প্রগতিবাদী উর্দুকাব্যের আবির্ভাব ও তিরোভাব

আবদুস সাকুর


‘অল ইন্ডিয়া প্রোগেসিভ রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশন’ ছিল ফ্যাসিবাদ, পুঁজিবাদ এবং উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে শিল্পসাহিত্যের ভুবনে গড়ে ওঠা একটি ভূমণ্ডলীয় আন্দোলনের ভারতবর্ষীয় চ্যাপ্‌টার। বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে-পড়া এই সাংস্কৃতিক আন্দোলনের মূল উৎস ছিল বিশ শতকের প্রথম পাদে রাশিয়ায় সংঘটিত সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব। আন্দোলনটির চালিকাশক্তি ছিল প্রগতি-ভাবনা। ভাবনাটিকে চাগিয়ে দিয়েছিল লেখকদের ফ্যাসিবাদ-বিরোধী ইউরোপীয় আন্দোলন এবং পরবর্তী প্যারিস-লন্ডনভিত্তিক ‘প্রোগ্রেসিভ রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশন’ (১৯৩৬)।
ফ্রান্সে ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে একটা যুক্তফ্রন্ট গড়ে তোলার আন্দোলন শুরু হয় ১৯৩৩ সালে। এর প্রতি সমাজের মধ্যশ্রেণীও আকৃষ্ট হচ্ছিল। ১৯৩৫ সালে বিখ্যাত ফরাসী লেখক অঁরি বার্বুস্‌ কর্তৃক প্যারিসে আহূত হয়েছিল ‘ওয়ার্ল্ড কংগ্রেস অব রাইটার্স ফর দ্য ডিফেন্স অব কালচার’। কনফারেন্সটির স্পন্সর ছিলেন রমা রল্যাঁ, আঁদ্রে মালরো, টমাস মান, ম্যাঙ্মি গোর্কি, ওয়াল্ডো ফ্রাংক। প্যারিসের বিখ্যাত হল বালবুলিয়েতে অনুষ্ঠিত ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ও জাতির শ্রেষ্ঠতম লেখকদের এই সভা ঐতিহাসিক অবদান রেখেছিল প্রতিক্রিয়াশীলতার বিরুদ্ধে এবং সংস্কৃতির ক্ষেত্রে প্রগতিশীলতার শক্তি বর্ধন করেছিল অভূতপূর্ব মাত্রায়।
সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী লেখকদের মতাদর্শ বিভিন্ন ছিল বটে, তবে একটি বিষয়ে তাঁদের অভিমত ছিল অভিন্ন, তা হলো লেখকদের চিন্তা এবং সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা। ফ্যাসিবাদী কিংবা সাম্রাজ্যবাদী কোনো শক্তি লেখকদের প্রতি বিধিনিষেধ আরোপ করলেই তার বিরুদ্ধে তাঁরা সম্মিলিত আন্দোলন গড়ে তুলবেন। এক্ষেত্রে লেখকগণ তাঁদের সাংস্কৃতিক সত্তাকে শ্রেষ্ঠতম সুরক্ষা দিতে পারেন কেবল জনগণের যুক্তফ্রন্টের অংশীদার হয়ে। এতেই তাঁরা শ্রমজীবী শ্রেণীসমূহের সমর্থন পাবেন। এর সাক্ষ্য বহন করে ফরাসী এবং চৈনিক লেখকদের অভিজ্ঞতা। হানাদার জাপানীদের বিরুদ্ধে জীবনমরণ সংগ্রামের সঙ্গিন সময় চীনের কবি-সাহিত্যিক-দার্শনিক-শিক্ষাবিদ সকলেই তাঁদের দেশের মুক্তিযুদ্ধে আপন আপন প্রতিভার পূর্ণসদ্ব্যবহার করে যুদ্ধজয়ের সাফল্যে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছিলেন। ফ্রান্সেও দেখা যায় একই দৃষ্টান্ত। অঁরি বার্বুসের নেতৃত্বে দেশের কবি-সাহিত্যিক-দার্শনিক-বিজ্ঞানীগণ ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে সম্পৃক্ত করে একটি জনগণের যুক্তফ্রন্ট গড়ে তোলেন, যাঁরা শেষ পর্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে তাঁদের সরকারও গঠন করেন ১৯৩৬ সালে।
আলোচ্য সম্মেলনের খুব তাৎপর্যপূর্ণ একটি বৈশিষ্ট্য এই ছিল যে, টিকেট কিনেও এতে বিপুল সংখ্যক শ্রমিক অংশ নিতেন। এই সাগ্রহ অংশগ্রহণ তাঁদের সঙ্গে লেখকদের নবস্থাপিত সম্পর্কটির সখ্যতা প্রমাণ করত যে সম্পর্কটির কর্ষণ ছিল কনফারেন্সটির বিশেষ উদ্দেশ্য। প্রসঙ্গত স্মর্তব্য যে, পুঁজিবাদী সমাজে মানসিক শ্রমজীবী লেখকদের সঙ্গে শারীরিক শ্রমজীবী শ্রমিকদের সম্পর্কটি হয়ে গিয়েছিল একেবারেই ছিন্ন কিংবা অপরিচয়ের অথবা অঘনিষ্ঠ কিংবা অস্বস্তিকর। আধুনিক সাহিত্যিকদের বৃহদাংশের আত্মিক সংবেদনহীনতার কারণই হলো জীবনের উৎসের সঙ্গে তাঁদের দূরত্বজনিত বিচ্ছিন্নতা, অথবা শ্রমজীবী শ্রেণীর জীবনের সঙ্গে অনাত্মীয়তা। সম্মেলন শেষে প্যারিসে স্থাপিত হলো সমগ্র বিশ্বের ‘ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার অব প্রোগ্রেসিভ লিটারারি মুভমেন্ট’। সেন্টারটি সাংগঠনিকভাবে সম্পর্ক স্থাপন করবে বিভিন্ন দেশের ‘প্রোগ্রেসিভ রাইটার্স মুভমেন্টে’র সঙ্গে।
১৯৩২ সালে ভারতবর্ষের উত্তর প্রদেশে আঙ্গারে (অলাত)- নামের একটি সঙ্কলন প্রকাশিত হয়েছিল-সাজ্জাদ জহীর, রশীদ জাহান, মাহমুদুজ্জাফর এবং আহমদ আলীর মোট দশটি উর্দু ছোটগল্প নিয়ে। সংকলনে সমসাময়িক ভারতবর্ষের ধর্মীয় ও যৌন জীবনের সামাজিক গোঁড়ামি, ভণ্ডামি ও অবক্ষয়ের কঠোর সমালোচনা ছিল। প্রকাশনামাত্রই মুসলিমমহলে ও বিভিন্ন সংগঠনে ‘অশ্লীলতা’ এবং ‘ধর্মনিন্দা’র অভিযোগে গ্রন্থটির বিরুদ্ধে সমালোচনার ঝড় ওঠে। পরিণামে তৎকালীন যুক্ত প্রদেশের পুলিশবিভাগ পরের বছরই বইটি বাজেয়াপ্ত করে। তবে গল্পকারগণ মোটেই দমেন নি। তাঁদের ভাষ্যকার হয়ে মাহমুদুজ্জাফর এলাহাবাদ-ভিত্তিক সংবাদপত্র দ্য লিডার-এর ৫ এপ্রিল সংখ্যায় লিখলেন যে, তাঁদের কণ্ঠ রোধ করা যাবে না, যেহেতু তাঁদের উদ্দেশ্য একটি প্রগতিবাদী লেখকসংঘ গঠন করা, যে-সংঘের সদস্যগণ এধারার লেখাই লিখতে থাকবেন এবং রক্ষণশীলতা ও প্রতিক্রিয়াশীলতার বিরুদ্ধে একটা মোর্চা গড়ে তুলবেন।
এই উদ্দেশ্য সাধনকল্পেই ‘আঙ্গারে’-গোষ্ঠীর নেতা সাজ্জাদ জহীর সমমনাদের এক সভা আহ্বান করেন লন্ডনের ‘নানকিং’-নামক চাইনীজ হোটেলে, ১৯৩৪ সালের ২৪ নভেম্বর সন্ধ্যায়। পরবর্তীকালের অনেক স্বনামধন্য সাহিত্যিক উপস্থিত ছিলেন তাৎপর্যপূর্ণ সেই ঐতিহাসিক সন্ধ্যায়-যেমন বাংলা সাহিত্যের জ্যোতির্ময় ঘোষ, ইংরেজী সাহিত্যের মুলকরাজ আনন্দ এবং উর্দু সাহিত্যের মোহাম্মদ দীন তাসীর প্রমুখ। সেই সমাবেশেই জন্ম নেয় ‘অল ইন্ডিয়া প্রোগ্রেসিভ রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশন’, সংক্ষেপে পি.ডব্লিয়ো.এ। লক্ষণীয় যে সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী কলোনীর প্রগতিবাদী সমিতিটি জন্ম নেয় পরাধীন দেশে নয়, কলোনীকারদেরই স্বাধীন পরিবেশে।
এই প্রগতিশীল লেখক আন্দোলনের প্রবাসী ভারতবর্ষীয় পুরোধা উর্দু কথাসাহিত্যিক সাজ্জাদ জহির তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন, তাঁরা বুঝতে পেরেছিলেন যে এ-আন্দোলনের অংশীদার হয়ে লন্ডনে বসে উপমহাদেশীয় ভাষাসমূহের সাহিত্যিকদের মধ্যে তেমন ফলপ্রসূ প্রভাব বিস্তার করা যাবে না। আন্দোলনটিকে ছড়িয়ে দিতে হবে উপমহাদেশেই এবং জাতীয় আন্দোলন দানা বেঁধে উঠলেই কেবল আন্তর্জাতিক সংস্থাটির সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে কার্যকরভাবে শক্তিবৃদ্ধি করা সম্ভব হবে। (বাংলার সংস্কৃতিতে মার্কসবাদী চেতনার ধারা পৃ ৫৭৫-৫৮৮)।
উপমহাদেশে প্রগতিবাদী লেখক সংঘটিকে একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে এর একটি মেনিফেস্টো চূড়ান্ত করে সেটি নিয়ে সাজ্জাদ জহীর ১৯৩৫ সালের মাঝামাঝি ইউরোপ থেকে ভারতবর্ষ ফিরে দেশের বিশিষ্ট লেখকদের মধ্যে বিতরণ করেন। ইশতাহারটিকে লুফে নেন হিন্দুস্তানী সাহিত্যের অন্যতম শীর্ষ ব্যক্তিত্ব মুনশী প্রেমচান্দ। তিনি এর হিন্দি অনুবাদ ছাপেন তাঁর হান্স্‌ (হাঁস)-নামক পত্রিকার অক্টোবর সংখ্যায়। মেনিফেস্টোটির ইংরেজী ভাষ্য লন্ডনের লেফ্‌ট রিভিউর ফেব্রুয়ারী, ১৯৩৬ ইস্যুতে ছাপা হয়। ঐতিহাসিক সে-দলিলটির মুখ্য কথাটি ছিল এ-রকম : ভারতবর্ষীয় সমাজে মৌল পরিবর্তন ঘটে চলেছে। বদ্ধমূল ধারণা ও পুরাতন বিশ্বাসের ধারকবাহক সামাজিক-রাজনীতিক প্রতিষ্ঠানগুলি চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে নিত্যদিন। এই সংঘর্ষ নতুন সমাজের জন্ম দিচ্ছে। তবে বাধ সেধে যাচ্ছে প্রতিক্রিয়ার ক্ষয়িষ্ণু শক্তিসমূহ। তাই দেশের প্রগতিবাদী লেখকদের উচিত সমাজপরিবর্তনের সপক্ষে কলম ধরা। নবগঠিত এই লেখকসংঘের উদ্দেশ্য সামাজিক প্রতিক্রিয়া ও রক্ষণশীলতা এবং ধর্মীয় গোঁড়ামী ও ভণ্ডামির কবল থেকে ভারতবর্ষীয় সাহিত্যকে উদ্ধার করে জনগণের সংস্পর্শে নিয়ে আসা এবং জীবনের বাস্তবতাকে অবলম্বন করে জাতিকে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।
