শয়তানের ইতিহাস

জিসান হাসান

বিদ্রোহী ফেরেস্তা এবং মানবজাতিকে প্ররোচনাকারী হিসেবে শয়তানের ব্যাপারটির সাথে সকলেই পরিচিত, আদম আর হাওয়াকে প্ররোচিত করে আদিপাপ ঘটিয়েছিল সে-ই। মজার বিষয় হলো, বাইবেলের পর্যালোচনায় দেখা যাবে, শয়তান সম্পর্কে আদি দৃষ্টিভঙ্গি এটা ছিল না মোটেই; বরং তা ধারাবাহিক ধর্মতাত্ত্বিক বিকাশেরই ফল। শয়তান বিষয়ে মুসলমানদের সাধারণ অভিজ্ঞান হল আদমকে সেজদা করতে অস্বীকার করার মাধ্যমে ঈশ্বরদ্রোহ দিয়ে তার প্রাথমিক ভূমিকা আরম্ভ হয়, এরপর আদমকে নিষিদ্ধ ফল খাওয়ানো এবং স্বর্গ হতে বিতাড়নের দায়ভাগীও সে-ই। বাইবেলের আদি বর্ণনা কিন্তু একেবারেই আলাদা; সেখানে শয়তান নয়, আদম আর হাওয়াকে নিষিদ্ধ ফলের ফাঁদে ফেলে সাপ। নিম্নেউদ্ধৃত বাইবেলীয় সৃষ্টিতত্ত্বের কিতাবে শয়তানকে কোথাও পাওয়া যাবে না।

প্রভু ঈশ্বরের সৃষ্ট অন্য যে কোন জীবজন্তুর মধ্যে সাপ ছিল সবচেয়ে ধূর্ত। এই সাপ একদিন সেই নারীকে বলল, “ঈশ্বর কি সত্যি তোমাদের বলেছেন, ‘তোমরা বাগানের কোন গাছ থেকে কিছু খেতে পারবে না?’ নারী শয়তানকে প্রত্যুত্তর দিল, ‘আমরা বাগানের গাছগুলো থেকে ফল খেতে পারি; কিন্তু ঈশ্বর বলেছেন, “বাগানের মাঝখানের গাছটি থেকে তোমরা ফল খেতে পারবে না, এমনকি তোমরা সেটা স্পর্শও করবে না, করলে তোমরা মারা যাবে।” কিন্তু সাপটি নারীটিকে বলল, “তুমি মৃত্যুবরণ করবে না; কেননা ঈশ্বর জানেন যখন তুমি এই ফল খাবে, তোমার চোখ উন্মোচিত হবে, আর তুমি ঈশ্বরের মতই হয়ে উঠবে, শুভ আর অশুভকে চিনতে শিখবে।” কাজেই নারীটি যখন দেখল গাছটির ফল খাওয়া ভাল হবে, আর এটা দেখতেও দারুণ সুন্দর, আর জ্ঞানী হবার জন্য এটি আকাঙ্ক্ষিত, তখন সে এর ফল পেড়ে নিল এবং ভক্ষণ করল; আর সে তার স্বামীকে কিছুটা খেতে দিল, সেও তার সাথেই ছিল, আর সেও তা খেল। (জেনেসিস ৩:১-৬)

এই লংঘনের ফলস্বরূপ সংশিষ্ট সকলকেই প্রভু অভিশপ্ত করলেন; পুরুষ, নারী ও সর্প তিনজনকেই। সাপকে প্রদত্ত অভিশাপটি কৌতূহলোদ্দীপক :

নারী বলল, “সর্প আমাকে ধোঁকা দিয়েছে, আর আমি তা ভক্ষণ করেছি।” প্রভু ঈশ্বর সাপকে বললেন, “তুমি এটা করেছ বলে সকল প্রাণী আর বন্যজন্তুর মাঝে তুমি হবে অভিশপ্ত; জীবনভর পেটের ওপর ভর দিয়ে চলতে হবে তোমাকে, আর ধূলি হবে তোমার খাদ্য। আমি তোমার আর এই নারীর মাঝে, আর তোমার সন্তান ও তার সন্তানগণের মাঝেও শত্রুতা জন্মাবো; সে তোমাকে মস্তকে আঘাত করবে, আর তুমি তার গোড়ালিতে আঘাত হানবে।” (জেনেসিস ৩:১৩-১৫)

সাপের প্রতি প্রদত্ত অভিশাপ এই যে এটা সাপ হবে; কাজেই সে ধূলিতে পেটের ওপর হামাগুড়ি দিয়ে চলার শাস্তি প্রাপ্ত হবে এবং চিরকাল তাকে মাড়িয়ে যাওয়া হবে। এ থেকেই এটা খুব স্পষ্ট হয় যে, এই অনুচ্ছেদে মোটেই শয়তান নিয়ে নয়, বরং নিছক সাপ নিয়েই বলা হচ্ছে। সাপকে স্পষ্ট করেই একটা প্রাণী হিসেবে বলা হচ্ছে যে “অন্য যেকোন প্রাণী থেকে ধূর্ত”, এবং কোন ফেরেস্তা বা জিন বিষয়ে এখানে বলা হচ্ছে না। তাহলে আদমের প্ররোচনাকারী বিদ্রোহী ফেরেস্তা হিসেবে শয়তানের ধারণাটা এলো কোথা থেকে? বাইবেলীয় সৃষ্টিতত্ত্বের গ্রন্থে অবশ্য এক “বিদ্রোহী ফেরেশতা”র গল্প আছে, মহাপ্লাবনের আগে ফেরেশতা আর মানবের অবৈধ মিলনে তা এভাবে বর্ণিত আছে :

মানুষ যখন পৃথিবীর বুকে বহুগুণে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হল, আর তাদের কন্যারা জন্ম নিতে থাকল, ঈশ্বরের পুত্ররা দেখল যে তারা আকর্ষণীয়; আর তারা তাদের মাঝ থেকে যাদের পছন্দ হত তাদের স্ত্রীস্বরূপ গ্রহণ করতো...তারপর প্রভু দেখলেন যে পৃথিবীর বুকে মানুষের নাফরমানী দারুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। (জেনেসিস ৬:১-৪)

