তিমির পেটে বসবাস

রফিক আনোয়ার

উপার্জনক্ষম ব্যক্তিটি যখন উপার্জন অক্ষম হয়ে পড়েন তখন তাঁর দুটো যন্ত্রণার সৃষ্টি হয়, একটি বয়সের আর একটি অবহেলার। আর ব্যক্তিটি যদি সরকারী অবসরপ্রাপ্ত চাকুরীজীবী হন, তাহলে আরো একটি যন্ত্রণার হুল বেড়ে যায়, ক্ষমতাহীনতার। গোলাম রসুল এখন সেই তিন যন্ত্রণায় কাতর।
সেজে-গুঁজে ঘর থেকে সবাই একে একে বের হয়ে গেলো। কাজের মেয়ে দু’টোও। গোলাম রসুল বিছানায় শুয়ে শুয়ে আনমনা ভাবছেন। মাঝে মাঝে তাঁর তৃষিত নয়ন দক্ষিণের একমাত্র জানালাটির বন্ধ কপাটে গিয়ে আছড়ে পড়ছে। এক সময় এই জানালাটিই ছিল তাঁর দশদিগন্ত। খোলা জানালার গ্রিল ধরে প্রাণভরে নির্মল বাতাস নিতেন আর নীল আকাশের দিকে মুগ্ধ বিস্ময়ে চেয়ে ফেলে আসা জীবনের নান্দিপাঠের আসর বসাতেন। হঠাৎ করে সমাজে গজিয়ে-ওঠা নব্য অর্থগৃধ্‌নুরা তার সেই সামান্য সুখটুকুও সহ্য করলো না। জানালা খুললেই মনে হয় যেন বাসি কফিনের ঢাকনা খোলা হয়েছে। এক রাশ গুমোট বাতাস দুঃস্বপ্নের ধূসরতা নিয়ে চোখে-মুখে থাবা মারছে। বিশাল বিশাল বহুতল ভবনরাশি, কোনটা আকাশ ছুঁয়েছে, কোনটা কোমর তুলেছে আর কোন কোনটা প্রাগৈতিহাসিক যুগের ডাইনোসরের কংকালের মতো হাতে পায়ে মাটি আঁকড়ে মাথা তোলার চেষ্টা করছে। ভূমিখাদকেরা দক্ষিণ গিলেছে, উত্তর গিলেছে, পশ্চিম গিলেছে। শুধু মাত্র গোলাম রসূলের পাঁচ কাঠার পুবের ছোট্ট বাড়ীটার জন্য জিহ্বাটা বের করে থমকে আছে। গোলাম রসুলের জীবনের সফলতা বলতে তেজকুনি পাড়ার এই ছোট্ট পাঁচ কাঠা ভিটে। তিল তিল সঞ্চয়ের ব্রহ্মতালু! এ-টুকু যদি ফুটো হয়ে যায়? গোলাম রসূল আর ভাবতে পারেন না। মাথাটা ধক করে জ্বলে উঠলো। আজীবন সৎ মানুষের অভিনয় করতে গিয়ে টলতে টলতে জীবনটা তো খড়-কূটার মতো চরায় এসে ঠেকেছে, আর কোথায় যাবেন? না, এ ব্যাপারে কোনো আপস নেই। বিছানা থেকে কাঁপতে কাঁপতে উঠে দাঁড়ালেন। ভেজানো সদর দরজাটায় হুক টেনে বাথ রুমে ঢুকলেন।
ট্যাপের উপর হাত রেখে ভাবনায় পড়লেন, রাবণের গোষ্ঠীরা গণহারে গোছল করে গেছে। ট্যাংকে কোনো পানি অবশিষ্ট আছে কি? অর্ধসিদ্ধ মাথাটা ভেজাতে হবে। খোসাছড়ানো বাতাবি লেবুর মতো বেঢপ মাথাটা ট্যাপের নীচে বসিয়ে নব ঘুরাতেই ঝপ্‌ ঝপ্‌ করে পানি পড়তে শুরু করলো। সামান্য ক্ষণ মাত্র, তার পরই ফোঁস-ফাঁস করে বন্ধ হয়ে গেলো। পানি আসবে সেই রাত বারটায়। সজিনাতলার মাটির মটকাতে কিছু পানি থাকে। ববিতা-কবিতারা তাও রেখেছে কিনা সন্দেহ! গোলাম রসূল বিড় বিড় করতে করতে কপাট খুলে