১৯৩৬ সালেই ভারতবর্ষের প্রগতিপন্থী প্রবীণ বিদ্বজ্জনমণ্ডলী এবং স্বনামধন্য লেখকবৃন্দ-প্রেমচান্দ, আবদুল হক, দয়া নারায়ণ নিগম, আবিদ হোসেন প্রমুখ- সমমনা নবীন লেখকসমাজ কর্তৃক রচিত ইস্তাহারের দস্তখতে সামিল হলেন। সমিতির শাখা স্থাপিত হল লাহোর, দিল্লী, এলাহাবাদ, আলীগড়, বম্বে, পুনা, কলকাতা, বেনারস, কানপুর, আহমেদাবাদ, পাটনা প্রভৃতি অগ্রসর শহরে।
প্রথম সর্বভারতীয় প্রোগ্রেসিভ রাইটার্স কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হল লখনৌ শহরে ১৯৩৬ সালের এপ্রিল মাসের ১০ তারিখে, মুনশী প্রেমচান্দের সভাপতিত্বে। ‘সাহিত্য কা উদ্দেশ্য’-শীর্ষক সভাপতির ভাষণটি প্রগতিবাদী আন্দোলনের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণিত হয়। সেখানে একই আসরে সমবেত হন বাংলা, মাদ্রাজ, পাঞ্জাব, গুজরাট, মধ্যপ্রদেশ এবং উত্তরপ্রদেশের লেখকবর্গ। সেই সম্মেলন সাহিত্যালোচনা করছে, বিদ্যাবাগীশের দৃষ্টিভঙ্গিতে নয়, সমাজবাদীর দৃষ্টিকোণ থেকে; দিকনিদের্শনা দিয়েছে অতীত না-ভুলে ভবিষ্যৎ রচনা করতে।
‘অল ইন্ডিয়া প্রোগ্রেসিভ রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশনে’র দ্বিতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় কলকাতায়, ১৯৩৮ সালের ডিসেম্বর মাসের ২৪ ও ২৫ তারিখে। কনফারেন্সে বাণী প্রেরণ করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি লেখেন, সত্য বটে একান্ত তা লেখককে তাঁর গভীর ভিতরের কণ্ঠ শোনার সুযোগ দান করে। কিন্তু এও সত্য যে সমাজবিচ্ছিন্ন লেখক মানবতার সঙ্গে থাকে অপরিচিত। সমাজকে জানতে হলে তার নাড়ির সংবাদ জানতে হয়, তার হৃৎস্পন্দন শুনতে হয়। মনুষ্যজাতির ও সমাজের কর্ণধারগণ ভবিষ্যতের পথ সঠিক চিনতে পারেন কেবল সাহিত্য এবং মানবতা একাত্ম হলে পরেই। কেবল তখনই জানা যায় কী গান তাঁদের স্বকার শুনতে চায়। কেবল তখনই তাঁরা মানুষের হৃদয়ানুভূতি সম্পর্কে নির্ভুল অবহিত হতে পারেন। জনসাধারণের সঙ্গে সম্পর্কহীন হয়ে যাওয়া মানে তাঁদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া। জনগণকে জানতে হলে তাঁদের সঙ্গে মেশার বিকল্প নেই। সমাজ থেকে দীর্ঘকাল দূরে থেকে তিনি একটি মারাত্মক ভুল করেছেন। এই দেশ আজ মরুপ্রায়, যার প্রতিটি ইঞ্চি যেন বিষাদের প্রতিমা। এই বিষাদ লেখকদেরই তাড়াতে হবে এবং নবজীবনের উদ্যান রচনা তাঁদেরই করতে হবে। নবজাগরণের গান গেয়ে প্রতি মানুষের হতাশা দূর করা লেখকসমাজেরই কর্তব্য। সাহিত্য-সংগীতকে নবকিশলয়ের মতো জীবনের মাটি থেকেই গজিয়ে উঠতে হবে। রবীন্দ্রনাথের এই মহান বাণী সম্মেলনটিকে সঠিক সুরে বেঁধে দিয়ে প্রগতি লেখক সঙ্ঘকে প্রভূত উদ্বুদ্ধ করেছিল।
অল ইন্ডিয়া প্রোগ্রেসিভ রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রাগুক্ত ইশতাহারটির প্রকাশনা পরাধীন এই বিশাল দেশটির সংস্কৃতির সকল অঙ্গনেই একটা বিরাট প্রভাব বিস্তার করে। তবে ভারতবর্ষের অন্যান্য ভাষা ও সাহিত্যের তুলনায় প্রোগ্রেসিভ রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশনের বিশেষ সম্পর্কটি তাৎক্ষণিকভাবে গড়ে উঠেছিল উর্দুসাহিত্যের সঙ্গে। কারণ এ-অঙ্গনে এসব ধ্যানধারণা কর্ষণের ক্ষেত্রটি ছিল সুপ্রস্তুত। এ-প্রচারপত্রটির হুবহু এক বছর পূর্বে আখতার হোসেন রায়পুরী-নামক জনৈক নবীন সাহিত্যসমালোচক একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করেছিলেন ‘আদব আওর জিন্দেগী’ (সাহিত্য ও জীবন) নামে। প্রবন্ধটিতে তিনি উর্দুসাহিত্যের সমগ্র পরিসরটিকে বিশ্লেষণ করেন এবং পারিপার্শ্বিক ভৌত পরিস্থিতি থেকে সম্পূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন দেখে ভাষাটির কথাসাহিত্য ও কাব্যসাহিত্যকে এককথায় নাকচ করে দেন। মোহগ্রস্ত পাঠকসমাজের ঘোর কাটিয়ে দেওয়া জাগ্রত এই তরুণের ডাক প্রোগ্রেসিভ রাইটার্স এসোসিয়েশনের ইশতাহারটিকে উর্দুসাহিত্যিক মহলে সহজেই গ্রহণযোগ্য করে তোলে।
এ ছাড়া প্রেমচান্দের দেখাদেখি হিন্দীকবি সুমিত্রানন্দন পান্থ, মৈথিলীশরণ গুপ্ত এবং সূর্যকান্ত ত্রিপাঠী ওরফে ‘নিরালা’র সমর্থনও পিডব্লিয়োএ’র প্রভাবের দিগন্ত সমপ্রসারণে সহায়ক হয়। অবশ্য সংঘটির গ্রহণযোগ্যতা বর্ধনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে উপমহাদেশীয় সাহিত্যের দুই প্রধান রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং মুহাম্মদ ইকবালের অনুমোদন। এসবের যোগফলে সংঘে যোগ দেন স্বনামধন্য উর্দুকবি হাসরাত মোহানী, জোশ মালিহাবাদী, এবং ফিরাক গোরখপুরী প্রমুখ। এঁদের অনুসরণ করেন তেলুগু কবি শ্রী শ্রী, গুজরাটী কবি উমাশঙ্কর যোশী, পাঞ্জাবী লেখক গুরবখশ শিং এবং মারাঠী লেখক আন্না ভাউ সাথে। দলটির দ্রুতবর্ধমান উপনিবেশবিরোধী পরিচিতিতে চিন্তিত হয়ে এঁদের সম্পর্কে ভারতসচিব ব্রিটিশ সরকারের সন্দেহ ও সংশ্লিষ্ট সকলকে এদের ব্যাপারে সতর্ক থাকার উপদেশ সংবলিত একটি প্রাইভেট সার্কুলার জারি করেন ১৯৩৬ সালের ৭ সেপ্টেম্বরে।
সমিতির ইশতাহারটিকে কিঞ্চিৎ রদবদল করা হয়-কট্টর সমাজতন্ত্রী নয় তেমন লেখকদেরও অন্তর্ভুক্ত করার জন্য। ফলে শুরু থেকেই পিডব্লিয়োএ’র কেন্দ্রে ছিল সমাজতন্ত্রে অঙ্গীকারবদ্ধ এক শাঁসালো গোষ্ঠী। তবে বৃহত্তর সদস্যদলে ইশতাহারের মৌলিক নীতিতে বিশ্বাসীগণও অন্তর্ভুক্ত হন। ফলত পিডব্লিয়োএ’র ছত্রছায়ায় সকল ধরনের প্রগতিবাদী লেখকেরই স্থান সঙ্কুলান হয়েছিল। প্রতিক্রিয়াশীলতা ও রক্ষণশীলতাবিরোধী এবং প্রগতিবাদী শিল্পচর্চার সমর্থক লেখকদের একটি যুক্তফ্রন্ট গড়ে তোলাই ছিল সংঘটির মিশন। সেই থেকে অনেক কাল যাবৎই উর্দুসাহিত্যে ‘তরক্কীপসন্দি’ কিংবা প্রগতিবাদ সঙ্গত কারণেই পিডব্লিয়োএ’র সমার্থক বিবেচিত হয়ে আসছিল। এই সংঘের মঞ্চটিই ছিল ভারতবর্ষীয় লেখকদের ইতিহাসে প্রথম, যেখানে দাঁড়িয়ে একটি সাহিত্য-প্রতিষ্ঠান তার সৃজনশীল উৎপাদের শর্তাবলী পুনর্নির্মাণ করে নিয়েছিল-সাহিত্যসৃষ্টির স্থান-কাল-পাত্রের সঙ্গে নতুন সম্পর্ক রচনা করার উদ্দেশ্য শিরোধার্য করে।
উর্দুসাহিত্যের প্রগতিবাদী কবিদের চেষ্টা ছিল ভাষাটির অত্যুজ্জ্বল অতীতের সঙ্গে সম্পর্ক অবিচ্ছিন্ন রেখে নতুন নতুন দিগন্তপানে পাড়ি জমানো। এই আদর্শই বিবৃত হয়েছে ‘নয়া আদব’ (‘নতুন সাহিত্য’)র উদ্বোধনী সংখ্যায়-আলী সরদার জাফরি, সিব্‌তে হাসান এবং ইসরারুল হক মাজাজের রচনাসমূহে। অন্যকথায়, এঁরা ঐতিহ্যের সঙ্গ যুক্ত থেকেই নতুন নতুন রাস্তা কাটতে চেয়েছিলেন। উর্দুকাব্যে প্রগতিবাদী আন্দোলন তরতর করে বেড়ে ওঠার কারণ, এ-কাব্য সম্বোধন করেছে নিজের কাল, ইতিহাস ও রাজনীতিকে। সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রাম, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, দেশভাগ এবং তেলেঙ্গানা অভ্যুত্থানে একটানা ত্যাগ ও তিতিক্ষার শেষে নবজাত জাতিকে নবজীবন দানে এস্টাবলিশমেন্টের সার্বিক ব্যর্থতা-এই সমস্ত একাকার হয়ে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা-কামনা-বাসনা সমাজতন্ত্রী কবিদের সমবেত কণ্ঠে তুলে দিয়েছিল। প্রগতিবাদীদের প্রতিনিধিস্থানীয় কবি সাহির লুধিয়ানভী লিখেছেন :


