জাতীয়তাবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ও জনগণের মুক্তি

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরি

[ পূর্ব প্রকাশিতের পর ]

দেশভাগের দায়দায়িত্ব

ভারতবর্ষকে যে হিন্দুস্থান পাকিস্তানে ভাগ করে সকল মানুষের স্থায়ী ক্ষতি, এবং বহুমানুষের সমূহ সর্বনাশের ব্যবস্থা করা হয়েছিল তার দায়ভাগ কাজটা যাঁরা করেছেন তাঁদের তুলনায় ভুক্তভোগীদেরকেই বহু শত গুণ বেশী পরিমাণে বহন করতে হয়েছে। কর্তাব্যক্তিরা দায়ভাগ তেমন বহন করেন নি, ভান করেছেন দায়িত্বপালনের, কোনো কাঠগড়ায় তাঁদেরকে দাঁড়াতে হয় নি, তবে ইতিহাস যে তাঁদেরকে ক্ষমা করবে না এটা স্থির নিশ্চিত।
এই কর্তাব্যক্তিরা কারা? তারা তিন দলে বিভক্ত, কিন্তু তিন দল আবার একদলও বটে। তিনটি স্বতন্ত্র দলকে আমরা অবশ্যই চিনি। একদিকে কংগ্রেস, অপরদিকে মুসলিম লীগ, পেছনে হাস্যরত অন্তর্যামীর মতো শাসক ব্রিটিশ। কংগ্রেস প্রথমে বলেছে ভারতবর্ষীয়রা এক জাতি, কাজেই ভারতবর্ষকে অখণ্ড রাখতে হবে, ভাগ করা চলবে না; পরে অবশ্য তারা হিন্দুস্থান পাকিস্তান দ্বিখণ্ডিকরণ মেনে নিয়েছে, কেবল যে মেনে নিয়েছে তা নয়, কংগ্রেসের ভেতরকার দক্ষিণপন্থী অংশ, যাদেরকে ছদ্মবেশী হিন্দুমহাসভাপন্থী বলাটা অন্যায্য নয়, তারা অস্থির হয়ে পড়েছিল নিজেদের ভাগটা বুঝে নেবার জন্য। অপরদিকে মুসলিম লীগ প্রথমে নিজেদের জন্য স্বতন্ত্র ব্যবস্থার দাবী দিয়ে শুরু করেছে কিন্তু ১৯৪০এর পর থেকে স্বতন্ত্র বাসভূমির চাহিদার কথাটাকে ক্রমান্বয়ে তীব্র করে তুলেছে, এবং শেষ পর্যন্ত হিন্দুস্তান পাকিস্তান ভাগাভাগি চেয়েছে। অবশ্য এটা তাদের দূরবর্তী কল্পনার মধ্যেই ছিল না যে, পাকিস্তান কায়েম করতে গেলে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমদেরকে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রদেশ বাংলা ও পাঞ্জাবের অর্ধেকটা হিন্দুস্থানের হাতে তুলে দিতে হবে। কংগ্রেসের নেতারা অনেকেই বয়সবৃদ্ধি ও ক্রমাগত কারাভাগের দরুন ক্লান্ত ও বিরক্ত হয়ে পড়ছিলেন, ক্ষমতা নাগালের কাছে এসেও হস্তগত হচ্ছে না এই বোধটা তাঁদের অসহিষ্ণুতা বৃদ্ধি করছিল, তাঁদের অনেকেই বিশ্বাস করতেন পাকিস্তান জিনিসটা সাময়িকমাত্র, টিকবে না, অচিরেই ভারতীয় ইউনিয়নের অংশ হয়ে যাবে, কারো কারো-যেমন সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের বক্তব্য ছিল, ুওঃ ধিং নবঃঃবৎ ঃড় যধাব ড়হব পষবধহ ভরমযঃ ধহফ ঃযবহ ংবঢ়ধৎধঃব ঃযধহ যধাব নরপশবৎরহম বাবৎুফধুচ,৬২৫ নেহেরুর ব্যক্তিগত বন্ধু কৃষ্ণ মেনন মনে করতেন পাকিস্তান দাবী মেনে নিয়ে জিন্নাহর বিরক্তিকর হাত থেকে চিরতরে অব্যাহতি লাভই বাঞ্ছনীয় বটে।৬২৬
দেশভাগের প্রয়োজনীয়তার ব্যাপারে হিন্দু মহাসভা ছিল মুসলিম লীগের চেয়েও অধিক স্থিরনিশ্চিত। তাদের নেতা বীর সাভারকার জিন্নাহর আগেই দ্বিজাতিতত্ত্বের তপ্ত মন্ত্র উচ্চারণ করেছিলেন। তাঁর মতে ভারত হচ্ছে হিন্দুর দেশ, মুসলমানরা এখানে বসবাস করে বলেই যে পূর্ণ নাগরিক অধিকার পাবার যোগ্য হয়ে গেছে তা নয়। সাভারকারের বিশিষ্ট সহযোগী শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় একজন খাঁটি বাঙালী ছিলেন, ছোটলাটের ভোজসভাতে তিনি ধুতি পরে উপস্থিত হতে পছন্দ করতেন, কিন্তু তিনি আবার নিজেকে হিন্দু হিসাবেও জানতেন, যে জন্য তিনি দেশ ভাগ হবে কি হবে না নিয়ে সংশয় দেখা দিলে প্রবল কণ্ঠে ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, ভারতবর্ষ অখণ্ড থাকলেও বাংলাকে অবশ্যই দু’টুকরো করতে হবে, কেননা পশ্চিমবঙ্গের সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুরা পূর্ববঙ্গের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের আধিপত্য মানবে না। দু’টুকরো হলে পূর্ববঙ্গের হিন্দুদের অবস্থাটা কী দাঁড়াবে সে নিয়ে অবশ্য তাঁর কোনো দুশ্চিন্তা ছিল না, যেমন জিন্নাহর দুশ্চিন্তা ছিল না হিন্দুস্থানে রয়ে-যাওয়া পাকিস্তানীদের (অর্থাৎ মুসলমানদের) সম্ভাব্য দুর্দশা বিষয়ে। পারস্পরিক বৈরী চিন্তার অধিকারীদের এই ধরনের আশ্চর্য মিলন অস্বাভাবিক নয়; এর মূল রহস্য অবশ্য নিহিত রয়েছে এই সত্যে যে, উভয়পক্ষই ছিলেন আত্মস্বার্থ চিন্তায় নিমগ্ন, জনগণের স্বার্থ তাঁরা দেখেও দেখেন নি, যদিও নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ প্রতিষ্ঠায় জনগণকে ব্যবহার করবার ব্যাপারে তাঁদের ব্যস্ততার কোনো অবধি ছিল না। দেশভাগের ব্যাপারে হিন্দু মহাসভাকে কংগ্রেস থেকে আলাদা করে দেখাটা অপ্রয়োজনীয়, কেননা কংগ্রেসের ভেতরেই হিন্দু মহাসভাপন্থীদের বিস্তর উপস্থিতি ছিল; সেখানে উদারনীতিকেরাই বরঞ্চ কোণঠাসা হতেন। হাইকমান্ড দক্ষিণপন্থীদের দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত হতো। ওই তিন পক্ষ-কংগ্রেস, লীগ এবং ব্রিটিশ সরকার-আবার একপক্ষও বটে; কেননা তারা সবাই জনস্বার্থ-বিরোধী। তিন পক্ষেরই অভিন্ন ভীতি ছিল সামাজিক বিপ্লবকে, যে জন্য নিজেদের মধ্যে বিরোধ থাকা সত্ত্বেও তাঁরা অকপটে অবিশ্বাস করতেন কমিউনিস্টদেরকে।
দেশভাগের জন্য মুসলিম লীগকেই অধিক পরিমাণে দায়ী করার রেওয়াজ রয়েছে, কিন্তু কংগ্রেসের দায়িত্বটা মোটেই কম ছিল না। আর পেছনে ছিল ব্রিটিশ শাসকেরা। আসল কলকাঠি তারাই নাড়ছিল। পরাধীন ভারতবর্ষে জনগণের মুক্তির পথে বড় অন্তরায় ছিল তিনটি, শ্রেণী, জাতি ও পরাধীনতা। পরাধীনতাটা ছিল সর্বাগ্রগণ্য ও সর্বজনীন, শ্রেণী ও জাতি নির্বিশেষে সকলের জন্যই পরাধীনতা ছিল সত্য। সাধারণ মানুষ আটকা পড়ে ছিল শ্রেণীর প্রাথমিক বন্ধনে, কিন্তু তারা আবার জাতিগত ভাবেও পীড়িত ছিল, বিজাতীয় ব্রিটিশ তাদেরকে শোষণ ও শাসন করছিল। ওই শাসকদের বিতাড়িত করতে না পারলে অন্য দুই সমস্যার অর্থাৎ জাতিগত ও শ্রেণীগত নিপীড়নের সমস্যার সমাধান সম্ভব ছিল না। প্রধান দ্বন্দ্বটা তাই ছিল সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গেই। কিন্তু বাস্তবিক সত্য ছিল এটিও যে, ভারতবর্ষ কখনোই একজাতির দেশ ছিল না। সাম্রাজ্যবাদী শাসকেরা তাদেরকে একসাথে শোষণ-শাসন করতো, যে জন্য অখণ্ড ভারতের ধারণা, এবং আর্থ-প্রশাসনিক ক্ষেত্রে একটি সর্বভারতীয় বাস্তবতাও তৈরী করে নিয়েছিল। সাম্রাজ্যবাদী নিপীড়ন ও জাতীয় নিপীড়ন তাই অভিন্ন হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু জনগণের মুক্তির জন্য বিভিন্ন জাতিসত্তার মুক্তিও আবশ্যক ছিল বৈকি। কেননা জাতিগত সত্তার সঙ্গে একটি জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি অবিচ্ছিন্নভাবে মিশে থাকে, এবং অর্থনৈতিক মুক্তির সঙ্গে সঙ্গে সাংস্কৃতিক মুক্তিরও দরকার পড়ে, কেবল অর্থনৈতিক মুক্তি মানুষকে পরিপূর্ণরূপে মানবিক এবং মুক্ত করে না।
ব্রিটিশ শাসকেরা শ্রেণী অভ্যুত্থানকে ভয় পেতো। ১৮৫৭এর জনঅভ্যুত্থান তাদেরকে এটা শিখিয়েছিল যে, ওই অভ্যুত্থানে সেদিনকার মধ্যবিত্ত যোগ দেয় নি বলেই অভ্যুত্থানটি সামাজিক বিপ্লবের আকার ধারণ করে নি। মধ্যবিত্ত অবশ্য তখন সবে গড়ে উঠেছে; তবে শিক্ষা, পেশা ও ব্যবসার মধ্য দিয়ে তারা যে আরো বিকশিত হবে সেটা তো নিশ্চিত ছিল, এবং শাসকেরা তাদের নিজেদের কাজকর্মের সুবিধার জন্য এই বিকাশকে উৎসাহিতও করছিল। এই মধ্যবিত্ত শ্রেণী যদি সাধারণ মানুষের সঙ্গে কোনো এক ভবিষ্যতে হাত মিলিয়ে ফেলে তাহলে তো বিপর্যয় আর ঠেকানো যাবে না, ফরাসী বিপ্লবের মতো একটা সামাজিক বিপ্লবই ঘটে যাবে, এবং তখন সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখা দুঃসাধ্য হয়ে পড়বে, এই রকমের একটা আশঙ্কা থেকেই সাম্রাজ্যবাদী শাসকেরা নিজেরাই উদ্যোগ নিয়ে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস গঠন করে দিয়েছিল, যাতে সাধারণ মানুষের সঙ্গে মধ্যবিত্তের বিচ্ছিন্নতাটা শক্ত হয়। কিন্তু পরে দেখা গেলো তাতে কাজ হচ্ছে না। ওই মধ্যবিত্তের মধ্যেই ব্রিটিশবিরোধী বিক্ষোভ চাড়া দিয়ে উঠতে চাইছে। তখন তাদের মাথায় এলো নতুন চিন্তা, কি করে এই শ্রেণীর একাংশকে অপর অংশের বিরুদ্ধে সার্বক্ষণিকভাবে লাগিয়ে রাখা যায়।