মানবের সাথে ফেরেশতাদের এই দৃশ্যতঃ পাপপূর্ণ মিশ্রণকে সেই সব অশুভ পরিস্থিতিগুলোর একটি হিসেবে উত্থাপন করা হচ্ছে যেগুলোকে প্রভু মহাপ্লাবনের মাধ্যমে শোধন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। যাহোক, ফেরেশতাদের (ওপরে ব্যবহৃত “ঈশ্বরের পুত্র” অভিধাটি স্পষ্টতই “স্বর্গীয় আত্মাদের”, অর্থাৎ ফেরেশতাদের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে) কামজর্জরিত বিদ্রোহের এই অস্পষ্ট ভাসাভাসা গল্পের সাথে যুক্ত হবার আগ পর্যন্ত শয়তানের সত্তাটি বিদ্রোহী সত্তা ছিল বলে মনে হয় না, বরং সে ছিল একজন ফেরেশতাই, যার দায়িত্ব ছিল মানুষকে পাপের দায়ে “অভিযুক্ত” করার ভূমিকা পালন। ফেরেশতাদের ওপরই এই রকম দায়িত্ব অর্পণ করা যেত, কেননা বনি ইসরায়েলীদের দৃষ্টিতে ঈশ্বর একটি স্বর্গীয় পরিষদ দ্বারা পরিব্যপ্ত থাকতেন, অনেকটা যেমন ইসরায়েলীদের রাজারা থাকতেন উপদেষ্টা-পরিবেষ্টিত।
এরকমেরই একজন স্বর্গীয় উপদেষ্টা ছিল শয়তান (হিব্রু ভাষায় স্যাটান, ‘যিনি অভিযুক্ত করেন’)। দৃশ্যত তার ভূমিকা ছিল অভিযোগ উত্থাপনকারী একজন স্বর্গীয় আইনজীবীর সমতুল, যিনি মানুষের অন্যায় তুলে ধরেন (এবং এভাবে তাদেরকে পাপের দায়ে “অভিযুক্ত করেন”)। নিম্নে উদ্ধৃত বাইবেলের জাকারিয়া পুস্তকে এই ভূমিকাটি স্পষ্ট করেই উল্লেখিত আছে :

তারপর তিনি আমাকে দেখালেন মহা ইমাম যশুয়া প্রভুর ফেরেস্তাদের সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছেন, আর শয়তান তার হাতের ডানদিকে দাঁড়িয়ে তাঁকে অভিযুক্ত করছে। (জাকারিয়া ৩:১)

অভিযোগকারী হিসেবে শয়তানের ভূমিকাকে আরও বিকশিত করার জন্য তার যুক্তিসঙ্গত বিবর্তন হলো প্রথমে মানুষকে পাপের দায়ে অভিযুক্ত করা, আর পরবর্তীতে মানুষ পাপে আকৃষ্ট হয় কিনা তা পরীক্ষা করার জন্য ঈশ্বরকে প্ররোচিত করা এবং এভাবে তার নিজের অভিযোগকে সঙ্গত প্রমাণ করা। ঠিক এটাই ঘটেছে বাইবেলের আইয়ুব নবী সম্পর্কিত গ্রন্থটিতে।

ঈশ্বর শয়তানকে বললেন, “তুমি কি আমার বান্দা আইয়ুব-কে খেয়াল করেছো? দুনিয়ায় তার মত আর কেউ নাই, সে একজন দোষমুক্ত এবং ঋজু মানুষ যে মাবুদকে ভয় পায় এবং নাফরমানী থেকে দূরে থাকে।” তখন শয়তান উত্তর করলো, “...কিন্তু আপনি আপনার হস্ত প্রসারিত করে তার সব কিছু ধ্বংস করে দিন, তখন সে আপনাকে মুখের ওপর অভিসম্পাত দেবে।” (আইয়ুব ১:৮ এবং ১১)

এই বাক্যবিনিময়ের ফল হলো আইয়ুব গবাদি, উট এবং ভৃত্যসমেত তার সন্তানাদি সকলই হারালেন। যাহোক, আইয়ুব এই সকল পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েও তার ঈমানে অটল থাকলেন। এরই ফলশ্রুতি বেহেস্তী দরবারে আরেকটি আলোচনা;

ঈশ্বর শয়তানকে বললেন, ‘তুমি কি আমার ভৃত্য আইয়ুবকে খেয়াল করেছো?...সে এখনও তার একাগ্রতা ধরে রেখেছে, যদিও তুমি আমাকে তার বিরুদ্ধে উস্কে দিয়েছিলে যাতে আমি কোন কারণ ছাড়াই তাকে ধ্বংস করি।” (আইয়ুব ২:৩)

শয়তান এভাবে মানুষকে পাপাচারের দায়ে অভিযুক্ত করা থেকে অগ্রসর হয়ে আইয়ুব নবীর পর্বে মানুষকে প্ররোচিত করার জন্য ঈশ্বরকে উস্কে দিলো যাতে তার উত্থাপিত এই পাপাচারের অভিযোগ সঠিক বলে প্রতীয়মান হয়। কিন্তু আদি প্ররোচক হিসেবে শয়তানের ব্যক্তিত্বটিকে ওই পর্যন্ত বাইবেলের কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না, যে কি-না আদমের পাপের জন্য তো বটেই, মানবজাতিকে পরবর্তী সকল প্ররোচনার জন্যও দায়ী। এটা বাইবেলীয় বর্ণনাগুলোর উদ্দেশ্যমূলক পুনর্লিখনের আগে ঘটেনি, যেটি করা হয়েছিল একটি সুনির্দিষ্ট ধর্মতাত্ত্বিক প্রশ্নের উত্তর প্রদান করার জন্য। প্রশ্নটি হল পাপের দায়ভার কার? এটা ঘটলো ওল্ড টেস্টামেন্টের স্যামুয়েল কিতাবে। মুসা নবীর পশ্চাৎগমন করে করে মিশর থেকে বেরিয়ে নিজেদের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত ইসরায়েলী জাতির আদিতম দিনগুলোর একটি ধর্মীয় ইতিহাস বর্ণিত হয়েছে এই গ্রন্থে, আর এতে আছে নিম্নবর্ণিত এই অনুচ্ছেদটি :

আবারও ইসরায়েলীদের বিরুদ্ধে প্রভুর ক্রোধ জাগ্রত হল, আর তিনি দাউদকে তাদের বিরুদ্ধে উস্কে দিলেন এই বলে, “যাও, ইসরায়েল আর ইহুদার মানুষদের শুমারী কর।” (স্যামুয়েলের দ্বিতীয় পুস্তক ২৪:১)

বাইবেল অনুযায়ী (লোক) গণনা বা আদমশুমারীর সাধারণ উদ্দেশ্য যুদ্ধের লক্ষ্যে বাহিনী গড়ে তোলা। যুদ্ধ ও রক্তপাতের জন্য বাহিনী গড়ে তোলার কাজটিও স্যামুয়েল নবীর সেই পাপের হুঁশিয়ারীগুলোর মধ্যে একটি, যেগুলো ইসরায়েলীদের ওপরে কাউকে রাজা হিসেবে নিয়োগ দেয়া হলে তার দ্বারা সংঘটিত হবে।