দাওয়ায় এসে আকাশের দিকে তাকালেন। বেলা কতো? ঘাড় নব্বই ডিগ্রী বাঁকিয়ে বায়োস্কোপের বাঙের মতো একটুকরো উঠোনের ফোকর দিয়ে উপরে তাকাতেই মনের সব বদ্ধ কপাট খুলে গেল। আহা! কী সুন্দর, নির্মেঘ, নির্মল সুনীল আকাশ! কাশের গুচ্ছের মতো এখানে ওখানে মেঘের আড়। মাঝে মাঝে মেঘকুমারীর শুভ্র কাঁচুলির ছোট ছোট ঢেউ। হঠাৎ নীল আকাশটায় একটা মস্ত বড় অর্ধচন্দ্রাকৃতির কৃষ্ণ রেখা ফুটে উঠলো। রেখাটি ক্রমশঃ গুঞ্জন তুলে কালো জলের রূপালী স্রোতের মতো ধেয়ে আসছে। গোলাম রসুলের সারা শরীর রোমাঞ্চিত হয়ে উঠলো। গুঞ্জনটা মাথায় উপরে আসতেই মনে হলো শত-সহস্র এস্রাজের আরোহ, অবরোহ! দেখতে দেখতে সুরের সহস্র রাগিনী বাজিয়ে চলে গেলো বিহঙ্গ দল। অযাচিত সুখপ্রাপ্তির এমন বিচ্ছেদ ঘটবে গোলাম রসুল মুহূর্ত আগেও ভাবেন নি। মনে আবারও শূন্যতার হাহাকার। তবু লক্ষ্যহীন দৃষ্টি দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন। শিথিল হয়ে যাওয়া গ্রন্থি মাথার ভার সইতে পারছিল না, টন্‌ টন্‌ করে উঠলো। বাইরের শত্রুর সঙ্গে দেহশত্রুও যুগলবন্দী হচ্ছে। গ্রন্থি, মজ্জা, ত্বক, দন্ত, চুল-দাড়ি সে-ই দেড় দশক ধরেই তো জরার জরুতে পরিণত হয়েছে।
এক রাশ হতাশা নিয়ে গোলাম রসুল ঘরে ঢুকলেন। কেমন যেন ভূমিকম্পের মতো একটা ধাক্কা লাগছে। মেঝে, দেয়াল, ছাদ সব কিছু যেন নাগর দোলায় দুলছে। গোলাম রসুল আর স্থির থাকতে পারলেন না। ঘূর্ণির সঙ্গে সঙ্গে সব কিছু অন্ধকার হয়ে আসছে, মাঝে মাঝে জোনাকির মতো কী যেন জ্বলছে, কানে ঝিঁঝিঁর শব্দ। তাহলে কী জীবনের মাধ্যাকর্ষণের বিযুক্তি ঘটতে চলেছে? প্রচণ্ড ঘূর্ণির মধ্যেও গোলাম রসুল হুঁস হারান নি। সজ্ঞানে বিদায়ের এমন রাগিনী কেউ কি শুনতে পায়? এবার তিনি আত্মরক্ষার শেষ চেষ্টা করলেন। ধীরে ধীরে মাটিতে বসে হাত পা মেলে সটান মেঝেতে শুয়ে পড়লেন। ঘুরছে সব কিছু। কতক্ষণ মনে নেই। এক সময় মাথাটা ঝাঁ করে উঠলো। চোখের অন্ধকার অপসৃত হলো। তিনি দেখলেন সব কিছু থির থির করে কাঁপতে কাঁপতে এক সময় স্থির হয়ে গেলো। বাম হাতটা ভারি ভারি মনে হচ্ছে। ডান পায়েও জোর নেই। মুখের ডান কোনা বেয়ে লালা লাগছে! গোলাম রসুল ভয় পেয়ে গেলেন। এবার প্রাণ-পণ চেষ্টা করে শোয়া থেকে উঠে বসলেন। দুরু দুরু বুকে দাঁড়াবার চেষ্টা করলেন। দেয়াল ধরে উঠে দাঁড়ালেন। বাম হাতটা উপরের দিকে তোলার চেষ্টা করলেন। ভয়ে পারলেন না। এবার ডান পা সামনের দিকে বাড়াতে চাইলেন। তাও পারলেন না। তাহলে কী তিনি পক্ষঘাতে... কথা