বাংলাদেশের জ্বালানী নীতি ও পরিবেশের পরিবর্তন

মেহেদী হাসান

সারকথা

শিল্পোন্নত সকল পুঁজিবাদী বিশ্ব কর্তৃক সমর্থিত ‘ধারণযোগ্য উন্নয়ন’ ধারণাটি আত্মীকরণ করে বিশ্বব্যাংক দুটো কৌশলের কথা ব্যক্ত করেছে। প্রথমতঃ প্রাকৃতিক সম্পদের অতিব্যবহার উৎসাহিত করে তেমন সব কিছুর ওপর (যেমন: শক্তি, রাসায়নিক উপকরণ, পানি, গাছ কাটা/বনসম্পদ সংগ্রহ ইত্যাদি) ভর্তুকি প্রদানের নীতি বর্জন; জনসংখ্যা কার্যক্রম, নারী, শিক্ষা, কৃষি সম্প্রসারণ ও গবেষণা এবং জনস্বাস্থ্য ও বিশুদ্ধ জলের ওপর বর্ধিত গুরুত্বারোপ; উন্নয়ন কার্যক্রমের নক্‌শা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে অধিকতর স্থানীয় অংশগ্রহণ এবং মুক্ত বাণিজ্য ও বিনিয়োগ নীতি যা প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন ও স্থানান্তরকে উৎসাহিত করে তার অনুকরণ। দ্বিতীয়ত; জোরালো নীতিমালা ও প্রতিষ্ঠানাদি স্থাপন যেগুলি কর্পোরেশন, পরিবার, কৃষক এবং সরকারের মত সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের কম ক্ষতিকারক আচরণে প্রবৃত্ত করবে (বিশ্ব ব্যাংক, ১৯৯২ ওওও)। উন্নত পুঁজিবাদী রাষ্ট্র যারা এই কৌশলপত্রকে সমর্থন করেছে তাদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী ও আধিপত্যবাদী রাষ্ট্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ’৯২-এ রিও-ডি-জেনেরিওতে অনুষ্ঠিত ধরিত্রী মহাসম্মেলনের চুক্তিনামা ‘এজেন্ডা ২১’-এর জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সাহায্য প্রদানের চুক্তি স্বাক্ষর করতে অস্বীকার করে। পরবর্তীকালেও গ্রীন হাউজ গ্যাস নিরোধ সংক্রান্ত কিওটো প্রটোকল অনুসমর্থন করা থেকেও যুক্তরাষ্ট্র বিরত থাকে।
পুঁজিবাদের অন্তর্গত প্রবণতা-মুনাফার অদম্য বাসনাতাড়িত অপরিণামদর্শী এবং একগুঁয়ে উন্নয়ন প্রক্রিয়া-সে প্রবণতাই যে সারা পৃথিবীর সম্পদ নিঃশেষকরণ এবং সামগ্রিক পরিবেশের সংকটের জন্য দায়ী উক্ত সামাজিক বৈশিষ্ট্যও এই ঘটনার মধ্যে প্রতিফলিত হয়।
সুতরাং পরিবেশ সংকটকে শুধুমাত্র প্রকৃতির ওপর আধিপত্য বিস্তারের মাধ্যমে সম্পদ নিঃশেষকরণ এবং তার প্রতিক্রিয়ায় দূষণ কিংবা বিজ্ঞান, প্রযুক্তিগত প্রয়োগের সমস্যা কিংবা অর্থনৈতিক উন্নয়নের সমস্যা হিসেবে না দেখে বরং একে পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থার প্রেক্ষিতে দেখাটা প্রয়োজন। নির্দিষ্ট দেশে, আঞ্চলিক পরিমণ্ডলে, প্রাচ্যের সাথে পাশ্চাত্যের, উত্তর গোলার্ধের সাথে দক্ষিণ গোলার্ধের পারস্পরিক অসম সম্পর্কের ব্যবস্থাধীনে পরিচালিত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিসহ উৎপাদনী শক্তি এবং পরিবেশের মধ্যকার মিথষ্ক্রিয়ার বিশেষ সামাজিক বৈশিষ্ট্য ও পরিণতি হিসেবে পরিবেশের সংকটকে দেখার অবকাশ আছে।