কাজেই স্যামুয়েল প্রভুর সকল বাণী মানুষের কাছে বললেন, তারা তাঁর কাছে একজন রাজা চাইছিল। তিনি বললনে, “তোমাদের ওপর যারা রাজত্ব করবে সেই রাজাদের ধরন হবে এই রকম: সে তোমাদের সন্তানদের নিয়ে যাবে এবং তার রথ ও ঘোড়সওয়ারীর কাজে এবং তার রথের পেছনে দৌড়ানোর কাজে তাদেরকে নিযুক্ত করবে। (স্যামুয়েলের প্রথম পুস্তক ৮:১০-১১)

কিন্তু বুক অব ক্রনিকলস-এ ওপরের ঐতিহাসিক বর্ণনাটির পুনর্কথন করতে গিয়ে পরবর্তীকালে একজন বাইবেলীয় গ্রন্থকার একটি ধর্মতাত্ত্বিক সঙ্কট উপলব্ধি করেন; ঈশ্বর কীভাবে দাউদ-এর পাপের জন্য দায়ী হতে পারেন? আদমশুমারী যদি সত্যিই পাপাচার হয়, তবে অবশ্যই এই পাপের দায় ঈশ্বরের নয়, তা দাউদের ওপরই বর্তায়। এটাই স্বাধীন ইচ্ছা আর পাপাচারের মধ্যবর্তী সেই প্রাচীন সমস্যা, একেশ্বরবাদের পাটাতনে যেটা সর্বদাই উঁকি মারে; চূড়ান্তভাবে ঈশ্বর অবশ্যই এইসব কিছু ঘটানোর ইচ্ছা করেন (না-হলে ওসব ঘটতো না), কিন্তু মানুষও অবশ্যই তার নিজের পাপের জন্য দায়ী থাকবে। আধুনিক একেশ্বরবাদীরা সাধারণভাবে একমত যে, এই সমস্যাটির কোনো সন্তোষজনক সমাধান নেই; এটা সেই বিষয়গুলোর মাঝে একটি যেখানে তারা হাল ছেড়ে দিয়ে মানবজাতির নিজের কাজের দায়ভার নেবার মতো পর্যাপ্ত স্বাধীন ইচ্ছা থাকার ওপর গুরুত্বারোপ করে খাঁটি যুক্তিবাদের আশ্রয় নেয়। কিন্তু এই ধর্মতাত্ত্বিক জটিলতা শেষ পর্যন্ত প্ররোচক রূপে শয়তানের এমন একটা বিকাশ ঘটালো, মানুষকে যে (দাউদসহ) অশুভের দিকে টেনে নেয়। এভাবে অশুভকে ঈশ্বরের ইচ্ছার সাথে সর্বদা সম্পর্কিত রাখার জটিলতা পরিহার করা গেল। দাউদের আদমশুমারীর সেই একই ইতিহাস বুক অব ক্রনিকলস-এ পুনর্কথিত হলো নিম্নরূপে, এবং এটাই হিব্রু বাইবেলে একমাত্র বর্ণনা যেখানে মানবজাতির পাপের জন্য শয়তানকে সত্যিকার অর্থে দায়ী করা হয়েছে :

শয়তান ইসরায়েলের বিরুদ্ধে উদ্যত হলো, আর দাউদকে ইসরায়েলের আদমশুমারী করতে উস্কে দিল। (ক্রনিকলস প্রথম পুস্তক ২১:১)

মানবজাতির চিরস্থায়ী প্ররোচক হিসেবে শয়তানের ক্রমবিকাশ একটি কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় তুলে ধরে। ধর্মকে একটি স্থির অপরিবর্তনীয় সত্য হিসেবে বিশ্বাস করে রক্ষণশীল মুসলমানরা সাধারণত প্রথাগত ইসলামের প্রতি কঠোর আনুগত্যের ওপর গুরুত্বারোপ করে থাকেন। শয়তানের ইতিহাসের উপরিউক্ত বিশ্লেষণ কিন্তু দেখায় যে শয়তানের ধর্মীয় বয়ানের মতোই ইসলামের ধর্মীয় বয়ানও সময়ের প্রেক্ষিতে বহু পরিবর্তনের ফসল। এটা ধর্মকে গতিশীল হিসেবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিকেই সমর্থন করে, যা একটি সত্য হিসেবে সময়ের ধারায় বিবর্তিত হয়, ঠিক যেমন হয়েছে শয়তানের চরিত্রটিও।
হিব্রু বাইবেলে শয়তানের সংক্ষিপ্ত উপস্থিতির পর্যবেক্ষণ এটাই দৃশ্যমান করে যে, আদমকে পাপে প্ররোচনাদানকারী বিদ্রোহী ফেরেশতা হিসেবে শয়তানের পূর্ণ ভূমিকা ক্রমবিবর্তনের মধ্য দিয়েই বিকশিত হয়েছে। ইহুদী বাইবেলে শয়তান আদম ও হাওয়ার গল্পের সর্প চরিত্র হিসেবে চিহ্নিত হয় নি, সেখানে ওটা স্রেফ একটা সাপই। অথবা শয়তানকে প্রত্যক্ষভাবে লালসাপূর্ণ ফেরেশতাদের তালিকাভুক্তও করা হয়নি যারা মহাপ্লাবনের পূর্বে মানবীদের গর্ভবতী করেছিল, যেটি বাইবেলের একমাত্র বর্ণনা যাকে ফেরেশতাদের বিদ্রোহ বলা চলে। বহু শতাব্দী ধরে তাকে দৃশ্যত নালিশ উত্থাপনকারীর ভূমিকা পালনরত ঈশ্বরের অনুগত ভৃত্যদের একজন হিসেবেই গণ্য করা হতো, যে মানব জাতির পাপগুলো ধরিয়ে দিত; তাইতো তার উপাধি অভিযোগ-উত্থাপনকারী। কেবলমাত্র পরবর্তীতেই সে মানুষকে পাপের দায়ে অভিযুক্তকারীর ভূমিকা থেকে তাদেরকে পাপে প্ররোচনাদানকারী রূপে বিবর্তিত হয়, এটা এমন একটা পরিবর্তন স্পষ্টতই যা ঘটলো ঈশ্বরকে বুক অব ক্রনিকলস-এর ইসরায়েলী রাজাদের পাপাচারের দায় থেকে মুক্ত করার বাসনায়।
বাইবেল-উত্তর ইহুদী রচনাতেই কেবল আদম ও হাওয়াকে যে প্ররোচিত করেছিল এবং মানবনারীদের যারা গর্ভবতী করেছিল সেই বিদ্রোহী ফেরেশতাদের মাঝে একটি যোগসূত্র স্থাপন করা হয়েছিল। এনখ-এর প্রথম পুস্তকে এই উভয় অপরাধই বিদ্রোহী ফেরেশতাদের অন্যায় কাজের মাঝে লিপিবদ্ধ হয়েছে, যদিও শয়তান নামটি তখনও ব্যবহৃত হয় নি।

