একজন মহিলার প্রতিকৃতি

জাফর আলম

মূল খুশবন্ত সিং

[ ভারতের প্রখ্যাত লেখক খুশবন্ত সিং। সাংবাদিকতা ও জনসংযোগ পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। তিনি ভারতের বিখ্যাত ইংরেজী সাপ্তাহিক ইলাস্ট্রেটেড উইকলী অফ ইন্ডিয়া এবং দৈনিক হিন্দুস্তান টাইমসের সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ব্যঙ্গাত্মক রচনা ও কলাম লেখায় তিনি সিদ্ধহস্ত। তাঁর কৌতুকমিশ্রিত ইংরেজী কলাম ভারতের ১৪টি দৈনিকে একযোগে প্রকাশিত হয়। ইংরেজীতে ছোট গল্প রচনায় তিনি ভারতীয় হিসেবে প্রথম খ্যাতি অর্জন করেন। ‘একজন মহিলার প্রতিকৃতি’ খুশবন্ত সিং-এর দি কালেক্টেড শর্ট স্টোরিজ থেকে নেয়া হয়েছে। ]

আমার দাদীমা ছিলেন অন্যদের দাদীমায়ের মতোই একজন বৃদ্ধা মহিলা। বিগত বিশবছর যাবত তাঁকে আমি দেখছি বৃদ্ধা মহিলা হিসাবে। লোক মুখে শুনেছি, তিনি যুবতী ও সুন্দরী ছিলেন, তাঁর স্বামীও ছিল কিন্তু তা অবিশ্বাস্য মনে হয়। আমার দাদার একটি ছবি ড্রয়িং রুমের তাকের উপর রাখা ছিল। ছবিতে দেখা যাচ্ছে, তিনি মাথায় পাগড়ী আর ঢিলাঢালা পোশাক পরেছেন। তাঁর মাথার সাদা চুল বুকের উপর ছড়ানো। দেখলে মনে হয় শত বছরের বুড়ো। তাঁকে দেখলে মনে হয় না তাঁর স্ত্রী ছিল, ছেলেমেয়ে আছে। মনে হয়, শুধু তাঁর অনেকগুলো নাতী নাতনী আছে।
কিন্তু আমাদের দাদীমা ছিলেন তখন বেশ স্বাস্থ্যবতী, সুন্দরী। ছেলেবেলায় দাদীমা তাঁর খেলাধুলার গল্প শুনাতেন আমাদের। গল্প শুনে আমাদের কাছে তা অবিশ্বাস্য মনে হতো যেন পয়গম্বরদের উপকথা।
দাদীমা ছিলেন ছোটখাট, মোটা আর কুঁজো হয়ে হাঁটতেন। তাঁর চেহারায় ছিল আঁকা বাঁকা বার্ধক্যজনিত কুঞ্চিত রেখা। তিনি বুড়ো হয়েছেন সত্য কিন্তু বিগত বিশ বছর যাবত তাঁকে একই রকম দেখছি, যেন বয়স বাড়ে নি বরং একই রকম আছে। তাঁকে অপূর্ব সুন্দরী বলা যায় না, তবে মোহনীয় ছিলেন। একহাত কোমরে রেখে সামনের দিকে ঝুঁকে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে সারা ঘরে হাঁটতেন আর এক হাতে মালা জপতে থাকতেন। মাথার চুল সাদা মলিন চেহারায় এলোমেলোভাবে ছড়ানো থাকতো আর মুখে অবিরাম প্রার্থনার বাণী জপতে থাকতেন তিনি। তখন তাঁকে বেশ সুন্দর দেখাতো, যেন শীতকালীন বরফে ঢাকা পাহাড়ের ভূ-প্রাকৃতিক দৃশ্য ধবধবে সাদা বরফে সমপ্রসারিত হয়ে শান্তি ও পরিতৃপ্তির নিঃশ্বাস ছাড়ছে।