লর্ড কার্জন তো স্পষ্ট করেই ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, বাঙালীরা নিজেদেরকে একটি জাতি বলে ভাবে এবং এই সেই দিনের সুখ স্বপ্ন দেখে যেদিন ইংরেজদেরকে তাড়িয়ে দিয়ে একজন বাঙালীবাবু কলকাতার লাটভবনে স্থাপিত হবে। বলা বাহুল্য এই স্বপ্ন ভেঙে দেওয়াটাই ছিল কার্জনদের প্রধান উদ্দেশ্য, যার জন্য ১৯০৫এর বঙ্গভঙ্গের আয়োজন করা হয়েছিল। আশা করা হয়েছিল যে, এতে করে বাঙালী ‘জাতি’ ভেঙ্গে দু’টুকরো হবে এবং জাতীয়তাবাদের জায়গায় সামপ্রদায়িকতা দেখা দেবে। বাঙালীরা (অর্থাৎ বাঙালী মধ্যবিত্তরা) নিজেদেরকে জাতি বলে ভাবছিল; এর পরে পাঞ্জাবী, মারাঠী, পাঠান ইত্যাদিরাও ওই ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ হতে শুরু করবে এমন আশঙ্কাও ছিল। ফলে ইংরেজের পক্ষে শান্তিতে থাকাটা কঠিন হবে। তাই মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ওপর নির্ভর না করে ওই শ্রেণীকে সামপ্রদায়িকতার অস্ত্রের সাহায্যে দু’ভাগ করাটাই ছিল নতুন সিদ্ধান্ত।
কিন্তু বাংলায় গোলযোগ দেখা দিল। আন্দোলন হলো। তাই ভাগাভাগিটাকে ওই রকম ভাবে, অর্থাৎ কেবল ভৌগোলিক ও স্থানীয় না-করে ‘মতাদর্শিক’ এবং সর্বভারতীয় রূপ দান করাকেই অধিকতর উপযোগী বিবেচনা করা হয়েছিল। সে জন্য বড়লাট মিন্টো মুসলমান সমপ্রদায়ের নেতাদেরকে পরামর্শ দিলেন মুসলিম লীগ নামে স্বতন্ত্র একটি রাজনৈতিক দল গঠনের; এবং তার চেয়েও যেটা গুরুত্বপূর্ণ তা হলো মুসলমান নেতাদেরকে তিনি উৎসাহিত করলেন পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা দাবী করতে। ভোটাধিকার তখন অত্যন্ত সীমিত ছিল; বাড়তে বাড়তে সেটা দেশভাগের সময় মাত্র শতকরা তের জন পর্যন্ত পৌঁছায়; এরি মধ্যে মুসলমানদের পক্ষ থেকে দাবী করা হলো পৃথক নির্বাচনের। শুরুতে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বলেছিলেন যে, পৃথক নির্বাচন জাতিকে বিভক্ত করে ফেলবে। মোটেই ভুল বলেন নি। এবং বিভক্ত করাটাই ছিল শাসকদের অভিপ্রায়। পৃথক নির্বাচন কেবল যে আইন সভাগুলোর নির্বাচনের ক্ষেত্রের বিভক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ রইলো তা নয়, এটা অন্যান্য এলাকাতেও সামপ্রদায়িক বিভাজন তৈরী করলো।
বস্তুত সামপ্রদায়িকতার বিকাশের ব্যাপারে মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠা যতটা নয় তার চেয়ে অনেক বেশী কার্যকর ছিল ওই পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা। ওই ব্যবস্থায় অনুষ্ঠিত প্রতিটি নির্বাচনই সামপ্রদায়িকতাকে নতুনতর মাত্রায় উন্নীত করেছে, এবং শেষ পর্যন্ত ভয়ঙ্কর রকমের দাঙ্গাহাঙ্গামা বাধিয়ে দিয়ে দেশবিভাগকে অনিবার্য করে তুলেছে। সামনে ছিল কংগ্রেস ও লীগ, পেছনে ইংরেজ। দাঙ্গাহাঙ্গামার সময় হিন্দু ও মুসলমান উভয় সমপ্রদায়ই বিপদে পড়েছে, নিরাপদে থেকেছে ব্রিটিশ শাসকেরা। জনগণের মুক্তির জন্য প্রয়োজন ছিল যে সামাজিক বিপ্লবের তার সম্ভাবনা সামপ্রদায়িক দাঙ্গার আশঙ্কার নীচে চাপা পড়ে গেছে। আর সাম্রাজ্যবাদকে ভারতছাড়া করবার আন্দোলনও বিপথগামী হয়ে পড়েছে।
ইংরেজ শাসকেরা সামপ্রদায়িকতাকে উস্কানি দেবার ব্যাপারে অবশ্য সুবিধা করতে পেরেছে তখনকার জাতীয়তাবাদীদের ভুলের কারণেই। জাতীয়তাবাদীরা মনে করেছেন তাঁরা যা করেছেন ঠিকই করেছেন, কিন্তু আসলে সেটা ছিল একটা মারাত্মক ভ্রম। বঙ্গভঙ্গবিরোধী জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সঙ্গে তাঁরা ধর্মকে যুক্ত করে ফেলেছিলেন। ধর্ম সেই যে সংযুক্ত হলো তারপর তাকে কিছুতেই আর বিযুক্ত করা সম্ভব হলো না। ‘শিবাজী উৎসব’ উপলক্ষে রচিত একটি কবিতায় রবীন্দ্রনাথ যে শিবাজীর উক্তি হিসাবে “এক ধর্ম্মরাজ্যপাশে খণ্ড ছিন্ন বিক্ষিপ্ত ভারত বেঁধে দেব আমি,” এই বক্তব্যকে উপস্থিত করেছিলেন, সে-কবিতাটি তিনি পরে প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন সত্য, কিন্তু কংগ্রেসের অভ্যন্তরে ওই ধরনের বক্তব্যধারণকারী ব্যক্তির মোটেই অভাব ছিল না। ফলে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে সামপ্রদায়িক উপাদান তৎপর হয়ে উঠেছিল। তাতে অসুবিধা যা হবার সবটুকুই হয়েছিল জনগণের, সুবিধা হয়েছিল শাসকদের। স্বাধীনতার জন্য অত্যাবশ্যকীয় ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম অধীনস্ত হয়ে পড়েছিল সামপ্রদায়িক বিভাদের। শ্রেণীগত সংগ্রামের বাস্তবতাটা যে সামনে এগিয়ে আসবে সেটা ঘটে নি। শ্রেণী সংগ্রাম প্রবল হলে সামাজিক বিপ্লব ঘটবার আশঙ্কা ছিল; তা না ঘটাতে অবশ্য কেবল বিদেশী শাসকেরা নয় স্বদেশী কংগ্রেস ও লীগ নেতারাও ভীষণ স্বস্তি পেয়েছেন। এ ব্যাপারে তাদের স্বার্থ ছিল সমসূত্রে গ্রথিত।
বিদেশী শাসকেরা কখনো কংগ্রেসের কখনো লীগের দিকে ঝোঁকার ভান করেছে, এবং দু’য়ের মধ্যকার বিরোধটার যাতে কিছুতেই মীমাংসা না হয় বরঞ্চ সেটি তীব্রতর হতে থাকে সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রেখেছে। সিপাহী অভ্যুত্থানের পরে তারা মুসলমানদেরকে অপছন্দ করছে বলে মনে হতো। পরে কংগ্রেস প্রবল হলে কংগ্রেসের ওপর তারা বিরক্ত হলো, এবং ভান করলো যে তারা মুসলিম লীগকেই পছন্দ করে। শেষ পর্যায়ের বড়লাট ওয়াভেল ও মাউন্টব্যাটেনের মধ্যে প্রথমজনকে মনে হতো লীগের দিকে কৃপাদৃষ্টি নিক্ষেপ করেছেন, দ্বিতীয়জনের ভাবগতিক দেখে ধারণা হতো যে তিনি বুঝি-বা কংগ্রেসকে কিছুটা বেশী পছন্দ করেন। কিন্তু উভয়েই এক ব্যাপারে অনড় ছিলেন, সেটা হলো ব্রিটিশের স্বার্থ দেখা; সেটা দেখতে গিয়ে তাঁরা চেষ্টা করেছেন যে খণ্ডিত কিংবা অখণ্ডিত যাই হোক ভারতবর্ষ যেন ঔপনিবেশিক স্বায়ত্তশাসনের (ডমিনিয়ন স্ট্যাটাস) অধিক কিছু না পায়, কিছুতেই যেন স্বাধীন না হয়ে যায়, এবং অতিঅবশ্যই ব্রিটিশ কমনওয়েলথের ভেতরে থাকে। সেই লক্ষ্যেই তাঁরা কাজ করেছেন, এবং বলার অপেক্ষা রাখে না যে সফল হয়েছেন। তাঁদের সাফল্য জনগণের ব্যর্থতা। স্বাধীনতাকামী কংগ্রেসের ভেতর উদারপন্থীরা ছিলেন। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তগুলো দক্ষিণপন্থীদের চাপেই গৃহীত হয়েছে। এই দক্ষিণপন্থীদের সঙ্গে সরকারের একটা যোগাযোগ থাকতো। যেমন ধরা যাক, দেশভাগের ওই সিদ্ধান্তের ব্যাপারটা। এ ব্যাপারে গান্ধী তো অবশ্যই, প্রথম দিকে জওহরলাল নেহেরুও অনিচ্ছুক ছিলেন। কিন্তু প্যাটেলের সঙ্গে সরকারের সংযোগ ছিল এবং তিনিই প্রথমে দেশভাগে সম্মত হন, পরে এগিয়ে আসেন অন্যরা। লীগের সঙ্গে অপ্রত্যক্ষ তো অবশ্যই, প্রত্যক্ষ যোগাযোগটাও ছিল অধিকপরিমাণে। মাউন্টব্যাটেনের দাপ্তরিক কাগজপত্র থেকে জানা যাচ্ছে যে, ২২ মে ১৯৪৭ তারিখে মাউন্টব্যাটেন যখন ইংল্যান্ডে চার্চিলের সঙ্গে দেখা করেন, তখন সম্ভাব্য হিন্দুস্থান ও পাকিস্তান উভয়েই ব্রিটিশ কমনওয়েলথের ভেতরে থাকবে বলে চার্চিলকে তিনি আশ্বস্ত করতে পেরেছিলেন। নেহেরু এতে সম্মত আছেন, জিন্নাহও রাজি, মাউন্টব্যাটেন এমনটা জানিয়েছেন। জিন্নাহর প্রসঙ্গ ওঠাতে রক্ষণশীলতার শিরোমনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী চার্চিল যে মন্তব্যটি করেন তা তাৎপর্যহীন নয়। চার্চিল বলে ওঠেন,