ভাবতেই সমস্ত শরীর ঘামতে শুরু করলো। না, মৃত্যু ভয় নয়। অথর্ব, অচল, গলগ্রহ, করুণা-অবহেলার পাত্র হবার ভয়! দিনে দিনে যে ব্যক্তির গ্রহণযোগ্যতা নিজ পরিবারে শূন্যের দিকে, তার তো এমনিতেও বেঁচে থাকা দায়, সে সঙ্গে যদি পঙ্গুত্ব বরণ করেন? না, না, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত গোলাম রসুল এক মুহূর্তের জন্যও কারো অবহেলার পাত্র হতে চান না। মৃত্যু আসবে ধূমকেতুর মতো। কেউ বোঝার আগেই আতশবাজির মতো পুড়িয়ে ছাই করে অদৃশ্য হয়ে যাবে। এমন মহাপ্রাণ বরেণ্য মৃত্যু তাঁর চাই।
গত তিন দিন ধরে প্রেসারের ঔষধ খাচ্ছেন না। ফুরিয়ে গেছে। বড় ছেলে সোবাহানকে বলেছিলেন। রাত্রে বাসায় ফিরলে ছেলের কাছে হাত পাতলেন। বিরক্তির সুরে বলল, ‘এত ঝক্কি ঝামেলার মধ্যে মনে থাকে? ভুলে গেছি। অন্য কাউকে দিয়ে আনতে পারলে না?’
অন্য কেউ কে? সুজা? নকীব? রোজ পকেট হাতড়ায়। ওদের জন্যই তো এই দশা। পেনশনের যে ক’টা টাকা ঔষধ আর হাতখরচের জন্য এখানে ওখানে গুঁজে রাখেন, নেংটি ইঁদুরের মতো তাও খুঁজে বের করে ফেলে। গ্রামের বাড়ী যাবেন বলে মাসের ঔষধ না কিনে কিছু টাকা রেখেছিলেন। মাস ফুরাতে আরও ষোল দিন বাকী! হাতে টাকা নেই এ কথা কেউ মানবে? খোদেজা পারলে পেনশনের গোটা টাকাই রেখে দেয়। বলে, ‘ঘরকুনো মানুষের পয়সার দরকার কী! কত লোকই তো অবসরের পর টুক-টাক চাকরী-বাকরী করে সংসারে দু’টো পয়সা জোগান দেয়, তোমাকে বলে কী হবে।’
ডাক্তারের কড়া নির্দেশ, ব্লাড পেসারের ঔষধ রোজই খেতে হবে। ঔষধের খরা। দোকানে স্টক ছিল না। বিনা ঔষধে তিন তিনটা দিন যাচ্ছে। এই চক্কর, মাথার ব্রহ্ম তালুতে সূর্যের তাপ, কী করে সামলাবেন গোলাম রসুল? উদভ্রান্তের মতো বিছানার চাঁদর, বেড, বালিশ উল্টে-পাল্টে, ড্রয়ার খুলে, পুরানো খবরে কাগজের ভাঁজে ভাঁজে ক্ষেপার মতো খুঁজে চলেছেন! না, কিছুই নেই। একটা ফুটো কড়িও বাচ্চারা রাখেনি। ওয়ার্ডরোবের উপর থেকে ঔষধের টিনটা নিয়ে ঢাকনা খুলে দেখেন, নানান ঔষধের উচ্ছিষ্ট স্ট্রিপ, টেবলেট। পাতি পাতি করে খুঁজলেন, যদি কোনো স্ট্রিপে একটি বড়ি লুকিয়ে থাকে। না। পেলেন না। এবার খোজেদার টিনটা দেখলেন। নিদেন পক্ষে একটা ভেলিয়াম, কী পাওয়া যাবে না? এ বাসায় তো ঘুমের বড়ি নেশার মতো সেবন করা হয়। অভাগার দৃষ্টিতে এখন মহাসাগরেও শুধু চরের পর চর। হতাশা আরো বেড়ে গেলো। হতশ্রী অন্ধকারে কিছুই খুঁজে পাবার কী যো আছে? সে-ই সকালে বিদ্যুৎ গেছে।