চলো কে আজ সবহি পায়েমাল রুহুঁসে
কাহেঁ কে আপনে হার এক জাখ্‌ম কো জবাঁ কার্‌ দেঁ
হামারা রাজ হামারা নেহি, সবহি কা হ্যয়
চলো কে সারে জমানে কো রাজ্‌দাঁ কার্‌ দেঁ

[ চলো আজ সকল পদদলিত আত্মাকে বলি
তারা যেন তাদের প্রত্যেক আঘাতকে ভাষা দেয়
আমাদের গোপন কথা কেবল আমাদের নয়, সকলের
চল সেটা আমরা ভাগাভাগি করি সমগ্র বিশ্বের সঙ্গে ]

নানান কারণে প্রগতিবাদী উর্দু কবিগণ হিন্দী ফিল্মের সুবাদে গণসংস্কৃতির অঙ্গনেও অর্থপূর্ণরূপে তৎপর হয়ে পড়েছিলেন। ম্যাস-কালচারের সেই বিশাল এবং উর্বর ক্ষেত্রটিতে প্রোগ্রেসিভ রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশনের মুখ্য সদস্য সাহির লুধিয়ানভী, কাইফি আজমি, মাজরুহ সুলতানপুরী, আলী সরদার জাফরি ও জাঁ নিসার আখতার প্রমুখের শক্তিশালী এবং জনপ্রিয় ভূমিকা রাষ্ট্রীয় কৃপাবঞ্চিত উর্দু কাব্যের গণবিস্মৃতির পরিণতি ঠেকিয়ে রাখতে সমর্থ হয়েছে।
জন্মলগ্ন থেকেই প্রোগ্রেসিভ রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশন উর্দু লেখকদের সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক কর্মসূচীর রূপরেখা প্রণয়ন করতে সমর্থ হয়েছে-যেহেতু পার্টিশন পর্যন্ত এই সংঘটি ছিল জাতীয় আন্দোলনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। পঞ্চাশের দশকের শুরু থেকেই সাংস্কৃতিক ঐকমত্যে নানামুখী ফাটল দেখা দিল। স্বাধীন ভারতবর্ষের প্রথম সকালটি ছিল সামপ্রদায়িক দাঙ্গার রক্তে রাঙা লালসকাল, প্রগতিবাদী উর্দুকবিদের প্রতীক্ষিত সমাজতন্ত্রী লালসকাল নয়। তেলেঙ্গানা কৃষক আন্দোলনের বিরুদ্ধে নতুন ভারত সরকারের নির্মম দমনমূলক আক্রমণ প্রগতিবাদী কবিদের সমাজতন্ত্রী আশা-আকাঙ্ক্ষাকে যেন অঙ্কুরেই নির্মূল করে দিল। তেলেঙ্গানা আন্দোলনের হন্তারক রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস সম্পর্কে বলতে গিয়ে কৃষণচন্দর লেখেন, ‘তেলেঙ্গানার পরে আমাদের স্বপ্নগুলি বিদূরিত হয়ে গেল, আমাদের আশাগুলি বুকের পিঞ্জরেই মরে গেল। সেই ছিল আমাদের কৃষ্ণতম সময়। পরস্পরকে দোষী করা, অন্তর্বিবাদ, শুদ্ধি অভিযান ইত্যাদির মাধ্যমে হতাশা-নিরাশা আমাদের প্রগতিবাদী আন্দোলনটিকে বিভাজনের দিকেই নিয়ে গেল।’
স্বভাবকপট ব্রিটিশ তার ঔপনিবেশিক স্বার্থ-সংরক্ষণকল্পে উপমহাদেশ থেকে নিষ্ক্রান্ত হয়েছিল হিন্দু-মুসলিম দু’টি সমপ্রদায়কে হিংস্র পশুর মতো পরস্পরে লড়িয়ে দিয়ে। এই প্রক্রিয়ায় ঘটে-যাওয়া বহুবিধ ট্র্যাজিডির একটি ছিল উর্দুভাষাটির দেশহারা হয়ে যাওয়া। ভাষাকে সামপ্রদায়িক করে তোলার বিষবৃক্ষটির বীজ ইতর ইংরেজ বহু পূর্বেই বপন করে সযত্নে লালন করে আসছিল দীর্ঘকাল ধরে-‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ নীতির অংশ হিসেবে। দখলদার ইংরেজ বিভাজন ও শাসন নীতিটি ভাষার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করেছিল উনিশ শতকের পঞ্চাশের দশক থেকে উর্দুসাহিত্যে ‘নিশাতে সানিয়া’ (রেনেসাঁস) এর সতেজ উদ্ভব দেখে। সেই নবজাগৃতি উপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে তীব্র বিরক্তি ও উত্তাল বিদ্রোহের সঞ্চার করছিল। সূচনা হয়েছিল ‘কাওমি শায়েরি’ (জাতীয়তাবাদী কাব্যচর্চা)র, যার ফলশ্রুতিতে বিশ শতকের শুরুতে আলতাফ হোসেন হালী ও মোহাম্মদ হোসেন আজাদ উর্দুভাষীদের ‘কাওমি মুশায়েরা’র ধারা প্রবর্তনের আহ্বান জানিয়েছিলেন। এই জাতীয়তাবোধই ১৯২০ সালের পর থেকে উর্দুকাব্যে, জাঁ নেসার আখতারের ভাষায়, ‘আওয়ামী বেদারি কি লহর’ (গণজাগরণের তরঙ্গে)র সৃষ্টি করেছিল। এরই পরম্পরায় উর্দুসাহিত্যে ১৯৩০-এর দশকে প্রগতিবাদী আন্দোলন গড়ে উঠেছিল যা শোষক-শোষিতের ‘বাইনারি’ ধারার সংগ্রামের রূপ পরিগ্রহ করেছিল।
উর্দুসাহিত্যের নবজাগৃতির এই ঔপনিবেশিকতা-বিরোধী রূপ দেখেই দখলদার ইংরেজ এ-সাহিত্যের আধার উর্দুভাষাটিকেই দুর্বল করে তোলার মিশনে নেমেছিল। ১৮৬০-এর দশকেই বিদেশী শ্বেতাঙ্গরা এদেশের সংখ্যাগুরু সমপ্রদায়ের মগজধোলাইয়ের কাজে সফল হয়েছিল, চতুর ফন্দিতে এই শ্বেত মিথ্যেটি তাদের মাথায় ঢুকিয়ে দিয়ে যে, উর্দু বহিরাগত সমপ্রদায়ের ভাষা অর্থাৎ মুসলমানের ভাষা, প্রতিপক্ষে হিন্দীই স্থানীয় সমপ্রদায়ের ভাষা তথা হিন্দুর ভাষা। সুতরাং সংখ্যাগুরু গোষ্ঠীর উচিত দেবনাগরী লিপির হিন্দী ভাষাকে প্রমোট করা এবং ফার্সী লিপির উর্দু ভাষাকে ডিসোন্‌ করা। এটাই ছিল ‘খারি বোলি’র ক্ষেত্রে অ্যান্টনি ম্যাকডানেলের ‘১৯০০ রেজলুশন’সহ বিবিধ কলোনিয়াল ডিক্রির সার কথা। বিষয়টি সবিস্তার জানার উদ্দেশ্যে পাঠকের জন্য একটি শ্রেষ্ঠ পাঠ হল নতুন দিল্লীর অঙফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস-প্রকাশিত, খ্রিস্টোফার আর. কিং প্রণীত ওয়ান ল্যাঙ্গোয়েজ, টু স্ক্রিপট্‌স : দ্য হিন্দী মুভমেন্ট অফ দ্য নাইনটিন্‌থ সেঞ্চুরি (১৯৯৪)। একই ‘খারি বোলি’র দু’টি সন্তান উর্দু ও হিন্দীকে ব্রিটিশরাজের সরকারী ষড়যন্ত্র বিবদমান ভিন্ন ভিন্ন দুটি প্রকোষ্ঠবদ্ধ করে দেবার পরেও হিন্দীভাষীদের ‘লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা’ ছিল খারি-বোলিরই ভাষিক উত্তরাধিকারী ‘হিন্দুস্তানী’।
উপমহাদেশের ১৯৩১ সালের আদমশুমারীতেও উর্দু এবং হিন্দীকে আলাদা দু’টি ভাষা হিসেবে দেখানো হয় নি। ১৯৬১ সাল নাগাদ ভাষা হিসেবে হিন্দুস্তানীকে চিরতরে বিদায় করে দিয়ে দেশবাসীকে বাধ্য করা হয়েছে হিন্দী কিংবা উর্দুর মধ্যে যে-কোনো একটি ভাষাকে বেছে নিতে। এভাবে যে-উর্দু বা ‘রেখ্‌তা’ দিল্লীরই সৃষ্টি, সে-উর্দুকে ভারতের মুখের ভাষা থেকেই বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। উর্দুর জন্মভূমি ভারত থেকে দেশান্তরী হওয়া, ‘ইউপিওয়ালা’ অভিহিত উর্দুভাষী পাকিস্তানী এলিট শ্রেণী কর্তৃক তাদের ভাষাটিকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার পর থেকে ভারতে উর্দু হয়ে গেল, আনুষ্ঠানিকভাবেই, ‘বিদেশে’র ভাষা বা আরো বিশেষ অর্থে ‘শত্রু’র ভাষা। অতঃপর হিন্দু জাতীয়তাবাদের ভাষিক মৌলবাদীরা উর্দুভাষাটিকে সন্দেহের চোখে দেখতে থাকে এবং উত্তরপ্রদেশ ও বিহারের উর্দু চর্চার প্রতিষ্ঠানগুলি রাষ্ট্রিক এবং সামাজিক পৃষ্ঠপোষকতা হারাতে শুরু করে। এ প্রক্রিয়ায় শত শত বৎসরের রাজধানীর ভাষাটি জাতীয় জীবনের প্রান্তিক অবস্থানে চলে যায় এবং একসময় অভিধা পায় ‘মুমূর্র্ষু’ ভাষার। সামপ্রদায়িক মহল প্রচার চালায় যে ভারতে উর্দুর জানাযা আর দাফনই শুধু বাকি।
তবে বাস্তবে দাফন তো দূরস্থান, জানাযাকেও অনির্দিষ্ট কালের জন্য স্থগিত করে দেয় ভাষাটির জন্মভূমির সাধারণ-জনরুচি আর জনপ্রিয় হিন্দী সিনেমার উর্দুকাব্যগীতি-প্রীতি। স্মরণ করুন, মির্জা গালিবের ‘দিলে নাদাঁ তুঝে হুয়া কেয়া হ্যয়’ (মির্জা গালিব, ১৯৫৪), বাহাদুর শাহ জাফরের ‘লাগ্‌তা নেহি হ্যয় জী মেরা’, (লাল কিল্লা, ১৯৫৭), ফয়েজ আহমদ ফয়েজের ‘মুঝ সে প্যহলি সি মুহাব্বত’ (কয়দী, ১৯৫৭), সাহির লুধিয়ানভীর ‘চলো একবার ফির সে আজনবী বন্‌ জায়ে হাম দোনুঁ’ (গুমরাহ, ১৯৬৩) কাইফি আজমীর ‘হো কে মজবুর মুঝে উস্‌নে ভুয়ালা’ (হাকিকাৎ, ১৯৬৪), মোহাম্মদ ইকবালের ‘কভি আয় হাকিকাত-এ মুন্তাজার’ (দুলহান্‌ এক্‌ রাত কি, ১৯৬৭), মাজরুহ সুলতানপুরীর ‘হাম থে মাতায়ে কুচা ও বাজার’ (দাস্তাক, ১৯৭০), মীর তকী মীরের ‘দিখায়ে দিয়ে ইয়ুঁ, কে বেখোদ কিয়া’ (বাজার, ১৯৮২), ইত্যাদির মতো অজস্র অমর পঙ্‌ক্তিমালা।
জনপ্রিয়তম গণমাধ্যম হিন্দী সিনেমায় এসব পঙ্‌ক্তির এমনি ব্যাপক অন্তর্ভুক্তি ও সমন্বয় একদিকে জনজীবনে উর্দু ভাষার ভাবগ্রাহিতা ও সুবেদিতা চারিয়ে দিয়েছে এবং আরেকদিকে জনাদৃত একটি সঙ্গীতশৈলীও তৈরী করে দিয়েছে। ভাষাটির সাধারণ আভিজাত্যের এবং কাব্যের বিশেষ প্রসাদগুণের কারণে ভারতের স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীবিশেষের উর্দুকে কাফন পরানোর আকাঙ্ক্ষাপূরণ এখনো সুদূরপরাহত বলেই মনে হয়। সে-আত্মঘাতী খাহিশটি যেদিন পূরণ হবে, সেদিন অজস্র স্বনামধন্য হিন্দু উর্দুকবিদের বিদেহী আত্মা বিশেষ কষ্টই পাবে। তেমন যে-কয়েকজনের নাম এ-মুহূর্তে আমার মনে পড়ছে তাঁরা হলেন-দিওয়ালী সিং ফরিদাবাদী ওরফে কাতিল্‌, ব্রিজনারায়ণ ওরফে চাক্‌বাস্ত্‌ (১৮৮২-১৯২৬), তিলকচাঁদ ওরফে মাহরুম, (১৮৮৭-১৯৬৫), রঘুপতি সাহায় ওরফে ফিরাক্‌ গোরখ্‌পুরী (১৮৯৬-১৯৮২), সুরজ নারায়ণ ওরফে মেহের (১৮৫৯-১৯৩১), লাভু রাম ওরফে মালসিয়ানি (১৮৮৪-১৯৭৬), জগত মোহন লাল ওরফে রাওয়াঁ (১৮৮৯-১৯৩৪), নরেশকুমার ওরফে শাদ (১৯২৭-১৯৬৯) প্রমুখ।
পঞ্চাশের দশকের হিন্দী ফিল্মের প্রাণ ছিল উর্দু গান। সে গানের সবচেয়ে কার্যকর অংশটি ছিল প্রগতিবাদী উর্দু কবিদের প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। সুযোগটা জুগিয়েছিল কিছু প্রগতিবাদী হিন্দীফিল্ম-ডিরেক্টর আর হিন্দী সিনেমার অপরিহার্য প্রতিবাদী টাইপ-চরিত্রটি। উদাহরণ : ‘নয়া দাওর’ (‘নবযুগ’ ১৯৫৭), ‘ফির সুবাহ্‌ হোগি’ (‘আবারও ভোর হবে’ ১৯৫৮), ‘পেয়াসা’ (‘তৃষ্ণার্ত’ ১৯৫৭)। কিন্তু অতটা জনপ্রিয় প্রগতিবাদ সংস্কৃতি-নিয়ন্ত্রক স্বাধীন ভারত সরকারের সয় নি। বি.ভি. কেসকার ১৯৫২ সালে তথ্যমন্ত্রী হওয়ার পর অল ইন্ডিয়া রেডিওতে ফিল্ম মিউজিক সমপ্রচার বন্ধ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন এবং সঙ্গে সঙ্গে তা বাস্তবায়নও করেন। বাহ্যত হিন্দীগানের লঘুত্বকে দূষলেও মূল কারণটি ছিল-ওই মিউজিক উর্দুপ্রধান যা ভারতের ভাষিত মৌলবাদীদের দূরভিসন্ধিমূলক উদ্দেশ্যসাধনের প্রবল অন্তরায়। ফলে উর্দু প্রোগ্রাম শোনার জন্য শ্রোতাসাধারণও ভারতের কেন্দ্রীয় রেডিয়ো ‘বিবিধ ভারতী’র বদলে ‘রেডিয়ো পাকিস্তান’ এবং ‘রেডিও সিলনে’র দিকে ঝুঁকে পড়ে।
উর্দু কবিতা হিন্দীফিল্মের সঙ্গে আরেকভাবেও বিজড়িত। বিখ্যাত উর্দু কবিতার স্মৃতিধার্য টুকরো ও শব্দবন্ধ হিন্দীসিনেমার গানের অঙ্গীভূত হয়ে আছে হেথা, হোথা এবং সর্বথা। কিছু দৃষ্টান্ত। ‘এক দুজে কে লিয়ে’ (‘একে অপরের জন্যে’, ১৯৮১) সিনেমাটির শীর্ষ সংগীতে পেশাদার গীতিকবি আনন্দ বখ্‌শী গালিবের অমর একটি ফ্রেজ ঢুকিয়ে দিয়েছেন, ‘ “ইশক পর জোর নেহি”, গালিব নে কাহা হ্যয় ইসি লিয়ে’। ‘লাভ ইন সিমলা’ (১৯৬০) সিনেমায় গীতিকার রাজিন্দার কিষাণ ‘আয় মেরি শাহে খুবাঁ’-গানে বিরল উদ্ভাবনীশক্তির পরিচয় দিয়ে ব্যবহার করেছেন মোমিন খান মোমিনের অমর শের ‘তুম মেরে পাস হোতি হো গোয়া, জব কোয়ি দোসরা নেহি হোতা’ (মনে হয় তুমি আমার পাশে রয়েছে, যখন দ্বিতীয় কেউ কাছে থাকে না)। ‘মৌসম’ ফিল্মে (১৯৭৫) গীতিকার গুলজারের একটি গানের মুখড়ারূপে ব্যবহৃত হয়েছে মির্জা গালিবের বিখ্যাত পঙ্‌ক্তি ‘জী ঢোঁঢ়তা হ্যায় ফির ওহি ফুরসত কে রাত-দিন’ (মন খুঁজে বেড়ায় ফের সেইসব অবসরের দিনরাত’)।
এভাবে শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে উর্দুভাষা হিন্দীসিনেমার আশ্রয়ে প্রাণবন্ত হয়ে বেঁচে থাকে এবং মাধ্যমটিকে নিজের শব্দসম্পদ ও কাব্যিক ঐতিহ্য দিয়ে সমৃদ্ধও করে চলে। এর ফলে বানচাল হতে থাকে সংঘ-পরিবারের অপচেষ্টা-উর্দুকে ভারতের জাতীয় চেতনা থেকে নির্মূল করার। হিন্দীফিল্মী গানের প্রয়োজনে লালিত এই উর্দুপ্রীতিকে প্রতীকরূপে যথাযথভাবেই উপস্থাপন করেন নিবেদিতচিত্ত গালিবভক্ত কবি গুলজার তাঁর একটি চমকপ্রদ চরণে। দ্বিপদীটি ব্যবহৃত হয়েছে ‘দিল সে’ (১৯৯৮) ফিল্মের সুপারহিট গান ‘ছাইয়াঁ ছাইয়াঁ’-তে। অতীব সুন্দর সে-উচ্চারণ :

উয়ো য়ার হ্যায় জো খুশবু কি তারাহ্‌
জিসকি জবান্‌ উর্দু কি তারাহ

[ও-ই বন্ধু, যে খুশবুর মতো
এবং যারা ভাষা উর্দুর মতো]

বস্তুত এমনি স্মৃতি-বিস্মৃতির দোলাচলেই উর্দু বিশেষ কিছু পার্শ্বধারায় বেঁচে রয়েছে ভারতে। ভাষাটির মূলধারা বয়ে চলেছে এখন পাকিস্তানে, যেখানে উর্দু দেশভাগ থেকেই অভিবাসী। তাই এ কালের উর্দু ভাষার পুরাতন প্রগতিবাদী এবং নতুন নারীবাদী কবিদের দেখা মেলে কেবল তার অভিবাসভূমেই-যেমন হাবীব জালিব, কিশওয়ার নাহিদ, ফাহমিদা রিয়াজ, গুলনার, পারভীন শাকির, আদা জাফরী প্রমুখ। এঁদের কবিকর্মের মূল্যায়নের জন্যে সংশ্লিষ্ট বাস্তবিক ও সামাজিক পটভূমিটি জানা জরুরী হলেও এ-লেখায় সেটা প্রাসঙ্গিক হবে না। এখানে স্মর্তব্য সারকথাটি শুধু এই যে, শেষ পর্যন্ত উর্দুকাব্যের অতুল সম্ভাবনাময় তিরিশের দশকের প্রগতিবাদী আন্দোলনটি সামপ্রদায়িকতার কাছেই হার মানল, চল্লিশের দশকের দেশভাগের পরে। এমনকি উর্দুভাষাটিও সামপ্রদায়িকতার শিকার হয়ে গেল, যার পরিণামস্বরূপ দিল্লীর রেখ্‌তা স্বদেশেই হয়ে গেল পরের ভাষা, মুসলমানের ভাষা; পরদেশের ভাষা, পাকিস্তানের ভাষা। এভাবে শেষ পর্যন্ত সত্যসত্যই দেশহারা হয়ে যায় উর্দু। এই ট্র্যাজিক সত্যটি থেকেই, ১৯৯৭ সালে গালিবের জন্মের দ্বিশতবার্ষিকী অনুষ্ঠান উপলক্ষে, প্রগতিবাদী কবি সাহির লুধিয়ানভীর ক্ষুব্ধ মন্তব্যটি কাব্যরূপ পেয়েছিল:

জিন্‌ শাহরুঁ মে গুঞ্জী থী গালিব কি নাওয়া বরসুঁ
উন্‌ শাহরুঁ মে আজ উর্দু বে-নাম-ও-নেশাঁ ঠ্যাহ্‌রি
আযাদী-এ কামিল কা এলান হুয়া জিস্‌ দিন
মা’তুব্‌ জবাঁ ঠ্যহ্‌রি, গাদ্দার জবাঁ ঠ্যহ্‌রি
জিস্‌ আহ্‌দে সিয়াসাত্‌ নে ইয়ে জিন্দা জবাঁ কুচ্‌লি
উস্‌ আহ্‌দে সিয়াসাত্‌ কো মরহুমুঁ কা গম কিউঁ হ্যায়
গালিব জিসে কাহ্‌তে হ্যাঁয়, উর্দু হি কা শায়ের থা
উর্দু পে সিতম ঢা কার, গালিব পে কারাম কিউঁ হ্যায়।

[যে সব শহর মুখরিত ছিল গালিবের কণ্ঠের রণনে
সেসব শহরেই উর্দু আজ অস্বীকৃত, নিশ্চিহ্ন
পূর্ণ স্বাধীনতার ঘোষণা যেদিন হল, সেদিনই
উর্দু চিহ্নিত হলো অভিশপ্ত ভাষা বলে, গাদ্দার ভাষা বলে
যে-রাজনীতি এই জীবন্ত ভাষাটিকে পয়মাল করল
সে-রাজনীতিরই আবার মৃতদের জন্য চিন্তা করা কেন।
গালিব যাঁর নাম, তিনি কবি ছিলেন উর্দুরই
উর্দুর উপর জুলুম করে গালিবের উপর দয়া কেন।]