ইু এড়ফ, যব রং ঃযব ড়হব সধহ যিড় পধহহড়ঃ ফড় রিঃযড়ঁঃ ইৎরঃরংয যবষঢ়.

সেইখানে না-থেমে চার্চিল আরো একটি কাজ করেন। বড়লাটকে অধিকার দেন জিন্নাহকে নিম্নোক্ত বক্তব্যটি পৌঁছে দিতে,

ঞযরং রং ধ সধঃঃবৎ ড়ভ ষরভব ধহফ ফবধঃয ভড়ৎ চধশরংঃধহ, রভ ুড়ঁ ফড় হড়ঃ ধপপবঢ়ঃ ঃযরং ড়ভভবৎ রিঃয নড়ঃয যধহফং.৬২৭

সন্দেহ কী যে রক্ষণশীলরা মুসলিম লীগকে কাছের লোক বলে ভাবতেন।
লীগ নয়, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন যা করবার কংগ্রেসই করেছে, জেল জুলুম তাদের ওপর দিয়েই গেছে; লীগের নেতারা ওই পথের যাত্রী ছিলেন না; মওলানা আকরম খাঁ যে জেল খেটেছেন সেটা স্বদেশী যুগে, পরবর্তীতে শাসকেরা তাঁদের কাউকেই কারাবন্দী করবার মতো বিপজ্জনক বলে মনে করেন নি। মুসলিম লীগ বরঞ্চ কংগ্রেসের আন্দোলনের সুবিধাটুকু নেবার দিকেই চোখ রেখেছে। খুব বড় একটা দৃষ্টান্ত ১৯৪২এর আগস্ট মাসের ভারতছাড় (ছঁরঃ ওহফরধ) আন্দোলনের সময়কার ঘটনা। ব্রিটিশ শাসকের দৃষ্টিতে এটি ছিল একটি বিদ্রোহ; তাদের অনেকেই ১৮৫৭এর পরে এমন বিদ্রোহ আর দেখেন নি বলে উল্লেখ করতে বাধ্য হয়েছেন। কংগ্রেসের প্রধান প্রধান নেতারা বিদ্রোহের শুরুতেই কারারুদ্ধ হন, এবং দীর্ঘকাল সেখানেই রয়ে যান; আন্দোলন, বিক্ষোভ, নির্যাতন সহ্য করা-এসব যা যা করবার সাধারণ কর্মীরা ও মধ্যবিত্ত তরুণরাই করেছেন। কিন্তু কংগ্রেস নেতাদের অনুপস্থিতি চমৎকার একটা সুযোগ হিসাবে দেখা দেয় মুসলিম লীগের জন্য। এবং সেই সুযোগের সদ্ব্যবহারে তাঁরা কোনো দ্বিধা প্রকাশ করেন নি। ব্যাপারটা বড়লাট ওয়াভেল স্বয়ং লক্ষ্য করেছেন। তিনি লিখছেন,

ঞযব ঃবসঢ়ড়ৎধৎু বপষরঢ়ংব ড়ভ ঈড়হমৎবংং যধফ ষবভঃ ঃযব ঢ়ড়ষরঃরপধষ ভরবষফ ড়ঢ়বহ ঃড় ঔরহহধয ধহফ ঃযব গঁংষরস খবধমঁব সধফব মড়ড়ফ ঁংব ড়ভ ঃযরং ড়ঢ়ঢ়ড়ৎঃঁহরঃু ঃড় ারষরভু ধহফ ফরংপৎবফরঃ ঈড়হমৎবংং ধহফ ঃড় ৎধষষু ধষষ গঁংষরসং ঃড় ঃযব খবধমঁব্থং ংঁঢ়ঢ়ড়ৎঃ. ঔরহহধয ৎবঢ়ৎবংবহঃবফ ঃযব ছঁরঃ ওহফরধ ৎবনবষষরড়হ ধং ধ সধষরপরড়ঁং ঢ়ষড়ঃ ঃড় পড়বৎপব ঃযব ইৎরঃরংয ঃড় ংঁৎৎবহফবৎ ওহফরধ ঃড় ঈড়হমৎবংং, য়ঁরঃব ৎবমধৎফষবংং ড়ভ গঁংষরসং রহঃবৎবংঃং.৬২৮