হঠাৎ সমস্ত ঘর চমকে আলোকিত হয়ে উঠলো। দেয়াল ঘড়িটার দিকে চোখ পড়তেই গোলাম রসুলের পেটের ক্ষিদে মাথায় চড়ে বসলো। পাঁচটা দশ! সে-ই সকালে, আটটায় বাসি ভাজি দিয়ে দু’খানা আটার রুটি খেয়েছিলেন। ক্ষুধার তীব্রতা এখন প্রচণ্ড। এখনই কিছু মুখে দিতে না পারলে শুরু হবে পেপটিক আলসারের তীব্র কামড়। গোলাম রসুল ক্ষেপার মতো রান্না ঘরে ঢুকে হাঁড়ি-পাতিল উল্টাতে লাগলেন। কড়াইয়ের তলাতে সে-ই বাসি কিছু ভাজি আর ভাতের হাঁড়িতে রাত্রের সামান্য উচ্ছিষ্ট ভাত পানির মধ্যে ডুব-সাঁতার খেলছে। তবু নাকের কাছে নিয়ে দেখলেন, বিশ্রী গন্ধে বমির উদ্রেক হলো। গোলাম রসুল এবার মিটসেফ খুলে দেখলেন। বিস্কুটের টিন, মুড়ির টিন, না, কিছুই নেই। ফ্রিজের দিকে তাকাতেই মনের মধ্যে একটা ক্ষীণ আশা জাগলো। হয়ত খাবারগুলো ভালো থাকার জন্য ববিতা, কবিতা ওখানে রেখে গেছে। ফ্রিজের হাতল ধরে টান দিতেই বুঝতে পারলেন, লক্‌ড। ঘরে কাজের লোক বা বাইরের তো কেউ নেই। তারপরও বন্ধ? গোলাম রসূলের উপর কারো কোনো আস্থাই নেই? গভীর হতাশায় গোলাম রসুল বারান্দার মেঝেয় বসে পড়লেন। দীর্ঘ চল্লিশ বছর এই সংসারকে তিল তিল করে নিজের পরিশ্রমের সবটুকু অর্জন ঢেলে দিয়েছেন। নয় ছেলেমেয়ে, স্ত্রী, পরিজন, বেশী হোক, কম হোক সবাই তো তার শ্রমের অর্জন খেয়ে শরীর মন বৃদ্ধি করেছে। দু’ছেলে বিদেশে, দু’মেয়েও। এক ছেলে বৌ-সংসার নিয়ে এখনো বাপের কাঁধে। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার নামে দু’ছেলে দু’মেয়ের অত্যাচারে গোলাম রসুলের জীবন এখন ধরতে গেলে বিপন্ন। টাকা-পয়সা তো রাখতে পারেনই না, তাঁর পরনের শার্ট-পাঞ্জাবীগুলো পর্যন্ত বেছে বেছে নিয়ে যাচ্ছে। খোদেজার লাই না পেলে ছেলেমেয়েরা কখনোই এমন বেপরোয়া হয়ে উঠতো না। প্রবাসী দু’ছেলে তো চিঠিপত্র দেয়া দূরে থাক, ফোনেও কথা বলে না। জন্মদানের অপরাধের শাস্তি? নিজের এ-ই দুর্ভাগ্যের কথা ভাবতে ভাবতে গোলাম রসুল ক্ষুধা, তৃষ্ণা, পেপটিক আলসারের ব্যথা ভুলে গেলেন। ধীরে ধীরে বিছানায় উঠে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন। নিজের অজান্তেই চোখের কোনা ভিজে উঠলো।
দরজায় বার বার শব্দ হচ্ছে। মাথা তুলে চারিদিকে তাকিয়ে দেখলেন, ঘুট ঘুটে অন্ধকার। বিদ্যুৎ নেই। দরজার কড়া নাড়ার শব্দ ক্রমশঃ অসহ্য হয়ে উঠছে। এবার শব্দের সঙ্গে কোরাস, ‘খালুজান, খালুজান! দরজা খোলেন’। গোলাম রসুলের সম্বিত ফিরে আসে। ধীরে ধীরে উঠে অন্ধকার হাতড়িয়ে দরজার দিকে যেতে যেতে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কে রে?’
