রাষ্ট্র ও নাগরিকের নিরাপত্তা প্রসঙ্গে

আহমেদ কামাল

কতগুলো প্রশ্ন তোলার জন্যই এ আলোচনার সূত্রপাত করছি।
আজ থেকে তিন বৎসর আগে, ২৬ মে ২০০৬ তারিখে আমরা পত্রিকায় পড়েছি প্রেসিডেন্ট বুশের পরবর্তী টার্গেট ছিল ইরান। তার এরও কদিন আগে ঘোষণা করা হয়েছিল ফিদেল ক্যাস্ট্রোর বিচারের জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের সম্মতি কংগ্রেস থেকে নেয়া হবে। ঐ বছর এপ্রিল মাসে আমরা টেলিভিশনে দেখেছি লক্ষ্য হচ্ছে ইরাক আক্রমণ এবং পরবর্তী পর্যায়ে দখলের ঘটনা তার কদিন আগে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে এ আক্রমণ হালাল করেছে। ঐদিন সিরিয়ার প্রতিনিধি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে অনুপস্থিত ছিলেন। তার আর কি বা করার ছিল? ২০০৫ সালে আফগানিস্তানে পুতুল সরকার বসানোর জন্য তালেবান সরকারের উৎখাতের প্রক্রিয়া আমরা টেলিভিশনে সবাই উপভোগ করেছি। এখন সেখানে মার্কিন সৈন্যের নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে কারজাই সরকার দেশ চালাচ্ছে। যে ধীরং ড়ভ বারষ ধ্বংসের ঘোষণা দিয়ে প্রেসিডেন্ট বুশ এ কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়েছিলেন ওবামা প্রশাসনের আমলেও তা অব্যাহত ও অপ্রতিহত গতিতে এগিয়ে চলেছে। সর্বোপরি টেলিভিশন ও আন্তর্জাতিক প্রচার মাধ্যম থেকে ইরাকের ধ্বংসযজ্ঞ প্রদর্শনী এমনকি স্মৃতিও আস্তে আস্তে বিলীন হয়ে গেছে। আমরা যেন সবাই একটা ধপঃরড়হ-ঢ়ধপশবফ ছায়াছবির শেষ দৃশ্য দেখে বাড়ী ফিরে এসেছি। এবং প্রাত্যাহিক সাংসারিক আলোচনার মধ্যে ছায়াছবির হৃদয়দুমড়ানো দৃশ্যগুলো ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে, যেখানে ক্ষোভ, ঘৃণা, দ্রোহ আমাদের চৈতন্যকে আচ্ছন্ন করার কথা সেখানে কিভাবে এসবের প্রতি আমাদের ‘সম্মতি’ দ্রুত তৈরী হয়ে যায় এ প্রক্রিয়া না বুঝতে পারলে আমাদের মতো ছোট রাষ্ট্রের নিরাপত্তার প্রশ্নটি একটি বায়বীয় আলোচনায় পর্যবসিত হতে বাধ্য। ইরাক যুদ্ধ, আমরা এখনও যুদ্ধ বলেই পুরো ব্যাপারটা গ্রহণীয় করে তুলেছি, আমি দখল বলার পক্ষপাতী, আমাদের মতো রাষ্ট্রের নিরাপত্তার প্রশ্নটিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ববর্তী প্রেসিডেন্ট বুশ এবং তার গং নিয়ন্ত্রিত বিশ্বে প্রধান প্রশ্ন হিসেবে হাজির করেছে। এ প্রেক্ষিতে আমি কয়েকটি প্রশ্ন উত্থাপন করে আপনাদের স্বস্তি হরণ করতে চাই। এ প্রশ্নগুলোর উত্তর আমারও জানা নেই, তবে এ প্রশ্নগুলি নিয়ে ভাবাটা অত্যন্ত জরুরী।
ইরাক দখল বা নয়া জবরদখলদারিত্বের প্রক্রিয়ায় কতগুলো জিজ্ঞাসা উঠে এসেছে। গত মে মাসে গেব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস সহ লাতিন আমেরিকার একদল লেখকের বিবৃতিতে সঙ্কটের চেহারাটা কিছু ধরা পড়েছে।

