বেচু সরদারের ট্রুথ কমিশন

সালেহ উদ্দীন আহমেদ

সাম্পান আর নদী। ঘাট থেকে ঘাটে। এক ঘাটের মাল বয়ে নিয়ে যায় আরেক ঘাটে। এই হলো হোসেন মাঝির পেশা ও নেশা। এখন বয়স হয়েছে, খুব বেশী দূরে সাম্পান নিয়ে যায় না, দু’চার সপ্তাহের খ্যাপ টেনে ফিরে আসে ঘরে। ভালো লাগে বউ তমিজা বিবি আর মেয়ে সাগরীর সাথে সময় কাটাতে। এক সময় সখ ছিল নদী ছেড়ে সমুদ্রে যাবে, বিদেশী জাহাজে কাজ করবে। সে আর হলো না। যতবারই ‘নলি’ কেনার টাকা-পয়সা দিয়েছে, প্রতিবারই ঠকেছে।
সাগরের হাতছানি হোসেন মাঝির রক্তের কণায় কণায়। তাই মেয়ের নাম রেখেছিল-সাগরী। সাগরী গায়ের কাছে এলে হোসেন মাঝি কেমন নোনা নোনা গন্ধ পায়, ঠিক সমুদ্রের পানির মতো। খুব ভালো লাগে। সাগরীকে নিয়েই এখন হোসেন মাঝির যত স্বপ্ন। সাগরীর বিয়ে হবে, বিয়ের পর বেড়াতে আসবে বাপের বাড়ী, খল খল করে হাসবে আর গলগল করে শ্বশুর বাড়ীর গল্প করবে। এখন একটা ভালো ছেলে পেলেই হয়। দু’চার কলম লেখাপড়া জানে এমন ছেলেই হোসেন মাঝির পছন্দ। আর যেন সৎ হয়, দুই নম্বরী লোক মাঝির একদম অপছন্দ।
বেচু সরদার চায় সাগরীকে বিয়ে করতে। সেদিনও হাটের মোড়ে দেখা, পায়ে ধরে সেলাম করে মাঝিকে। আর বলে, ‘আমুর কথাটা মনে রাইখ্যেন কাকু, আমু কোনদিন সাগরীকে কষ্ট লাইগবার দুমু না।’
হোসেন মাঝির লাল চোখ টগবগে হয়ে ওঠে, ‘তুরে না কতবার কইছি এসুব কথা না কইতে। সাগরীরে গাঙে ভাসাইয়া দুমু, তবু তুর লগে বিয়্যা দুমু না।’
বেচু সরদার দুঃখ পায়, চুপ করে থাকে। মাঝি বলতেই থাকে, ‘তুরতো কত টাকা পয়সা ক্ষেমতা, কত বড় বড় জাগায় বিয়্যা করতে পারস। সাগরীর দিকে যেনু আর চোখ না উডে।’
সত্যিই বেচু সরদার ক্ষমতাবান লোক। ঘাটের আড়তটা যত বড় হচ্ছে, টাকা-কড়ি প্রতাপও তত বাড়ছে। ব্যবসা করতে গেলে একটু এদিক ওদিক করতেই হয়, ক্ষমতা দাপট এসবও দেখাতে লাগে। এ নিয়ে বেচুর কোনো ধানাই পানাই নেই। এ বয়সে শূন্য হাত থেকে গদির মালিক হওয়া চাট্টিখানি কথা নয়। তবে ক্ষমতা আর আয় উন্নতির সাথে সাথে বেচু সরদার আরও কিছু পেয়েছে-লোকনিন্দা। বেচুর খুব আফসোস-হতে চেয়েছিল সওদাগর, গাঁয়ের লোক বানিয়ে দিয়েছে সরদার। যতটা না সে খারাপ কাজ করে, লোকে আরও বানিয়ে বাড়িয়ে বলে। কেরসিনের দাম বাড়িয়েছে সরকার, দোষ হলো বেচু সরদারের। রোজার দিনে ডালের দাম বেড়ে যায়, নিশ্চয় বেচু সরদার বাড়িয়েছে।