এককথায় ‘অল্‌ ইন্ডিয়া প্রোগ্রেসিভ রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশন’ পরিবর্তমান সময়ের সঙ্গে কুলিয়ে উঠতে পারে নি। এর কারণ কেবল সংঘটির অভ্যন্তরেই নেই। তিরিশের এবং চল্লিশের দশকে পীড়ন ও শোষণধর্মী উপনিবেশবাদের প্রতিরোধ ছিল নিজের ভিতরেই এক দুর্বার শক্তি। সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রামজনিত গণআন্দোলন এমন একটি ছকের সৃষ্টি করেছিল যার খোপগুলিতে সমাজতন্ত্রের বিশ্লেষণাত্মক শ্রেণীসমূহ রেডিমেড ঘরগুলি পূরণ করে ফেলত, যেমন-শোষক-শোষিত, নির্যাতক-নির্যাতিত, পুঁজি-মজুর, পুঁজিবাদী-শ্রমিক প্রভৃতি। কিন্তু জাতি-রাষ্ট্র গঠিত হতেই মোহমুক্তি ঘটতে লাগল। কারণ নবরাষ্ট্রগুলি মনোপলি মূলধনের পুতুলের রূপ পরিগ্রহ করতে থাকল। সিস্টেমটি পূর্বতন শোষণেরই পুনরুৎপাদন শুরু করল। বদল হল কেবল উৎপাদক, বিদেশীর বদলে দেশী। কালক্রমে রাজনীতির বিকৃতি, সুবিধাবাদী নেতৃত্ব এবং বৈশ্বিক মূলধনের প্রবৃদ্ধি ও সংহতির ক্রমবর্ধমান চাপে এই স্বপ্নভঙ্গ অধঃপতিত হল আত্মসমর্পণে। বিপ্লবাত্মক রূপান্তরের আশা জীবিত ছিল আরো কিছু কাল। তবে তার প্রাণবায়ু ফুরিয়ে আসছিল-উপমহাদেশে এবং বিদেশে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের ওপর নেমে-আসা আঘাতের পর আঘাতে। শেষ আঘাতটি ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙনের। সোভিয়েত পতাকার পতনের দিন প্রগতিবাদী উর্দুকবি আলী সরদার জাফরি রচনা করেছিলেন একটি অন্ত্যেষ্টিগাথা :

আলবিদা আয় সুর্‌খ্‌ পরচম, সুর্‌খ্‌ পরচম আলবিদা
আয় নিশান্‌-এ আয্‌ম-এ মজলুমান্‌-এ আলম আলবিদা
দীদা-এ পুরনম্‌ নে কাল্‌ দিল্‌ সে কাহা থা মারহাবা
আজ লেকিন কাহ্‌ রহি হ্যায় চশ্‌ম-এ পুরনম্‌ আলবিদা
রজম্‌গাহ্‌-এ খায়্‌র ও শর্‌ যে য়াদ আয়েগী তেরি
হাঁ ম্যায় আব্‌ আওর লশকর্‌-এ ইবলিস্‌-এ আযম আলবিদা
আয় ফুরাত-এ তিশ্‌নাবলি-এ জিহাদ-এ জিন্দেগি
খুল্‌জুম্‌-এ তিশ্‌নাবলি কি মৌজ্‌-এ বর্‌হম্‌ আলবিদা

[বিদায় হে লালপতাকা, লালপতাকা হে বিদায়
বিদায় হে জগতের যত নির্যাতিতের নিশান বিদায়
গতকাল পর্যন্তও আনন্দাশ্রুভরা চোখে তোমাকে বলেছি মারহাবা
সেই চোখই আজ অশ্রুভারাক্রান্ত আর তোমাকে বলছে বিদায়
ভালো ও মন্দর মধ্যেকার যুদ্ধকালে তোমাকে মনে পড়বে
মহাশয়তানের লস্করসমক্ষে আজ আমি একা, তোমাকে বিদায়
জীবনযুদ্ধে শহীদদের তৃষ্ণা মেটানোর হে মহতী নদী বিদায়
শুকিয়ে কাঠ হয়ে-যাওয়াদের আহারদানে উদগ্রীব হে ঊর্মি বিদায়]

পার্টিশনের সময় এবং তার কিছুকাল পর পর্যন্তও উর্দু লেখক সমাজে হিন্দু-মুসলমানের ধর্মনিরপেক্ষ একটি কম্পোজিট কালচার ছিল। স্বাধীন ভারতের ‘সমাজতন্ত্রী’ সরকারের তেলেঙ্গানা ও অন্যান্য অঞ্চলে আন্দোলন দমনের নির্মমতা দেখে ‘কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া’র পলিসিতে পরিবর্তন এল। মডারেট পি.সি.জোশীর বিরুদ্ধে বিজয়ী সিপিআই-এর নতুন সেক্রেটারি-জেনারেল র‌্যাডিক্যাল বি.টি. রনদীভের নামানুসারে ‘রনদীভ ডক্ট্রিন’ নামে পরিচিত হার্ডলাইন নিল। অর্থাৎ ‘ইউনাইটেড ফ্রন্ট’-এর সাম্রাজ্যবাদবিরোধী গোষ্ঠীগত সংযুক্তিটি পরিত্যাগ করে খোলাখুলি পুঁজিবাদ-বিরোধী এবং সামন্ততন্ত্রবিরোধী অবস্থান নিল। ‘অল পাকিস্তান প্রোগ্রেসিভ রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশনে’র সেক্রেটারী আহমদ নাদিম কাসেমী এবং অন্যান্য পাকিস্তানী কমিউনিস্ট প্রধানগণ পরে অবশ্য স্বীকার করেছেন যে, এটা একটা বাম-হঠকারিতাই ছিল। এই অ্যাডভেঞ্চারিজমের ভিত্তি ছিল একটা ভ্রান্ত ধারণা যে পাকিস্তানও একটা পুঁজিবাদী রাষ্ট্র এবং ভারত-পাকিস্তানে কমিউনিস্ট আন্দোলন জঙ্গী বিপ্লবের স্তরে উত্তীর্ণ হয়েছে। ১৯৫০ সালে জেনারেল সেক্রেটারীর পদ থেকে অপসৃত হবার সময় সিপিআই সমীপে কৃত আত্মসমালোচনাকালে রণদীভে নিজেই এ-ভুল স্বীকার করেন।
সে তো পরের কথা। তার আগে কথা আরো আছে। যেহেতু ১৯৪৮ সালের ‘সেকেন্ড কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া কংগ্রেস’-এর আগে ‘কমিউনিস্ট পার্টি অফ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয় নি, সেহেতু পাকিস্তানী বামপন্থীদের কাছে ‘প্রোগ্রেসিভ রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশন’ই ছিল আদর্শগত কাজ করার একমাত্র সংগঠিত মঞ্চ। ফলে মঞ্চটি মহাগুরুত্বপূর্ণ এবং তাৎপর্যমণ্ডিত হয়ে ওঠে। সেজন্যেই ১৯৪৯ সালের সম্মেলনে অল্‌-পাকিস্তান পিডব্লিয়োএ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগেই, নতুন রাষ্ট্রের বড় শহর লাহোর-করাচীর মতো ছোটোখাটো শহরগুলিতেও সমিতিটি স্বতন্ত্র শাখাসমূহ কাজ শুরু করে দিয়েছিল। পাকিস্তানী বামপন্থীদের, বিশেষত তাদের সমর্থক প্রগতিবাদী লেখকদের, প্রাতিষ্ঠানিক মঞ্চের জোগান দিয়েছিল মিয়া ইফতিখারুদ্দীন কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ‘প্রোগ্রেসিভ পেপার্‌স্‌ লিমিটেড’। পিপিএল-এর এ-ভূমিকাটি ছিল অতীব গুরুত্বপূর্ণ- বিশেষত পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি এবং এপিপিডব্লিয়োএ নিষিদ্ধ ঘোষিত হবার পর। মঞ্চটির তাৎপর্য অনুধাবন করে জেনারেল আইয়ুব খান ১৯৫৮ সালের অক্টোবরের সামরিক অভ্যুত্থানের পরপরই এই লিমিটেড কম্পানীটির নিয়ন্ত্রণভার কেড়ে নেয় এবং এর প্রকাশনাগুলোর কণ্ঠে সরকারী ভাষ্য পুরে দেয়।
১৯৪৯ সালের নভেম্বরে পিডব্লিয়োএ’র শাখাসমূহ অল-পাকিস্তান সমিতিতে একীভূত হবার আগে থেকেই প্রগতিবাদী লেখকদের কণ্ঠে এবং রণকৌশলে রণদীভের হার্ডলাইন প্রতিফলিত হয়েছিল। পাকিস্তানী রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রগতিকামী সমালোচনা এবং প্রগতিশীলদের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবকামী সাহিত্য সৃষ্টির আহ্বান স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর ভাষায় প্রকাশ পেতে লাগল ‘সভেরা’, ‘নকুশ’, ‘সঙ্‌গে মীল্‌’ এবং ‘আদব্‌-এ লতিফ’ ইত্যাদি প্রগতিবাদী পত্রিকাগুলিতে প্রকাশিত রচনায়। ‘অল-পাকিস্তান প্রোগ্রেসিভ রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশনে’র সফদর মীর, সিব্‌তে হাসান, হাজেরা মসরুর, আহমদ নাদিম কাসেমী, আবদুল্লাহ মালিক, আরিফ আবদুল মতিন, জহীর কাশ্মিরী, মোমতাজ হোসায়েন, খাদীজা মসতুর প্রমুখ অধিকতর বিপ্লবী ‘সভেরা গ্রুপ’ বলে অভিহিত হল। স্বভাবতই এই বিদ্রোহ-সঞ্চারী দলটি রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে এঁটে উঠতে পারল না। তাদের ব্যর্থতা বস্তুত গোষ্ঠীগত ততটা নয়, যতটা স্থান ও কালগত। পার্টিশন-পরবর্তী জাতিক ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পুনর্যোজনই ছিল প্রগতিশীলদের ব্যর্থতার প্রকৃত নির্মাতা। বরং লক্ষণীয় যে সে-সময় অভিজাততন্ত্রী পাকিস্তানী কায়েমীস্বার্থের সমালোচনায় ধারাবাহিকভাবে সোচ্চার ছিল একমাত্র এই প্রগতিবাদী লেখকগোষ্ঠীটিই।
সাংগঠনিক মঞ্চ এবং প্রাতিষ্ঠানিক খুঁটি হারানো স্পষ্টতই বাম মোর্চার প্রতি একটা প্রচণ্ড আঘাত হলেও, পার্টির নিষিদ্ধ ঘোষণা পাকিস্তানী সাহিত্যে প্রগতিবাদী আন্দোলনের মৃত্যু ঘটাতে পারে নি। তার প্রমাণ উনিশশো ষাটের ও সত্তরের দশকের প্রগতিবাদী উর্দুকবি হাবিব জালিব এবং আহমদ ফারায, আশির ও নব্বইয়ের দশকের নারীবাদী উর্দুকবি কিশোয়ার নাহিদ এবং ফাহমিদা রিয়াজ। অধুনা সমাজতন্ত্র রেফারেন্সের ফ্রেম হিসেবে আর ব্যবহৃত হয় না বটে, তবু আজকের উর্দুকাব্যেরও একটি তাৎপর্যপূর্ণ অংশ সমাজতান্ত্রিক সেন্টিমেন্টে জারিত এবং প্রগতিবাদী আদর্শে প্রভাবিত। কারণ এটা এমন একটি ক্রান্তিকালীন লেখকগোষ্ঠীর উত্তরাধিকার, যাঁরা সকল প্রতিকূলতার মধ্যেও নব্যউপনিবেশবাদীদের দোসর রাষ্ট্র ও কায়েমীস্বার্থের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন তাঁদের কাব্যসাহিত্যের মাধ্যমে এবং নানারকম ব্যক্তিগত খেসারত দিয়েও।
এর একটি উদাহরণ। ১৯৮০ সালের ডিসেম্বরে জিয়াউল হক সরকারের আদেশ সরাসরি অমান্য করে করাচী প্রেসক্লাবে সিব্‌তে হাসানের নেতৃত্বে প্রগতিবাদী কবি হাবিব জালিবের সম্মানে এক সংবর্ধনা সভার আয়োজন করা হয়েছিল। সে-মিটিঙের বহুলব্যবহৃত অডিওটেপে এখনো ধ্বনিত হয় প্রতিবাদের ভাষা, প্রতিধ্বনিত হয় বলিষ্ঠ সংগ্রামের প্রত্যয়। পাকিস্তানী মিলিটারী ডিক্টেটারশিপ-বিরোধী ভূমিকার জন্য দীর্ঘপ্রতিষ্ঠিত এবং কষ্টার্জিত দেশজোড়া খ্যাতি ছিল কবি জালিবের। এই অনলবর্ষী কবির পদ্যই ১৯৬২ সালে জেনারেল আইয়ুবের ‘শাসনতন্ত্রে’র বিরুদ্ধে জনসাধারণের মুখে প্রথম ভাষা জুগিয়েছিল। জালিবের স্বৈরতন্ত্রবিরোধী উচ্চারণের নমুনা :

দীপ জিস্‌কা মহল্লাত্‌ হি মে জ্বলে
চান্দ লোগুঁ কি খুশিউঁ কো লে কার্‌ চলে
উওহ্‌ জো সায়ে মে হার্‌ মাস্‌লেহাতে কে পলে
অ্যায়সে দস্তুর কো, সুবহ্‌-এ বে-নূর কো
ম্যয় নেহি মান্‌তা! ম্যয় নেহি জান্‌তা!

[ কেবল প্রাসাদকে আলোকিত করে যে-প্রদীপ
কেবল নির্বাচিতজনের ফুর্তির জোগান দেয় যে-প্রদীপ
যারা আপসের ছত্রছায়ায় শ্রীবৃদ্ধি অর্জন করে
এমন রেওয়াজকে, আলোকবঞ্চিত প্রভাতকে
আমি মানি না! আমি জানি না! ]

জেনারেল জিয়াউল হকের হকের আমলেও বারবার জেল খেটেছেন এই বিপ্লবী কবি। শেষবার জেল থেকে বেরিয়েও তিনি তাঁর স্বৈরতন্ত্রবিরোধী কণ্ঠটিকে খাটো করেন নি বিলকুল। এই ‘আওয়ামী শায়ের’, (‘জনগণের কবি’) তাঁর স্বভাবসুলভ তীব্র আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে সাহসী প্রহসন লিখেছেন ‘জিয়া ও জুলমত’ (‘আলো এবং অন্ধকার’) শব্দযুগল নিয়ে বাচিক ক্রীড়ার ছলে :

জুলমত কো জিয়া, সরকার কো সাবা, বন্দে কো খোদা ক্যা লিখ্‌ না? ক্যা লিখ্‌ না?
পাত্থর তো গাওহার, দিওয়ার কো দার্‌, জুগ্‌নু কো দিয়া লিখ্‌ না? ক্যা লিখ্‌ না?
এক্‌ হাশ্‌র বপা হ্যায় ঘর ঘর মে, দম ঘুঁটতা হ্যায় গুম্বাদ-এ বে-দর্‌ মে
এক্‌ শখ্‌স কে হাথুঁ মুদ্দত্‌ সে রুস্‌ওয়া হ্যায় ওয়াতান্‌ দুনিয়া ভর মে
আয় দীদাওয়ারো! ইস জিল্লাত কো, কিস্‌মত কা লিখ্‌খা ক্যা লিখ্‌ না? ক্যা লিখ্‌ না?