এ সময়ে জিন্নাহ কেবল যে মুসলমানদেরকে লীগের পতাকাতলে নিয়ে এলেন তা নয়, লীগের তিনি একমাত্র মুখপাত্রতেও পরিণত হলেন। অবশ্য জিন্নাহ তাঁর অনুসারীদেরকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে বেশ হিমসিম খাচ্ছিলেন বলে ওয়াভেলের মনে হয়েছে। ওয়াভেলের মতে, ুযব যধং ঃযব যধৎফবংঃ ঃধংশ ড়ভ ধহু ষবধফবৎ, ধং যব যধং পবৎঃধরহষু হড়ঃ ঃযব মৎরঢ় ড়ভ ভড়ষষড়বিৎং ঃযধঃ ঈড়হমৎবংং যধং.চ৬২৯ আপাত দৃষ্টিতে এই ধারণাটা সঠিক নয় বলেই মনে হবে, কেননা জিন্নাহ তো ছিলেন একচ্ছত্র নেতা, কায়েদে আজম, সর্বেসর্বা; কংগ্রেসের হাই কমান্ডেই বরঞ্চ নানা ধরনের দ্বন্দ্ব ছিল; কিন্তু লীগের হাই কমান্ড তো ওই একজনকে নিয়েই গঠিত। তাহলে? কিন্তু জিন্নাহর জন্য খুব বড় একটা অসুবিধা অবশ্যই ছিল। তিনি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার ডাক দিয়েছেন, ভারতের যে মুসলমানরা এতকাল একটি সংখ্যালঘু সমপ্রদায় ছিল তাকে তিনি একটি ‘জাতি’তে পরিণত করেছেন, এখন যদি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা না হয় তাহলে তিনি তাঁর ধাবমান অশ্ব থেকে কোন নিরাপদ ভূমিতে অবতরণ করবেন? অথচ পাকিস্তান যে কোনো ধরনের রাষ্ট্র হবে, তার সীমানাই বা কি হবে সেটা অন্যদের তো জানবার কথাই নয়, তিনি নিজেই জানতেন না। বিশেষ করে সমস্যা ছিল ওই সীমানা তথা ভৌগোলিক এলাকাটা নিয়ে। পাকিস্তান যদি কেবল মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশগুলো নিয়ে গঠিত হয় তবে ভারতের সর্বত্র যে মুসলমানরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে তাদের দশাটা কি হবে, তারা কোথায় যাবেন, কোন রাষ্ট্রের নাগরিক হবেন-এসব অত্যন্ত জরুরী প্রশ্নগুলোর কোনো সদুত্তর তাঁর কাছে ছিল না। উত্তর দিতে গেলে বিপদে পড়তেন, অনুসারীদের অনেকেই দ্বিধায় পড়তো, হয়তো পিছিয়ে যেতো। যে জন্য ‘পাকিস্তান’ ব্যাপারটাকে তিনি কখনোই স্পষ্ট করবার চেষ্টা করেন নি। অপরদিকে অন্যরা যদিও জানতো না, কিন্তু তিনি নিজে জানতেন, এবং আমরা এখন জানি যে দূরারাগ্যে ব্যাধির কারণে তাঁর জীবনসীমা দ্রুতগতিতে সংক্ষিপ্ত হয়ে আসছিল; জীবদ্দশায় পাকিস্তান দেখে যেতে পারবেন এমন আশা যে তাঁর ছিল না, নতুন রাষ্ট্রের প্রথম গভর্নর জেনারেল হিসাবে করাচী আসার পথে বিমান থেকে নামার সময় তিনি তাঁর ব্যক্তিগত সামরিক সহকারীকে সে কথা বলেছিলেন। ওদিকে পাকিস্তানের প্রথম গণপরিষদের অধিবেশনেই তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, পাকিস্তানে দ্বিজাতিতত্ত্বর কার্যকারিতা থাকবে না, সামপ্রদায়িক বিভেদের অবসান ঘটবে এবং রাষ্ট্রটির চরিত্র হবে ধর্মনিরপেক্ষ। পরবর্তীতে তাঁর অনুসারীরা এই ঘোষণার মর্যাদা তো রাখেনই নি, বরঞ্চ নয় বছর ধরে চেষ্টা-অপচেষ্টা ও ধস্তাধস্তির শেষে ১৯৫৬ সালে যে-সংবিধানটি রচনা করেন তাতে পাকিস্তানকে একটি ইসলামী রাষ্ট্র বলেই ঘোষণা করা হয়, যে-রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব জনগণের হাতে থাকবে না, থাকবে করুণাময় আল্লাহর কাছে। অপরদিকে যাদেরকে তিনি সংখ্যালঘু থেকে জাতিতে উন্নীত করবেন বলে অঙ্গীকার করেছিলেন ভারতবর্ষের সেই মুসলমানদের একটি বড় অংশ ‘স্বাধীনতা’ লাভের প্রত্যুষেই দেখতে পেলো যে, তারা যে কেবল সংখ্যালঘুই রয়ে গেছে তা নয়-হিন্দুস্থানের নাগরিক হিসাবে তাদের অবস্থা আগের তুলনায় আরো খারাপ হয়েছে, এবং তাদেরকে ফেলে রেখে বিত্তবান ও সুবিধাবাদী মুসলিম নেতাদের দ্রুত পাকিস্তান গমনের ফলে তাঁরা নেতৃত্বহীন ও দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।
ভারতবর্ষের মানুষের মুক্তি অর্জনের জন্য দরকার ছিল সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ঐক্যবদ্ধ, অব্যাহত ও ধারাবাহিক আন্দোলনের এবং দেশটি যে এক বা দুই জাতির দেশ নয়, দেশ বহুজাতির বটে সেই সত্যের কার্যকর স্বীকৃতিদানের। আন্দোলন অবশ্যই হয়েছে। কেবল আন্দোলনের কারণেই না-হলেও আন্দোলনের পরিণতিতেই ব্রিটিশ ভারতবর্ষ থেকে বিদায় নিয়েছে। কিন্তু সে-আন্দোলন সংগ্রামের ঐক্যকে ধরে রাখতে পারে নি; বরঞ্চ সামপ্রদায়িক বিভেদকে প্রশ্রয় দিয়েছে, তার বৃদ্ধিও ঘটিয়েছে। প্রথম বড় আন্দোলন হয় ১৯২০ সালে, যখন অসহযোগ ও খিলাফৎ এই দুই ধারা একত্র হয়ে আন্দোলনকারী হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে একটি ঐক্য তৈরী করেছিল। কিন্তু সেটা টেকে নি। ১৯৪৬ সালে লিখিত কমিউনিস্ট পার্টির বিশিষ্ট সদস্য হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় ‘হিন্দু ও মুসলিম’ নামের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন যে, “সামপ্রদায়িক মৈত্রী যখন প্রায় অটুট বলে মনে হচ্ছিল তখনই মাঝে মাঝে দু’য়েকটা খারাপ সংকেত দেখা দিত। ৮ই সেপ্টেম্বর ১৯২০ তারিখের ইয়ং ইন্ডিয়া পত্রিকায় গান্ধীজি লেখেন যে “সভাসমিতিতে হিন্দু আর মুসলমান যেন রেষারেষি করে ‘বন্দে মাতরম’ কিংবা ‘আল্লা-হো-আকবর’ রব তোলে, অথচ রব তুলতে হলে সকলেরই সমান অনুরাগ ও আবেগ নিয়ে তা করা উচিত।”৬৩০ কেবল তাই নয়, হঠাৎ করেই যখন আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেওয়া হলো তখন শুরু হয়ে গেল প্রথমে হিন্দু-মুসলিম বিরোধ ও পরে দাঙ্গা। সেই দাঙ্গায় নিহত হলেন স্বামী শ্রদ্ধানন্দ, যে স্বামী শ্রদ্ধানন্দকে ১৯১৯ সালে দিল্লীর মুসলমানরা জুম্মার নামাজের পর তাদের প্রধান মসজিদের ভেতরে বক্তৃতা দেবার জন্য আহ্বান জানিয়েছিলেন। একদা যিনি হিন্দু-মুসলমান সকলেরই শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন, আন্দোলন থেমে যাবার পর মুসলমানদের প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যায়, তিনি ‘শুদ্ধি’ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন, এবং মুসলমানদের চক্ষুশূলে পরিণত হন। হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় যথার্থই লক্ষ্য করেছেন যে, “পরাধীন দেশের রাজনীতি যখন কেবল নিয়মানুবর্তী রাস্তায় চলে, তখন চাকরী-বাকরী নিয়ে কামড়াকামড়ি হলো হিন্দু আর শিক্ষিত মুসলমানের প্রধান কাজ”৬৩১ ঘটনাটিকে অস্বাভাবিক বলা যাবে না, হাতে কাজ না-থাকলে প্রতিবেশীর সঙ্গে ঝগড়া বাধানো চমৎকার কাজ, এমনকি সহজলভ্য বিনোদনের উপায় হয়ে দাঁড়ায় বৈকি। উত্তেজনার ভেতর সময় কাটে, এবং ভেতরের চাপা ক্রোশ-আক্রোশ প্রকাশের একটা পথ খুঁজে পায়।
কংগ্রেসের আন্দোলনের একটি বড় দুর্বলতা ছিল এই যে, জনগণকে সে সঙ্গে নিতে পারে নি। এটা মোটেই তাৎপর্যহীন নয় যে অসহযোগ-খিলাফৎ-এর আকস্মিক প্রত্যাহারের পর বিক্ষুব্ধ মতিলাল নেহেরু ও চিত্তরঞ্জন দাশ বিকল্প পথ ধরতে চাইলেন বটে, কিন্তু জনগণের কাছে যে যাবেন তা করলেন না, ওই কংগ্রেসের ভেতরেই রয়ে গেলেন, ভেতরে থেকেই স্বরাজ্য পার্টি গঠন করলেন, এবং সেই পার্টির গন্তব্য স্থির হলো আন্দোলন নয়, আইন সভাতে যাওয়া। শুধু তাই নয়, হীরেন্দ্রনাথের ভাষায়, “১৯২৭-২৮ সালে হিন্দু-প্রধান স্বরাজ্য পার্টি কাউন্সিলে প্রজাস্বত্ব আইন সংশোধনকালে জমিদারদের পক্ষে ও প্রজাদের বিপক্ষে কথা বলে বাংলায় হিন্দু-মুসলমান পার্থক্যকে আরও কটু করে তোলেন।”৬৩২ এটা সত্যি সত্যিই ঘটেছে। এ সমস্ত ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় দেখা যায় ১৯২৯ সালে যখন কৃষক প্রজাপার্টি গঠিত হয় তখন সেটি নামে অসামপ্রদায়িক হলেও কার্যত মুসলিম সংগঠনেরই চরিত্র ধারণ করে। এ প্রসঙ্গে দলের অন্যতম নেতা মওলানা আকরম খাঁর একটি মন্তব্য স্মরণীয়; তিনি বলেছিলেন, হিন্দুরা যেহেতু কংগ্রেসের অসামপ্রদায়িক নামের আড়ালে একটি হিন্দু সংগঠন পরিচালনা করছে তাঁরা তাই অসামপ্রদায়িক প্রজা পার্টি নাম দিয়ে একটি মুসলিম সংগঠন চালাবেন।৬৩৩
হিন্দু-মুসলমান বিরোধের মূলটি যে নিহিত আছে অর্থনীতিতে চিত্তরঞ্জন তা পরিষ্কারভাবে বুঝেছিলেন। বেঙ্গল প্যাক্টের মধ্য দিয়ে দুই সমপ্রদায়ের মধ্যবিত্তকে তিনি একটি সমঝোতার ভেতর আনতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তা কার্যকর হয় নি। দীর্ঘজীবন লাভ করলে তিনি বাংলার রাজনীতিকে হয়তো সর্বভারতীয় রাজনীতি থেকে পৃথক করতে চেষ্টা করতেন, কিন্তু এটা না-মেনে উপায় নেই যে, তিনি ধর্মনিরপেক্ষ ছিলেন অবশ্যই, কিন্তু সমাজবিপ্লবী অবশ্যই ছিলেন না, যেটা তাঁর পক্ষে হওয়া সম্ভবপরও ছিল না, এমনকি ‘স্বরাজ’ বলতে তিনি কি বুঝতেন তা স্পষ্ট করে বলেন নি। কে জানে স্বরাজ বলতে আসলে হয়তো উপনিবেশিক স্বায়ত্তশাসনই বুঝতেন। হীরেন্দ্রনাথ লিখছেন, “১৯২৫ সালে ফরিদপুরে বাংলা প্রাদেশিক সম্মেলনে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন গান্ধীজীর উপস্থিতিতে সভাপতিত্ব করার সময় ডমিনিয়ন স্টেটাসের ‘আধ্যাত্মিক গুরুত্ব’ ও স্বাধীনতার তুলনায় শ্রেষ্ঠত্বের কথা বলেন।”৬৩৪ তাঁর এই দৃষ্টিভঙ্গিকে বিস্ময়কর বলা যাবে না; তাঁকেও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ভেতরে থেকেই রাজনীতি করতে হয়েছে।
এটা লক্ষ্য করা গেছে যে, কংগ্রেস ও লীগ উভয় দলই ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটলে কে কতটা ভাগ পাবে সেটা নিয়েই শেষ পর্যন্ত রাজনীতি করেছে। কংগ্রেসের ইতিহাসে অবশ্য ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের দীর্ঘ তালিকা রয়েছে, কিন্তু এই আন্দোলনের অন্তর্গত বস্তুগত লক্ষ্যটা ছিল ক্ষমতা লাভ, যে জন্য কংগ্রেস নির্বাচনে গেছে, মন্ত্রিসভা গঠন করেছে, এমনকি ১৯৪৬এর অন্তর্বর্তী সরকারেও (যাকে তারা মনে করতো তত্ত্বাবধায়ক সরকার) যোগ দিয়েছে। আন্দোলনের ব্যাপারে মুসলিম লীগের অংশগ্রহণের তালিকাটা অবশ্যই নিষপ্রভ। কিন্তু দুই দলে মিল রয়েছে এক জায়গায়, সেটা এই যে তারা কেউই দেশে সমাজ বিপ্লব ঘটুক এটা চায় নি, তাদের কাজটা ছিল বরঞ্চ বিপ্লব ঠেকানো। এইখানে উভয় দলের নেতারা ব্রিটিশ শাসকদের কাছাকাছি চলে গেছেন, যে জন্য আমরা দেখি ওই শাসকদের সঙ্গে দেনদরবার, পত্রালাপ, বিশেষ বৈঠক, বিলেতে গিয়ে গোলটেবিলে করা কোনো কিছুতেই তেমন একটা অসুবিধা ঘটে নি, বরঞ্চ বাইরে থেকে দেখলে মনে হয়েছে যে তারা বুঝি পরস্পরের বেশ নিকটজন। তাদের আসল দূরত্বটা ছিল জনগণের কাছ থেকেই। নেতারা সাধারণ মানুষের কাছে গেছেন দুই কারণে। একটি হচ্ছে তাঁদের প্রতি জনগণের সমর্থন দেখিয়ে ব্রিটিশ শাসকদের সঙ্গে দরকষাকষিতে সুবিধা লাভ। অপরটি হলো পাছে জনগণ তাঁদেরকে প্রত্যাখ্যান করে, এবং প্রত্যাখ্যানের মাধ্যমে নেতাদের দাঁড়াবার জায়গাটাকে ভেঙ্গে দেয় এই আশঙ্কা। আন্দোলনের নেতারা ব্রিটিশকে যত ভয় করতো তার চেয়ে বেশী ভয় করতো জনগণের বিপ্লবী অভ্যুত্থানের সম্ভাবনাকে। এইখানে ওই তিন শক্তি-ব্রিটিশ, কংগ্রেস ও লীগ-পরস্পর থেকে দূরে ছিল না, ছিল নিকটবর্তী। লক্ষণীয় যে এরা সবাই শক্তিশালী কেন্দ্রীয় শাসনের পক্ষে ছিল; প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন না চাইতো কংগ্রেস, না চাইতো লীগ; আর ব্রিটিশের পক্ষে কিছুটা স্বায়ত্তশাসন দেবার একটা ভান করা হতো, কেন্দ্রীয় সরকারের শাসনকে অক্ষত রাখার স্বার্থেই।
ব্রিটিশ সরকারের নীতি আগাগোড়াই ছিল ভাগ করো এবং শাসন করো, শাসন করার স্বার্থেই তারা কংগ্রেস ও লীগ তথা হিন্দু-মুসলিম বিরোধকে উৎসাহিত ও উত্তেজিত করার ব্যাপারে কোনো প্রকার কার্পণ্য করেন নি। ১৯৪৬এর ১৬ আগস্ট যখন কলকাতায় সেই ভয়ঙ্কর দাঙ্গা শুরু হয় তখন পুলিশ নিষ্ক্রিয় ছিল, সামরিক বাহিনী রাস্তায় নেমেছে ২৪ ঘণ্টা পার করে দিয়ে, এবং বড়লাট কলকাতায় কি ঘটেছে দেখতে এসেছেন এমনকি এক সপ্তাহও নয়, পুরো নয় দিন পরে। কলকাতার দাঙ্গা নোয়াখালি, বিহার, দিল্লী এবং পরে পাঞ্জাবে ছড়িয়ে পড়ে। পাঞ্জাবের দাঙ্গা যে অতিশয় ভয়াবহ আকার ধারণ করবে গোয়েন্দা সূত্রে মুসলমান, শিখ ও হিন্দু তিন পক্ষের প্রস্তুতির খবর থেকে তার পূর্বাভাস সরকার ঠিকই পাচ্ছিল, কিন্তু মোকাবিলার জন্য তেমন কোনো প্রস্তুতি নেয় নি।
আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি, নিজের দেশে সঙ্কট এবং সর্বোপরি ভারতবর্ষের অতিউত্তপ্ত অবস্থার দরুন ভারতবর্ষকে যখন কিছুতেই আর অধীনে রাখা যাচ্ছিল না তখন শুরু হয় দেশভাগের কাজ। এর শেষ পর্যায়ে বড়লাট মাউন্টব্যাটেন ভাগ করার ব্যাপারে মোটেই আগ্রহী নন এরকমের একটা মনোভাব প্রকাশ করেছেন। তাঁর আসল আগ্রহ কিন্তু ছিল অন্যত্র। সেটা এখানে যে, এক থাকুক বা একাধিকে পরিণত হোক ভারতবর্ষকে ব্রিটিশ কমনওয়েলথের অধীনে রাখা চাই। এ ব্যাপারে পাকিস্তানওয়ালাদের সম্মতি পাওয়া যাচ্ছিল, কিন্তু কংগ্রেস কতটা সম্মত হবে তা নিয়ে সংশয় দেখা দিচ্ছিল। মাউন্টব্যাটেন লীগ-সম্পাদক লিয়াকত আলী খানের কাছে ব্রিটিশের ইচ্ছাটা উপস্থাপন করেন এবং এটা দেখে সন্তুষ্ট হন যে, লিয়াকত আলী প্রস্তাবটির প্রতি কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন নি। মাউন্টব্যাটেন লিখছেন,