বাইরে থেকে কোরাসে হাসির শব্দের সঙ্গে সংলাপ, ‘খালুজান মোগো গলা বুঝেন নাই?’
দরজা খুলতেই ববিতা কবিতা ঘরে পা দিয়ে আর্তনাদ করে উঠলো, ‘হায় আল্লাহ! কেমুন ঘুট ঘুইট্টা আঁনধার। কী খালুজান বাতিটাও জ্বালাইতে পারেন নাই?’
ববিতার এমন বেয়াড়া প্রশ্নের জবাব কবিতাই দিল, ‘তোর যেমুন আক্কেল? কারেন্ট আছেনি যে খালু বাতি জ্বালাইবেন?’
‘হ, কবিতা হাছাইত কইলি, কখন থেইক্কা বেল টেপতাছি। বাজে না। খালুজান, ঘরে মোম নাই?’
আবারও কবিতা ঝামটা মারল, ‘খালুজানরে জিগাছ কিল্লাই, তুই রান্না ঘরের কোন কোণায় হান্দাইছস খালু জানবেন কেমনে, যা, হাতাইয়া হাতাইয়া জ্বালাইয়া আন’।
মোম জ্বালানো হলো। ববিতা-কবিতা বিগ সাইজের দুটো টিফিন ক্যারিয়ার সঙ্গে নিয়ে এসেছে।
‘কবিতা তড়া কর, খালা কইছে ফ্রিজে ঢুকাই রাইখতে।’
কবিতা ফ্রিজের হাতল টেনে চিৎকার দিয়ে উঠে, ‘ওরে হারামী, ফ্রিজ যে বাঁন্দা।’
গোলাম রসুলের চতুর্দিক যেন ক্রমশঃ অন্ধকার হয়ে আসছে। হঠাৎ বিদ্যুৎ এসে গেলো। গোলাম রসুল আবার বিছানা পত্র, সার্ট, প্যান্টের পকেট হাতড়াতে লাগলেন। বৃথা। কিছুই নেই।
‘খালুজান,’ পিছনে ডাক শুনে গোলাম রসূল চমকে উঠলেন, ফিরে দেখেন ববিতা, ‘কিরে ববিতা?’
‘খালুজান, আপনে কিছু খাইছেন?’
গোলাম রসুল নিরুত্তর। ববিতা অপরাধবোধে আক্রান্ত। ক্ষীণ কণ্ঠ বলল, ‘খালাম্মা, কবিতারে এক কাপ চাউল ফুডাইয়া রাইখতে কইছিল, হারামী ভুইল্যা গেছে, আমারে কইছিল, ফ্রিজতন তরকারির পাতিলগুলান চুলায় রাইখা যাইতে। খালায় ফ্রিজে লক মাইরা গেছে গা।’
চোরের মতো পা ফেলে কবিতা পাশে এসে দাঁড়ালো, ‘খালুজান, বিয়ে বাড়িরতন টিপ্পা টিপ্পা বিরানী ভাত ভরি আনছি, এহনো গরম আছে, টেবিলে পানি বাসান দিছি, গরম গরম চারটা খাইয়া নেন!’