জ্বালানী ব্যবহারের অসম চিত্র

সভ্যতার শুরু থেকে মানুষ প্রকৃতির নিয়মকে আত্মস্থ করে তার নিজের অবস্থার পরিবর্তন ঘটিয়েছে পাশাপাশি প্রকৃতির মধ্যেও নানাবিধ রূপান্তর সাধন করেছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত বিকাশকে এমন এক জায়গায় উন্নীত করেছে যেখানে বর্তমান পৃথিবীর মানুষ তার নিজস্ব ভৌগোলিক সীমানা ছাড়িয়ে মহাজাগতিক পরিসর পর্যন্ত অভাবনীয় সাফল্যের সাথে নিজের প্রভাব বিস্তৃত করেছে। এটি যেমন সত্য তেমনি সত্য হলো এই একই পৃথিবীতে সকল দেশের সকল মানুষের স্বার্থে সর্বাংশে এই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সুফল সমানভাবে বণ্টিত হয়নি। বর্তমান পৃথিবীর জনগণ এমন একটি বৈশ্বিক ব্যবস্থাপনার মধ্যে বসবাস করছে যেটি একদিকে উৎপাদনের বিপুল সমারোহ গুটিকয়েক কর্পোরেশনের অধীনস্থ করেছে, অভাবনীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত সাফল্যকে পুঁজি এবং মুনাফা পুঞ্জীভবনের স্বার্থে ব্যবহার করছে; অন্যদিকে অধিক সংখ্যক মানুষের প্রান্তিকীকরণ এবং নিঃস্বকরণই করছে না অধিকন্তু পুঁজি এবং মুনাফার পুনরুৎপাদনের উল্লেখযোগ্য শর্তটিকেও হুমকিগ্রস্ত করার পর্যায়ে পরিবেশের অবনতি ঘটাচ্ছে।
বলাই বাহুল্য, পরিবেশগত এই সঙ্কট সৃষ্টির জন্য সমানভাবে সকলে দায়ী নয়। কেননা প্রকৃতির সম্পদ ও শক্তিকে সমানভাবে আত্মস্থ করার মতো বৈজ্ঞানিক ও আধুনিক প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং পুঁজি ঐতিহাসিক কারণে সকল মানুষের নেই। যার ফলে একই সাথে নিজস্ব ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে যেমন অসম বিকাশ সাধিত হয়েছে তেমনি তারতম্য সৃষ্টি হয়েছে বিভিন্ন দেশের মধ্যে। যেমন: পৃথিবীর নিম্ন-আয় অর্থনীতিগুলোর প্রায় ষাট শতাংশ মানুষ বসবাস করে সারা পৃথিবীর মধ্যে মোট আঠাশ শতাংশ এলাকায়। পৃথিবীর সর্বমোট উৎপাদনে এই সাধারণ মানুষগুলোর ভাগ মাত্র চার শতাংশ। কৃত্রিম পরিবেশ দূষণে তাদের অবদান মাত্র সতের শতাংশ। বায়ুমণ্ডলে কার্বন নিঃসরণজনিত দূষণের সর্বপ্রধান উৎস হলো জ্বালানী; বাণিজ্যিকরূপে প্রাথমিক শক্তিসম্পদের ব্যবহার। এর মধ্যে রয়েছে : অ-নবায়নযোগ্য প্রাথমিক জ্বালানী, যেমন তেল, গ্যাস, কয়লা, পেট্রোলিয়াম, লিগনাইট এবং নবায়নযোগ্য প্রাথমিক বিদ্যুৎ, যেমন নিউক্লিয়ার, জিওথারমাল, জলবিদ্যুৎ শক্তি। নিম্ন আয় অর্থনীতির দেশগুলোর মাথাপিছু শক্তি ভোগের পরিমাণ উচ্চ আয় অর্থনীতির দেশগুলোর মাত্র সাত শতাংশ। মধ্য-আয় অর্থনীতির দেশগুলোর সকল অংশের মোট সাতাশ শতাংশ মানুষ বাস করে পৃথিবীর ৪৭ ভাগ এলাকায়; মোট উৎপাদনে এদের অংশ শতকরা ২২ ভাগ এবং মাথাপিছু শক্তি ভোগের পরিমাণ উচ্চ-আয়ভুক্ত দেশগুলোর শতকরা ৫০ ভাগ, আর বায়ুমণ্ডলের দূষণে তথা মানবসৃষ্ট কার্বন দূষণে এদের অবদান শতকরা ৩৭ ভাগ। তবে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে কার্বন দূষণের ক্ষেত্রে শিল্পোন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলোর অবদানই সর্বোচ্চ। এই দেশগুলোর জনসংখ্যার পরিমাণও কম। এসব দেশের জনসংখ্যা সারা পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার মাত্র তের শতাংশ। অথচ তারা বসবাস করে পৃথিবীর পঁচিশ ভাগ এলাকায় এবং বিশ্বের মোট জিডিপিতে তাদের ভাগ হলো চুয়াত্তর শতাংশ। ঐ সূত্রে বিশ্বের সর্বোচ্চ মাথাপিছু শক্তিভোগকারী (৫,১৫৮ কেজি তেল সমতুল্য) এই ১৩ শতাংশ মানুষ বায়ুমণ্ডলের কার্বন দূষণেও রাখে সর্বোচ্চ অবদান-৪৬ শতাংশ। উচ্চতম মাত্রায় ভোগ এবং দূষণ উৎপাদন পুঁজিবাদী আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার বিশেষ সম্পর্কের বিশ্ব তাৎপর্যও ব্যাপক। পৃথিবীর বেশীরভাগ মানুষের উৎপাদন, বণ্টন এবং ভোগের উপর এই তের শতাংশের ভোগ কেবল নেতিবাচক প্রভাব বিস্তার করে তাই নয়, উপরন্তু বায়ুমণ্ডলের দ্রুত ও ব্যাপক দূষণের মাধ্যমেও পঁচাশি ভাগ মানুষের জীবনকে করে দুর্বিষহ-বিপর্যস্ত। কেননা দূষণ কোন নির্দিষ্ট দেশের সীমানায় গণ্ডিবদ্ধ থাকে না। প্রকৃতির মধ্যে সৃষ্ট অস্বাভাবিকতার ফল উচ্চ আয়ভুক্ত দেশের সীমানার মধ্যেকার মানুষজনই শুধু ভোগ করে না; সীমানা ছাড়িয়ে তা দূর-দূরান্তের মানুষের জীবনকেও আঘাত করে। তাদের ভোগের প্রায়শ্চিত্ত করতে হয়। মুষ্টিমেয়র অপরাধের জন্য সাজাভোগ করতে হয় অধিকাংশকে। ধনী দেশের একচেটিয়া কর্পোরেশন এবং মুষ্টিমেয়ের ভোগবিলাসিতার বলি হতে হয় তথাকথিত অনুন্নত-দরিদ্র দেশগুলোর অধিকাংশ সাধারণ মানুষকে।
প্রাকৃতিক জলীয় বাষ্প, কার্বন-ডাই-অঙাইড, মিথেন, নাইট্রাস-অঙাইড এবং ওজোন-এর মতো প্রাকৃতিক গ্রীন হাউজ গ্যাসগুলো থেকে যে গ্রীন হাউজ প্রতিক্রিয়া তৈরী হয় সেটি পরিবেশের স্বাভাবিক অবস্থার জন্য প্রয়োজনীয়। পৃথিবীর আবহাওয়া ও জলবায়ুর উপর সেটির কোন বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয় না। কিন্তু মানবসৃষ্ট গ্রীন হাউজ গ্যাস, যেমন ক্লোরোফ্লোরোকার্বন; খনিজ জ্বালানি-জাত কার্বন-ডাই-অঙাইড; প্রাকৃতিক গ্যাস উত্তোলন, কয়লা উত্তোলনজনিত মিথেন; বায়োমাস (জ্বালানি কাঠ, লতাপাতা ইত্যাদি) পোড়ানো; রাসায়নিক সার ব্যবহারজনিত নাইট্রাস অঙাইড ইত্যাদি বায়ুমণ্ডলে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। মুনাফা বৃদ্ধির তাড়নায় এবং ভোগের উচ্চমাত্রার দরুন এগুলোর বিপুল পরিমাণে উৎপাদন-উত্তোলন ওজোন স্তরকে ছিদ্র করে ফেলেছে। যার কারণে সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি সরাসরি ভূ-ভাগে এসে পড়ে পৃথিবীর উত্তাপ বৃদ্ধি করছে যা এক মহাবিপর্যয়কর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের মানব সভ্যতা এখন হুমকির সম্মুখীন।