ঞযব রহঃবৎহধঃরড়হধষ ড়ৎফবৎ যধং নববহ...ারড়ষধঃবফ ধং ধ পড়হংবয়ঁবহপব ড়ভ ঃযব রহাধংরড়হ ধমধরহংঃ ওৎধয়. অ ংরহমষব ঢ়ড়বিৎ রং রহভষরপঃরহম মৎধাব ফধসধমব ঃড় ঃযব হড়ৎসং ড়ভ ঁহফবৎংঃধহফরহম, ফবনধঃব ধহফ সবফরধঃরড়হ ধসড়হমংঃ পড়ঁহঃৎরবং. ঞযরং ঢ়ড়বিৎ যধং রহাড়ষাবফ ধ ংবৎরবং ড়ভ ঁহাবৎরভরবফ ৎবধংড়হং রহ ড়ৎফবৎ ঃড় লঁংঃরভু রঃং রহাধংরড়হ. অঃ ঃযরং াবৎু সড়সবহঃ, ধ ংঃৎড়হম পধসঢ়ধরমহ ড়ভ ফবংঃধনরষরুধঃরড়হ ধমধরহংঃ ধ খধঃরহ অসবৎরপধহ হধঃরড়হ যধং নববহ ঁহষবধংযবফ. ঞযব যধৎধংংসবহঃ ধমধরহংঃ ঈঁনধ পড়ঁষফ ংবৎাব ধং ধ ঢ়ৎবঃবীঃ ভড়ৎ ধহ রহাধংরড়হ!

দুটো গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ আছে এ বক্তব্যে। একটি হচ্ছে ্তুটহরষধঃবৎধষ ধপঃরড়হ্থ। বিশ্ব ও নিজের দেশের জনমতের তোয়াক্কা না করে ইরাকে আগ্রাসন ও জবর দখল; অন্যদিকে আগ্রাসনের যুক্তি হিসেবে হাজির করেছে, ্তুঝবৎরবং ড়ভ ঁহাবৎরভরবফ ৎবধংড়হং (ডবধঢ়ড়হং ড়ভ সধংং ফবংঃৎঁপঃরড়হ)। তাছাড়া এ দুই প্রক্রিয়াকেই বুশ প্রশাসন আন্তর্জাতিক আইন ও নীতি হিসেবে গ্রহণীয় করে তুলেছে। সর্বোপরি, বর্তমান বিশ্বে এ দুই প্রক্রিয়া প্রতিহত করার মতো কোনো রাষ্ট্রশক্তি আর নেই। এ প্রেক্ষিতে রাষ্ট্রের বিশেষ করে আমাদের মতো রাষ্ট্রের নিরাপত্তার প্রশ্নটি আলোচনা কারো কারো কাছে একটু বেশী বিলাসী বলে মনে হতে পারে। আমাদের আলোচনার জন্য যে প্রশ্নটি মোকাবিলা করা দরকার সেটি হচ্ছে ইরাকের অভিজ্ঞতা কি সমস্ত রাজনীতি ও সংগ্রামের শেষ সীমানার সূচক?
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর রাষ্ট্রের উপর হুমকি যখন কোনো এক বা একাধিক সামরিক শক্তির কাছ থেকে আসে তখন যেখানে নিরাপত্তার জায়গাটি নির্দিষ্ট ছিল সেটি হচ্ছে জাতিসংঘ। আমরা হালে যে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি সেটি হচ্ছে জাতিসংঘের সে ভূমিকা পালন করার আর কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই। জাতিসংঘ বড়জোর একটি আন্তর্জাতিক এন.জি.ও-র ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারে। এর বেশী এ সংগঠন থেকে আশা করার কিছু নেই। তাহলে কি রাষ্ট্রের নিরাপত্তার প্রশ্নটি অমীমাংসিত থাকবে? এ আলোচনায় যাবার আগে বিশ্ব পরিসরের অবস্থাটা কি সেদিকে তাকানো যাক।
‘সভ্যতার সংঘর্ষে’র লেখক হান্টিংটনের চোখ দিয়ে যদি দেখি তাহলে দেখব-

গঁপয বারফবহপব বীরংঃং রহ ঃযব ১৯৯০ং ভড়ৎ ঃযব ৎবভৎধসব ড়ভ ঃযব ্তুংযববৎ পযধড়ং্থ ঢ়ধৎধফরমসং ড়ভ ড়িৎষফ ধভভধরৎং: ধ মষড়নধষ নৎবধশফড়হি ড়ভ ষধ িধহফ ড়ৎফবৎ, ভধরষবফ ংঃধঃবং ধহফ রহপৎবধংরহম ধহধৎপযু রহ সধহু ঢ়ধৎঃং ড়ভ ঃযব ড়িৎষফ, ধ মষড়নধষ পৎরসব ধিাব, ঃৎধহংহধঃরড়হধষ সধভরধং ধহফ ফৎঁম পধৎঃবষং, রহপৎবধংরহম ফৎঁম ধফফরপঃরড়হ রহ সধহু ংড়পরবঃরবং, ধ মবহবৎধষ বিধশবহরহম ড়ভ ঃযব ভধসরষু, ধ ফবপষরহব রহ ঃৎঁংঃ ধহফ ংড়পরধষ ংড়ষরফধৎরঃু রহ সধহু পড়ঁহঃৎরবং, বঃযহরপ, ৎবষরমরড়ঁং, ধহফ পরারষরুধঃরড়হধষ ারড়ষবহপব ধহফ ৎঁষব নু ঃযব মঁহ ঢ়ৎবাধষবহঃ রহ সঁপয ড়ভ ঃযব ড়িৎষফ... ঙহ ড়িৎষফ রিফব নধংরং পরারষরুধঃরড়হ ংববসং রহ সধহু ৎবংঢ়বপঃং ঃড় নব ুরবষফরহম ঃড় নধৎনধৎরংস মবহবৎধঃরহম ঃযব রসধমব ড়ভ ধহ ঁহঢ়ৎবপবফবহঃবফ ঢ়যবহড়সবহড়হ. অ মষড়নধষ উধৎশ অমব রং ঢ়ড়ংংরনষু ফবংপবহফরহম ড়হ যঁসধহরঃু.

