একজন নূরজাহানের জবানবন্দী

ফারুক আলমগীর

হে প্রভু মহামহিম, তোমার অপরিজ্ঞাত
কিছু নেই ত্রিভুবনে, সকল নিগূঢ় তত্ত্ব
তুমি জান, ভালো-মন্দ মিশিয়ে সৃজন কর
প্রাণী ও জগৎ সংসার, এই আমাকেও।

হে মহামহিম
আমি সেই নূরজাহান নই
যার সমাধিতে বসে একজন
সত্যেন্দ্রনাথ আবেগে একদা আপ্লুত হন
যদিও জেনেছি নূরজাহান ছিলেন
প্রবল প্রতাপান্বিত গর্বিত সাম্রাজ্ঞী
যার অঙ্গুলি হেলনে সদা কম্পমান ছিল
সমগ্র ভারতবর্ষ
সম্রাটের পাশে উপবিষ্ট তাঁর
ক্ষমতার দর্পিত ব্যবহারের নামান্তরে
অবশ্য শঙ্কায় কেটেছিল শেষ দিনগুলি!

আমার ছিল না কোন ঐশ্বর্য-সম্পদরাজ্য
ছিল না সৈন্যসামন্ত বাহুবল সুরম্য মহল
অনিন্দ্য সুন্দরী সহচরী পারস্য-গোলাপ
কোনোদিন দেখি নাই জলোদ্যান হাওয়া-মহল
ইতিহাস-শ্রুত যৌবনদীপ্ত সাকির মদির পানীয়-

আমিতো নূরজাহান অতীব দীন-দরিদ্র
হতভাগ্য নারী বাংলাদেশের, যার নামে
কোনো পুষ্পউদ্যান সৌধ-কিরীটী এবং
শীর্ষ মহল হয়নি উৎসর্গিত কখনো

আমি সে নূরজাহান অতীব দীন-দরিদ্র
হতভাগ্য নারী বাংলাদেশের, শতচ্ছিন্ন
বসনের অন্তরালে যার ছিল প্রস্ফুটিত
যৌবন কোমল মন ও হৃদয়, ভালোবাসাবাসি
নামক মোহন এক অন্তহীন লাভাস্রোত
যা কী-না ভাসিয়ে নেয় সমুদয় লৌকিকতা
আমূল বসাতে পারে অজান্তেই তীক্ষ্ণশর
অতনুর, কিন্তু পিতৃপুরুষের দরিদ্র হতশ্রী
গৃহের কারণে অই সমাজপতিরা
আমাকে পাপিষ্ঠা বলে অপ্রাপ্তির হিংস্র প্রতিশোধে
পাথরে পাথরে বিচূর্ণ করেছে আমার হৃদয়!

হে মহামহিম প্রভু
এই দীন-দরিদ্র নূরজাহান কী অপরাধ করেছে?
কোন অপরাধে শাস্তি পেলো?
যদিচ রূপ-যৌবন ভালোবাসাবাসি
অপরাধ হয়ে থাকে, তবে উঠিয়ে নাও না
কেন প্রেমসুধা ভালোবাসা অমৃত কথন?

হে মহামহিম
দুরাত্মা শয়তানের প্রতি একদা নিক্ষিপ্ত
পাথর খণ্ড এখন প্রতিহিংসার স্পৃহায়
অব্যর্থ নিশানা নিচ্ছে তোমার নূরজাহান
শহরবানু এবং সখিনাদের কোমল
শরীরের প্রতি, অথচ তাদের নফ্‌সের
ভেতরে প্রবেশ করে নাই কোনোদিন
গোমরাহির তমসা
যেমন পেরেছে শয়তান, সত্যসাধকের
রক্তের হিমোগ্লোবিন শুষে নিয়ে প্রবিষ্ট করাচ্ছে
অবিশ্বাসের পুরিয়া, মুহূর্তের দোলাচলে
নিভে যাচ্ছে আলোকিত কাল্‌বের বাল্ব।

হে মহামহিম প্রভু
তোমার দীন-দরিদ্র নূরজাহানের
একমাত্র ফরিয়াদ শোন : আলো দাও
অই ভণ্ড মূর্খ ধর্ম-ব্যবসায়ীর দলকে
আলো দাও; আর আমাকে বাঁচতে দাও
বাঁচার আলোক চাই-

প্রভু, তমসা ঘুচাও!