গ্রীন হাউজ ইফেক্ট হিসেবে পৃথিবীর তাপবর্ধন থেকে যেসব পরিস্থিতির উদ্ভব হতে পারে সেগুলির মধ্যে রয়েছে : বৃষ্টিপাতের ব্যাপক পরিবর্তিত ধরন, বিভিন্ন তাপমাত্রার স্তর, আমূল পরিবর্তিত মহাস্রোত, প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের বর্ধিত তীব্রতা এবং বরফ গলার হার বৃদ্ধি-ফলস্বরূপ সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধি। এসবের ফলাফল হবে; শস্য উৎপাদনের তীব্র ক্ষতি, পৃথিবীর নিম্নাঞ্চল পানির নীচে তলিয়ে যাওয়া, উর্বরভূমির মরুভূমিতে পরিণত হওয়া এবং গণ অভিবাসনের মত ঘটনা সংঘটিত হওয়া। বায়ুমণ্ডল ছাড়া শিল্পায়নজনিত বিভিন্ন রাসায়নিক দ্রব্য উৎপাদন, রাসায়নিক বর্জ্য, তেজষ্ক্রিয় বিকিরণ, তেল উত্তোলন-পরিশোধন-নিঃসরণ, আবর্জনা খালাস ইত্যাদি বায়ু-মাটি-পানির ব্যাপক দূষণ ঘটাচ্ছে।
দূষণজনিত পরিবেশ সঙ্কটের প্রভাব বিশ্বব্যাপী বিস্তার লাভ করেছে। বিশ্বব্যাংকের একটি সমীক্ষায় দেখা যায় যে, পানির দূষণ এবং নিরাপদ পানির অভাবে প্রতি বছর বিশ লক্ষ মানুষের মৃত্যু ঘটে এবং কয়েকশ’ কোটি লোক প্রায়শই অসুস্থ থাকে। বায়ু দূষণের কারণে শহরাঞ্চলে প্রতি বছর তিন লক্ষ থেকে সাত লক্ষ মানুষের অকাল মৃত্যু ঘটে এবং চল্লিশ কোটি থেকে সত্তর কোটি মানুষ-যাদের মধ্যে অধিকাংশ প্রধানত নারী এবং শিশু-অসুস্থতায় ভোগে ওজোন স্তরের ফাটলের কারণে অতিবেগুনী রশ্মির প্রভাবে। প্রতি বছর তিন লক্ষ লোক চর্মক্যান্সারে আক্রান্ত হয় এবং সতের লক্ষ লোক ক্যাটারেক্ট এর শিকার হয়। উচ্চ-আয়ের দেশগুলোর তুলনায় এই আক্রান্ত হওয়ার হার নিম্ন-আয়ের দেশগুলোতে অত্যধিক।
বাংলাদেশ সে-ধরনের একটি নিম্নআয়ের দেশ যে-দেশের সাথে এই বৈশ্বিক কাঠামো পরিচালনাকারী সংস্থা-রাষ্ট্র-প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক শিকারী ও শিকারের। এ সম্পর্কের সুবাদে বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত ব্যবহৃত হচ্ছে পুঁজি বিনিয়োগ এলাকা, অতি মুনাফা লুণ্ঠনের অঞ্চল এবং পরিণতি বিবেচনা না করে প্রকৃতিকে বিনষ্ট করে কাঁচামালের উৎস হিসেবে। অন্যদিকে তুলনামূলক অনেক কম দায়ী থাকা সত্ত্বেও দেশী-বিদেশী এহেন শোষণ-লুণ্ঠনের পরিণতি (প্রাকৃতিক দুর্যোগ) ভোগ করতে হয় দেশের সাধারণ মানুষকে।