এ সব কিছুর অনুষঙ্গ হিসেবে আর যা ঘটছে তা শুধু আমেরিকার অর্থনৈতিক সঙ্কটই নয়, এ পুরো পাশ্চাত্য সভ্যতারই সঙ্কট। আর সে সঙ্কটের রাহুর রোষে পৃথিবীর ছোট বড় সব দেশই কম্পমান। সঙ্কটটির আর এক নাম হচ্ছে ‘পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক’ ব্যবস্থার সঙ্কট। এর বিশদ বিবরণের দরকার নেই; শুধু অনুধাবন করতে হবে যে এর মারাত্মক ছোবল থেকে আমরাও রেহাই পাবো না এমনটাই আশঙ্কা। তাহলে আত্মরক্ষার উপায় কি?
রাষ্ট্রের নিরাপত্তার সাধারণ জ্ঞাননির্ভর সমাধান আমাদের জানা আছে। এর প্রচলিত ব্যবস্থা হচ্ছে একটি সুশৃঙ্খল পেশাদার প্রতিরক্ষা বাহিনীর উপস্থিতি। এ ধরনের বাহিনীর সাফল্য নির্ভর করে প্রতিরক্ষার জন্য নিয়োজিত প্রযুক্তি ও সমরাস্ত্রের সমারোহের উপর। বাংলাদেশের মতো গরীব দেশের পক্ষে বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে এ ধরনের নিরাপত্তার কথা ভাবা অর্বাচীনতার সামিল। কেবল মাত্র নাগরিকদের ইচ্ছা, দৃঢ়চিত্ততা ও রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যের দ্বারাই রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হতে পারে। কিন্তু এ ধরনের সম্পর্ক রাষ্ট্রের সাথে নাগরিকদের আনুগত্য কখন হতে পারে? যখন নাগরিকরা ভাববে রাষ্ট্রটি তাদের। আসলে শেষ বিচারে রাষ্ট্রের নিরাপত্তার প্রশ্ন আর নাগরিক নিরাপত্তার প্রশ্নটি একই সূত্রে গাঁথা। বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে এ দুটোকে আলাদা করে আলোচনার কোনো সুযোগ নেই। দৃষ্টান্ত ইরাক। সাদ্দাম শাসনামলে নাগরিক নিরাপত্তা না থাকার কারণেই আজ রাষ্ট্রীয় ও নাগরিক উভয়ের নিরাপত্তাই শেষ হয়েছে। এবার তাহলে আমরা যে রাষ্ট্রে বসবাস করছি তার চেহারাটি একটু ভালো করে দেখি।
যাদের হাতে নাগরিকদের নিরাপত্তার ভার রাষ্ট্রের সেই পুলিশ এবং বিচারব্যবস্থা এখন নাগরিকদের জন্য প্রধান এক উদ্বেগের বিষয়। আজকাল প্রতিদিনই অনেক রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের খবর পাচ্ছি আমরা। নিরাপরাধ মানুষের ওপর চলছে হয়রানি। গোয়েন্দা অফিস ও কোর্ট চত্বরে খুন, জেলের ভেতরে রহস্যজনক মৃত্যু ঘটছে অহরহ, সবচেয়ে ভয়াবহ হচ্ছে ‘ক্রস ফায়ারে’ বিচারবহির্ভূত খুন, যা কিনা পরিসংখ্যান হিসেবে রাষ্ট্রের মানবাধিকার লঙ্ঘনের সকল রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। রাষ্ট্র ও পুলিশ জনগণের নিরাপত্তা দিতে পারছে না, বা দিচ্ছে না। যেটাই সঠিক হোক, নাগরিক সমাজের জন্য উৎকণ্ঠার ব্যাপার অবশ্যই। রাষ্ট্র এখন জনগণের জানমালের রক্ষক নয়। সে কারণেই রাষ্ট্রের গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্ন সামনে এসে দাঁড়াচ্ছে। রাষ্ট্রের উদ্ভবের সূত্রটি ছিল এই যে, বিভিন্ন শ্রেণী ও ব্যক্তির পরস্পরবিরোধী স্বার্থের দ্বন্দ্বে রাষ্ট্র একটা নিরপেক্ষ ভূমিকা নেবে। একারণেই শক্তি প্রয়োগের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা দেয়া হয়েছে রাষ্ট্রের হাতে। কিন্তু সবকিছু দেখে মনে হচ্ছে যে, রাষ্ট্র এখন তার দায়িত্ববোধ থেকে সরে গেছে। এটাই ভীতির কারণ দেশবাসীর জন্য।