ও ফরংপঁংংবফ রিঃয যরস ঃযব যিড়ষব য়ঁবংঃরড়হ ড়ভ ফড়সরহরড়হ ংঃধঃঁং ভড়ৎ চধশরংঃধহ ধহফ ঐরহফঁংঃধহ ঁহফবৎ ড়হব এড়াবৎহড়ৎ এবহবৎধষ, ধহফ ভড়ঁহফ ঃযধঃ যব ধিং ংঁৎঢ়ৎরংরহমষু ৎবপবঢ়ঃরাব ঃড় ঃযব রফবধ.৬৩৫

এর তিন দিন পরে লন্ডনে ভারতবর্ষ ও বার্মা সংক্রান্ত কেবিনেট কমিটির মিটিং-এ (২০ মে ১৯৪৭) বড়লাট মাউন্টব্যাটেন কেবিনেট কমিটির সদস্যদেরকে জানাচ্ছেন,

ডযধঃ গৎ. ঔরহহধয ৎবধষষু ধিহঃবফ ধিং ঃযধঃ চধশরংঃধহ ংযড়ঁষফ যধাব উড়সরহরড়হ ংঃধঃঁং ধহফ ঃযধঃ ঐরহফঁংঃধহ ংযড়ঁষফ ষবধাব ঃযব ঈড়সসড়হবিধষঃয.৬৩৬

এর আগে দিল্লীতে মাউন্টব্যাটেন তাঁর স্টাফ মিটিংএ মন্তব্য করেছেন যে,

রঃ ড়িঁষফ নব ফরংধংঃৎড়ঁং ঃড় ধষষড় িড়হষু, ভড়ৎ বীধসঢ়ষব, চধশরংঃধহ ঃড় ৎবসধরহ রহ, ধহফ ঃযঁং নধপশ ড়হব ঢ়ধৎঃ ড়ভ ওহফরধ ধমধরহংঃ ঃযব ড়ঃযবৎ, যিরপয সরমযঃ রহাড়ষাব ঃযব ট.ক. রহ ধিৎ.