গেল মাঘে ঘুগনী পাড়ায় একটা মেয়ে ইঁদুর মারার ঔষুধ খেয়ে মরে গেল। গ্রামের চারদিকে কানাঘুষা, বেচু সরদারের হাত আছে। উপরওয়ালা সাক্ষী, সাগরী ছাড়া আজ পর্যন্ত বেচু কোনো মেয়ের দিকে তেমন করে চেয়েও দেখে নি। বন্দরে-গঞ্জে কত অলিতে-গলিতে ঘুরেছে ব্যবসার ধান্দায়। গঞ্জের গলিগুলো যেন গিজ গিজ করে মেয়ে মানুষে। বেচু সরদার কোনোদিন ধারে কাছেও যায় নি। গ্রামের লোকদের বলা কওয়া নিয়ে বেচুর তেমন তোয়াক্কা নেই। যত কানাঘুষা আড়ালে আবডালে। মুখের উপর বলার লোক এই দু’চার গাঁয়ে কেউ নেই, একদম মুখ খুবলে দেবে। এমনই ক্ষমতা বেচুর।
হোসেন মাঝি অবশ্য আলাদা। বেচু বাপের মতোই মানে মাঝিকে। যত পারে এড়িয়ে চলে। বেচু জানে, হোসেন মাঝি ওকে একদম পছন্দ করে না। অথচ এই মাঝি পরিবারের স্নেহেই এক সময় বেঁচে ছিল বেচু। ছোটকালে পড়ে থাকত হোসেন মাঝির বারান্দায়। মাঝে মাঝে তমিজা বিবির ফুটফরমাস খাটতো, আর মাঝি বাড়ীতে না থাকলে বাজার সাজার করে আনতো। ঝড়ঝাপটা বাতাস এলে বড় ভয় করত বেচুর, আকাশে যেন আগুনের ফুলকি বয়ে বেড়াত। বেচু দৌড়ে দু’লাফেই চলে যেত কাকীর ঘরে। তমিজা বিবি কাঁথা গায়ে দিয়ে মাথায় হাত রেখে অভয় দিত। বেচুকে যেদিন মাঝি সাম্পানে নিয়ে গেল, যাওয়ার আগে তমিজা বিবির সেকি কান্না। বার বার বলে, ‘এতটুকুন ছাওয়াল, বাতাস তুফান দেখলেই ডরে মইর‌্যা যার। ও কেমুনে থাইকবো সাম্পানে?’
হোসেন মাঝি হাসে, ‘দু’চার মাস সাম্পানে থাইকলেই সুব ঠিক হইয়্যা যাবু। গাংগের বাতাসে যখন মায়া ধইর‌্যা যাবু, আর কুলে আইতে চাইবু না।’
সেই বেচু। নদীর গর্জন শুনতে শুনতে আস্তে আস্তে কেমন বেপরোয়া হয়ে উঠল। সাহসও বেড়ে গেল। প্রথম প্রথম সাম্পানের মালামাল ছিঁচকে চুরি করতো। পরে হয়ে গেল দু’নম্বরী মালের নিখুঁত পাচারী। সড়কে পড়ল হোসেন মাঝির সাম্পান থেকে। প্রথম দিকে হোসেন মাঝি চেষ্টা করেছিল শুধরাতে, পরে হাল ছেড়ে দেয়। এখন বেচু চারটা সাম্পানের মালিক। নিজে আর সাম্পানে যায় না, অন্যরাই চালায়। আড়তের গদীতেই বেশীর ভাগ সময় কাটে বেচুর। হোসেন মাঝি বাড়ী না থাকলে, বেচু মাঝে মাঝে মাঝি বাড়ীতে আসে তমিজা বিবি ও সাগরীকে দেখতে। সাগরী বেশী কথা বলে না। কাকী আগের মতোই এটা ওটা খেতে দেয়, চা বানিয়ে খাওয়ায়।
বেচু অনেকক্ষণ বসে থাকে রান্না ঘরের বারান্দায়, যদি সাগরী একটু আসে। হয়ত বলবে, ‘বেচু ভাই, কয়টা লাল চুড়ি আইনতা পাইরবা, সোনালী কাজ-করা? একটা ছোট্ট ট্রানজিস্টার, পুরানটা ভাইঙা গেছে।’