দাদীমা ছিলেন আমার ভালো বন্ধু। আমার পিতা-মাতা শহরে বসবাসের জন্য চলে গেলে আমাকে দাদীমার কাছে রেখে যান। আমি সর্বক্ষণ দাদীমার সাহচর্যে থেকেছি। তিনি আমাকে সকালে ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলতেন আর স্কুলে যাওয়ার জন্য জামাকাপড় পরিয়ে রেডি করে দিতেন। তিনি সকালে বিদঘুটে ভাষায় প্রার্থনা করতেন যা আমার বোধগম্য ছিল না। যখন আমাকে জামাকাপড় পরিয়ে দিতেন, তখন তাঁর আশা থাকতো আমি স্কুলে লেখাপড়া মনোযোগ সহকারে করবো। তারপর তিনি আমার হলুদ চকের আঁকাবাঁকা লেখা সম্বলিত কাঠের শ্লেটটি ধুয়ে দিতেন। ছোট মাটির কালির দোয়াত আর নিবের কলম পুঁটলীতে বেঁধে আমার কাছে হস্তান্তর করতেন। মোটা শুকনা চাপাতি মাখন ও চিনি মেখে খেয়ে আমি স্কুলে যেতাম। দাদীমা অনেকগুলো শুকনো চাপাতি প্রামের কুকুরের জন্য রেখে দিতেন।
আমার দাদীমা স্কুলে আমাকে পৌঁছে দিতেন কারণ স্কুলের পাশেই ছিল মন্দির। পুরোহিত আমাদেরকে গণিতের জ্ঞান দিতেন আর সকালের প্রার্থনা পরিচালনা করতেন। স্কুলের বারান্দার দু’পাশে ছাত্ররা সারিবদ্ধ হয়ে বসতো আর কোরাস সহকারে প্রার্থনা করতো। দাদীমা তখন ক্লাসের ভেতরে বসে ধর্মগ্রন্থ পড়তেন। আমাদের প্রার্থনা শেষ হলে, মন্দিরের বাইরে গেটে কুকুরের দল ভীড় জমাতো। আমরা দু’জনে বাড়ী না ফেরা পর্যন্ত কুকুরের দল পরস্পর ঝগড়া বিবাদে লিপ্ত হতো আর আমরা চাপাতি ছিঁড়ে ছিঁড়ে ওদের দিকে ছুঁড়ে দিতাম।
আমার বাবা শহরে যথারীতি বসবাসের ব্যবস্থা করে আমাদেরকে নেয়ার জন্য লোক পাঠালেন। এটা ছিল দাদীমা ও আমার মধ্যে বন্ধুত্বের পরিবর্তনের দিক। যদিও দাদীমা আর আমি একই কামরায় থাকতাম কিন্তু দাদীমা আমাকে স্কুলে পৌঁছে দিতেন না। আমি বাসে চড়ে একটি ইংরেজী মাধ্যম স্কুলে যেতাম। সেখানে রাস্তায় কোন কুকুরের দল ছিল না বরং আমাদের শহরের বাড়ীর বারান্দায় চড়ুই পাখী বাস করতো।
সময় অতিক্রান্ত হয়, আমাদের দু’জনার মধ্যে দেখা সাক্ষাৎ হ্রাস পায়। মাঝে মধ্যে দাদীমা আমাকে স্কুলে যাওয়ার আগে ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলতেন আর স্কুলের পোশাক পরিয়ে দিতেন। স্কুল থেকে ফিরে এলে, শিক্ষকরা কি পড়িয়েছেন তা জানতে চাইতেন। উত্তরে আমি তাঁকে কিছু ইংরেজী শব্দ, আর্কিমিডিসের সূত্র, মাধ্যাকর্ষণ সূত্র, পাশ্চাত্যের বিজ্ঞান নীতি এবং বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের নানা তথ্য সম্পর্কে বুঝাবার চেষ্টা করতাম। এতে তাকে বেশ অসুখী মনে হতো, কারণ তিনি আমার ক্লাসের পড়ার ব্যাপারে তেমন কিছু বুঝতেন না। ইংরেজী স্কুলে যা পড়াশুনা হয় সে