কাজেই দুটোকেই একই জোয়ালে বেঁধে রাখা চাই। তিনি আরো মন্তব্য করেছেন যে, তিনি নিজে

ধিং রহ ভধাড়ঁৎ ড়ভ ইৎরঃরংয ওহফরধ ধং ধ যিড়ষব নবরহম ঢ়বৎসরঃঃবফ ঃড় ৎবসধরহ রহ ঃযব ঈড়সসড়হবিধষঃয ধহফ ধিং ঁংরহম ঃযব চধশরংঃধহ ঃযৎবধঃ ঃড় ৎবসধরহ রহ ধং ধ ষবাবৎ ঃড় যবষঢ় ঈড়হমৎবংং ঃড় ্তুঃধশব ঃযব ঢ়ষঁহমব্থ.

লক্ষণীয় যে ব্রিটিশ মহলে ইতিমধ্যেই হিন্দুস্থান পাকিস্তান নামাবলী চলে এসেছে। ওপরের উদ্ধৃতিতে মাউন্টব্যাটেনের কার্যাবলী যে তাঁর পূর্বসূরীদের চেয়ে মোটেই ভিন্ন ছিল না সেটাও জানা যাচ্ছে, যদিও উদারপন্থী বলে তাঁর খ্যাতি লাভ ঘটেছিল। অনুগত মুসলিম লীগকে তিনি ব্যবহার করছিলেন তাঁর ‘মিত্রপ্রতিম’ কংগ্রেসকে বশে আনার জন্য। অন্য সময়ে আবার কংগ্রেসকে ব্যবহার করেছেন লীগকে ভয় দেখানোর কাজে। মাউন্টব্যাটেনের ভঙ্গিটা ছিল এই রকমের যে, আমরা তো এই মুহূর্তেই চলে যেতে পারলে বেঁচে যাই, কিন্তু তোমরা কংগ্রেস ও লীগ তো ঠিক করতে পারছো না রাষ্ট্রক্ষমতার ভাগাভাগির ব্যাপারটা কীভাবে মীমাংসা করবে, মুস্কিলটা তো সেখানেই। মাউন্টব্যাটেনের কাজটাকে বিড়ালের পিঠাভাগের সঙ্গে তুলনা করাটা অন্যায় হবে না। আর তিনি যে ভারতবর্ষকে দ্বিখণ্ডিত করার ব্যাপারে উৎসাহের অতটা অভাব প্রদর্শন করেছেন তার কারণ হয়তো এই যে, নিজেদের হাতে-গড়া সাম্রাজ্যটার অখণ্ডতার প্রতি এক ধরনের মায়া পড়ে গিয়েছিল। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় হিন্দুস্থানকে অখণ্ড রাখার পক্ষে যে-যুক্তি ক্রিপস মিশনের স্যার স্ট্যাফোর্ড ক্রিপসের কাছে তুলে ধরেছিলেন সেটাও এই লাইনেরই। ক্রিপসকে তিনি অভিযুক্ত করেছিলেন এই বলে যে,

ুড়ঁ ধৎব নৎবধশরহম রিঃয ুড়ঁৎ ড়হি যধহফ ঃযব ড়হব মৎবধঃ ধপযরবাবসবহঃ ড়ভ ঃযব ইৎরঃরংয রহ ওহফরধ-ঃযব ঢ়ড়ষরঃপধষ ঁহরঃু ড়ভ ওহফরধ ধং ধ যিড়ষব.৬৩৮

এখানে উল্লেখ করা হয়তো অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে, ভারতবর্ষীয় রাজনৈতিক নেতাদের সম্পর্কে ইংরেজ আমলারা মোটেই উচ্চ ধারণা পোষণ করতেন না; কাউকে কাউকে বড় জোর পিঠ চাপড়ে দিতেন; ১৯৪৭-এ বাংলার গভর্নর ছিলেন ফ্রেডরিখ ব্যারোজ, প্রথম জীবনে তিনি ছিলেন ব্রিটিশ রেলওয়ের গার্ড। ৮ আগস্ট ১৯৪৭-এ মাউন্টব্যাটেন তাঁর লন্ডন কর্তৃপক্ষকে জানাচ্ছেন যে শ্যামাপ্রসাদকে ব্যারোজ ঘনিষ্ঠভাবে দেখেছেন এবং দেখে তাঁর মনে হয়েছে যে, শ্যামাপ্রসাদ এতটাই নিম্নমানের লোক যে ুধ ংহধশব পড়ঁষফ হড়ঃ পৎধষি ঁহফবৎ যরং নবষষুচ৬৩৯ মাউন্টব্যাটেনের পক্ষে ব্যারোজের এই উক্তি স্মরণ করার কারণ ছিল নেহেরু তাঁর মন্ত্রিসভায় যাঁদের নাম রাখার প্রস্তাব করেছিলেন তাঁদের মধ্যে শ্যামাপ্রসাদের নামও ছিল। মাউন্টব্যাটেনের মনে হয়েছিল যে, হিন্দু মহাসভার একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্যকে মন্ত্রী করার প্রস্তাবটা নেহেরুর দিক থেকে অবশ্যই প্রশংসনীয়, কিন্তু তিনি দ্বিধায় পড়েছিলেন ছোটলাট ব্যারোজের ওই মূল্যায়নটি স্মরণ করে। তাতে অবশ্য কিছু যায় আসে নি। শ্যামাপ্রসাদ ঠিকই মন্ত্রী হয়েছিলেন। ব্যারোজের উক্তিটি অতিশয়োক্তি অবশ্যই, কিন্তু শ্যামাপ্রসাদের মহাসভাপন্থী রাজনীতির প্রশংসা করাটা এমনকি অসাম্প্রদায়িক হিন্দুদের পক্ষেও কঠিন ছিল বৈকি।
শ্যামাপ্রসাদের চেয়েও কঠিন পাত্র ছিলেন হিন্দু মহাসভার আসল নেতা বীর সাভারকার, যিনি মুসলমানদেরকে পূর্ণ নাগরিক অধিকার দিতেও প্রস্তুত ছিলেন না, এবং যার দলেরই একজন গান্ধীকে সামনাসামনি গুলি করে হত্যা করে। ১৯৪৪ সালে পাকিস্তানের প্রশ্ন নিয়ে যখন গান্ধী জিন্নাহ আলাপ চলছে, হিন্দু মহাসভার নেতা হিসাবে সাভারকার তখন ভারত সচিব এমেরিকে টেলিগ্রাম করে জানান, ুঐরহফঁ গধযধংধনযরঃবং পধহ হবাবৎ ঃড়ষবৎধঃব ঃযব নৎবধশরহম ঁঢ় ড়ভ ঃযব ঁহরড়হ ড়ভ ওহফরধ, ঃযবরৎ ভধঃযবৎষধহফ ধহফ যড়ষুষধহফ.চ৬৪০ হিন্দু মহাসভাপন্থীদের চোখে ভারতবর্ষ কেবল যে পিতৃভূমি ছিল তা নয়, ছিল পুণ্যভূমিও। তাকে ভেঙ্গে ফেলাটা তারা সহ্য করে কী করে! ইতিহাসের পরিহাস এই যে তাদের অনমনীয়তাই দেশভাগকে অনিবার্য ও ত্বরান্বিত করে তুলেছিল।
ওদিকে জিন্নাহ বরঞ্চ এদের চাইতেও অধিক অস্থির ছিলেন পাকিস্তান পাবার জন্য। গান্ধীর কথা শোনার মানসিকতা জিন্নাহর অবশ্যই ছিল না। প্রশ্নই ওঠে নি। কিন্তু সেই সময়ে পাকিস্তান-বিষয়ে গান্ধী যে ভবিষ্যদ্বাণীটি করেছিলেন তা মোটেই মিথ্যা প্রমাণিত হয় নি। এক সাক্ষাৎকারে গান্ধী বলেন,

গৎ ঔরহহধয রং ংরহপবৎব, নঁঃ ও ঃযরহশ যব রং ংঁভভবৎরহম ভৎড়স যধষষঁপরহধঃরড়হ যিবহ যব রসধমরহবং ঃযধঃ ধহ ঁহহধঃঁৎধষ ফরারংরড়হ ড়ভ ওহফরধ পড়ঁষফ নৎরহম বরঃযবৎ যধঢ়ঢ়রহবংং ড়ৎ ঢ়ৎড়ংঢ়বৎরঃু ঃড় ঃযব ঢ়বড়ঢ়ষব পড়হপবৎহবফ.৬৪১

জিন্নাহর স্বপ্ন দেখার ভেতর আন্তরিকতার কোনো অভাব ছিল না, কিন্তু সেই স্বপ্ন যে কেবল অন্যদের জন্য নয়, তাঁর নিজের জন্যও দুঃস্বপ্নে পরিণত হবে সেটা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গেই জিন্নাহর উপলব্ধির ভেতর এসে গিয়েছিল। পাকিস্তানী দুঃস্বপ্ন কতটা ভয়াবহ হবে সেটা অবশ্য আমাদেরকে অবিশ্বাস্য যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে বুঝতে হয়েছে-একাত্তর সালে; এখন পাকিস্তানের ভগ্নাংশের মানুষদের বুঝবার পালা, অচিরেই তারা এখনকার চেয়ে আরো ভয়ঙ্কর রূপে টের পাবে বলে ধারণা করা যায়।



