অন্ধকারে গাছের পাতাগুলোও কত কালো

খালেদ হোসেন

১.

আকাশ ঝকঝক করছে এই বৌদ্ধপূর্ণিমার রাতে, আর আমাদের পৃথিবীতে জমাট হচ্ছে অন্ধকার। আমরা জানি না কোথায় যাচ্ছি। কিছু অচেনা মুখ কী এক অলৌকিক শক্তির বলে ভেড়ার পালের মতো আমাদের তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে, সামনে না পেছনে, বুঝতে পারছি না। কান ঝালাপালা হয়ে আসে কথার তুবড়িতে, আর আমাদের বুকের ভেতর পাথরের মতো থমকে থাকে নীরবতা। আমরা অপেক্ষা করি, কখন পেয়াদা এসে বলির পাঁঠার মতো টানতে টানতে নিয়ে যাবে কয়েদখানায় কিংবা ঠেলে দেবে নির্বাসনে, ক্রস-ফায়ারে ঝাঁজরা হবে আমাদের বুকের পাঁজর। পৃথিবীতে অনেক রঙের সমারোহ, কিন্তু এখন অন্ধকার গাছের পাতাগুলোও কত কালো। আমরা আমাদের হাতকেও বিশ্বাস করতে পারি না, ডান হাত খুঁজে পায় না বাঁ হাতকে, মনে হয় তারা যথাস্থানে নেই, কোনো ল্যাবরেটরিতে তাদের সংস্কার করা হচ্ছে।

আমাদের পকেট শূন্য করে চারপাশে গড়ে তোলা হচ্ছে ন্যায্যমূল্যের অজস্র দোকান। আমাদের জীবন ছিনিয়ে নিয়ে হেলিকপ্টার থেকে ছুড়ে ফেলা হচ্ছে থোকা থোকা অন্ধকার, উত্তর-পুরুষের লাশ।

২.

বিস্ময়কর পসরা নিয়ে আবির্ভূত সন্ধ্যায় নিজস্ব ছায়া পার হয়ে এসেছিল সুস্থির কুয়াশা। ভেবেছিলাম, স্বপ্ন তার নিজস্ব মহাযানে আমাদের নিয়ে যাবে প্রত্যাশিত গন্তব্যে, শিরার ভেতরে সব রক্তধুলো ধুয়েমুছে নক্ষত্রপুঞ্জে ভরে দেবে দুই হাত। রাত্রির নির্জনতায় সবকিছু চেনাজানা, এমনকি স্বপ্নের প্রতিধ্বনি, ঘাসের প্রান্তরে পিছলে যাওয়া বসন্তঘ্রাণ। মাঝরাতে ট্রেনের শব্দে ঘুম ভেঙে গেলে বাতাসের ভাঁজে ভাঁজে মিশে যায় মানুষের ক্রন্দন। শীতকালীন অন্ধকারে পৃথিবীর অস্তিত্বকে অবিশ্বাস্য মনে হয়। ভোরের বাতাসে পল্লবিত কল্পনার মতো একটিমাত্র মেঘের চাঙর অসহায়ভাবে ডুবে যায় বাদুড়ের ডানার ঝাপটায় গুঁড়ো হয়ে যাওয়া আকাশে। অসম্পূর্ণ বাস্তবতায় আমরা তবু বেঁচে থাকতে চাই বিস্মৃত ঋতুর মতো অভিমানী রক্তপথে, মধুহীন ফুলের জঞ্জালে।