জ্বালানী নীতি প্রণয়নের প্রেক্ষাপট

পুঁজিতান্ত্রিক অসম বিকাশের ঐতিহাসিক কারণে বাংলাদেশ বিশ্বের অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক যে বলয়ের মধ্যে বসবাস করছে সেখানে সম্পদের উপর এদেশের জনগণের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি অনেক বড় ধরনের রাজনৈতিক পালা বদল হওয়া সত্ত্বেও। শাসক শ্রেণীর অনুৎপাদনশীল শ্রেণীগত সীমাবদ্ধতা ও দুর্বলতার দরুন পুঁজিবাদী বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ার সাথে অঙ্গীভবন বিশেষ কোন সুফল বয়ে আনতে পারেনি। দেশীয় শাসক শ্রেণীর দুর্বল অবস্থানের কারণে বিশ্বায়ন, মুক্তবাজার ইত্যাদির নামে সম্পদ বহুজাতিক পুঁজির-প্রতিষ্ঠান-রাষ্ট্রের আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণ বলয়ে রাখার প্রক্রিয়া বাংলাদেশের রাজনৈতিক অভ্যুদয়ের পর থেকে শুরু হয়। এ প্রক্রিয়া যে চেতনা নিয়ে মুক্তিসংগ্রাম শুরু হয়েছিল-তার মমার্থ ছিল স্বীয় শক্তি সম্পদের উপর ভর করে দেশীয় জনগণের স্বাধীন উন্নয়ন ও বিকাশ-তার সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ এবং সাংঘর্ষিক। বলাই বাহুল্য, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী, পুঁজিবাদী ব্যবস্থাধীনে জাতীয় কর্মকাণ্ডের সূত্রে উদ্ভূত অথচ সর্বজনীনভাবে পরিণামসহ পরিবেশ সঙ্কট-এর সমাধানও তাই হয় নি।
আগেই বলা হয়েছে, দেশীয় ক্ষমতাবান শাসকবর্গের আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক আধিপত্যবাদী শক্তির উপর নির্ভরশীলতর দরুন জনগণের সম্পদকে একচেটিয়া পুঁজির শৃঙ্খলে আবদ্ধ করার ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার শুরু হয় বাংলাদেশের জন্মের পর থেকেই। সে ধারাবাহিকতায় আশির দশকের শেষ হতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, কানাডা ইত্যাদি দেশের অব্যাহত চাপে সারা দেশকে ২৩ ভাগে ভাগ করে; জনগণের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে তেল-গ্যাস ক্ষেত্রগুলোকে আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানীগুলোর হাতে তুলে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। জাতীয় জ্বালানী নীতি তৈরীর মাধ্যমে পিএসসি চুক্তির অধীনে এসব কর্মযজ্ঞকে বৈধতা দানের ব্যাপারটি তখন থেকেই লক্ষ্য করা যায়।
অ-নবায়নযোগ্য, নবায়নযোগ্য প্রাকৃতিক খনিজ সম্পদ, বিদ্যুৎ এভাবে দেশী-বিদেশী লুণ্ঠন প্রক্রিয়ার আওতাধীন হওয়ার কারণে যে সম্পদ হতে পারতো জনগণের জন্য আশীর্বাদ; তা না হয়ে সম্পদ জনগণের জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর যে স্বাভাবিক প্রকৃতি পরিবেশ জীববৈচিত্র্য জনগণের সুষ্ঠুভাবে বেঁচে থাকার জন্য একান্ত প্রয়োজনীয়, তার ধ্বংস প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকার কারণে পুরো দেশ এখন ভয়ঙ্করভাবে বিপর্যস্ত হওয়ার সম্মুখীন। আর এ জন্য প্রকৃতপক্ষে দায়ী দেশী-বিদেশী লুণ্ঠনজীবী, কমিশনভোগী এজেন্টরা এবং তাদের প্রতিনিধি নীতি নির্ধারকরা। জনগণের স্বার্থের বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা যে ‘উন্নয়ন’ দর্শনের মধ্যে পড়ে না সে ‘উন্নয়ন’এর নামাবলী গায়ে জড়িয়ে এ কাজগুলো তারা করেছে। জাতীয় জ্বালানি নীতি প্রণয়ন এই ‘উন্নয়ন’ দর্শনেরই প্রতিফলন।

জ্বালানী নীতি

বাংলাদেশে নব্বুই দশকের পূর্বে কোন সমন্বিত জ্বালানি নীতি ছিল না। অতীতের সরকারগুলোর এনার্জি উন্নয়ন কর্মসূচী ও ব্যবস্থাপনা পর্যালোচনা করে এনার্জির অনুসন্ধান, উৎপাদন, সরবরাহ ও ব্যবহার এবং টেকসইভাবে এনার্জির চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে ১৯৯৬ সালে তৎকালীন সরকার ন্যাশনাল এনার্জি পলিসি প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে নিম্নলিখিত সীমাবদ্ধতাগুলো চিহ্নিত করে-