[ অন্ধকারকে আলো লেখা কেন? খসখসকে বাতাস, বান্দাকে খোদা কেন লেখা?
পাথরকে হীরা বলা কেন? দেয়ালকে দরজা, জোনাকিকে বাতি কেন লেখা? কেন লেখা?
ঘর ঘরে কেয়ামত লেগে আছে, দম বন্ধ হয়ে আসে দুয়ারহীন গম্বুজে
একটি ব্যক্তির হাতে স্বদেশ আমার দীর্ঘকাল ধরে বিশ্বময় লাঞ্ছিত
হে চক্ষুষ্মানগণ! এই অপমানকে বিধির লিখন কেন লেখা? কেন লেখা? ]

‘প্রোগ্রেসিভ রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশনে’র উত্থান, দ্রুত বর্ধন এবং শ্লথ পতনের প্রক্রিয়াটির বিশ্লেষণ উর্দুকাব্যের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুই খুলে তুলে ধরে-যেমন জাতীয়তাবাদ, শ্রেণীবৈষম্য, ধর্মীয় সংস্কার এবং সামাজিক ন্যায়বিচার ইত্যাদির সঙ্গে প্রগতিবাদী কবিদের সম্পর্ক। প্রগতিবাদী সামাজিক ভাবগ্রাহিতার সঙ্গে এই লেখক সংঘের এমন গভীর একটা সম্পর্ক ছিল যে সেই নিরন্তর বিজড়ন-হেতু উর্দুসাহিত্যের বিষয়তালিকা প্রধানত নিয়ন্ত্রণ করছিল। এঁরা নতুন একটা কাব্যরেওয়াজই প্রবর্তন করলেন যা গতানুগতিক মেটাফোর বা পরোক্ষ উপমাদিকে বিদায় দিয়ে সমাজ-রূপান্তরের নতুন নন্দনতত্ত্বের বিকাশ ঘটাল। প্রেমপাগলদের জন্য গজল লেখার বদলে এঁরা প্রগতি এবং আধুনিকতার বিজয় উদযাপনকল্পে সহজ সরল জনপ্রিয় কবিতা লেখা শুরু করলেন। শাশ্বত প্রেমিক-প্রেমিকার চিরন্তন প্রতীক লায়লা-মজনু, শিরী-ফরহাদের শোকগাথা রচনা করার বদলে এঁরা শহীদ বিপ্লবী প্যাট্রিস লুমাম্বা ও মার্টিন লুথার কিং প্রমুখের
অন্ত্যেষ্টিগাথা রচনা করার প্রতি অধিক দায়বদ্ধতা দেখালেন। উর্দুকাব্যের জনপ্রিয় প্রেম-প্রতিদ্বন্দ্বী, কবির প্রবচনীয় ঈর্ষার পাত্র ‘রকিব’কে পুনর্নির্মাণ করলেন বিপ্লব ঘটানোর সংগ্রামে কবির সহযোদ্ধারূপে।
নবধারার এই কাব্যরীতির পথিকৃৎ কবি ও তাঁর পথিকৃৎ কবিতাটি সম্পর্কে এখানে একটু বিস্তারিত উল্লেখ প্রয়োজন। প্রেমিক কবির চিরপরিচিত মানসপ্রতিমাগুলি নতুন তাৎপর্য লাভ করে প্রথম ফয়েজ আহমদ ফয়েজের হাতে। এরপর তাঁর ভালোবাসার জন হয়ে যায় জনগণ, ‘মাহবুবা’ হয়ে যায় দেশমাতৃকা; তবে একেবারে বিস্মৃত হন না প্রেমিকাও। প্রেমাস্পদের সঙ্গে বিচ্ছেদ হয়ে ওঠে কবির কাঙ্ক্ষিত আদর্শের সঙ্গে বিভেদ। রোমান্স এবং এরস্‌ থেকে মুখ ফিরিয়ে রিয়েলিজম ও অ্যাগেপের প্রতি আকৃষ্ট হওয়ার ব্যাপারটা খোলাখুলি প্রথম প্রকাশিত হয়েছে তাঁর ‘মুঝ্‌ সে প্যহ্‌লি সি মুহব্বত মেরি মাহবুব না মাঙ্গ্‌’ (আমার কাছে আগের মতো প্রেম হে বান্ধবী আর চেয়ো না) শীর্ষক কবিতাটিকে, যেটি উর্দুকাব্যের ইতিহাসে যুগান্তকারী বলে গৃহীত:

ম্যয় নে সমঝা থা কে তু হ্যায় তো দরখশাঁ হ্যায় হায়াত
তেরা গম হ্যায় তো গমে দহর্‌ কা ঝগড়া ক্যা হ্যায়
তেরি সুরত সে হ্যায় আলম মে বাহারুঁ কো সোবাত্‌
তেরি আঁখুঁ কে সেওয়া দুনিয়া মে রাখ্‌খা ক্যা হ্যায়
তু জো মেল্‌ যায়ে তো তকদীর নেগুঁ হো যায়ে
য়ুঁ না থা, ম্যায় নে ফকত্‌ চাহা থা য়ুঁ হো যায়ে
আওর ভি দুখ হ্যাঁয় জমানে মে মুহব্বত কে সেওয়া
রাহাতেঁ আওর ভি হ্যাঁয় ওয়াস্‌ল্‌ কি রাহাত কে সেওয়া
আন্‌গিন্ত্‌ সাদিয়ুঁ কে তারিকে বাহিমানা তালিস্‌ম
রেশ্‌ম ও আত্‌লাস্‌ ও কম্‌খাব্‌ মে বুন্‌ওয়ায়ে হুয়ে
জা বজা বিক্‌তে হুয়ে কুচা ও বাজার মে জিস্‌ম্‌
খাক মে লিথ্‌ড়ে হুয়ে খুন মে নাহ্‌লায়ে হুয়ে
জিস্‌ম নিক্‌লে হুয়ে আম্‌রাজ্‌ কে তন্‌নুরুঁ সে
পীপ্‌ বহ্‌তি হুয়ি গল্‌তে হুয়ে নাসুরুঁ সে
লওট্‌ জাতি হ্যয় উধার কো ভি নাজার ক্যা কীজিয়ে
আব্‌ ভি দিলকাশ্‌ হ্যায় তেরা হুস্‌ন, মগর ক্যা কীজিয়ে
আওর ভি দুখ্‌ হ্যায় জমানে মে মুহব্বত কে সেওয়া
রাহাতেঁ আওর ভি হ্যায় ওয়াস্‌ল কি রাহাত্‌ কে সেওয়া
মুঝ্‌ সে প্যহ্‌লি সি মুহব্বত মেরি মাহবুব না মাঙ্গ

[ আমি ভেবেছিলাম তুমি আছ তাই জীবনটা ঝলমলে
তোমার দুঃখ আছে, ফের যুগের দুঃখের তর্ক কিসের
জগতের যত বসন্ত সব তোমার মুখেরই মুখাপেক্ষী
তোমার চোখ দু’টি দুনিয়ার আর আছেটা কী
নিয়তিই নত হয়ে যাবে তুমি আমার হয়ে গেলে
বাস্তবে এমন ছিল না, শুধু আমি চেয়েছিলাম এমন হোক
প্রেমের দুঃখ ছাড়াও জীবনে দুঃখ আছে আরো
আছে আরো আনন্দ, মিলনের আনন্দ ছাড়াও
অগণন শতকের অন্ধকার অমানবিক সম্মোহক
সিল্ক-সাটিন-আর কিংখাবে বোনা জীবনের পাশাপাশি
অলিগলি আর হাট-বাজারে মনুষ্যের শরীর বিকোয়
কর্দমে লদপদ রক্তে স্নাত দেহ
গলিত জখমের বহতা ক্লেদে অক্ত দেহ
যেন আধিব্যাধির ফুটন্ত তন্দুর থেকে নির্গত
সেদিকেও ফিরে যায় চোখ আমার কী আর করা
এখনো আকর্ষণীয় তোমার রূপ কিন্তু কীইবা করা যায়
প্রেমের দুঃখ ছাড়াও জীবনে দুঃখ আছে আরো
আছে আরো আনন্দ, মিলনের আনন্দ ছাড়াও
আমার কাছে আগের মতো প্রেম হে বান্ধবী আর চেয়ো না ]

সাদামাটা সহজসরল মৃদুকণ্ঠ ছোট্ট এ-কবিতাটি বলতে গেলে উর্দুকাব্যের সনাতনধারার মূল্যেৎপাটনেরই প্রয়াস পেয়েছে। জন্মাবধি উর্দু কবিতার ব্যতিক্রমহীন মৌল বাণীটি ছিল-নরনারীর প্রেমই মানবজীবনের উৎস ও কেন্দ্র এবং এর বাইরে এ-জগতে আর কিছুরই অস্তিত্ব নেই। এই প্রথম একজন প্রধান উর্দুকবি তাঁর কবিতায় বিপরীত মেসেজটি দিলেন যে,-প্রেম ছাড়াও জগজ্জীবনে মানব-মানবীর অনেক জরুরি বিষয় আছে যেমন অভাব, ক্ষুধা ও সামাজিক বৈষম্য। তবে উর্দুভাষার শ্রেষ্ঠতম আধুনিক কবি ফয়েজের এ-ধারণাটি আমাকে ডাক দিয়ে নিয়ে যায় ভাষাটির শ্রেষ্ঠতম ক্লাসিক কবি গালিবের (১৭৯৭-১৮৬৯) আসরে, যিনি উচ্চারণ করেছিলেন :

তেরি ওয়াফা সে কেয়া হো তালাফি কে দাহর মেঁ
তেরে সেওয়া ভি হাম পর বহুত সে সেতম্‌ হুয়ে

[ কেবল তোমার প্রেমই কীভাবে ক্ষতিপূরণ করবে
তোমার ছাড়াও জুলুম অনেকই হয়েছে আমার ওপর ]

আমার মনে হয় উর্দুকাব্যের ক্লাসিকো-মর্ডান কবি একমাত্র ফয়েজ আহমদ ফয়েজ (ডাইডাক্টিক কিংবা উপদেশাত্মক মুহাম্মদ ইকবালকে মডার্ন ভাবতে দ্বিধা আছে বলে)। বস্তুত বাণীতে আধুনিক হলেও শৈলী ও বাকরীতিতে ফয়েজ ক্ল্যাসিকেল গালিবের ঐতিহ্যেরই উত্তরাধিকারী। প্রেমাস্পদের রূপের কথা ছেড়ে জনগণের দুঃখের কথা বলার সময়ও সাধারণ্যের ভাষার বদলে পরিশীলিত ফারসি-ঋদ্ধ অভিজাত বাকরীতি ব্যবহারেই আকৃষ্ট ছিলেন ফয়েজ। গালিবে ফয়েজের মুগ্ধতা প্রতিফলিত তাঁর প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ (১৯৪৩) ‘নক্‌শে ফরিয়াদী’র নামকরণেও। নক্‌শে ফরিয়াদী (অভিযোগকারীর রূপরেখা) শব্দবন্ধটি ‘দিওয়ানে গালিবে’র প্রথম গজলের প্রথম পঙ্‌ক্তি থেকে নেয়া :

নক্‌শে ফরিয়াদী হ্যায় কিস্‌ কি শওখি-য়ে তাহরীর কা
কাগজী হ্যায় পায়্‌রাহান্‌ হার্‌ পায়্‌কর-এ-তাস্‌ভীর কা

[ অভিযোগকারীর রূপরেখা কার লেখার রসিকতা
সব চিত্রার্পিত মুখের পোশাক কাগুজে হয় ]

বস্তুত গালিব থেকে ফয়েজ পর্যন্ত উর্দুকাব্যের স্বর্ণপর্ব। ‘মুঝ্‌সে প্যহলি সি মুহাব্বত’ কবিতাটি ফয়েজের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘নক্‌শে-ফরিয়াদী’তেই সংকলিত হয়েছে। ‘নক্‌শে-ফরিয়াদী’ শব্দবন্ধটি ফয়েজের মোট কাব্যসম্ভারেরই প্রাণসত্তাটাকে ধারণ করে। এ-কবি যেহেতু পশ্চিমসৃষ্ট কোর্টের কর্তৃত্বে বিশ্বাসী নন, সেহেতু তিনি কেবল বিশ্ব-আদালতেরই ফরিয়াদী। এ দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে ফয়েজ আহমদ ফয়েজকে বিদ্রোহীই বলতে হয়। জোশ মালিহাবাদী (১৮৯৮-১৯৮২), ইসরারুল হক মাজাজ (১৯১১-১৯৫৫), আলী সরদার জাফরি (মৃ. ২০০১), মজ্‌রুহ্‌ সুলতানপুরী, মাখদুম মহিউদ্দীন, সাহির লুধিয়ান্‌ভী (১৯২২-১৯৮০), কাইফি আজমী (মৃ. ২০০২) প্রমুখ সুবিখ্যাত প্রগতিবাদী কবিকুলের সহযাত্রী, ফয়েজ আহমদ ফয়েজ (১৯১১-১৯৮৪) মুহাম্মদ ইকবালের (১৮৭৩-১৯৩৮) পরে উর্দু সাহিত্যের শ্রেষ্ঠতম কবি হিসেবে স্বীকৃতি পাবার আগেই ফোকাসে চলে আসেন তিরিশের দশকের ‘অল-ইন্ডিয়া প্রোগ্রেসিভ রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশন’-এর উজ্জ্বলতম সদস্য হিসেবে। কিন্তু দেশের মুক্তি-আন্দোলনের সহযাত্রী উর্দুভাষার এ কাব্য-আন্দোলনটি হোঁচট খায় দেশভাগের অর্জনের সঙ্গে সঙ্গেই। এর সবচেয়ে বড় কারণ ছিল দেশভাগজনিত সামপ্রদায়িক সংঘাত। যার দরুন উর্দু অভিযুক্ত হল পরের ভাষা, মানে মুসলমানের ভাষা এবং পরদেশের ভাষা মানে, পাকিস্তানের ভাষা হিসেবে। ফলে ভাষাটি তার জন্মভূমি ভারতে হয়ে গেল ‘ঘরেতে পরবাসী’। পাকিস্তানে তো উর্দু একান্তই প্রবাসী। এভাবে শাহজাহানাবাদ ওরফে দিল্লিতে ভূমিষ্ঠ, আওরঙ্গাবাদ ও হায়দ্রাবাদে পালিত এবং লখ্‌নৌ ও মুর্শিদাবাদে লালিত শত শত বছরের বনেদী ভাষাটি আজ অর্ধশতাব্দী যাবৎ গৃহহারা।
প্রগতিবাদের একমাত্র সাহিত্যিক প্রতিপক্ষ ছিল ‘মডার্নিজম’ বা ‘জাদিদিয়াত’-নন্দনতাত্ত্বিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক আন্দোলন হিসেবে পার্টিশনের পরে উর্দুসাহিত্যে যে ‘জাদিদিয়াত মুভমেন্ট বা নতুনত্ব আন্দোলনের উদ্ভব ঘটেছিল, তার প্রতিনিধিত্ব করেছিল ‘হালকা-এ আরবাব্‌-এ জাওক’ বা কান্তিবিদ্‌গোষ্ঠী। ‘শিল্পের খাতিরে শিল্প’ নন্দনতত্ত্বের প্রবক্তা এই নান্দনিক সংঘটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ‘প্রোগ্রেসিভ রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশনে’র এই-দাবীর বিপরীতে যে সাহিত্যকর্মকে হতে হবে সামাজিক দায়ভার বহনের মাধ্যম। তবে কিছু বিষয়ে দু’টি গোষ্ঠীর আদর্শ অভিন্নও ছিল-যেমন ন্যাশনালিজম, সেকুলারিজম ইত্যাদি। প্রগতিবাদী গোষ্ঠীর একরোখা, বরং আপসহীন বিপক্ষ ছিল সরোশ কাশ্মীরী এবং তাঁর সম্পাদনাধীন সাপ্তাহিক ‘চাটান’ পত্রিকাগোষ্ঠী। এমনি কট্টর প্রতিক্রিয়াশীল ছিলেন এই সম্পাদক যে ১৯৪৯ সালে লাহোরে আহূত অল-পাকিস্তান প্রোগ্রেসিভ রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রথম সমাবেশে রাষ্ট্রায়োজিত হয়রানির অংশস্বরূপ সরোশের নেতৃত্বাধীন দালাল আর ভাড়াটে গুণ্ডাবাহিনী সভাটি পণ্ড করার প্রয়াস পায়। তবে সমাবেশে অংশগ্রহণকারী ঐতিহ্যবাহী লাঠিধারী কৃষকদের প্রতিরোধে তারা পালিয়ে যায়।
ভারত-পাকিস্তান দু’টি দেশেই কালেকালে প্রগতিবাদী লেখকসংঘের বিলোপ ঘটলেও বিংশ শতাব্দীর তিনটি ভাগ জুড়েই উর্দুসাহিত্যের উজ্জ্বলতম উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ করেছে এই গোষ্ঠীরই আদর্শ এবং আজও এর জনপ্রিয়তা বহাল রয়েছে। এঁরা সমাজ ও সময়সচেতন একটি লেখকদল গড়ে তুলেছেন, যে-দল সামাজিক ন্যায়বিচার এবং সমানাধিকারবাদের সপক্ষে সর্বদাই মধ্যস্থতা করেছে এবং সত্য বলার সাহস দেখিয়েছে ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে। এই মনোবৃত্তিই ধ্বনিত হয়েছে ফয়েজ আহমদ ফয়েজের ‘বোল্‌’ (বল্‌)- নামক কবিতায়, যা নিত্য আবৃত্তির সূত্রে ঘরোয়া বুলিতে পরিণত হয়েছে:

বোল্‌ কে লব্‌ আযাদ হ্যায় তেরে
বোল্‌ জবান্‌ আব তক্‌ তেরি হ্যায়
তেরা সুত্‌ওয়াঁ জিস্‌ম্‌ হ্যায় তেরা
বোল্‌ কে জান্‌ আব্‌তক্‌ তেরি হ্যায়
দেখ্‌ কে আহাঙ্গার কি দুকাঁ মে
তুন্দ্‌ হ্যাঁয় শো’লে, সুর্‌খ্‌ হ্যায় আহন্‌
খুল্‌নে লাগে কুফ্‌লুঁকে দাহানে
ফায়লা হার্‌ এক্‌ জিন্‌জীর কা দামন
বোল্‌ ইয়ে থোড়া ওয়াক্‌ত্‌ বহুত্‌ হ্যায়
জিস্‌ম-ও জবাঁ কি মউত সে প্যাহ্‌লে
বোল্‌ কে সাচ্‌ জিন্দা হ্যায় আব্‌তক্‌
বোল্‌ জো কুছ্‌ ক্যাহনা হ্যায়, ক্যাহ্‌লে

[ বল্‌ কারণ তোর ঠোঁট এখনো স্বাধীন
বল্‌ কারণ রসনাটা এখনো তোর
ভঙ্গুর হলেও দেহটা এখনো তোরই
বল্‌ কারণ প্রাণটা তোর এখনো তোরই
কামারের কারখানায় দেখ্‌
শিখা এখনো তীব্র, লোহা লাল
খুলতে লেগেছে তালাগুলির মুখ
নিগড়ের কড়াগুলি হয়ে যাচ্ছে খোলা
বল্‌ কারণ এই অল্প সময়ও অনেক
শরীর এবং জিহ্বার মৃত্যুর পূর্বে
বল্‌ কারণ সত্য এখনো জীবিত আছে
বল্‌ যেটুকু বলতে হবে বলে নে ]

পিপল্‌স আর্ট বা গণশিল্পের বিষয়টি বামবলয়ের পণ্ডিত চিন্তাবিদ, দার্শনিক ও সক্রিয়তাবাদীদের মধ্যে শতাধিক বর্ষ ধরেই আলোচিত-বিবেচিত হয়ে আসছে। বহু প্রশ্নই উঠে এসেছে সে আলোচনায়-বিবেচনায়। কী কী উপাদানে গণশিল্পবস্তু গঠিত হয়? সামাজিক পরিবর্তন সাধনে শিল্পের ভূমিকা কী? কোন্‌ স্তরের সরলতা বা জটিলতা নিয়ে শিল্পকে জনসাধারণের কাছে যেতে হবে? পুরাতন থেকে নতুন সমাজ জন্ম নিলে নতুন সংস্কৃতিও কি জন্ম নিয়ে থাকে? সর্বহারা শ্রেণীর রাজনীতিক এবং আর্থনীতিক সংগঠনের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক সংগঠন গড়ে তোলার প্রয়োজনও আছে কী? অনেকানেক প্রশ্নের মধ্যে প্রধানত এসবই তাড়া করছিল প্রগতি সংঘের উর্দু লেখকদের, এবং তা ১৯৩৫ সালে তাঁদের সমিতির সূচনাকাল থেকেই। বস্তুত তাঁরা বামবিশ্বের বিশশতকের গোড়া থেকে চলমান বিতর্ক থেকেই বেশির ভাগ উপাদান ধার নিচ্ছিলেন। সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির ১৯৩২ সালের সিদ্ধান্তমতে সৃষ্ট সোভিয়েত রাইটার্স ইউনিয়ন ও তার গৃহীত ‘ডক্‌ট্রিন্‌ অফ সোশালিস্ট রিয়েলিজম’ বিতর্কটিকে শাণিত করেছিল। ভারতবর্ষীয় পিডব্লিয়োএ বের্টল্ট ব্রেখট্‌, ওয়াল্টার বেঞ্জামিন, লু সুন প্রমুখ তাত্ত্বিকদের কাছ থেকে সবক নিচ্ছিল, যেমন নিচ্ছিল গিয়র্গি প্লেখানভ্‌, ম্যাঙ্মি গর্কি প্রমুখের কাছ থেকে। ভ্লাদিমির মায়াকভস্কি পরিষ্কার ভাষায় বলছিলেন যে, সুকুমারশিল্পের সম্বোধন করা উচিত কেবল কৃষক-শ্রমিক এবং জনতাকে-আর্থনীতিক ও রাজনীতিক এলিটদের দিকে তাকিয়ে পরিচালিত হওয়া উচিত নয় এ-শিল্পের। প্লেখানভ্‌ জোর দিয়ে বলেছেন যে, ‘শিল্পের খাতিরে শিল্পে’ বিশ্বাসের সৃষ্টি কেবল তখনই হয় যখন শিল্পী তাঁর সামাজিক পরিবেশের সঙ্গে সঙ্গতিহীন হয়ে পড়েন। মাও সে তুঙের মতে শিল্পী জনগণকে শেখাবেন না, উল্টে তাঁদের থেকে শিখবেন এবং সে-শিক্ষাই প্রক্রিয়াজাত করে তাঁদেরকে ফেরৎ দেবেন।
পিডব্লিয়োএ গঠনের মূল প্রণোদক ‘আঙ্গারে’ শীর্ষক ছোটগল্প সংকলনটি ছিল বস্তুত ভিক্টর খ্‌লেব্‌নিকভ্‌-লিখিত ১৯১২ সালের মেনিফেস্টোরই বাস্তবায়ন। সে-ইশতাহারটির শিরোনাম ছিল ‘আ স্ল্যাপ ইন দ্য পাবলিক ফেস’ (জনরুচির ওপর একটা চপেটাঘাত)। লেখাটির বক্তব্য ছিল-অতীত ও বর্তমানের সাহিত্য নিয়ে যারা আত্মতৃপ্ত তাদেরকে নতুন সামাজিক-রাজনীতিক বাস্তবতা সম্পর্কে থাপ্‌পড় দিয়ে জাগিয়ে তুলতে হবে। ‘আঙ্গারে’তে সঙ্কলিত সাজ্জাদ জহীরের ‘জান্নাত কি বাশারত’ নামক গল্পটি হুবহু তাই করেছিল। জহীরের ‘স্বর্গের কল্পদৃশ্য’ গল্পটি ধর্মীয় অন্ধবিশ্বাসের ওপর ভয়ঙ্কর তীব্র বিদ্রূপ হেনেছিল। প্রগতিশীলতার প্রারম্ভিক এই উচ্চ মাত্রা যে-জলদ লয় নির্দেশ করেছিল তাতে অচিরেই প্রশ্ন উঠেছিল-প্রগতিবাদী সাহিত্যের হুবহু উপাদানটি কী?
এই প্রশ্নেই আন্দোলনের তথাকথিত ‘সৃজনপ্রধান’ এবং ‘রাজনীতিপ্রধান’ উপদল দু’টির মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধ চরমে উঠল ১৯৩৯ সালে। যুদ্ধে রাজনীতি জয়ী হয়ে প্রাধান্য পায় সাহিত্যের ওপর। ক্ষোভে এবং হতাশায় ‘আঙ্গারে’ গ্রুপের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য আহমদ আলী প্রোগ্রেসিভ রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশন থেকেই বেরিয়ে যান। ফলে তাঁর সম্পাদনাধীন ইংরেজী ভাষায় প্রোগ্রেসিভ জার্নাল ঘব িওহফরধহ খরঃবৎধঃঁৎব বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তী কয়েক বছরে প্রগতিশীল সাহিত্যের মান অবনত হয়ে শিক্ষামূলক প্রচারণার রূপ পরিগ্রহ করে। উর্দুকাব্যের সবচেয়ে শিল্পিত প্রকরণ ‘গজল’ পর্যন্ত আক্রান্ত হয় প্রতিক্রিয়াশীল, সামন্ততান্ত্রিক এবং ইন্দ্রিয়াসক্ত বলে। তবে গজলকে কোনো প্রগতিশীল উর্দুকবিই সম্পূর্ণ ত্যাগ করে পারে নি। যেমন মজরুহ্‌ সুলতানপুরী আধেয়র বেদিতে আধারকে বলি দিতে পারেন নি। মানে কনটেন্টের খাতিরে ফর্মকে খাটো করতে কবির সুকুমার মন কখনোই সাড়া দেয় নি। বরং তিনি গজলের ঐতিহ্যবাহী আঙ্গিক ঠিক রেখে উপজীব্যকেই বদলে দিয়েছেন :

আব্‌ আহ্‌ল-এ দরদ ইয়ে জীনে কা এহ্‌তেমাম্‌ কারেঁ
উসে ভুলাকে গমে জিন্দেগী কা নাম কারেঁ
সিখায়েঁ দস্ত্‌-এ তলব্‌ কো আদা-এ বেবাকি
পয়াম্‌-এ জের-এ লবি কো সালা-এ আম কারেঁ
গোলাম রাহ্‌ চুকে, তোড়েঁ ইয়ে বন্দ্‌-এ রুসওয়ায়ি

কুছ্‌ আপনে বাজু-এ মেহনত্‌ কা এহ্‌তেরাম্‌ কারেঁ

[ এবার প্রেমীগণ জীবনযাপনের ব্যবস্থায় নামুন
মাশুককে ভুলে জীবনের চিন্তা করুন
কাঁচুমাচু হাতগুলিকে সাহসী মুদ্রা শেখান।
নিচু স্বরের খবরকে জনতার সংবাদে পরিণত করুন
আর দাস থাকা নয়, অসম্মানের শিকল ভাঙুন
নিজের মেহনতের হাতকে কিছু সম্মান করুন ]

গজলটির কবির নামসংবলিত অন্তিম পঙ্‌ক্তিটিকে কবি এতখানি রেওয়াজবিরোধী করেছেন যে শুদ্ধবাদীদের অনেক গালি খেতে হয়েছে তাঁকে :

মেরি নিগাহ্‌ মে হ্যয় আরজ্‌-এ মস্কো, মজরুহ
উওহ সারজমিন কে সেতারে জিসে সালাম কারেঁ

[ আমার দৃষ্টিতে মস্কোর ভূমি, মজরুহ
সেই জমিন যাকে আসমানের তারাও সালাম করে ]

প্রগতিবাদী লেখককুল এভাবেই শিল্পের মাধ্যমে সমাজ-রূপান্তরের চেষ্টা চালাতেন। এঁদের মধ্যে যেমন সাজ্জাদ জহিরের মতো কমিউনিস্ট ছিলেন, তেমনি ছিলেন প্রেমচান্দের মতো গান্ধীবাদীও। তবে এঁদের সংহতিটা ছিল দখলদার ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে। সেজন্যেই ব্রিটিশদের প্রত্যাবর্তন এঁদের ছত্রভঙ্গ করে দিয়েছিল। কেননা পার্টিশন প্রগতিবাদী লেখকদের দু’টি প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের বাসিন্দা বানিয়ে দিয়েছিল। তদুপরি নতুন দেশ-দু’টির সরকারও প্রগতিপন্থীদের ওপর একই রকম দমনমূলক প্রয়োগ করছিল। পরিস্থিতিটি ভাষা পেয়েছিল আহমদ রাহীর এই চরণে :

মায়ুসি মে উমর কাটি থি আস্‌ নে আঙ্গ্‌ড়ায়ি সি লী থি
সোচা থা কিসমত বদলেগি, লেকিন হামনে ধোকা খায়া

[ হতাশায় জীবন কেটেছিল, আশা একটুখানি নড়েচড়ে উঠেছিল
ভেবেছিলাম কপাল বদলাবে, কিন্তু আমরা ধোঁকা খেলাম। ]