‘ববিতা-কবিতা, তোমরা তো জান, আমার আলসার রোগ আছে, আমি কোর্মা পোলাও বিরানী খেতে পারি না। বড়লোক বাড়ীর বিয়ের উচ্ছিষ্ট আজকাল ফকির মিছকিন, কুকুর বেড়ালে পায় না, টিফিন কেরিয়ার ভরে চালান যায়, ডিপ ফ্রিজে ঢোকে। বরফের চাক হয়ে থাকে। তারপর সেই চাক্‌ ভেঙ্গে ভেঙ্গে খায়! হায়রে মানুষ।’
‘খালুজান ভাত ফুটাইয়া দি? তয় খাইবেন কি দিয়া? হ একটা ডিম বাইরে আছে।’
আবার বিদ্যুৎ চলে গেল।
গোলাম রসূলের মাথাটা ক্রমশঃ ভারি হয়ে উঠলো। ব্লাড প্রেসারের মেশিনটা বের করে নিজে নিজে বাহুতে জড়ানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে চলেছেন। ববিতা-কবিতা ভয়ে জড়োসড়ো। তারা দু’জনই মোম নিয়ে গোলাম রসুলের সামনে নির্বাক দাঁড়িয়ে।
‘কীরে অমন চুপ করে আছিস কেন, কিছু বলবি?’
‘খালুজান, আমাগো মেলা ভুল হইয়া গ্যাছে’, কবিতা কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে কথাগুলো বলে আবার নীরব হয়ে গেলো।
‘তোরা পরের মেয়ে, হকুমের চাকর, তোদের ভুল হবে কেন? ভুলতো আমার। পোষা কুকুরের মতো মুখবুঁজে সব কিছু সহ্য করার এটাই তো শাস্তি। হ্যাঁরে, তোদের বিবিসাবরা কোথায়?’
এবার কবিতা বলে উঠে, ‘খালু, মেলা খাওন বাইচ্চা গেছে। রাতের খাওন খাইয়া তবে আইবো। দেহেন না, দুই টেফিন কেরিয়ার টিপ্পা টিপ্পা ভইরা নিয়া আইচি।’
না, গোলাম রসুল পেপটিক আলসারের ব্যথা আর সইতে পারছেন না। বাম হাতে তলপেটের চামড়া চেপে ধরে ব্লাড প্রেসারের মেশিনটা বিছানায় রাখতেই কবিতা হাত বাড়িয়ে বলল, ‘খালুজান, নিজে নিজে পারবেন না, দ্যান।’
তীব্র ব্যথার মধ্যেও গোলাম রসুলের চেহারা হঠাৎ উজ্জ্বল হয়ে উঠে, ‘তুই পারবি?’
কবিতা সোৎসাহে বলল, ‘হিকাই দিলে পারুম। ছোট আপা মোরে হিকাই দিব? উনি দেহি আইজ কাইল আপনার ধারে কাছে আহে না।’
পাঁচ কাঠার এই বাড়ী এখন গোলাম রসুলের গলায় কাঁটা। ওরা জোট বেঁধেছে, জমি চাই, বহুতল ভবন চাই। তাই বুঝি ভাতে-পানিতে মারা শুরু। ববিতা-কবিতার চোখ-মুখ ঘুমে ঢুলু ঢুলু, ওরা ভিতরে চলে গেলো। তলপেট থেকে বুক পর্যন্ত এসিডের কুণ্ডলী, কী করবেন? ঢক ঢক করে এক গ্লাস জল গিলে ফেললেন। হঠাৎ ক্ষীণ একটা আলার আলো দেখা গেলো। হ্যাঁ কবিতা। কবিতার কাছে ধার চাওয়া যায়। গত মাসে সে বাড়ীতে টাকা পাঠাতে পারে নি। পোড় খাওয়া শক্ত মেয়ে। মুখরা হলেও দরদী, গোলাম রসুল দ্বিধান্বিত কণ্ঠে ডাক দিলেন, ‘কবিতা, কবিতা!’
