকিস্তানী সৈন্য আর মিলিশিয়ারা আতঙ্কে (?) গুলি ছুঁড়ছিল। পাক সেনাদের আত্মসমর্পণ দেখতে যাওয়ার পথেই শুনেছিলাম প্রফেসর মুনীর চৌধুরী, গিয়াসউদ্দিন আহমেদ সহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষককে আল-বদর বাহিনী ১৪ তারিখ রাতে কারফিউর মধ্যে ধরে নিয়ে গেছে। তখন ভেবেছি, আলবদর, মিলিশিয়ারা পালাবার পর তাঁরা নিশ্চয়ই ফিরে আসবেন। সন্ধ্যের পর বাসায় ফিরে শুনি রায়ের বাজারের ইঁট ভাটার নীচে জলা ভূমিতে হাত পা বাঁধা কয়েকজনের লাশ পাওয়া গেছে। গিয়াসউদ্দিন স্যারের লাশও নাকি সেখানে আছে। পর দিন আমি ও বন্ধু ফরিদ মোহসিন হলে যাই। বিহারী দারোয়ান, যে তখনো হলে ছিল, স্যারকে ধরে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা বর্ণনা করে।
- মাথা মুখ কালো কাপড়ে ঢাকা আছিলো, তবু পায়ের জুতা আর প্যান্ট দেখে আমি বুঝছি স্যার, ঐটা জহির সাহেব আছিল।
জহির ছিল হলের ইসলামী ছাত্র সংঘের নেতা। ১৬ ডিসেম্বর থেকে সে উধাও হয়ে যায়।
আমি আর ফরিদ বন্ধুদের জনে জনে জিজ্ঞেস করি। হাসপাতালে যাই, ক্যাজুয়ালটি ওয়ার্ডে খোঁজ করি, যদি একজন চিহ্নিত আলবদর খুনীকে ধরতে পারি। আমরা পারি নি। বহুদিন পর জানতে পারি জহির বিলেতে পালিয়ে গেছে। জহিরকে আমরা ধরতে পারি নি, বিচার করতে পারি নি বুদ্ধিজীবী হত্যাকারীদের, স্বাধীনতার শত্রু আলবদর-রাজাকাররা রয়ে গেছে আমাদের ধরা ছোঁয়ার বাইরে। ঋণের বোঝা আজও আমাদের কাঁধে।