কিছুকাল আগে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের একটি রিপোর্ট বেরিয়েছে খবরের কাগজে। এতে দেখা যাচ্ছে, সবচেয়ে বড় দুর্নীতিপরায়ণ হচ্ছে পুলিশ বিভাগ। অথচ মানুষের নিরাপত্তার দায়িত্বে রাখা হয়েছে এই পুলিশকেই। বিচারব্যবস্থা নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠেছে। বিচারকরা আজ কেন অসহায়, তার উত্তর খুঁজতে গেলে পুরো রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থারই সম্মুখীন হতে হবে। তাহলে নিরাপত্তা দেবে কে? এই প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়। রাজনীতিও হয়ে গেছে দুর্বৃত্তদের আশ্রয় ও বিকাশের ক্ষেত্র। টাকা, অস্ত্র, ভয়-ভীতি এসবের মাধ্যমেই জনগণের পক্ষে কথা বলার অধিকার আদায় করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় জনগণের আশ্বস্ত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। যে রাজনীতিতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার সুযোগ থাকে না, সেখানে রাষ্ট্রের কোনো অঙ্গই নিরপেক্ষ ও জনমুখী হয়ে উঠতে পারে না। অন্যদিকে এই ধরনের অস্বচ্ছ, জবাবদিহিতাহীন অবস্থায় প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে যারা অবস্থান করেন, তাঁরাও হয়ে পড়েন দুর্নীতিগ্রস্থ। অনেক সময় সেটা স্বেচ্ছায় না হলেও নাগরিকদের ওপর তার প্রতিক্রিয়া একই দাঁড়ায়। এই অবস্থায় কেউ কেউ মনে করতে পারেন গণতান্ত্রিক শাসন কি তবে নাগরিকদের জীবন আরও নিরাপত্তাহীন করে তোলে? আমাদের দেশের পরিপ্রেক্ষিতে এর উত্তর নির্ভর করছে যে প্রশ্নের ফয়সালার ওপর, তা হলো গণতান্ত্রিক শাসন বলতে আমরা কী বুঝি। আসলে আমরা বেশীর ভাগ মানুষই ভোটের মাধ্যমে তৈরী পার্লামেন্টারি শাসন ব্যবস্থাকেই মনে করে থাকি গণতান্ত্রিক শাসন।
উন্নত দেশে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় জনপ্রতিনিধিদের রাজনৈতিক জীবনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার প্রশ্নটি খুব বড়। এসব নিশ্চিত করেই কেবল তারা গণতান্ত্রিক সমাজ গড়ে তোলে। এটাও একদিনে হয় নি। ‘গণতন্ত্র’ বলে কোনো কংক্রিট মডেল নেই। গণতন্ত্র টেলিভিশন-ফ্রিজের মতো কোনো বস্তু নয় যে, বাইরে থেকে আমদানী করেই তা ঘরে বসিয়ে দিলাম। আমরা কীভাবে অনুশীলন করছি, সেভাবেই বিকাশ ঘটবে গণতন্ত্রের। এখানে একটা উদাহরণ দিতে চাই, ১৯৭৩-এর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশের কথাই ধরা যাক। এমন গণতান্ত্রিক অধ্যাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে নেই। বাইরেও কম। গণতন্ত্র চর্চার অনেক সুযোগ রয়েছে এতে। কিন্তু ফলপ্রসূ জবাবদিহিতা এবং স্বচ্ছতার অভাবে এরকম একটি গণতান্ত্রিক বিধি