দ্বিতীয়জনের নাম ছিল আসবে’ল; সে ছিল তাদের মাঝে একজন যে স্বর্গীয় ফেরেস্তাদের সন্তানদের অশুভ পরামর্শ দিল এবং তাদেরকে অসৎ পথে পরিচালিত করলো, যাতে তারা তাদের দেহকে মানব-কন্যাদের দ্বারা কলুষিত করে। তৃতীয় জনের নাম ছিল গাদেরে’ল; এই হলো সে যে ঈভকে কুপথে চালিত করেছিল। (ইনখ-এর প্রথম পুস্তক ৬৯:৬)

একজন ফেরেশতা কেন ঈভকে বিপথগামী করবে এই প্রশ্নটা রয়েই গেল; এই সঙ্কটটির নিরসন করা হয়েছিল শয়তানের আদমকে সেজদা করতে অস্বীকার করার গল্পটি উদ্ভাবন করে, যে গল্পটি প্রথম দৃশ্যমান হয় আদম ও ঈভ-এর বাইবেল পরবর্তী জীবনচরিত থেকে :

শয়তান উত্তর দিল,...‘প্রভু ঈশ্বর বললেন, ‘আদম, শ্রবণ করো। আমি তোমাকে বানিয়েছি আমাদের আদল আর আকৃতিতে।’ এবং জিবরায়েল বাইরে গেলেন এবং সকল ফেরেস্তাদের ডেকে বললেন, ‘প্রভু ইয়াহইয়ের আকৃতিকে ভজনা কর।’ আর আমি বললাম...‘আমি আমা হতে হীনতর এবং অর্বাচীন কাউকে ভজনা করব না...তার সৃষ্টির পূর্বেই আমি সৃষ্ট হয়েছি। তার উচিত আমাকে ভজনা করা।’...আর প্রভু ঈশ্বর আমার ওপর ক্রোধান্বিত হলেন এবং আমার ফেরেস্তাদের সাথে আমাকে আমাদের গৌরব থেকে বঞ্চিত করলেন;...কাজেই আমি তোমার স্ত্রীকে প্রতারণাপূর্বক অভিভূত করেছি এবং তোমাদের বহিষ্কার ঘটিয়েছি...যেমন আমি নিজেই বহিষ্কৃত হয়েছি।” (আদম ও ঈভের জীবনচরিত, ১৩-১৬)

একবার এটা যখন করা গেল, তখন শয়তানকে বেহেস্তের সেই প্ররোচক সাপের সাথে একাকার করাটা খুব সহজ একটা পদক্ষেপ মাত্র। কাহিনীটির প্রাচীনতম সংস্করণগুলোতে সাপটি এখনও কেবলমাত্র একটা সাপই, এবং সে নিজেও এই প্রতারণাটি করার জন্য শয়তান কর্তৃক প্ররোচিত।

এবং শয়তান সর্পকে উদ্দেশ্য করে বলল, এই কথা... “...আমি শুনেছি তুমি সকল পশু হতে জ্ঞানী...তুমি কেন বেহেস্তের ফলগুলো বাদ দিয়ে আদমের আগাছা গুলো ভক্ষণ করো? ওঠো এবং অগ্রসর হও, আর চলো তার স্ত্রীর মাধ্যমে আমরা তাকে স্বর্গোদ্যান থেকে বিতাড়ন করি, যেমনটি আমরা তার মাধ্যমে বিতাড়িত হয়েছি... আমার অনুগত হও, আর আমি তোমার মুখ দিয়ে এমন শব্দ উচ্চারণ করি যার সাহায্যে তুমি তাকে প্রতারিত করতে সক্ষম হবে।” (আদম ও ঈভের জীবনচরিত, ১৬)

খ্রিস্টান নিউ টেস্টামেন্টের সময় নাগাদ শয়তানের প্ররোচক ভূমিকাটি সম্পূর্ণরূপে প্রতিষ্ঠিত।

(যিশু) চল্লিশ দিবস যাবত মরুভূমিতে ছিলেন, শয়তান কর্তৃক প্ররোচিত অবস্থায়। (মার্ক-এর সুসমাচার, ১: ১৩)

সুসমাচার এবং বাইবেল-পরবর্তী ইহুদী প্রথার সাথে সামঞ্জস্য রেখেই কোরআনে শয়তানের জন্য প্ররোচক বিদ্রোহী রূপে একটি পূর্ণবিকশিত ভূমিকা রয়েছে। এখানে শয়তানকে উল্লেখ করা হয়েছে দু’টি নামবাচক বিশেষ্য দ্বারা; হিব্রু “শয়তান” শব্দের আরবী রূপ শাইতান, এবং ইবলিশ, যা খুব সম্ভবত ডেভিল শব্দটির গ্রীক রূপের আরবী (ডায়াবোলোস) সংকোচন, শব্দটি হয়তো বা বাইবেলের গ্রীক অনুবাদ ব্যবহারকারী ইহুদী ও খ্রিস্টানরা আরবে নিয়ে এসেছিল। কোরআনে শয়তানের চিত্রণসম্বলিত সুরাগুলোর দিকে আমরা এবার নজর দিতে পারি :

