আলোকের অশেষ গল্প

সাবিনা পারভিন

অনেক অনেক আগের কথা, যে গল্পের শেষ হয়েও হয় না শেষ,
অশেষ সেই গল্পের কথা যেন বা ইতিহাসেরই অংশ; প্রজন্মের পর প্রজন্ম চলে যায়
আমাদের এই অজপাড়া গাঁয়ে একদিন কিভাবে যে এসেছিলো
নেটিভ মানুষদের শিক্ষা দানে একদল ইউরোপীয় সাদা মানবিক মানুষ,
গহীন অন্ধকার থেকে উজ্জ্বল আলোর দিকে আমাদের
সামনে এগিয়ে নিতে

যদিও আমাদের নতুন প্রজন্মের তথ্যানুসন্ধানী অনেকের কাছেই
তার ঐতিহাসিক তথ্য-উপাত্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে
সামনে শান্ত ধীর স্থির শ্রীমন্ত নদী কেনই বা সোজা দক্ষিণে
না গিয়ে বারে বারে বাঁক নিলো-সে রকম নানা প্রশ্ন
তর্ক-বিতর্ক বাক-বিতণ্ডা তো চলতেই পারে!

তবুও যেন মনে হয়
সামান্য একটু পুবে এবং দক্ষিণে এগুলোই ঝড়-বৈশাখের
উত্তাল তরঙ্গ মালায় উত্তুঙ্গ ঢেউয়ে ঢেউয়ে বিশাল ভয়াল পায়রা নদী
আমাদের প্রিয় গ্রাম পাদ্রীশিবপুরের খুব কাছাকাছি এই নদী,
গ্রামের নাম তো আসলে শিবপুরই, হিন্দুদের গণদেবতা
স্বয়ম্ভূ শিবের নামেই গ্রামের নাম ছিল একদা;
দ্রাবিড়ীয় রক্তধারার কালো শ্যামবর্ণ খেটে খাওয়া চাষাভুষা,
জেলে-মালো-বাড়ৈ, মাঝি-মাল্লা-পাটনি, ঘরামি-ছুতার, মুটে-মুচি
গায়েন-বায়েন নানা পেশার নিম্ন আয়ের নিম্নবর্গের
মানুষেরই আবাসভূমি ছিল একদিন, আজও আছে
যারা হয়তো বা শিব বন্দনাই করতো একদিন
পাদ্রীদের আগমনে গেঁথে গেলো একটি শব্দ,
পরিচিতি পেল পাদ্রীশিবপুর।

চারদিকে অগণিত ছোট ছোট গ্রাম
পাশশিবপুর, কান্‌কী, লক্ষ্মীপাশা, কত কি-বাহারী সব নাম!
পাশ দিয়ে প্রবহমান নদী, অসংখ্য খাল-বিল-নালা,
ঘন সবুজ বৃক্ষরাজি আর সোনালী ধানের শীষ ঢেউ খেলে যায়
বাতাসের দোলায়

শোনা যায়, কিংবা ইতিহাসের অনুসন্ধানে প্যান্ডোরার বাঙ
খোলার মতোই হয়তো বা পাওয়া যাবে অজানা সব তথ্য-কাহিনী
শিবপুরের কাছাকাছি এই যে নদী পায়রা
হয়তো বা কাছাকাছি তারই তীরে গড়ে উঠেছিল
প্রাচীন সমুদ্র বন্দর বাক্‌লা।

আর সেই বন্দরে ভিড়ে ছিল কাঠের তৈরি নানা আকার
আর নক্‌শার উঁচু মাস্তুলের বাদাম তোলা জাহাজের সারি
জাহাজের মানুষেরা ছিল অসীম সাহসী
সাত সমুদ্র পাড়ি দেয়া মাঝি-মাল্লা দয়ামায়াহীন পর্তুগীজ হার্মাদ
ঠ্যাঙাড়ে জলদস্যু!

তাদেরও যে ভয়ভীতি ছিল না এমন তো নয়!
বিদেশ-বিভুঁইয়ে কে কখন আঘাত হানে
তাই ঈশ্বর বন্দনা তারাও করতো
মা-কালীর নামে নরবলি দিয়ে নৌ-ডাকাতি করা
আমাদের কাপালিকদের মতোই।
মধ্যযুগের সেইসব পর্তুগীজ হার্মাদ জলদস্যুর সাথে
হয়তো বা আগমন ঘটেছিল আলোকদিশারী কোনো কোনো
ধর্মযাজক সাধু পুরুষের!

কিংবা এমনও তো হতে পারে
ভারতবর্ষে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের শাসকদের শোষণ-শাসনের জন্য
প্রয়োজন ছিল এ দেশেরই কিছু শিক্ষিত মানুষের
আর এ জন্যই মানবিক গুণাবলীর শিক্ষাব্রতী বিশুদ্ধ
কিছু আলোকিত মানুষের আগমন ঘটেছিল এখানে।

দিন যায় মাস যায় বছরের পর বছর যায়,
যায় পেরিয়ে শতবর্ষ
বদলায় মানুষ, মানুষের অভাব-অনটন কখনো বাড়ে, কখনো কমে
ঝড়-বৃষ্টি-খরা উপেক্ষা করে জীবন সংগ্রামে অবিরাম এগিয়ে যায়
এই সব লড়াকু মানুষেরা
এগিয়ে যায় সভ্যতার বিকাশ ক্রমাগত সামনে এবং সামনেই

রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ জয়ে স্বাধীন জাতি আমরা আজ
আমাদের দীনতা দারিদ্র্য যায়নি যদিও
তবু স্বপ্ন দেখি মানব মুক্তির, একদিন জয় হবেই আমাদের

আমাদের প্রিয় পাদ্রীশিবপুর, আমাদের প্রিয় সেন্ট আলফ্রেড মিশন স্কুল
আমাদের সন্তানের শৈশব-কৈশোরের জ্ঞানের বাতিঘর যেন,
যেন শ্রী শ্রী মাতা সরস্বতী, স্মৃতিময় ভালোবাসার ধন।
যেন বা একটি সলতের পিদিম থেকে দিনে দিনে
শত শত প্রজ্জ্বলিত প্রদীপ ক্রমাগত খুব সকালে
সোনালী রঙ ধারণ করে এগিয়ে যাচ্ছে উজ্জ্বল রোদের দিকে

আমাদের মন-মন্দির প্রিয় স্কুলটি যেন বা একটি মৌমাছির চাক
সেই চাক ঘিরে বাড়তে থাকে অসংখ্য ছোট ছোট মৌমাছি
একটু বড় হলেই উড়ে যায় ঝাঁক বেঁধে অজানা পথের যাত্রী
দেশ থেকে দেশান্তরে-অনিন্দ্য আলোকিত সুন্দরতম ভুবনে।

[বাখেরগঞ্জ জেলার পাদ্রী শিবপুর সেন্ট আলফ্রেড মিশন হাই স্কুলের ৭৫তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে লিখিত]