তিন পক্ষেরই ভয় ছিল সমাজ বিপ্লবের। পরলোকগমন-আসন্ন বৃদ্ধ পিতার দুই উত্তরাধিকারী যখন ভাগবাটোয়ারা নিয়ে কলহে মত্ত, তাদের প্রজারা তখন সব ধরনের নিগ্রহ অনেকটা নীরবেই সহ্য করেছে। ব্রিটিশ শাসনের শোষণ-নির্যাতন, যুদ্ধের মন্দা, দাঙ্গা, দুর্ভিক্ষ সবই গেছে তাদের মাথার ও দেহের ওপর দিয়ে। দেশভাগে সবচেয়ে কষ্ট হয়েছে বাংলা ও পাঞ্জাবের মানুষদের। ভাগাভাগিতে দেশবাসীর কোনো সম্মতি নেওয়া হয় নি, নেওয়ার প্রয়োজনও বোধ করেন নি প্রতিষ্ঠিত ও উঠতি কর্তৃপক্ষ। বাংলা ও পাঞ্জাব দু’টুকরো হয়েছে, কিন্তু ভাগাভাগির আলোচনাগুলোতে ওই দুই প্রদেশের নেতাদের ডাকা হয় নি। সর্দার বলদেব সিং কালেভদ্রে উপস্থিত থাকতেন, তবে পাঞ্জাবী হিসাবে নয়, শিখদের প্রতিনিধি হিসাবে। বাংলার মুখ্যমন্ত্রী এ কে ফজলুল হককে প্রয়োজনের সময় ‘শেরে বাংলা’ উপাধি দেওয়া হয়েছিল, তাঁকে দিয়ে ১৯৪০-এর লাহোর প্রস্তাব উত্থাপন করে নেওয়া হয়েছে, কিন্তু তারপর থেকেই মুসলিম লীগ হাই কমান্ড তাঁকে ক্রমাগত কোণঠাসা করতে শুরু করে দিয়েছে, এবং শেষ পর্যন্ত অবস্থা এমন হয়েছে যে তখনকার বাংলার রাজনীতিতে যাঁর পক্ষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবার কথা, দেশভাগের মতো ভয়ঙ্কর সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় তাঁর কোনো ভূমিকাই দেখা গেল না, বঙ্গীয় আইন সভার সদস্যরা যখন হিন্দুস্থান পাকিস্তান নিয়ে ভোটাভুটি করে তখন ওই সভার সদস্য হওয়া সত্ত্বেও তিনি উপস্থিত পর্যন্ত ছিলেন না। সুভাষচন্দ্র বসু তখন দেশে ছিলেন না, শরৎচন্দ্র বসু ছিলেন, তিনি ছিলেন বঙ্গীয় আইন সভার কংগ্রেস দলের নেতা, বাংলাভাগের ব্যাপারে তাঁর মতামতও নেওয়া হয় নি, তিনি বরঞ্চ বাংলাকে ভাগ করার বিরুদ্ধে সক্রিয় অবস্থান নিয়েছিলেন, যেটা ফজলুল হকের পক্ষে নেওয়া সম্ভব হয় নি, কারণ ফজলুল হকের রাজনৈতিক অবস্থান তখন সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত। কংগ্রেসের পক্ষ থেকে শরৎবসুকে কেন্দ্রীয় অন্তর্বর্তী সরকারের সদস্য করা হয়েছিল বটে, কিন্তু সেটা মাত্র কয়েক সপ্তাহের জন্য, পরে তিনি কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি থেকে পদত্যাগ করেন, এবং আরো পরে, মৃত্যুর অল্প কিছুদিন আগে স্বতন্ত্র একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেন। বাংলা ভাগ হলো, কিন্তু বাংলার সাধারণ মানুষ তো দূরের কথা, নেতারাও তাঁদের অসম্মতির কথাটা জানাবার সুযোগ পেলেন না।
১৯৩৭ সাল ভারতবর্ষের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। তখন আটটি প্রদেশে কংগ্রেসের নির্বাচিত সরকার গঠিত হয়। বাংলাতেও কংগ্রেসের সঙ্গে কৃষক প্রজা পার্টির যুক্ত মন্ত্রিসভা গঠিত হতে পারতো। প্রজা পার্টির ফজলুল হক মনেপ্রাণে সেটা চেয়েছিলেন, প্রাদেশিক কংগ্রেসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নেতা শরৎবসুও খুবই আগ্রহী ছিলেন, কিন্তু হিন্দু-মুসলমানের যুক্ত মন্ত্রিসভা গঠিত হতে পারে নি কেন্দ্রীয় কংগ্রেসের হাই কমান্ডের হস্তক্ষেপে। (হাই কমান্ড ব্যাপারটা তখন কংগ্রেস এবং লীগ উভয় সংগঠনেই সংগঠিত হয়ে গেছে।)
চিত্তরঞ্জনের অকালমৃত্যুতে বাংলার স্বতন্ত্র রাজনীতি একদিন বড় রকমের একটা ধাক্কা খেয়েছিল, ১৯৩৭এ সেটা বস্তুত শেষই হয়ে গেল। বাংলা অন্তর্গত হয়ে গেল সর্বভারতের, এবং তার নিজস্ব বক্তব্য বলে কিছু যে থাকবে সে অবকাশ আর রইলো না। সেদিন প্রজা পার্টি ও কংগ্রেস মিলিত হয়ে যদি একটি অসামপ্রদায়িক মন্ত্রিসভা গঠন করতে পারতো এবং এমন যদি হতো যে সুভাষ বসু সর্বভারতীয় না-হয়ে বাংলার রাজনীতিতে থাকতেন, তাহলে রাজনীতির ইতিহাস কোন পথে এগুতো আমরা জানি না, কিন্তু বাংলাকে ভাগ করা অতটা সহজ হতো না, যতটা হয়েছিল, এবং বাংলা ভাগ না হলে, পাঞ্জাবকেও ভাগ করা কঠিন হতো। বস্তুত যাঁরা ভাগ করেছিলেন তাঁরাও বাংলা ও পাঞ্জাবের মানুষেরা দু’টুকরো হতে সম্মত হবেন বলে আস্থা রাখতে অসুবিধা বোধ করছিলেন। লাহোর প্রস্তাব প্রণয়নে ও উত্থাপনে পাঞ্জাবের মুখ্য মন্ত্রী সিকেন্দার হায়াত খান অংশ নিয়েছিলেন, কিন্তু তিনি মোটেই মুসলিম লীগের লোক ছিলেন না; তাঁর দল হলো ইউনিয়নিস্ট পার্টি, যে-দল হিন্দু-মুসলমান ও শিখদের নিয়ে গঠিত ছিল, মূলত জমিদারদেরই দল বটে কিন্তু সামপ্রদায়িকতার দ্বারা আক্রান্ত ছিল না। সিকেন্দার হায়াত পাঞ্জাব আইন সভায় তুমুল করতালির মধ্য দিয়ে ঘোষণা করেছিলেন যে পাকিস্তান বলতে যদি কোথাও মুসলমানের কোথাও হিন্দুর রাজত্ব এবং পাঞ্জাবে নির্ভেজাল মুসলিম শাসন বোঝায় তবে সে-পাকিস্তান তিনি চান না এবং পাঞ্জাব যে পাকিস্তানের মধ্যে হারিয়ে যাবে তাও নয়, পাঞ্জাব থাকবে পাঞ্জাবীদেরই। পাঞ্জাবের জন্য এই ঘটনাকে দুর্ভাগ্যজনকই বলতে হবে যে, হিন্দুস্তান-পাকিস্তান ভাগাভাগির সময়ে তিনি জীবিত ছিলেন না, ১৯৪২এর ডিসেম্বরে তাঁর জীবনাবসান ঘটে, এবং তারপরে পাঞ্জাবে যাঁরা রাজনীতি করছিলেন তাঁদের কারোই ব্যক্তিত্ব তাঁর মাপের ছিল না। বলা বাহুল্য, এতে সবচেয়ে বেশী সুবিধা হয়েছিল জিন্নাহর।
মুসলিম লীগ হাই কমান্ডও যে বাঙালীবিদ্বেষী ছিল তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ওই কমান্ড ফজলুল হককে তো অপ্রাসঙ্গিক করেছেই, জিন্নাহ-অনুগত সোহরাওয়ার্দীকেও ওয়ার্কিং কমিটিতে নেয় নি; এবং ১৯৪৬এর নির্বাচনে যদিও সোহরাওয়ার্দীর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং তিনিই অবিভক্ত বঙ্গের শেষ মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন, তবু দেশভাগের পরে তাঁকে পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী করা হয় নি, করা হয়েছে খাজা নাজিমুদ্দিনকে, যিনি নির্বাচনে কোনো ভূমিকা তো রাখেনই নি, এমনকি নির্বাচনে প্রার্থী পর্যন্ত ছিলেন না, ঘোষণা দিয়েছিলেন যে তিনি রাজনীতি থেকে অবসর নিয়েছেন। তবে এই অতিবিশ্বস্ত নাজিমুদ্দিনকেও জিন্নাহ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সদস্য হিসাবে মনোনয়ন দেন নি। মুসলিম লীগের সবচেয়ে বড় ঘাঁটি যে বাংলা প্রদেশ তার প্রতিনিধিত্ব করবার জন্য যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলকে খুঁজেপেতে বের করেছিলেন। সে-আবিষ্কারে জিন্নাহ তাঁর নাটকপ্রিয়তার পরিচয় দিয়েছিলেন, এবং লোকে ঠিকই চমকে উঠেছিল।
জিন্নাহ যে পাকিস্তানের কথা ভাবতেন সে-পাকিস্তান সম্পর্কে এটা নিশ্চিতরূপে বলা যায় যে সেটা মোটেই পুঁজিবাদী ভিন্ন অন্যকিছু ছিল না। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার জন্য মওলানা ভাসানীও কাজ করেছেন; আসাম প্রাদেশিক মুসলিম লীগের তিনি ছিলেন সভাপতি। ১৯৪৬ সালে জিন্নাহ একবার আসামে গিয়েছিলেন, রেলস্টেশনে মওলানা ভাসানী তাঁর সঙ্গে দেখা করে আসামের কোনো কোনো এলাকার বাসিন্দাদের দুরবস্থার এক মর্মস্পর্শী বিবরণ দেন। মওলানার চোখ দিয়ে তখন অশ্রু ঝরছিল। জিন্নাহর সঙ্গে ছিলেন হাসান ইস্পাহানী, তিনি লিখেছেন যে, মওলানার কথা শুনে তাঁর নিজের পক্ষেও অশ্রু সম্বরণ করা কঠিন হচ্ছিল। পরে রাতের বেলা সার্কিট হাউসে নৈশ আহারের পরে ইস্পাহানী জিন্নাহর কাছে মওলানার সংবেদনশীলতা ও নেতৃত্বের প্রশংসা করতে গিয়ে দেখেন জিন্নাহ সম্পূর্ণ উল্টো কথা বলছেন। তিনি বলেছেন যে মাওলানা ভাসানীর মতো লোকদের দিয়ে আর যাই হোক রাজনৈতিক আন্দোলনের নেতৃত্ব দান চলে না। রাজনীতিতে নবীন শিক্ষার্থী ইস্পাহানীকে প্রবীণ জিন্নাহ বলেন, এটা যেন ইস্পাহানী কখনো না ভোলেন যে, ুচড়ষরঃরপং রং ধ মধসব ড়ভ পযবংং. ওঃ পধষষং ভড়ৎ পড়ড়ষ ঃযরহশরহম ধহফ ঢ়ষধহহরহম.চ৬৪১
কেবল জিন্নাহ নন, বড় রাজনৈতিক দল দু’টি শেষ দিকে দাবাই খেলেছে- নিজেদের মধ্যে, আবার আলাদা আলাদা ভাবে ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে। জিম্মি ছিল চল্লিশ কোটি মানুষের ভবিষ্যৎ। দেশী দুই দলের কোনোটিই জেতে নি, এই অর্থে যে তারা যা চেয়েছিল তা পায় নি, জয় হয়েছে ব্রিটিশের, তারা যা চেয়েছিল তাই ঘটেছে। তেজোদৃপ্ত উভয় দলই অবশ্য নিজেদের পূর্বনির্ধারিত বৃত্তের মধ্যেই থেকে গেছে। সে বৃত্তটা কেবল যে রাজনৈতিক তা নয়, বরঞ্চ মূলতঃ অর্থনৈতিক, হিন্দুস্থান পাকিস্তান কেউই পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ও আদর্শের বৃত্ত ভেঙে বের হয়ে আসতে পারে নি, ওই বৃত্তের ভেতরেই রয়ে গেছে। বৃত্তটা ব্রিটিশ শাসকেরা তৈরী করেছিল-নিজের হাতে এবং নিজের প্রয়োজনে। ১৯৪৭ সালে দেশীয় পুঁজিবাদীদের হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা হস্তান্তরিত হয়েছে, কিন্তু তাতে না এসেছে দেশের স্বাধীনতা, না এসেছে জনগণের মুক্তি।