ব্যাপারে তাঁর বিশ্বাস ছিল না-যেখানে ভগবানের বিষয় নেই। একদিন দাদীমাকে জানালাম, আমাদের ক্লাসে সঙ্গীত শিখানো হচ্ছে। তিনি বিচলিত বোধ করলেন। তাঁর মতে, সংগীতের সঙ্গে অসভ্যদের সম্পৃক্ততা রয়েছে, গানবাজনা ভদ্র সমাজের জন্য নয় বরং ওটা হলো বেকার এবং অসভ্যদের আড্ডা। এর পর থেকে তিনি আর আমার সঙ্গে তেমন আলাপ করতেন না।
যখন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই, আমাকে পড়াশোনোর জন্য পৃথক কামরা দেয়া হয়। দাদীমার সঙ্গে আমার যোগাযোগ একপ্রকার বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তিনিও এই ব্যবস্থা মেনে নেন এবং নিঃসঙ্গ বসবাস শুরু করেন।
সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তিনি চরকায় সূতা কাটতেন আর প্রার্থনা রত থাকতেন। বিকেলে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতেন আর চড়ুই পাখীকে আহার দিতেন। তিনি বারান্দায় বসে রুটি ছোট ছোট টুকরো করে নিতেন আর চড়ুই পাখীর দল আহারের জন্য তাঁর মাথার উপর, পায়ের উপর, কাঁধে বসে কিচির মিচির শুরু করতো। তিনি মুচকি হাসতেন, কিন্তু কখনও এদেরকে তাড়িয়ে দিতেন না। আধঘণ্টা সময় তিনি চড়ুই পাখীদের আহার দিয়ে কাটাতেন।
আমি উচ্চ শিক্ষার জন্য বিদেশে যাচ্ছি। ভেবেছি, নিশ্চয় দাদীমা এই সংবাদ শুনে বিচলিত হবেন। আমি পাঁচ বছর বিদেশে থাকবো, জানি না, বৃদ্ধ বয়সে এই সময়ে তার কি ঘটে যায়। কিন্তু দাদী তেমন আবেগপ্রবণও হন নি। রেলওয়ে স্টেশনে আমাকে বিদায় জানাতে এলেন, আমার সাথে বিশেষ আলাপও করেন নি এবং আবেগপ্রবণ হন নি। শুধু প্রার্থনা করেছিলেন আর প্রার্থনার বাণী জপ করতে গিয়ে তাঁর ঠোঁট নড়ছিল। তাঁর হাতের আঙুল দ্রুত জপমালার দানা গুনতে ব্যস্ত ছিল। তিনি আমার কপালে চুমু দিয়ে দেন, এটাই ছিল আমাদের দু’জনার মাঝে শেষ গন্ধ-স্পর্শের যোগাযোগ।
দীর্ঘ পাঁচ বছর পর আমি দেশে ফিরে এসেছি। তিনি আমাকে অভ্যর্থনা জানাতে রেলস্টেশনে হাজির, তাঁকে দেখে বেশী বয়স বাড়েনি বলে মনে হলো। তিনি দু’বাহুতে আমাকে বুকে জড়িয়ে নিলেন আর সর্বক্ষণ প্রার্থনায় ব্যস্ত ছিলেন। প্রথমদিন বাড়ী ফেরার পর তাঁকে দীর্ঘক্ষণ চড়ুই পাখীদের আহার দিতে ব্যস্ত দেখেছি, কিন্তু পাখীর দলকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে তিরস্কার করছিলেন।