আসল কথা স্বাধীনতা সংগ্রামের বৈপ্লবিক উত্তাপপ্রসূত রোম্যান্টিসিজম স্বাধীনতা-উত্তর রিয়েলিজমের কাছে শেষ পর্যন্ত হার না-মেনে পারে নি। প্রথমে তো মডারেট জোশীর বিরুদ্ধে র‌্যাডিক্যাল রনদিভের ‘কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া’ জেনারেল-সেক্রেটারী পদে নির্বাচনী বিজয়ে উদ্বুদ্ধ হয়ে পিডব্লিয়োএ বলিষ্ঠ বামপন্থী ইশতাহার প্রকাশ করল ১৯৪৯ সালে। সমসময়ে অনুরূপ মেনিফেস্টো পাকিস্তানেও প্রকাশিত হয়েছিল। নবগঠিত দু’টি দেশেই অভিন্ন এই মেনিফেস্টো এক আপসহীন সমাজতান্ত্রিক অবস্থান নিয়েছিল। প্রগতিবাদী লেখক সংঘের সোচ্চার মুখপত্র, ‘নয়া আদব’ বা নতুন সাহিত্য শীর্ষক পত্রিকার সম্পাদক, আলী সরদার জাফরি গুরুত্বপূর্ণ এক প্রবন্ধ মারফত সংঘের নতুন অবস্থানটিকে সমর্থন জোগালেন। প্রবন্ধটির নাম ‘তরক্কি-পসন্দ্‌ শায়েরি কে বা’জ মাসায়েল’, মানে ‘প্রোগ্রেসিভ পোয়েট্রির কিছু ইস্যু’। সমকালীন প্রধান সাময়িকীগুলি (যেমন ‘শাহরাজ’, ‘মাহাজ’, ‘তাহরিক’ প্রভৃতি) প্রবন্ধটি একই সময় ছেপে তাদের লেখক-পাঠকদের সিগন্যাল দিল যে এই হল চলতি সময়ের সুর। জাফরির প্রবন্ধটি প্রগতিবাদী সাহিত্যের মোটামুটি কিছু ফরমূলা তুলে ধরতে চেয়েছিল। তাঁর প্রধান পরামর্শগুলি ছিল নিম্নরূপ :
ক. প্রগতিবাদী কাব্যের থিম হবে ‘গমে দাওরাঁ’ বা জগতের দুঃখযন্ত্রণা, ‘গমে জানাঁ’ কিংবা ‘গমে জাত্‌’ অর্থাৎ অন্তরের বেদনা বা ব্যক্তির ব্যথা নয়। ‘ইনফিরাদী এহ্‌সাস্‌ আওর তাজরুবে’ (ব্যক্তিগত অনুভব এবং অভিজ্ঞতা) হবে ‘রুজ-আত্‌পসন্দি কি আলামত’ (প্রতিক্রিয়াশীলতা-প্রীতির লক্ষণ)।
খ. কবিদের হতে হবে দমনমূলক সরকার ও তার ব্যবস্থার বিরুদ্ধে স্বাধীনচেতা, ফোকাসে রাখতে হবে বিপ্লব এবং আন্তর্জাতিক সংগ্রামের বিষয়গুলি।
গ. যারা প্রগতিবাদী কাব্যকে প্রপাগ্যান্ডা হিসাবে নিকৃষ্ট জ্ঞান করে, তাদের পুঁজিবাদী শ্রেণীর ফেউ এবং স্থিতাবস্থার সমর্থক জ্ঞানে বিরোধিতা করতে হবে।
ঘ. যেসব কবি জনগণ এবং তাদের সংগ্রামকে উপেক্ষা করবে, তারা নিজেদের আদর্শত্যাগের অপরাধী বলে গণ্য হবে।

জাফরির এ আবেদনে সাড়া দিয়ে ওয়ামিক জৌনপুরী, নিয়াজ হায়দার, আরিফ আবদুল আমিন, খাতির গজনভি, আহমেদ রিয়াজ, সুলায়মান আরিব প্রমুখ কবিতা লিখছেন চীন-জাপান-বর্মা-মালয়-ইন্দোনেশিয়া-কোরিয়া, ইজিপ্ট-টার্কি-ইরান-তিউনিসিয়া ইত্যাদি দেশের মজুরদের নিয়ে। এসময়ের কবিতার একটি সঙ্কলন বেরিয়েছিল গোলাম রাব্বানির সম্পাদনায়, যার নাম ছিল শিকাস্ত্‌-এ জিন্দান বা কারাগারের পরাজয়। কাব্যগ্রন্থটির বিধ্বংসী সমালোচনা করেছিলেন, আর কেউ নয়, কঠিন প্রগতিবাদী কবি জোশ মালিহাবাদী স্বয়ং :

আফরী বর্‌ গোলাম রাব্বানি
কেয়া নিকালা হ্যায় মেন্ডাকুঁ কা জলুস।

[ গোলাম রাব্বানিকে অভিনন্দন!
কেমন ব্যাঙের মিছিল বের করেছেন তিনি। ]

১৯৪৯ সালের ইস্তাহারটির উদ্দেশ্য ছিল আদর্শগত স্বচ্ছতার একটা সীমারেখা নির্দিষ্ট করে দেওয়া। কিন্তু সেই সীমারেখা লঙ্ঘনকারীদের দণ্ডদানে প্রগতিবাদী লেখক সংঘের নেতৃবৃন্দের অতিউৎসাহ আত্মঘাতী প্রমাণিত হয়েছিল। লেখাতে যৌনতা সন্নিবেশনের অভিযোগে ইস্‌মত্‌ চুঘ্‌তাই, সাদাত হাসান মান্টো, এন.এম. রশীদ প্রমুখের ওপর জনসমক্ষে তিরস্কার বর্ষণ একটা দৃষ্টান্ত। রাজেন্দার সিং বেদীকে তাঁর লেখায় রাজনীতিক থিমের উপর ফোকাস না-করার ‘অপরাধে’ গণভর্ৎসনা আরেক নজির। এমনকি সমাজতান্ত্রিক চশমায় অস্বচ্ছতা দৃষ্ট হবার অভিযোগে ফয়েজ আহমদ ফয়েজও আক্রান্ত হয়েছিলেন।
ভারতে কিন্তু বামপন্থীদের অবস্থা ছিল আরো খারাপ। সেখানে শ্রেণীসাম্যের লক্ষ্যে সংগ্রামীদের জন্য তেলেঙ্গানা আন্দোলনের নির্মম দমন ছিল একটা বিপর্যয় সৃষ্টিকারী আঘাত। বিপর্যস্ত প্রোগ্রেসিভ রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশন ১৯৪৯ সালের গরম স্বর বর্জন করে নরম স্বরের একটা নতুন ইশতাহার জারি করল ১৯৫৩ সালে। এ দলিলটি শ্রেণী-রাজনীতির ওপর মন্তব্য এড়িয়ে মানবিকতা ও জাতীয়তার উদারনীতি নিয়ে এগিয়ে যেতে চাইল। এই মেনিফেস্টোটিই উর্দুসাহিত্যে প্রগতিবাদী লেখকদের প্রভাবপর্বটির ইতির সূচনা করল। প্রোগ্রেসিভ কবিগণ এরপরও বহ্নিশিখার মতো কবিতা লিখে চললেন বটে, তবে প্রগতিবাদী লেখক সংঘ হয়ে গেল তার পূর্বসত্তার ছায়ামাত্র। সমালোচকেরা যত কিছুই বলুন না কেন, স্থায়ী সত্যটি হলো-উর্দুসাহিত্যের বিশ শতকের শ্রেষ্ঠ কবিগণ ছিলেন এই সংঘটির প্রেরণাতেই সৃজনপ্রবণ। আজ পেছন ফিরে তাকালে তাঁদের সৃজিত কাব্যের মান হিমালয়সমানই প্রতীয়মান হয়।
আসলে উর্দুসাহিত্যে নীতিবাগীশতা, প্রচারধর্মিতা, জীবনঘনিষ্ঠতা ইত্যাদি পিডব্লিয়োএ’র নতুন আমদানী নয়। এসবের অবতারণা সুদূর অতীতেও ঘটেছিল এবং এ-মর্মে পালাবদলের পরামর্শও উচ্চারিত হয়েছে। ১৯৭৪ সালের লাহোর-মুশায়েরাতেই পাঞ্জাবের তৎকালীন ডিপিআই কর্নেল হলরয়েড উর্দুকবিদের আধুনিক হবার আহ্বান জানিয়েছিলেন। এমনকি তিনি পরবর্তী মুশায়েরার জন্য আধুনিক একটি বিষয়বস্তুর প্রস্তাবও উপস্থিত করেছিলেন। বলেছিলেন যুগযুগান্তবাহিত শামা-পারওয়ানা (প্রদীপ-পতঙ্গ), ফিরাক-ভিসাল (বিরহ-মিলন), হুস্‌ন-ইশক (রূপ ও প্রেম) ইত্যাদিকে শিকেয় তুলে রেখে আগামী মুশায়েরা হোক ঋতুভিত্তিক, যথা-‘বর্ষাকাল’ শীর্ষক।
আলতাফ হোসেন হালী (১৮৩৭-১৯১৪) তাঁর যুগান্তকারী গ্রন্থ ‘মুকাদ্দামাহ্‌-এ শের ও শায়েরি’-তে প্রস্তাব করেছেন-রূপকালঙ্কারের রুটিন লিস্টিটিকে সসম্মানে তাকে তুলে রেখে উর্দুকবিদের নতুন মেটাফর বানাতে হবে এবং একঘেয়েমি এড়ানোর জন্য তারও তালিকাটিকে বেশ সমপ্রসারিত করতে চাই। অন্যকথায় ‘শারাবপ্রশস্তি’, ‘মোল্লাগঞ্জনা’, ‘প্রেমভজনা’ ইত্যাদি হাতেগোনা ব্র্যান্ডগুলি হয়তো একেবারেই ছাড়তে হবে, নইলে নির্মমভাবে কমাতে হবে।
হালী তাঁর কালজয়ী লেখনী মারফৎ এসব কথা বলেছিলেন তিরিশের দশকের প্রোগ্রেসিভ রাইটারদের জন্মেরও বহু পূর্বে। এদিক থেকে দেখলে বলতে হবে যে, উর্দুকাব্যে বিশ শতকের প্রগতিবাদীদের আগমন ঘটেছে বস্তুত ঊনিশশতকের ইতিহাসের পথ ধরেই। সে-পথ থেকে এঁরা এত বেশী সরেও যান নি যে নতুনের কেতন ওড়ানোর জন্য পুরাতনকে বর্জন করতে গিয়ে স্নানের পানির সঙ্গে স্নাত শিশুটিকেও ফেলে দেবেন। একথাটাই প্রকারান্তরে বলার প্রয়াস পেয়েছেন প্রগতিবাদী সিব্‌তে হাসান, আলী সরদার জাফরি এবং ইসরারুল হক মাজায তাঁদের নয়া আদব (নতুন সাহিত্য) পত্রিকার উদ্বোধনী সংখ্যায়, ১৯৩৯ সালের এপ্রিল মাসে। এঁরা এমন একটি সাহিত্য সৃষ্টি করতে চেয়েছেন, যেটিতে প্রতিফলিত হবে নতুন সমাজ, নতুন রাজনীতি এবং নতুন নন্দনতত্ত্ব।
বস্তুত উর্দুকাব্যে সূচনা থেকেই বলিষ্ঠ একটা মানবিক ধারা বহমান ছিল। খসরু, ওয়ালী, মীর, সওদা প্রমুখ জগজ্জীবনে মানবের অবস্থান সম্পর্কে একটি কল্যাণকামী ও নীতিনিষ্ঠ সমাজের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। সেই সচেতনতার সঙ্গে গালিব-ইকবাল তাঁদের কাব্যে যোগ করেছেন সামাজিক ধারাভাষ্য। কিন্তু উর্দুকাব্যের প্রধান ধারাটি বরাবরই আচ্ছন্ন ছিল রোমান্স, প্রেম এবং মৃত্যু নিয়ে। শামা-পরওয়ানা (শিখা-পতঙ্গ), বুলবুল-সাইয়াদ্‌ (পাখি-শিকারী), সাগার্‌-জাম-মীনা (পানপাত্র-সুরা-বোতল), গুলবাহার-খিজাঁ (পুষ্পবসন্ত-পূর্ণমোচী মৌসুম) প্রভৃতিই প্রচলিত হয়ে আসছে আবহমান কালের প্রধান বিষয়বস্তু হিসেবে।
রূপকালঙ্কারের এসব প্রতিমা ভাঙার দায়িত্বটাই অবশেষে পালন করলেন প্রগতিবাদী কবি সমপ্রদায়। একটি দৃষ্টান্ত। ইসরারুল হক মাজাযের কবিতায় এতকালের প্রেমাস্পদার চেহারার প্রতীক চাঁদটি এসেছে তাচ্ছিল্য এবং বিরক্তির চিহ্নরূপে :

এক্‌ মহল কি আড়্‌ সে নিক্‌লা উয়োহ্‌ পীলা মাহতাব
জ্যয়সে মুল্লাহ্‌ কা আমামা, জ্যয়সে বানিয়ে কি কিতাব

[ প্রাসাদের পিছন থেকে বেরুল ওই হলুদ চন্দ্র
যেন মোল্লার পাগড়ি, কিংবা মহাজনের বালাম ]

১৯৩৬ সালের লখনৌ সমাবেশে প্রগতিবাদী লেখক সংঘের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ‘সাহিত্য কা উদ্দেশ্য’ শীর্ষক সভাপতির উদ্বোধনী ভাষণেই প্রেমচাঁদ বলেছিলেন, ‘হামেঁ হুসনকে মে’ইয়ার বদলনে হোঙ্গে’ (আমাদের সৌন্দর্যের মাপকাঠি বদলাতে হবে)। সংঘটির কবিগণ তাঁদের পূজ্যপাদ সভাপতির মৌলিক প্রস্তাবটি প্রাণ দিয়ে গ্রহণ করেছেন এবং মন দিয়ে বাস্তবায়ন করেছেন। করতে পেরেছেন যেহেতু তাঁরা তাঁদের স্বকালকে সম্বোধন করেছেন-স্থানকালপাত্র সম্বন্ধে সচেতন হয়ে। তাই তাঁদের শ্রেষ্ঠ কাব্য সৃষ্ট হয়েছে সঙ্কটেরই কালে-সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রাম, দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম, দেশভাগবিরোধী সংগ্রাম ইত্যাদি কর্তৃক সৃষ্ট সঙ্কটের। প্রোগ্রেসিভ কন্‌টেঙট প্রসঙ্গ অপচিত হওয়ার ধাপে ধাপে প্রগতিবাদী নন্দনতত্ত্বের আবেদনও ক্রমে ক্রমে ফিকে হয়েছে। তবে এই ক্যাম্পের কবিদের মহান অবদান উর্দুসাহিত্যের ইতিহাসে চির-অম্লান থাকবে। তার বহু কারণ। একটি বর্ণিত হয়েছে প্রগতিবাদী কবিশ্রেষ্ঠ ফয়েজ আহমদ ফয়েজের একটি চরণে :

হ্যায় দাশ্‌ত্‌ আব্‌ ভি দাশ্‌ত্‌, মগর খুন্‌-এ পা সে ফয়েজ
সায়ারার চান্দ খার-এ মুগিলাঁ হুয়ে তো হ্যাঁয়।

[ ঊষর এখনো মরুভূমি, কিন্তু পায়ের রক্তে ফয়েজ
তৃষ্ণা তো মিটেছে কিছু দুষ্ট কণ্টকের ]