নিশ্চয়ই আমরা মানুষকে বানিয়েছি কাদামাটির একটি ছাঁচ দিয়ে, আর আগেই জ্বিন বানিয়েছি আগুনের শিখা থেকে। আর যখন মাবুদ ফেরেস্তাদের বললেন, ‘দেখো, আমি কাদামাটির ছাঁচ দিয়ে মাটির তৈরী এক নশ্বর জীব সৃষ্টি করছি। আমি যখন তার আকৃতি দিয়ে ফেলবো, আর আমার আত্মাকে তার ভেতর ভরে দেব, তখন তোমরা উপুড় হয়ে তার সামনে নতজানু হবে!’ তারপর সেই ফেরেস্তারা সকলেই নিজেদের নতজানু করল, কেবল ইবলিশ ছাড়া; সে নতজানু হওয়াদের মাঝে অন্তর্ভুক্ত হতে রাজি হল না। তিনি বললেন, ‘ইবলিশ, তোমার সমস্যাটা কি, যে তুমি নতজানুদের মাঝে নেই?’ সে বলল, ‘আমি নিজেকে কখনোই একজন নশ্বরের সামনে নতজানু করব না যাকে আপনি কাদামাটির একটি ছাঁচে মাটি দিয়ে বানিয়েছেন।’ তিনি বললেন, ‘তাহলে তুমি এখান থেকে চলে যাও; তুমি অভিশপ্ত। তোমার উপর এই অভিশাপ বহাল থাকবে কিয়ামতের আগ পর্যন্ত।’ ...সে বলল, ‘প্রভু, যেহেতু আপনি আমাকে কলুষিত করছেন আমিও তাদের ভাল সবকিছুকে ধুলিসাৎ করবো, আর আমি তাদের কলুষিত করবো, তাদের সকলকে, কেবল আপনার বান্দাদের মাঝে তাদের ছাড়া যারা উৎসর্গপ্রাণ।’ (কোরআন ১৫:২৬-৪০)
আর আমরা বললাম, ‘আদম, তুমি এবং তোমার সঙ্গিনী এই বাগানের অধিকারী হও এবং যা খুশি ভক্ষণ কর, কিন্তু এই বৃক্ষের কাছে এসো না, যাতে তোমরা নাফরমানদের অন্তর্ভুক্ত না হও।’ তখন শয়তান তাদের কাছে তাদের নিজেদের শরীরের যে লজ্জাকর অংশ লুকিয়ে রাখা হয়েছিল তা তাদের কাছে উন্মোচিত করার জন্য তাদের গোপনে ফুসলানো শুরু করল। সে বলল, ‘তোমাদের মাবুদ এই বৃক্ষ থেকে তোমাদের বিরত রেখেছেন যাতে তোমরা ফেরেস্তাদের মত না হতে পার, অথবা তোমরা যেন অমর না হয়ে যাও।’ আর সে প্রতিজ্ঞা করে বলল, ‘সত্যি সত্যিই আমি তোমাদের একজন নিষ্ঠাবান পরামর্শক।’ এভাবে সে তাদের বিভ্রান্তির পথে পরিচালিত করল; আর যখন তারা বৃক্ষটির ফলের স্বাদ গ্রহণ করল তখন তাদের লজ্জাকর অংশ তাদের কাছে উন্মোচিত হয়ে পড়ল, কাজেই তারা নিজেদের দেহ উদ্যানের পাতা দিয়ে আবৃত করল। অতঃপর তাদের মাবুদ তাদেরকে ডেকে পাঠালেন, ‘আমি কী তোমাদের জন্য এই বৃক্ষ নিষিদ্ধ করিনি, আর বলিনি, “নিশ্চিতভাবেই শয়তান তোমাদের ঘোষিত শত্রু”?’ (কোরআন ৭:১৮-২৩)

শয়তানের উপরোক্ত ঐতিহাসিক বিবর্তনের দিকে তাকালেই এর পেছনকার অভিলাষটি স্পষ্ট হয়; শয়তান তার বর্তমান ভূমিকাটি গ্রহণ করেছে, কেননা ঈশ্বরকে দায়ী না-করেই পাপের ব্যাখ্যা দিতে হবে। ঈশ্বরের কাছ থেকে পাপের দায়ভার গ্রহণ না-করা পর্যন্ত শয়তানের পৌরাণিক চরিত্রটি বহু শতাব্দী ধরে বিস্তৃত হয়েছে, এবং কোরআনও এই ধর্মতাত্ত্বিক ব্যাখ্যাই গ্রহণ করেছে। এই পৌরাণিক ভাষার খুঁটিনাটি বহু শতাব্দীব্যাপী ইহুদী প্রথার বিকাশেরই ফল যা কোরআন তার নিজের ইতিহাস হিসেবেই আত্মীকৃত করেছে।
আদম, ঈভ ও সাপের গল্পটির উৎস যেখানে আদিতম বাইবেলীয় বর্ণনার দলিল (“জে” উৎস হিসেবে অভিহিত, কেননা এতে ঈশ্বরের প্রাচীন ইসরায়েলীয় নাম ‘জিহোভা’ অথবা হিব্রুতে ‘ইয়াহওয়ে’ ব্যবহৃত হয়েছে) এবং সম্ভবত এটা ১২০০-১০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ নাগাদ ইসরায়েলীদের একটি জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশের সমবয়েসী। শয়তানের পূর্ণতর বাইবেলীয় বিকাশ ঘটেছিল অ্যাপোক্যালিপটিসিজম-এর প্রেক্ষিতে, এটি একটি ধর্মীয় আন্দোলন, খ্রিস্টপূর্ব ২য় শতকে ইহুদীদের মাঝে যার আবির্ভাব ঘটেছিল। একটি জটিল আন্দোলন হলেও অ্যাপোক্যালিপটিসিজমকে দেখা যায় ঈশ্বরের সাথে ইব্রাহিম ও মুসা নবীর চুক্তির ব্যর্থতার ব্যাখ্যা হিসেবে। ঈশ্বরের সাথে ইসরায়েলী জাতির আদি সমঝোতাটি ছিল ধর্মের একটি জাগতিক, গোত্রগত বোঝাপড়া যাতে এই শর্তের ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছিল যে, ইসরায়েল ইহাহওয়ের উপাসনা করলে পুরস্কারস্বরূপ তাদেরকে একটি জনবহুল ও শক্তিশালী জাতিতে পরিণত করা হবে। যাহোক, ইসরায়েল ও ইহুদা রাজ্য অ্যাসিরিয়া ও ব্যবিলনীয় সাম্রাজ্য কর্তৃক খ্রিস্টপূর্ব ৮ম ও ৬ষ্ঠ শতকে অধীনস্থ হবার পর ইসরায়েলী স্বাধীনতা আর কখনো পুনরার্জিত হয়নি, ফলে ঈশ্বরের সাথে তাদের সম্পর্কের নতুন বোঝাপড়ার প্রয়োজনীয়তাটা অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়েছিল। অ্যাপোক্যালিপটিসিজম একটি সমাধান পেশ করেছিল; পৃথিবীতে জাগতিক শক্তিগুলোর সাথে ইসরায়েলীদের সংগ্রাম হচ্ছে স্বর্গে ঈশ্বর ও বিদ্রোহী ফেরেশতাদের লড়াইয়েরই প্রতিফলন, কাজেই স্বর্গীয় লড়াইটি সমাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত জাগতিক লড়াই নিষ্পন্ন হবার আশা করা যায় না। অ্যাপোক্যালিপটিসিজম-এর প্রয়োজন ছিল একটি বিদ্রোহী ব্যক্তিত্বের যে ঈশ্বরের বিরোধিতা করবে, এবং শয়তানের মাঝে তারা সেই ব্যক্তিত্বটিকে পেল, যাকে মানবজাতির গোটা ইতিহাস জুড়ে পাপের জন্য দায়ভার দেয়া হলো। অ্যাপোক্যালিপটিসিজম ইহুদীবাদে আরও অনেক গুরুতর বদল নিয়ে আসে, বিশেষতঃ এই বিশ্বাস যে একটি “বিচার দিবস” আসবে যা ঐশী ও জাগতিক এই উভয় লড়াইয়ের সমাপ্তি চিহ্নিত করবে; একই রকমভাবে জন্ম হলো মৃত্যুপরবর্তী জীবনের, যার প্রয়োজন ছিল নিষ্ঠাবান ইহুদীদের পুরস্কৃত করার জন্য, কেননা তাদেরকে জীবদ্দশায় একটি স্বাধীন ও সমৃদ্ধশালী ইসরায়েলী জাতি উপহার দেয়াটা আর হচ্ছে না। কিন্তু এগুলো ভিন্ন প্রসঙ্গ।
জরুীর উপলব্ধি হলো কোরআনে শয়তানের ব্যাপারটি জটিল একটি ধর্মতাত্ত্বিক বিকাশের চূড়ান্ত পরিণতি। আদম ও শয়তান এবং স্বর্গোদ্যান হতে বিতাড়নের ব্যাপারটি কোরানের বিশ্ববীক্ষায় কেন্দ্রীয় অবস্থানে রয়েছে। এই বিবরণ নিজেই কালে কালে বিবর্তিত হয়ে ঐশীবাণীর অপরিবর্তনীয়তার পরিবর্তে কালে কালে তার পরিবর্তনশীলতার ধারণাকেই সমর্থনের প্রবণতা দেখায়।
গত দুই দশকে ইসলাম-সম্পর্কিত শিরোনামগুলোর মাঝে সবচেয়ে বেশী স্থান জুড়ে ছিল সালমান রুশদীর “স্যাটানিক ভার্সেস’’এর প্রকাশ। কিন্তু রুশদীবিরোধী যে তুমুল গণ-বিক্ষোভ ঘটলো তার একটি লক্ষণীয় বিষয় হলো এটি রুশদীর গ্রন্থের সবচেয়ে গূরুত্বপূর্ণ দিকটি সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষা করে গিয়েছে; সেটা হলো এই যে “শয়তানী আয়াত” (অর্থাৎ কোরআনীয় সেই সুরাগুলি, যা সাময়িককালের জন্য মক্কার পৌত্তলিক দেবীদের কয়েকজনকে গ্রহণ করেছিল, কিন্তু শয়তান কর্তৃক প্ররোচিত হয়েছিল বলে যা পরে বাতিল হয়েছে) এর বিবরণ সম্পূর্ণতঃই নবীর একজন মুসলিম জীবনীকার আল-তাবারীর কাজের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত। আল-তাবারীর ঐতিহাসিক বর্ণনার বিশ্লেষণ ইসলামে শয়তান ও ঐশীবাণীর পূর্ণতর উপলব্ধিকে সম্ভবপর করবে।
প্রথমত সেই ঐতিহাসিক বর্ণনাটিই দেখা দরকার, এটির বর্ণনা করেছেন প্রখ্যাত মুসলিম ইতিহাসবিদ আল-তাবারী :