জনগণের পক্ষের প্রকৃত মিত্র ও শক্তি হবার কথা ছিল কমিউনিস্টদের। সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিষ্পেষণের সত্যটা তাঁদেরই সবচেয়ে ভালো করে জানবার কথা। তাঁরা তা জানতেনও। সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে আপোসের যে কোনো অবকাশ নেই সেটা তাঁরা যেমন তাত্ত্বিক তেমনি বাস্তবিক ভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। জনগণের মুক্তি তাঁদের আন্দোলনের ওপরই অনেকাংশে নির্ভর করছিল। কিন্তু তাঁরা সে-দায়িত্ব পালন করতে পারেন নি। যে জন্য আড়াআড়ি শ্রেণী বিভাজনের জায়গায় খাড়াখাড়ি ধর্মীয় সমপ্রদায়গত বিভাজন বড় হয়ে উঠেছে। সামপ্রদায়িকতা দমিত হতে পারতো জাতিগত সমস্যার মীমাংসা হলেও। ভারত যে বহুজাতিক দেশ এই কথাটা কমিউনিস্টরা শুরু থেকেই যে জোর দিয়ে বলেছেন তা নয়, পরে যখন বলতে শুরু করেছে তখনও ধর্ম নয় ভাষাই যে জাতিগঠনে প্রধান উপাদান তা অত্যন্ত পরিষ্কার করে দেখিয়ে দেন নি। জাতিগঠনে ধর্মেরও যে একটা ভূমিকা আছে সেটা সত্য হলেও সামপ্রদায়িক জাতীয়তাবাদীদের বিপক্ষে দাঁড়িয়ে জাতীয়তাবাদের ভাষাগত ভিত্তিকে রাজনৈতিকভাবে যে ধরনের গুরুত্ব দেওয়া উচিত ছিল তা দিতে তাঁরা সক্ষম হন নি। ফলে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী লড়াইটাকে আপোসহীনতার স্তরে উন্নীত করে তাকে সামাজিক বিপ্লব এবং স্বাধীন জাতিসমূহের যুক্তরাষ্ট্রীয় ভারতবর্ষ গড়ার অভিমুখে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হয় নি। আন্দোলনের নেতৃত্ব রয়ে গেছে সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে আপোসকামী পুঁজিবাদীদের হাতে, যারা ক্ষমতার হস্তান্তর চেয়েছে, গণতান্ত্রিক রূপান্তর চায় নি। একদল চেয়েছে অখণ্ড হিন্দুস্থান, অন্যদলের দাবী অখণ্ড পাকিস্তান; তাদের ভয় ছিল বিত্তবানদের সঙ্গে বিত্তহীনদের শ্রেণী সংগ্রামকে, যে-সংগ্রাম ঘটলে তাদের আধিপত্য ভেঙ্গে পড়তো। ক্ষমতা রূপান্তরিত হবে এবং ভারতবর্ষের বিভিন্ন জাতি স্বাধীনতার ভিত্তিতে প্রকৃত গণতান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত করবে এটা কংগ্রেস ও লীগ কেউই চায় নি। এই একটি ব্যাপারে তাদের ভেতরকার বন্ধুত্বটা ছিল গভীর ও অবিচ্ছেদ্য। দাবাড়ুরা তাই মিলে মিশে বেশ খাতিরজমাতেই ভারতবর্ষকে কেটে দু’টুকরো করলেন, ডমিনিয়ন স্ট্যাটাস ও ব্রিটিশ কমনওয়েলথে অন্তর্ভুক্ত থাকবার ‘সুযোগ’ হাতে পেয়ে তাকেই স্বাধীনতা বলে ঘোষণা করলেন। পরাভব ঘটলো জনমুক্তির আকাঙ্ক্ষার।
কমিউনিস্টরা কেন সফল হন নি তার বেশ কয়েকটি কারণ নিশ্চয়ই রয়েছে। তাঁদের আত্মত্যাগ কম নয়। দল হিসাবে এক পর্যায়ে কংগ্রেস ও লীগের পরেই তাঁরা স্থান করে নিয়েছিলেন; এবং শেষ পর্যন্ত রাজনীতিতে মূলধারা তাঁদেরই হবার কথা ছিল। না-হবার কারণগুলো যেমন বাইরের তেমনি ভেতরেরও, যেমন বিষয়গত তেমনি আত্মগত। বাইরে ছিল রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন এবং ধনিক শ্রেণীর প্রতিনিধি ভারতীয় কংগ্রেস, হিন্দু মহাসভা ও মুসলিম লীগের বিরোধিতা; আর ভেতরে ছিল আত্মগত কারণ, যেমন নেতৃত্বের শ্রেণীগত দুর্বলতা, দলের তাত্ত্বিক বিভ্রান্তি এবং পরনির্ভরতা।
(চলবে)

তথ্যসূত্র

৬২৫. অনঁষ কধষধস অুধফ, প্রাগুক্ত, ঢ় ২০১
৬২৬. ঘ. গধহংবৎময (বফরঃড়ৎ-রহ-ঈযরবভ), ঈড়হংঃরঃঁঃরড়হধষ জবষধঃরড়হং নবঃবিবহ ইৎরঃধরহ ধহফ ওহফরধ : ঞযব ঞৎধহংভবৎ ড়ভ চড়বিৎ, খড়হফড়হ, ১৯৭১-৮৩ াড়ষ ী, ঢ় ৯৩৪
৬২৭. ঐ, ঢ় ৯৪৫
৬২৮. ডধাবষষ, প্রাগুক্ত, ঢ় ২৭
৬২৯. ঐ, ঢ় ১৪৭
৬৩০. হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, ‘হিন্দু ও মুসলিম’, অনিল বিশ্বাস (সম্পাদিত), বাংলার কমিউনিস্ট আন্দোলন দলিল ও প্রাসঙ্গিক তথ্য, কলকাতা, ২০০৪, পৃ ৪৩৬
৬৩১. ঐ
৬৩২. ঐ
৬৩৩. উদ্ধৃত, ঞধল ঁষ-ওংষধস ঐধংযসর, চবধংধহঃ টঃড়ঢ়রধ, ঞযব ঈড়সসঁহধষরুধঃরড়হ ড়ভ ঈষধংং চড়ষরঃরপং রহ ঊধংঃ ইধহমধষ ১৯২০-১৯৪৭, উযধশধ, ১৯৯৪, ঢ় ১২৪
৬৩৪. হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, প্রাগুক্ত, পৃ ৫৩৮
৬৩৫. গধহংবৎময, প্রাগুক্ত, ঢ়ঢ় ৮২৫-২৬
৬৩৬. ঐ, ঢ় ৯১৮
৬৩৭. ঐ, ঢ় ৫২৩
৬৩৮. ঝযুধসধ চৎধংধফ গড়ড়শধৎলবব, প্রাগুক্ত, ঢ় ৬৩
৬৩৯. গধহংবৎময, প্রাগুক্ত, াড়ষ ীরর, ঢ় ৬০১
৬৪০. ডড়ষঢ়বৎঃ, প্রাগুক্ত, ঢ় ২৩
৬৪১. ঐ, ঢ় ২৩৬
৬৪২. ওংঢ়ধযধহর, প্রাগুক্ত, ঢ়ঢ় ১২০-২১