সন্ধ্যায় তাঁর মাঝে পরিবর্তন দেখেছি। তিনি প্রার্থনায় যোগ দেননি বরং প্রতিবেশী মহিলাদের জড়ো করে একটি ঢোল বাজাতে শুরু করেন। তাঁরা যুদ্ধে বিজয়ী যোদ্ধাদের বাড়ী ফেরা উপলক্ষে গীত কোরাস আকারে গাইতে থাকেন। তাঁদের গানের আসর দীর্ঘক্ষণ চলে। তিনি যাতে ক্লান্ত হয়ে না পড়েন তাই তাঁকে আমি অতিরিক্ত সময় গানবাজনারত থাকা থেকে বিরত রাখতে বাধ্য হই। এই প্রথমবার দেখেছি, তিনি প্রার্থনা থেকে বিরত থাকলেন।
পরদিন সকালে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। সামান্য জ্বর, ডাক্তার দেখেশুনে জানান, দ্রুত সেরে যাবে। কিন্তু আমার দাদীমা অন্য কিছু ভেবেছেন। তিনি আমাদের জানালেন, তার শেষ সময় ঘনিয়ে এসেছে।
মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা আগে তিনি আমাদেরকে জানান, কথা বলে সময় নষ্ট করতে চান না। আমরা প্রতিবাদ জানালে তিনি আমাদের প্রতিবাদ আমলে নেন নি। তিনি শান্তিপূর্ণভাবে বিছানায় শুয়ে শুয়ে প্রার্থনা করছিলেন আর জপমালার দানা গুনছিলেন। আমাদের সন্দেহ সত্য প্রমাণিত হওয়ার আগেই তাঁর ঠোঁট নড়া থেমে যায় আর তাঁর অসাড় হাত থেকে জপমালা মাটিতে পতিত হয়। তাঁর চোখে মুখে প্রশান্তির ছাপ, আমরা বুঝলাম, তিনি আর বেঁচে নেই।
আমরা রীতি অনুযায়ী তাঁর মৃতদেহ চৌকি থেকে নামিয়ে মাটিতে শুইয়ে দিই আর গায়ের উপর একটি লাল কাফনের কাপড় দিয়ে ঢেকে দিই। কয়েকঘণ্টা শোক পালনের পর আমরা তাঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার ব্যবস্থা করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ি।
সন্ধ্যায় তাঁর কামরায় একটি খাটিয়া নিয়ে গেলাম, তাঁকে দাফনের জন্য নিয়ে যাওয়া হবে। সূর্য অস্ত যাচ্ছে আর দাদীমার বারান্দায় ডুবন্ত সূর্যের সোনালী আলো ছড়িয়ে পড়ছে। আমরা উঠানে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করি। বারান্দা আর তাঁর মৃতদেহ লাল কাফনে ঢেকে রাখা হয়েছিল। আশ্চর্য এই, কামরায় হাজার হাজার চড়ুই পাখী জড়ো হয়।
চড়ুইপাখীর কিচির মিচির শব্দ পর্যন্ত নেই, সকলে নীরব। আমরা পাখীদের জন্য দুঃখবোধ করি। আমার মা পাখীগুলোর জন্য কিছু-রুটি নিয়ে আসেন। তারপর দাদীমা যেখানে দাঁড়িয়ে চড়ুই পাখীদের লক্ষ্য করে রুটির টুকরো ছুড়ে দিতেন, মা সেখানে দাঁড়িয়ে রুটিগুলো ছোট ছোট টুকরো করে ছুড়ে দেন। চড়ুই পাখীগুলো এসব রুটির টুকরোর দিকে ভ্রুক্ষেপই করে নি। আমরা যখন দাদীমার মৃতদেহ বহন করে নিয়ে গেলাম, চড়ুই পাখীর দল নিঃশব্দে উড়ে চলে যায়। পরদিন ঝাড়ুদার এসে ঝাড়ু দিয়ে মাটিতে পড়ে থাকা রুটির টুকরোগুলো তুলে নিয়ে ডাস্টবিনে ফেলে দেয়।