তন্দ্রালু কবিতা জড়িত কণ্ঠে জবাব দিল, ‘বলেন খালুজান।’
‘কবিতা, একটু এদিকে আসবি?’ গোলাম রসুলের এমন আহ্বান শুনে কবিতার সমগ্র শরীরে মৃদু একটা ভূ-কম্পন সৃষ্টি হলো। ধড়ফড় করে বিছানা থেকে উঠে বসলো।
‘ঘুট ঘুইট্যা আনধারের মধ্যে বুইড়া ডাক পারে ক্যান! মতলব?’
‘কবিতা!’
‘হ, শোনতাছি! কী কইবেন ঐ খান থেইক্যাই কন,’ কবিতা ধীরে ধীরে রুঢ়, প্রতিবাদী ও সতর্ক হয়ে উঠে।
এ রকম এক আলো-আঁধারি পরিবেশে সে-ই দাড়িঅলা বুড়ো ডাক্তার একা ঘরের মধ্যে মা মেয়ে ডেকে তার সর্বনাশ করতে চেয়েছিল। শক্তিতে বুড়া পারে নাই। সে-ই রাতেই বাড্ডা থেকে পালিয়ে কবিতা সারারাত কমলাপুর রেলস্টেশনে কাটিয়েছিল। আর গার্মেন্টস্‌ কারখানার ছোট সাব? ভাবলে সারা শরীর কাঁটা দিয়ে উঠে। এখনও বাম গালে কামড়ের দাগ আছে। গোলাম রসুল অনেকটা নির্জীব কণ্ঠে বললেন, ‘না থাক, পরে বলব!’
কবিতা শ্লেষের সঙ্গে বলল, ‘পরে কেন, এহনও মোরা ঘুমাই নাই, ঘুমাইলে...।’ পরের বিশ্রী শব্দগুলো কবিতা স্বগতোক্তির মতো বলল।
তার মাথায় রক্ত চড়ে গেছে। অন্ধকারে হাতড়িয়ে কিছু এটা হাতিয়ার খোঁজে। চোখে তন্দ্রার লেশমাত্র আর নেই, ‘হগল হারামি বেডাই একরকম! ছুঁড়ি দেখলেই আশ্বিন মাইস্যা পাগলা কুত্তার লাহান পিছু নেয়। এই বাসার বেডাগুলোর লাজ লজ্জা আছে বইলা মনে হইতো, সব শিয়ালের এক রা! আইজ ছাড়ুম না। এই ষোল বছর বয়সে কত কুত্তার কামড় খাইছি, আইজ কিচ্ছু হইলে খুনি হমু।’ এই বলে বাঁটিটা দু’হাতে শক্ত করে ধরলো এবং শ্লেষ দিয়ে আবারও বলল, ‘কি খালুজান, চুপ মাইরা গেলেন যে?’
গোলাম রসুল তীব্র ব্যথাকে চেপে অস্পষ্ট কণ্ঠে বলল, ‘না থাক মা, বড় লজ্জা।’
কবিতা এবার কেউটের মতো ফোঁস করে ফণা তুলে বলল, ‘এতো রাইতে আমারে লজ্জার কথা কইবেন ক্যান?’
‘ঠিক বলছিস মা, স্ত্রী-পুত্র-কন্যা যার বাঁচা-মরার খবর রাখে না, তুই তো পরের মেয়ে, কোনো অধিকারে লাজ-লজ্জা, বাঁচা-মরার কথা বলব?’