এ-রচনার উপসংহারস্বরূপ, গালিব এবং ইকবালের পরের উর্দুসাহিত্যের শ্রেষ্ঠতম কবি ফয়েজ আহমদ ফয়েজের ওপর সংক্ষিপ্ত একটি অ্যাকোলেড বা প্রশংসাবচন সংযোজন আবশ্যক বলে মনে করি। কেননা উর্দুকাব্যে তাঁর স্থানটি একান্তই একক। প্রগতিবাদী এবং আধুনিক হওয়া সত্ত্বেও ধ্রুপদী কবি হিসেবে স্বীকৃত এবং ক্ল্যাসিক কবিরূপে পূজিত একমাত্র তিনিই। নিম্নবর্গীয়দের অনভিজাত কথাও অভিজাত ভাষায় উচ্চারণ করেন ফয়েজ। তাঁর বক্তব্য অগ্নিময়, কিন্তু বচন দীপ্তিময়।
স্বদেশ ভারত থেকে উদ্বাস্তু হয়ে উর্দু ভাষা পাকিস্তানে আশ্রয় নেওয়ার পরপরই সেখানে সমাজতন্ত্রী মিয়াঁ ইফতিখারুদ্দীনের ‘প্রোগ্রেসিভ পেপারস লিমিটেড’ বা পিপিএল-এর ছত্রছায়ায় প্রোগ্রেসিভ রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশন বা (পি ডব্লিউও)-এর লেখকদল নব্য-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র পাকিস্তানের সাম্রাজ্যবাদী অবস্থানের বিরুদ্ধে লেখালেখি শুরু করেন জোরেশোরে। পিপিএল প্রকাশিত পত্রপত্রিকার স্টাফের লিস্টি আর পি.ডব্লিউও.এ’র লেখক-তালিকাটি হয়ে ওঠে অভিন্ন। যেমন ফয়েজ আহমদ ফয়েজ, এডিটর-ইন্‌-চিফ পাকিস্তান টাইমস (ফয়েজ ‘ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেসে’র ভাইস-প্রেসিডেন্টও ছিলেন); আহমদ নাদিম কাস্‌মী, এডিটর ইমরোজ; সিবতে হাসান, এডিটর লায়ল ও নাহার। ফিফথ-কলামিস্ট এবং পাকিস্তানের শত্রু বলে চিহ্নিত করে এস্টাবলিশমেন্ট এসব প্রগতিবাদী কবি, লেখক এবং সাংবাদিকদের ওপর আক্রমণ চালায় সর্বরকম কৌশলে।
১৯৫১ সাল থেকে ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত গল্পকার সাজ্জাদ জহীর এবং মেজর ইসহাকসহ কর্মরত কিছু সিনিয়র আর্মি অফিসার জেলবন্দী ছিলেন তথাকথিত ‘রাওয়ালপিন্ডি কন্সপিরেসি কেসে’-পাকিস্তান সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্রের দায়ে। বিচারে সম্ভাব্য মৃত্যুদণ্ডের অপেক্ষায় চার বছর জেল খাটেন প্রাক্তন আর্মি অফিসার, ট্রেড ইউনিয়ন লিডার এবং সমাজতন্ত্রী কবি-সাংবাদিক ফয়েজ আহমদ ফয়েজও। এ সময়েই, ১৯৫৪ সালে, কমিউনিস্ট পার্টি অফ পাকিস্তান ও তার অঙ্গসংগঠনগুলি পাকিস্তান সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়। সেই জেলবাস কবিকে জীবনের বাস্তব রূপ দেখায় প্রকটরূপে। শাণিত হয় তাঁর সামাজিক ন্যায়বিচারবোধ এবং কবিতার ভিত্তিটিও হয় পাকাপোক্ত। বরং বলতে গেলে একটা নবরূপান্তরই ঘটে যায় কবিচিত্তের গভীরে। এই রূপান্তরের ফলশ্রুতিতে লেখা ফয়েজ আহমদ ফয়েজের দু’টি কবিতা উর্দুকাব্যের ভুবনে নিত্যস্মৃত বিধায় বর্তমান আলোচনাতেও অবশ্য স্মর্তব্য।
প্রগতিবাদী উর্দুসাহিত্যবিষয়ক গ্রন্থ অ্যান্থেমস্‌ অফ রেজিস্টেন্স-এর (ইন্ডিয়া ইংক, ২০০৬) যুগ্মসম্পাদক, অন্ধ্রপ্রদেশের হায়দ্রাবাদ নগরীর অধ্যাপক ভ্রাতৃদ্বয়, রাজা মীর ও আলী হুসায়েন মীর তাঁদের পুস্তকটির মুখবন্ধে, নিজেদের অভিবাসন-নগরী নিউইয়র্কের ২০০১ সালের নাইন-ইলেভেন ট্রাজেডি সম্পর্কে ইউনাইটেড নেশান্স ফুড অ্যান্ড অ্যাগ্রিকালচারের অর্গানাইজেশনের অবহেলিত একটি পরিসংখ্যানের তাৎপর্যপূর্ণ খবর দিয়েছেন। সংক্ষেপে এফ.এ.ও.বা ‘বিশ্ব খাদ্য সংস্থা’ নামে পরিচিত, জাতিসংঘের গুরুত্বপূর্ণ এই সংগঠনটি একটি জরিপ-বিশ্লেষণের ভিত্তিতে জানিয়েছে যে, নিউইয়র্কের টাওয়ার-দু’টি ধসে পড়ার দিনটিতেই পৃথিবী জুড়ে কেবল অনাহারে মৃত্যুবরণ করেছিল ৩৫,৬১৫টি শিশু।
খবরটি না-জানালেও বিশ্ব কিন্তু এটা জানে যে, সেদিনের সেই বিপুলসংখ্যক শিশুমৃত্যুর ট্র্যাজিডিটিকে ধিক্কার জানিয়ে কোথাও কোনো সম্পাদকীয় লেখা হয় নি, কোনো পতাকা অর্ধনমিত হয় নি, কোনো আবেগমথিত বক্তৃতা করা হয় নি। ঘাতক সেই দারিদ্র্য ও ক্ষুধার স্রষ্টা হিসাবে চেনা আসামী কোনো দেশের বিরুদ্ধে কোনো যুদ্ধ ঘোষণা করা তো হয়ই নি। সেই রুটিন ট্র্যাজিডি বছরের তিনশো পঁয়ষট্টি দিনের প্রতিটি দিনই বিস্মৃতির ব্ল্যাকহোলে চলে যায় বিশ্বচেতনায় সাড়া না-জাগিয়ে, বিশ্ববিবেককে নাড়া না-দিয়ে-এমনকি কাউকে জানানি পর্যন্ত না-দিয়েই। এ-প্রসঙ্গে শত শত বছরের এই দণ্ডহীন গুরুপাপটির মসৃণ গতানুগতিকতার পরিপ্রেক্ষিতে ক্ল্যাসিক কবি ফয়েজ আহমদ ফয়েজের সর্বকালীন কবিতা ‘লহু কা সোরাঘ্‌’ (রক্তের চিহ্ন) বাধ্যতামূলকভাবেই স্মর্তব্য। পঙ্‌ক্তিগুলি নিম্নরূপ :

কাহিঁ নেহি হ্যায় কাহিঁ ভি নেহি লহু কা সোরাঘ্‌
না দাস্ত্‌ ও নাখুনে কাতিল্‌ না আস্তিন্‌ পে নেশাঁ
না সুরখি-এ লবে খঞ্জর, না রঙ্গে নওকে সিনাঁ
না খাক্‌ পর কোয়ি ধাব্বা, না বাম পর কোয়ি দাগ
কাহিঁ নেহি হ্যায় কাহিঁ বি নেহি লহু কা সোরাঘ্‌
না সির্‌ফ্‌ খিদমতে শাহাঁ কে খুঁ-বাহা দেতে
না দ্বীন্‌ কি নাজার কে বায়আনা-য়ে জাযা দেতে
না রাজাম্‌-গাহ্‌ মে বার্‌সা কে মো’তাবার হোতা
কিসি আলাম্‌ পে রাকাম্‌ হো কে মুশ্‌তাহার্‌ হোতা
পুকার্‌তা রাহা, বে-আস্‌রা, য়াতীম লহু
কিসি কো বহ্‌রে সামাআত্‌ না ওয়াক্ত্‌ থা না দেমাঘ্‌
না মুদ্দায়ী, না শাহাদাত, হেসাব পাক্‌ হুয়া
ইয়ে খুনে খাক-নাশিনাঁ থা, রিজ্‌কে খাক্‌ হুয়া

[ কোথাও নেই, কোথাও নেই রক্তের কোনো চিহ্ন
না খুনীর হস্তে-নখরে, না তার আস্তিনে কোনো ছাপ
না ছুরির ভিজে কোনো লালিমা, না বর্শার ফলায় কোনো রক্তিমা
না মাটিতে কোনো কলঙ্ক, না সিলিঙে কোনো দাগ
কোথাও নেই, কোত্থাও নেই রক্তের কোনো চিহ্ন
এই রক্ত কোনো যুদ্ধক্ষেত্রেও বহেনি যে কোনো মর্যাদা পাবে
কোনো যুদ্ধপতাকায় খচিত হয়নি যে খ্যাতি কুড়াবে
অসহায়, নিরাশ্রয় এ-রক্ত কেবল চীৎকার করে যাচ্ছে
কিন্তু তা শোনার জন্য কারো না আছে সময় না আছে মন
বাদী কিংবা সাক্ষী না-থাকায় চুকে গেল হিসাব
এ ছিল ধুলামাটিবাসীর রক্ত, হয়ে গেল মাটির খোরাক ]

এভাবে ফয়েজের পঙ্‌ক্তিমালা সাম্রাজ্যবাদী ঘাতকদের দ্বারা বিশ্বময় সংঘটিত দৈনন্দিনের ঠাণ্ডামাথার নীরব হত্যাযজ্ঞের নির্লিপ্ত-নির্বাক সাক্ষীদের আসামী হিসেবে শনাক্ত করে। এটাই শেষসীমা নয় তাঁর কাব্যের। নিস্পৃহ তামাশ্‌বিন্‌দের কাজে নেমে পড়ার আহ্বানও জানান সমাজতন্ত্রী এ কবি। যেমন তাঁর ‘আজ বাজার মেঁ পা-বাজাওলান্‌ চলো’ (বাজারে চল আজ বেড়ি-বাঁধা পায়ে)-শীর্ষক কবিতায় :

চশ্‌মে নাম্‌, জানে শোরিদা কাফি নেহি
তোহ্‌মতে ইশ্‌কে পোশিদা কাফি নাহি
আজ বাজার মে পা-বাজাওলান্‌ চলো
দাস্ত্‌-আফশাঁ চলো, মাস্ত্‌ ও রাক্‌সাঁ চলো
খাক বর্‌-সার্‌ চলো, খুঁ ব-দামাঁ চলো
রাহ্‌ তাক্‌তা হ্যায় সব্‌ শাহ্‌রে-জানাঁ, চলো
হাকেমে-শাহ্‌র ভি, মাজমায়ে-আম ভি
তীরে-ইলজাম্‌ ভি, সাঙ্গে দুশ্‌নাম ভি
সুব্‌হে-নাশাদ ভি, রোজে-নাকাম ভি
ইন্‌কা দম্‌সাজ্‌ আপ্‌নে সেওয়া কওন্‌ হ্যায়
শাহ্‌রে জানাঁ মে আব্‌ বা-সাফা কওন্‌ হ্যায়
দাস্তে-কাতিল কে শায়াঁ রাহা কওন্‌ হ্যায়
রাখ্‌তে-দিল্‌ বাঁধ্‌ লো, দিল্‌-ফাগারো চলো
ফির্‌ হামেঁ কাত্‌ল হো-আয়ে, য়ারো চলো

[ ভিজে চোখ আর ক্ষুব্ধ অন্তরই যথেষ্ট নয়
গোপন প্রেমের অভিযোগ যথেষ্ট নয়
বাজারে চলো আজ বেড়ি-বাঁধা পায়ে
চলো হাত দুলিয়ে, মস্ত্‌ হয়ে নেচে নেচে চলো
ধূলিমাখা মাথা নিয়ে চলো, রক্তমাখা বসন নিয়ে চলো
প্রিয় শহরের সকলে পথ চেয়ে আছে, চলো
চেয়ে আছেন শহরের শাসকও, সাধারণ জনগণও
অভিযোগের তীরও আছে, গালিগালাজের ইটও আছে
অসুখী প্রভাত আছে, ব্যর্থ দিবস আছে
পরমাত্মীয় কে আছে এদের আমরা ছাড়া
কে আছে পবিত্র এখন প্রাণপ্রিয় নগরীতে
ঘাতকের হস্তের উপযুক্ত কে আর অবশিষ্ট আছে
প্রাণের বোঝাটা বেঁধে নাও, চলো হে ক্লিষ্টচিত্ত
চলো বন্ধুগণ, আবারও আমরা নিহত হয়ে আসি ]

নিজের রাজনীতিক অবস্থান জনসমক্ষে এমনভাবে খোলাখুলি ঘোষণা করা সম্ভব ছিল যখন শোষণের প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জ্ঞাপনের মাধ্যমে প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য যথেষ্ট জায়গা ছেড়ে দিতে পারত উর্দুকাব্য, যেমন তিরিশের দশকে। সে-জায়গা ষাটের দশকের পরে অনেকটাই সঙ্কুচিত হয়ে গিয়েছে। আর আজ তো নিজের জন্মভূমিতেই উর্দু ভাষাটি সঙ্গিন থেকে সঙ্গিনতর পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়ে চলেছে। দিল্লী-লখনৌর একটি উল্লেখযোগ্য জনগোষ্ঠীর মুখে ভাষাটি এখনো চলমান থাকলেও-বিবেচিত হয় কেবল একটি নান্দনিক পণ্যরূপে, বিচিত্রসৌন্দর্যের আধাররূপে, একটি অতীত-আর্তির বিষয়রূপে।
পাকিস্তানে ভাষাটির অস্তিত্বসঙ্গট না থাকলেও, বলি হয়েছে সে জাতিক ও আন্তর্জাতিক উত্তর-ঔপনিবেশিক রাজনীতির। ফলে সেদেশেও বর্তমানে উর্দুকাব্যের প্রগতিবাদী রূপটি তার তিরিশের দশকের আগুনে চেহারার ছায়ামাত্র। তখনকার প্রগতিবাদী উর্দু কবিদের উপনিবেশিকতা-বিরোধী সংগ্রাম ছিল স্বাধীনতা পাওয়া দেশটিতে সাম্যবাদ সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় এবং সমগ্রবিশ্বের গণআন্দোলনের সঙ্গে সংহতি স্থাপনে বদ্ধপরিকর। সেসব আজ পর্যবসিত হয়েছে ধূসর স্মৃতিতে। সেই অগ্নিযুগের দৃপ্ত কবি সাহির লুধিয়ানভীকে স্বাধীন ভারত এখন মনে রাখছে কেবল সিনেমার গীতিকার হিসেবে। আর স্বাধীন পাকিস্তানে প্রতিক্রিয়া ও রক্ষণশীলতার বিরুদ্ধে প্রথম কলমধারক কবি ফয়েজ আহমদ ফয়েজকে মনে রাখছে কেবল গালিব-ইকবালের মতো ক্ল্যাসিকেল কবির পরম্পরায়-ক্লাসিকো-মর্ডান কবি হিসেবেও নয়।
উভয় দেশের স্মৃতিতেই আজ আর সঠিক পরিচয়ে বেঁচে নেই সেইসব কবিদের কেউই-যাঁরা শোষণ-পীড়নের বিরুদ্ধে এবং সাম্য ও ন্যায়বিচারের পক্ষে কলমযুদ্ধে আপসহীন ছিলেন। তাঁদের রাজনীতিক উত্তরাধিকার পুনরুদ্ধার করতে হবে আজকের কবিদের। কারণ তিরিশ-চল্লিশ-পঞ্চাশ দশকের সমাজতন্ত্রী উর্দু কবিগণ কেবল সে-ভাষার অতীতেরই নয়, সকল ভাষারই বর্তমানের এবং ভবিষ্যতেরও ভাষ্যকার।




ঙ মূলানুগ গদ্য- অনুবাদ বর্তমান লেখকের