সেবার নারায়ণগঞ্জ থেকে কাকীর জন্য একটা তসরের শাড়ী এনেছিল বেচু। প্রথমে দেখে কাকী খুব খুশীর ভাব দেখালো। শাড়ীটা বুকে জড়িয়ে বেচুর মাথায় হাত রেখে দোয়া করলেন। তারপর বললো, ‘বেচু, তুই আমুর ছাওয়াল, তুই রুজি করে আনছত আর চুরি করে আনছত, আমুর কোনো বাছবিচার নাই, কিন্তুক সাগরীর বাপকেতো জানুস, শাড়ীটা তুই এখন তুর কাছে রাইখ্যা দে, পরে আমি খুইজ্যা নিমু।’
কতক্ষণ নির্বাক হয়ে বসে থাকে বেচু। কাকী, সাগরী সবাই এখন কত দূরের মানুষ! শাড়ীটা কাগজের পোটলায় ঢুকিয়ে ফিরে আসে আড়তে।
হোসেন মাঝির বিরাগ আর তমীজা বিবির দোটানা ভাব তবু কিছুটা বোঝে বেচু সরদার। কিন্তু সাগরীকে একদম বুঝতে পারে না। সাগরী দু’চারটা কথা যখনও বা বলে, কেমন যেন ধারালো স্বর। কি জানি রাগ, অভিমান, না সত্যি ওর মনের কথা? একবার বলল, ‘বেচু ভাই, তুমি এই বাড়ীতে কিল্লাইগা আস? বাপজান একদম পছুন্দ করে না, তুমি আর মাঝি বাড়ীতে আইবা না।’
সাগরী সেদিন বলেই ফেলে, ‘বেচু ভাই, কি লাভ এতো টাকা পুইস্যা কইর‌্যা? তুমারতো একডা মাত্র পেট। ভালা মানুষ হইয়্যা তালুকদার বাড়ীর মাইয়্যাডাকে বিয়্যা কইর‌্যা ফেল, ঘর সংসার কর।’
বেচু খুব অবাক হলো। সাগরী ওর সম্পর্কে এত খবর রাখে? তালুকদার যে ওর কাছে মেয়ে বিয়ে দিতে চায়, এ কথাতো সে কাকা কাকীকেও বলে নি। সাগরী জানলো কিভাবে? বেচু কোনো প্রতিবাদ করল না। শুধু বলল, ‘সাগরী, তুর মনে আমুর জন্য কি কনু দয়ামায়া ভালোবাসা কিচ্ছুই নাই?’
সাগরী মুখ বাঁকিয়ে হেসে বলে, ‘মাঝির মায়্যার ভালোবাসা সাগর কুলের বালুর মতন, দমকা বাতাস আইলেই উইড়্যা যায়, আবার জোয়ারেও জোর কইরা টাইন্যা লইয়া যায়।’
বেচু ভেবে পায় না কি বলবে। দু’চার ক্লাশ স্কুলে পড়ে সাগরী যে কত কঠিন কঠিন কথা বলতে শিখেছে! শুধু বলল, ‘সাগরী, তুর মনে আছে খেজুর কাডা দিয়্যা যে তুর পায়ের কাডা তুইল্যা দিতাম? সারাদিন ডেঙা ডেঙা ঘুরতি, আর হাজারটা কাডা লাগাইয়্যা বাড়ী ফিরতি।’
পুরানো স্মৃতি মনে করে সাগরী আরও গম্ভীর হয়ে গেল। বেচুর দিকে না তাকিয়েই কাঁধের আঁচলটা টেনে চোখ দু’টি চেপে ধরল। বেচুও কেমন হারিয়ে গেল শূন্যতার মাঝে। এভাবে কতক্ষণ কেটে গেল। এক সময় বেচু আস্তে করে হাতটা সাগরীর মাথায় রাখলো, ‘সাগরী, তোর কাছে কয়ডা হাঁচা কথা কমু। কাকু ঠিকই কয়, আমু অনেক দুই নম্বরী কায়কারবার কইরছি, কিন্তুক কাগুজের কয়ডা ট্যাকা ছাড়া আর কুচ্ছু পাই নাই, আমু এসব বাজে ক্যাম ছাইর‌্যা দুমু।’