থাকার পরও এই বিশ্ববিদ্যালয়ে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ তৈরী বা অনুশীলন হচ্ছে না। বিভিন্ন কমিটির নিয়মিত নির্বাচন হচ্ছে, প্রতিনিধিরাও বসছেন নিয়মিত। তা সত্ত্বেও পুরো প্রক্রিয়াটি এমন রূপ নিয়েছে যে, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার যে লক্ষ্য তা অর্জিত হচ্ছে না। এমনকি যোগ্য শিক্ষক নিয়োগেও ব্যক্তিস্বার্থ, গোষ্ঠীস্বার্থ এসে যাচ্ছে সামনে। কারণ জবাবদিহিতা বলতে একমাত্র নির্বাচনকেই প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে। যদি নাগরিক সমাজের কাছে, অন্তত, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের ও অভিভাবকদের কাছে জবাবদিহিতার কোনো ব্যবস্থা থাকত, তাহলে, হয়তো অন্য ধরনের ফল পাওয়া যেত। কিন্তু সেটাও স্বয়ংক্রিয়ভাবে হবে না।
এখানেই নাগরিক সমাজের দায়িত্ব। একটি গণতান্ত্রিক সমাজ ও প্রতিষ্ঠান গড়ার কাজ আমার হয়ে কেউ করে দেবে, এরকম একটি ভ্রান্তির জালে আমরা আটকে আছি। আজকে যেসব দেশ গণতান্ত্রিক, কোনো সুন্দর সকালে হঠাৎ সেই ফুল ফোটে নি। সব জায়গাতেই সুদীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়েই সেসব দেশের জনগণ গণতান্ত্রিক সমাজ অর্জন করেছে। সেই সমাজের সবটাই যে আমাদের অনুকরণীয়, তা নয়। কিন্তু এটুকুও যদি আমরা অর্জন করতে চাই, তাহলে আমাদের নাগরিকদের অনেক বেশী সংগঠিত, প্রতিবাদী ও প্রতিরোধী হতে হবে। এমনকি প্রয়োজন হলে দীর্ঘস্থায়ী লড়াইয়ের জন্যেও প্রস্তুতি নিতে হবে।
আজ রাজনীতির যে দুর্বৃত্তায়ন ঘটেছে এবং রাষ্ট্র যেভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত; আর সেই দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতি যেভাবে রাষ্ট্রের সহযোগী, এই অবস্থা একটি জাতীয় দুর্যোগতুল্য। প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলার মতোই সকলকে এই দুর্যোগ মোকাবিলা করতে হবে এবং এর জন্য কোনো বিদেশী সাহায্য আসবে না।
এই প্রসঙ্গে আমি আমাদের বুদ্ধিজীবী সমাজ সম্পর্কেও কয়েকটি কথা বলতে চাই। একটি গণতান্ত্রিক সমাজ নির্মাণে ঐতিহাসিকভাবে এদেশের বুদ্ধিজীবীদের একটা ভূমিকা রাখার সুযোগ ছিল। কিন্তু নানা প্রলোভনে পড়ে অনেক বুদ্ধিজীবী সন্ত্রাসনির্ভর রাজনীতির আশ্রয়ে বিকশিত হওয়াই কর্তব্য হিসেবে স্থির করেছেন। এই রাজনীতির লেজুড়বৃত্তির কারণেই গণতান্ত্রিক সমাজ গঠনের সংগ্রামে তারা নেতিবাচক ভূমিকা পালন করেছেন। রাষ্ট্র এবং সরকার কর্তৃক নাগরিক জীবনের সীমানা লংঘনের প্রতি তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখা এবং প্রতিরোধ করাই আমাদের মতো দেশে বুদ্ধিজীবীদের প্রথম কাজ, কিন্তু সেই লক্ষ্য থেকে অনেক বুদ্ধিজীবী আজ সরে গেছেন। আসলে সরে গেছেন বললে কম বলা হবে। তারা পথভ্রষ্ট। জাতীয় এই সঙ্কটে গণতান্ত্রিক সমাজ বিনির্মাণের পক্ষের বুদ্ধিজীবীদেরও শনাক্ত করা দরকার। নাগরিকদের জন্য এটাই প্রয়োজনীয় কাজ। এ কাজটা আমরা কিভাবে করবো?
রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে আমি আবার ফিরে আসি লাতিন বুদ্ধিজীবীদের বিবৃতিটিতে। মার্কেজ ও তাঁর সাথীরা বলেছেন, ্তুডব ড়হষু ঢ়ড়ংংবংং ড়ঁৎ সড়ৎধষ ধঁঃযড়ৎরঃু, রিঃয যিরপয বি ধঢ়ঢ়বধষ ঃড় পড়হংপরবহপব রহ ড়ৎফবৎ ঃড় ধাড়রফ ধ হব িারড়ষধঃরড়হ ঃড় ঃযব ঢ়ৎরহপরঢ়ষবং যিরপয রহভড়ৎস ধহফ মঁরফব ঃযব মষড়নধষ পড়সসঁহরঃু ড়ভ হধঃরড়হং.্থ যে দুর্যোগের কথা একটু আগেই উল্লেখ করেছি সেটা যদি ভুল বোঝাবুঝির পর্যায়ে থাকত তাহলে হয়তো কারু ঈড়হংপরবহপব-এ অসহায়ের আকুতি পৌঁছাত। কিন্তু দুর্বৃত্তের কাছে যুক্তির কোনো আবেদন নেই। কেননা আজকের সঙ্কট আধুনিকতারই সঙ্কট। ওৎধয় রহ ভধপঃ রং ধ সবঃধঢ়যড়ৎ ধহফ ধ পৎরঃরয়ঁব ড়ভ সড়ফবৎহরঃু. অংংঁৎধহপবং ঃযধঃ ংপরবহপব ধহফ ৎবধংড়হ ড়হপব মধাব ঁং রং হড় সড়ৎব ঃযবৎব.
এ সঙ্কট থেকে উত্তরণ সম্ভব কেবল মাত্র একটি নতুন জীবনব্যবস্থার উত্তরণের মধ্য দিয়ে, যার লক্ষ্য হেগেলের লক্ষ্যকে ছাড়িয়ে যাবে। হেগেল মনে করেন, ওঃ রং ভধষংব ঃড় সধরহঃধরহ ঃযধঃ ঃযব ভড়ঁহফধঃরড়হ ড়ভ ঃযব ঝঃধঃব রং ংড়সবঃযরহম ধঃ ঃযব ড়ঢ়ঃরড়হ ড়ভ ধষষ রঃং সবসনবৎং. ওঃ রং হবধৎবৎ ঃযব ঃৎঁঃয ঃড় ংধু ঃযধঃ রঃ রং ধনংড়ষঁঃবষু হবপবংংধৎু ভড়ৎ বাবৎু রহফরারফঁধষ ঃড় নব ধ পরঃরুবহ. নাগরিক ও রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য হেগেল-বর্ণিত লক্ষ্যকে ছাড়িয়ে যে লক্ষ্যটি আমরা নির্ধারণ করতে চাই তা ইতালীর এক তরুণ সংগ্রামী আমাদের জন্য স্থির করেছেন গত শতকের শুরুতেই। সেটি হচ্ছে এমন একটি রাষ্ট্র যেখানে পড়হপবঢ়ঃ ড়ভ পরঃরুবহ মরাবং ধিু ঃড় ঃযব পড়হপবঢ়ঃ ড়ভ পড়সৎধফব. ফেলে-আসা শতবর্ষে সে লক্ষ্য অর্জিত হয় নি, আগামী শতবর্ষে যেন গ্রামসির সে লক্ষ্য অর্জিত হয় এ আশা ব্যক্ত করেই আমি আমার লেখাটি শেষ করছি।