যখন আল্লাহর নবী দেখলেন কীভাবে তাঁর গোত্র তাঁর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে এবং আল্লাহর কাছ থেকে তিনি তাদের জন্য যে বার্তা নিয়ে এসেছেন তা পরিহার করছে, তিনি ব্যথিত হলেন, তাঁর অন্তর থেকে তিনি চাইলেন যে আল্লাহর কাছ থেকে তাঁর কাছে এমন কিছু আসুক যা তাঁর গোত্রের সাথে তাঁর বিরোধ নিষ্পন্ন করবে। নিজ গোত্রের জন্য তাঁর ভালবাসা এবং তাদের মঙ্গলের জন্য তাঁর ব্যাকুলতার কারণে তাঁর পথে তাদের তৈরী-করা বাধাগুলোর কিছুটা প্রশমিত করা গেলে তাঁর জন্য তা পরমানন্দের হতো, আর নিজের সাথেই তিনি বিতর্ক করলেন এবং অন্তর থেকে তেমন একটি ফলাফল বারংবার কামনা করলেন। তারপর আল্লাহ প্রকাশ করলেন এই বাণী : “ঐ তারকার নামে যখন সেটি অস্ত যায়...”, আর যখন তিনি এই শব্দগুলোয় পৌঁছুলেন “তুমি কি বিবেচনা করেছো আল-লাত এবং আল উজ্জা আর মানাত, যিনি তৃতীয় জন?”, তখন শয়তান তাঁর অন্তর্দ্বন্দ্বের এবং তাঁর নিজের লোকদের তিনি যা শোনাবার আকাঙ্ক্ষা করতেন তার সুযোগ নিয়ে তাঁর জিহ্বায় ভর করে এই শব্দগুলো বসিয়ে দিল, “ঊর্ধ্বাকাশে উড্ডীয়মান ওইসব সারসেরা; তাদের উপাসনা পূর্ণরূপেই অনুমোদিত”... তারপরই জিব্রাইল আল্লাহর নবীর কাছে এলেন এবং বললেন, ‘‘মুহাম্মদ, এটা আপনি কি করলেন? আল্লাহর কাছ থেকে আমি আনিনি এমন কথা আপনি লোকেদের কাছে উচ্চারণ করেছেন, এবং আপনাকে বলা হয়নি এমন কথা আপনি লোকেদের বলেছেন।” আল্লাহর নবী তখন খুবই ব্যথিত হলেন এবং আল্লাহকে দারুণ ভয় করলেন, কিন্তু আল্লাহ্‌ তাঁর কাছে একটি ঐশীবাণী পাঠালেন (কোরআন, ২২:৫২) কেননা তিনি তাঁর প্রতি ছিলেন ক্ষমাশীল (দি হিস্ট্রি অব আল-তাবারী, ডব্লিউ এম ওয়াট এবং এম ভি ম্যাকডোনাল্ড কর্তৃক অনূদিত, খ - ৬, পৃ ১০৮-১০৯)।