গেলাম রসুলের ব্যথিত কণ্ঠের কান্নার ধ্বনির মতো করুণ আর্তি কবিতাকে ভাবিয়ে তুলল। মুহূর্তের মধ্যে তার মনের সন্দেহ ও ঘৃণার পর্দা অপসারিত হয়ে গেলো। তার চোখের সামনে ভেসে উঠলো, মেঘনা পারের নদী-ভাঙ্গা চরভৈরবী গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলের এক পর্ণ কুটিরে তার রোগাক্রান্ত চলচ্ছক্তিহীন পিতার অসহায় ক্লিষ্ট মুখচ্ছবি! সমস্ত দ্বিধা-দ্বন্দ্ব, ভয়ভীতি ঝেড়ে ফেলে দিয়ে কবিতা দৌড়ে গোলাম রসুলের বিছানার পাশে এসে পায়ের দিকে বসল এবং পায়ের পাতায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল, ‘খালুজান, চরভৈরবী গেরামে আমার বাপ, আর তেজকুনী পাড়ার এই বাপে কোনো ফারাক নাই, আপনি হকল কথা কন, মুই হুনুম।’
গোলাম রসুল শোয়া থেকে উঠতেই বিদ্যুতের আলো এসে গোটা ঘর আলোকিত করে দিল। কবিতার মাথায় স্বস্নেহে একটি হাত রেখে কোমল কণ্ঠে বললেন, ‘মা, এ সংসারে কেউ আমাকে আর চায় না, ওরা চায় এই পাঁচ কাঠা জমি। আমার জীবন থেকে ভালোবাসা-আদর তো আমার চাকুরির অবসরের এক বছরের মধ্যে বিদায় নিয়ে গেছে। এখন আমি সবার কাছে বোঝা। একটা মানুষ একা ঘরে পড়ে আছে, এটা কি ওরা জানে না? জানে। আজ তিন দিন ধরে ঔষধ খেতে পারছি না।’
গোলাম রসুল চুপ হয়ে গেলেন। কবিতার যেন ঘোর কাটে না, এও কী সম্ভব? এ-ই ঘরে এতো কিছু, এতো মানুষ, সবাই তো আনন্দ, স্ফূর্তিতে আছে, কিন্তু এই মানুষটা এতো একা কেন? সকলের পেছনেই এই মানুষটা আছে অথচ এই মানুষটার পেছনে কেউ নেই কেন? কবিতা আচ্ছন্নতা কাটিয়ে প্রশ্ন করে, ‘কেন ঔষধ খাইতে পারেন নাই খালু?’
গোলাম রসূল লজ্জায়, অপমানে অধোবদন হয়ে বললেন, ‘আমার কাছে যে একটা পয়সাও নেই মা!’
বজ্রের মতো জ্বলে উঠলো কবিতা, প্রচণ্ড শক্তি ও আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলল, ‘মুই! মুই আপনারে ঠেহা দিমু। মোর কাছে আপনের কিসের লজ্জা!’
‘দে মা দে, আমার আর না বলার শক্তি নাই, তোর কাছ থেকেই নেব। আগামী মাসে পেনশনের টাকা পেলে প্রথমেই তোর টাকা দিয়ে দেবো!’
কবিতা এখন বাকরুদ্ধ, চোখের পর্দায় চর-ভৈরবীর সাজু মিয়া, কবিতার পিতার করুণ ছবি। কবিতা বিদ্যুৎ গতিতে রান্না ঘরের কার্নিসে রক্ষিত তার ছোট টিনের বাঙটা এনে ছোট্ট তালাটা খুলে কাপড়ের ভাঁজ হতে একটা পাঁচশত টাকা নোট বের করে গোলাম রসুলের পাঞ্জাবীর পকেটে ঢুকিয়ে দিয়ে বলল, ‘খালু, জামা গায়ে দিয়া জলদি ওষুধ আনতে যান, আপনে মোর বাপ। মোর বাপেরে এমুন ভাবে মরতে দিমু না!’
গোলাম রসুল পাঞ্জাবীটা হাতে নিয়ে স্থানুর মতো দাঁড়িয়ে রইলেন, তাঁর দু’চোখে শ্রাবণের ধারা।
চরভৈরবীর সাজু মিঞা কখন যে তেজকুনি পাড়ার এ বাড়ীতে বসত গাড়লেন কবিতা বুঝতেই পারে নি।