সাগরী আঁচলটা আরও সজোরে চোখে চেপে ধরে তাড়াতাড়ি ঘরে ঢুকে গেল।
পরদিন সারা গ্রামে হৈ চৈ পরে গেল। বেচু সরদার আড়তের সব চাল, ডাল ন্যায্য মূল্যে বিক্রী করে দিচ্ছে। আশেপাশের সব গ্রামের লোকেরা হুমড়ি খেয়ে লাইন ধরে কিনছে চাল, ডাল, আটা, তেল, নুন যার যা লাগছে। খুঁত ধরার লোকেরও অভাব নেই-নিশ্চয় গুদামে পড়ে থেকে পচে যাচ্ছিল, কিংবা ভেজাল আছে নিশ্চয়। তবে সবাই খুশী। এই আক্রার বাজারে ন্যায্য দামে দু’টো চাল-ডাল কিনে পেট ভরে খাবে। ক’দিন পর হোসেন মাঝি বাড়ী এলো। এবার অনেকদিন বাইরে ছিল। ঘাটের মুখেই শুনেছে বেচুর আড়তের খবর।
বাড়ীতে এসে পেট ভরে ভাত খেলো হোসেন মাঝি। সাম্পানের রান্না খেতে খেতে পেট পচে গেছে। জর্দা দিয়ে পান নিয়ে এলো তমিজা বিবি। মেয়ের জন্য হোসেন একটা গোলাপী শাড়ী এনেছে। বলল, ‘সাগরী, শাড়ীটা পইর‌্যা একডু দেখানারে মা।’
সারগী গোলাপী শাড়ীতে আধা ঘোমটা দিয়ে বাপের মাথা ঘেঁষে এসে দাঁড়ালো। কথায় কথায় তমিজা বিবি বেচুর কথা ওঠালো। হোসেন মাঝি বলল, ‘বেটার তা হুলে সৎ মতি হইয়্যাছে, নাচ্ছার কোথাকার।’
মাঝি একটু থামল। আবার বলল, ‘সরকার ট্রুথ কমিশন খুইল্যাছে। কিরা কইর‌্যা পুরান চুরির কথা বেবাক স্বীকার কইরলে, সব দুষ মাপ। বেচুটাও এহন যদি দুনম্বরী ছাইর‌্যা সোজা লাইনে আইতে পারে।’
মাঝির কথায় হঠাৎ সাগরী চমকে উঠল, ‘বাজান, বেচু ভাই কি মাপ পাইবু না? শহুরে এতু বড়বড়ু চুরেরা ছাড়া পাইয়্যা গেছে, তুমি কি বেচু ভাইরে মাপ কইর‌্যা দিবা না?’
হোসেন মাঝি সাগরীর দিকে চেয়ে সজোরে হেসে উঠল। তারপর মেয়ের মুখটা কাছে টেনে বুকে জড়িয়ে ধরল।
পরের দিন মাঝি বাজারে গেলে দেখা হলো বেচুর সাথে। বেচু আগের মতোই পা ছুয়ে সেলাম করল, লক্ষ্য করল মাঝির চোখ দু’টা আগের মতো রাগ রাগ লাল নয়, ভাটার নদীর মতো কেমন শান্ত। হোসেন মাঝি বলল, ‘কেমন আছত বেচু? তুর কাকী তছর শাড়ীটা লইয়্যা তুরে বাড়ী যাইতে কইছে।’
অনেকদিন পর হোসেন মাঝি বেচুকে বাড়ী যেতে বলল-যে বাড়ীর বারান্দায় একদিন নিশ্চিত আশ্রয়ে ঘুমাত আর ঝড় হলে লাফ দিয়ে চলে যেতে তমীজা বিবির ঘরে।
সাগরী ঠিকই বলেছিল, ‘ঘাট ছাইর‌্যা নৌকা চইল্যা যায় কত দূরে, আবার ফিইর‌্যা আসে ঘাটে।’