এই বর্ণনার প্রামাণিকতা কেবল ঐতিহাসিক বিবরণ থেকে বিচার করাটা কঠিন। নবীর আদিতম জীবনীগ্রন্থটি হলো ইবনে ইসহাক-এর, কিন্তু পৃথক একটি পাণ্ডুলিপি হিসেবে এটি আর অস্তিত্বশীল নেই। তাঁর টিকে-থাকা প্রধান দুটো জীবনী ইবনে হিশাম ও আল তাবারীর, দু’টিরই লেখকদের দাবি তা তাদের মালিকানায় থাকা ইবনে ইসহাক-এর অনুলিপির ওপর ভিত্তি করে রচিত। কিন্তু আল-তাবারীর জীবনীগ্রন্থটিতে উপরোক্ত “শয়তানী সুরা” পর্বটি অন্তর্ভুক্ত হলেও ইবনে হিশামেরটিতে তা অনুপস্থিত। পশ্চিমা পণ্ডিতরা সকলেই আল-তাবারীর পক্ষাবলম্বন করেছেন, তাঁদের বিশ্বাস এই যে, ওটা ঐ সময়ে সাধারণভাবে গ্রাহ্য না হয়ে থাকলে তাঁর পক্ষে এমন একটি বিতর্কিত অধ্যায় ঢুকিয়ে দেয়াটা অসম্ভব হতো; মুসলমানরা ইবনে হিশামের পক্ষাবলম্বন করে পুরো ঘটনাটিকেই অস্বীকার করেছেন, একমাত্র ব্যতিক্রম খ্যাতনামা পাকিস্তানী পণ্ডিত ফজলুল রহমান, ফজলুল রহমানের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে পরে সংক্ষেপে আলোচনা করা হবে। এবার আমরা সেই আয়াতগুলোর দিকে দৃষ্টিপাত করি আল-তাবারী যেগুলোকে দেখিয়েছেন “শয়তানী আয়াতগুলো”র প্রতিস্থাপক হিসেবে :

তোমরা কি আল-লাত এবং আল উজ্জা আর মানাত, যিনি তৃতীয় জন, এদের কথা বিবেচনা করছো?...তোমরা এবং তোমাদের পূর্বপুরুষেরা তাদের যে নামে ডেকেছো, তারা সেই নামের বাইরে আর কিছুই না; মাবুদ তাদের ওপর কোন কর্তৃত্ব আরোপ করেন নি...আকাশমণ্ডলে তো কত ফেরেস্তাই আছে যাদের উপাসনা কোন ফলই বয়ে আনবে না, কেবল মাবুদই যাদের ওপর সন্তুষ্ট হন তাঁদেরকে ইচ্ছা প্রদান করেন। যারা আখেরাতে বিশ্বাস করে না, তারাই ফেরেস্তাদের সাথে (ওইসব) নারীদের নামের শরণ নেয়। (কোরআন ৫৩:২০-২৯)

সে কারণেই কোরআনে মক্কার তিন দেবীর সাথে আপোসের কোনো চিহ্নই অবশিষ্ট নেই। এই ঘটনার প্রধান বিষয় হলো নবী প্ররোচিত হয়েছেন এবং আসল আয়াতগুলোকে স্বয়ং পরিবর্তন করে মক্কাবাসীদের নিকট গ্রহণযোগ্য একটি সংস্করণ তৈরী করেছেন। এই পর্বটি মূলগতভাবে নবীর নৈতিক ব্যর্থতা বিষয়ক, আর শয়তান কোরআনের একটি ঐশী বাণীর সূত্র ধরে কেবল পরবর্তীকালেই এই দৃশ্যে প্রবেশ করে, এবং এভাবে এটা আল-তাবারীর বর্ণনার সত্যতার পক্ষেই আরও নিদর্শন হাজির করে :

আমরা তোমার আগে এমন কোন বার্তাবাহক বা পয়গম্বর পাঠাই নি, শয়তান যার আকাঙ্ক্ষায় ভর করে নি, যখন সে তেমন আকাঙ্ক্ষা করত; কিন্তু শয়তান যা করায় মাবুদ তা বাতিল করেন, তারপর মাবুদ তার চিহ্ন সন্দেহাতীতভাবেই নিশ্চিত করেন-ঈশ্বর সর্বজ্ঞ, সর্বজ্ঞানী-শয়তান যা বলায় তাকে তিনি দুর্বলচিত্তদের জন্য পরীক্ষাস্বরূপ ব্যবহার করেন... (কোরআন ২২:৫২)

আর তাবারীর বর্ণনার পক্ষে কোরআনে এমনকি আরও বেশী সাক্ষ্য রয়েছে, যদি আমরা ধরে নেই যে অন্য আয়াত দ্বারা ‘রহিত’-হওয়া আয়াতগুলো সত্যিকারার্থে “শয়তানী আয়াত” অধ্যায়ের সঙ্গে জড়িত।

আর আমরা যে আয়াতই রহিত করি কিংবা বিস্মৃত করি না কেন, আমরা তার তুলনায় উৎকৃষ্ঠ বা সমতুল্য অন্য কিছু আনয়ন করি। তুমি কি জান না যে-আল্লাহ্‌র কর্তৃত্ব সকল কিছুই উপর প্রতিষ্ঠিত? (কোরআন : ২-১০০)

আল-তাবারীর বর্ণনার একটি কৌতূহলোদ্দীপক দিক হলো এই গুরুত্বারোপ যে, শয়তান নবীর হৃদয়ে মিথ্যা আয়াত ভরে দিতে পারছে “তাঁর অন্তর্গত দ্বিধা”র কারণেই। ঘটনাটির এমন একটি ব্যাখ্যা শয়তান-বিষয়ক এই উপলব্ধির সাথে মেলে যেখানে শয়তান পাপপ্রবণতার ব্যক্তিচরিত্রায়ন। কোরআন শয়তানকে জ্বিন হিসেবে চিহ্নিত করে শয়তানের আক্ষরিক ব্যাখ্যার বদলে তার একটি মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যার পক্ষে আরও একটি যৌক্তিকতা দান করে :

আর যখন আমরা ফেরেস্তাদের বললাম, ‘আদমের সামনে নতজানু হও’; তখন ইবলিশ ব্যতীত সকলেই নতজানু হল; সে ছিল জ্বিনদের একজন, আর সে তার মাবুদের হুকুমের বিরুদ্ধে প্রভুদ্রোহী হল। (কোরআন ১৮:৫০)

‘জ্বিন’ বস্তুত একটি ইসলাম-পূর্ব শব্দ যা ব্যবহৃত হয় এমন একটি অদৃশ্য সত্তাকে বোঝাতে যে মানুষের সাথে কথা বলতে, এমনকি তাকে নির্বুদ্ধিতার দশাগ্রস্ত করতে সক্ষম (সে কারণেই উন্মাদনা বোঝাতে আরবীতে মাজনুন শব্দটি ব্যবহৃত হয়, এর আক্ষরিক অর্থ ‘জ্বিনের আছর-লাগা’)। শয়তান/ইবলিশ এখানে তাই অযৌক্তিক আকুতি যা নবীর মানবিক দুর্বলতা এবং মক্কাবাসীদের সাথে আপসের জন্য মরিয়া তাগিদ থেকে অঙ্কুরিত হয়েছে, এবং তাঁকে দিয়ে “শয়তানী আয়াতগুলো” ঐশীবাণীর মাঝে ঢুকিয়ে দেয়াতে পরিচালিত করেছে। পয়গম্বররাও মানুষ এবং সে কারণেই তাঁদের ত্রুটি হতে পারে, কোরআনের এই বারংবার গুরুত্বারোপের আলোকে বিশ শতকের মুসলিম পণ্ডিত ফজলুল রহমান “শয়তানী আয়াতসমূহ” অধ্যায়টির সত্যতা মেনে নিতে কোনো সমস্যাই দেখেন না। তাঁর মতে,

কিন্তু আপসের যে আশঙ্কা বা চিন্তা-এমন কি ইঙ্গিতও নবী করে থাকুন না কেন, সেগুলো দ্রুতই আল্লাহ “রহিত” করেন কিংবা ‘‘মুছে দেন”, যেমনটা ২২:৫২ আয়াতে পরিষ্কার বলা আছে। পৌত্তলিক দেবীদের কথা একবার উল্লেখ করে (৫৩:১৯-২০) নবী তাদেরকে ‘‘উচ্চস্তরের রাজহংস যাদের সাথে (আল্লাহর) মোলাকাত আশা করা যায়”...রূপে বর্ণনা করেই ৫৩:২১-২৩ এ এই কথাগুলো রহিত করে ফেলার ঘটনাটি সম্পূর্ণরূপেই হৃদয়ঙ্গম করা যায়, কেননা ঘটনাটি তাঁর সাহাবীদের বিচার ও শাস্তিপ্রদানের দুর্যোগপূর্ণ একটি সময়ে ঘটেছিল, যাঁদেরকে তিনি সাময়িকভাবে আবিসিনিয়ায় হিজরত করতেও হুকুম দিয়েছিলেন। এমন আরও লক্ষণ আছে যে নির্দিষ্ট কিছু আয়াত অন্যান্যগুলো কর্তৃক প্রতিস্থাপিত হয়েছিল: ২:১০৬, ১৩:৩৯, ১৬:১০১...। কোরআনের হিসেবে কিন্তু এমন একজন পয়গম্বরের জন্য এটা বিস্ময়করও নয়, ধারার বাইরেও নয় কিংবা দোষেরও নয়, মানুষ হিসেবে তিনি ভুল করতেই পারেন। এরপরও কিন্তু রক্তমাংসের একজন মানুষ হিসেবেই তিনি মানবজাতির জন্য একজন আদর্শে পরিণত হন, কেননা তাঁর সাধারণ আচার-আচরণের মান এসত্ত্বেও এতটাই উচ্চমানের যে তা মানবজাতির জন্য মূল্যবান আদর্শস্বরূপ...কোরআনে এমন প্রচুর উদাহরণ আছে যেখানে নবী কোনো সময়ে যখন আশা করছেন ঘটনাপ্রবাহ কোনো একটা নির্দিষ্ট পথে এগুবে, আল্লাহর ঐশীবাণী তখন সম্পূর্ণ ভিন্নপথে অগ্রসর হলো। “পূর্বানুমানবশতঃ চকিতে আপনার জিহবাকে ঐশীবাণীর সমভিব্যহারে (অর্থাৎ আগেই) অগ্রসর করবেন না। একে একত্রে নিয়ে আসা এবং আবৃত্তি করা আমাদের দায়িত্ব-কজেই আমরা যখন তা আবৃত্তি করব, আপনি কেবল তা অনুসরণ করবেন” (৭৫:১৬-১৯) (ফজলুর রহমান, মেজর থিমস ইন দি কোরআন, পৃ ৮৮-৯০)

তাহলে রক্ষণশীল মুসলিমদের বড় অংশই কেন আল-তাবারীর ‘শয়তানের আয়াত’ অধ্যায় নিয়ে আলাপ করতে সাধারণত গররাজী? মনে হয় এর সোজাসাপ্টা কারণ এই যে, এটা নবীর পক্ষেও ভ্রম করা সম্ভব এবং নিজগোত্রকে পক্ষে আনার জন্য তাঁর মানবিক ঝোঁক কোরআনকে সাময়িকভাবে হলেও বিকৃত করতে পারে-এমন একটি চিত্র হাজির করে। আরও জরুরি বিষয় হলো, ইসলামি আইনের বিশাল অংশটি দাঁড়িয়ে আছে নবীর জীবন ও শিক্ষার ওপর ভিত্তি করে। কাজেই যার খাঁটি ঐশী প্রকাশ হবার কথা, সেটাই যদি নবীর ভ্রমশীলতার শিকার হতে পারে, তবে হাদিসের ক্ষেত্রে এই সম্ভাবনা আরও বেশি, কেননা এগুলো তো আল্লাহ্‌র বাণী নয়, প্রত্যক্ষভাবে নবীরই কথা। রদকরণ সম্পর্কে কোরআনের আয়াতগুলোকে বস্তুত দেখা যেতে পারে ঐশীপ্রকাশের বিশুদ্ধতার ঐশী নিশ্চয়তা হিসেবে; নবীর ভ্রমশীলতা সত্ত্বেও আল্লাহ কোরআনের সঠিকত্ব নিশ্চিত করলেন অ-সঠিক আয়াতগুলোকে প্রতিস্থাপিত করে। যাহোক, হাদিসের জন্য এমন কোনো রদকরণের নিশ্চয়তা নেই। রক্ষণশীলরা হাদিস ও ইসলামী আইন বিষয়ে এমন প্রশ্ন উত্থাপন করাকে অগ্রহণযোগ্য মনে করেন।
তাহলে রুশদীর বইটি নিয়ে এত শোরগোল কেন? বেঁচে থাকলে আল-তাবারী নিজেও কি কতলযোগ্য হতেন, যদিও তাঁর নিজের সময়ে এই প্রশ্নটি আদৌ ওঠেনি? এর উত্তরটার সাথে সম্ভবত আল-তাবারীর সম্পর্ক সামান্যই, বরং এর সম্পর্ক বেশী আয়াতুল্লাহ খোমেনির সাথেই, যিনি রুশদীর মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করেছিলেন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে রুশদীর বইটি বেশীরভাগ মুসলিম রাষ্ট্রে নিষিদ্ধ হয়ে যাওয়ায় অধিকাংশ মুসলমানই খোমেনির প্রতি রুশদীর এই মর্মভেদী বিদ্রূপটি পড়ার সুযোগ পাননি যেটিতে আক্ষরিক অর্থেই একজন মোল্লা হিসেবে তিনি ফেরেশতা জিব্রাইলের পিঠে চড়ে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। রুশদীর ব্যঙ্গের প্রতিক্রিয়ায় স্রেফ খোমেনির ক্রোধই যদি এই মৃত্যুদণ্ডাজ্ঞা ডেকে আনে, তবে সারা দুনিয়ার মুসলমানরাই দুর্ভাগ্যজনক একটা অহমের দ্বন্দ্বের শিকার হয়েছেন।

অনুবাদ ফিরোজ আহমেদ