ক. বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের অভাবে এনার্জি সেক্টরের সকল ক্ষেত্রে সুষম উন্নয়ন কার্যক্রম গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি;
খ. এনার্জি সেক্টরের উন্নয়নে প্রাইভেট সেক্টরের অংশগ্রহণ উৎসাহিত করার জন্য সহায়ক নীতি প্রণয়ন করা হয়নি;
গ. নির্ভরযোগ্য এনার্জি সরবরাহের অভাবে এনার্জি ব্যবহারকারী সেক্টরের (শিল্প) উন্নয়ন কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে;
ঘ. এনার্জি এজেন্সিগুলোর ব্যবস্থাপনা দক্ষতার সাথে পরিচালিত হয়নি;
ঙ. যুক্তিসঙ্গতভাবে এনার্জির মূল্য নির্ধারণ করা হয়নি;
চ. দক্ষতার সাথে এনার্জি ব্যবহারের জন্য যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি;
ছ. বায়োমাস জ্বালানীর অপরিকল্পিত ব্যবহারের ফলে পরিবেশের অবক্ষয় ঘটেছে;
জ. গ্রামাঞ্চলের সার্বিক জ্বালানী চাহিদা মিটাবার জন্য যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি;
ঝ. প্রযুক্তি উন্নয়ন ও দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য গবেষণা কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়নি;
ঞ. জ্বালানী সেক্টরের দক্ষ ব্যবস্থাপনার জন্য প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জনশক্তি গড়ে তোলার কার্যক্রম গ্রহণ করা হয় নি।

প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে যে ‘উদ্দেশ্যগুলো’ ঠিক করা হয়-

ক. উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সকল সেক্টরের টেকসই অর্থনৈতিক অগ্রগতি অর্জনের জন্য এনার্জি সরবরাহ নিশ্চিত করা;
খ. দেশের বিভিন্ন অঞ্চল এবং আর্থ-সামাজিক গ্রুপের এনার্জি চাহিদা মিটাবার ব্যবস্থা করা;
গ. দেশের সকল ধরনের এনার্জি সম্পদের সর্বোত্তম উন্নয়ন ও ব্যবহার নিশ্চিত করা;
ঘ. এনার্জি ইউটিলিটিগুলোর টেকসই পরিচালনা নিশ্চিত করা;
ঙ. এনার্জি সম্পদের যৌক্তিক ব্যবহার নিশ্চিত করা;
চ. এনার্জি ডেভেলপমেন্টের সময় পরিবেশগত বিষয় যথাযথভাবে বিবেচনা করে এবং পরিবেশের ক্ষতিসাধন ন্যূনতম পর্যায়ে রেখে এনার্জি ডেভেলপমেন্ট কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা;
ছ. এনার্জি সেক্টরের উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনায় সরকারি ও বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণে উৎসাহ প্রদান করা।

এজন্য যে বিষয়গুলো বিবেচনা করার কথা বলা হয়, সেগুলো হচ্ছে-উপাত্ত সংগ্রহ, এনার্জি সম্পদের মূল্যায়ন, প্রযুক্তি মূল্যায়ন, গ্যাস ব্যবস্থাপনা, পেট্রোলিয়াম জ্বালানী ব্যবস্থাপনা, কয়লা ব্যবস্থাপনা, বিদ্যুৎ সেক্টরের ব্যবস্থাপনা, এনার্জি সংরক্ষণ, পরিবেশগত বিষয়, মূল্যনির্ধারণ, বিনিয়োগ নীতি, পশ্চিমাঞ্চলে জ্বালানী সরবরাহ বৃদ্ধিকরণ, এলাকাভিত্তিক এনার্জি পরিকল্পনা, জরুরী মজুদ, প্রকল্প মূল্যায়ন, গবেষণা ও উন্নয়ন, প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা, আইনগত বিষয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ইত্যাদি।
উপরোক্ত বিষয়গুলো বিবেচনা করে ন্যাশনাল এনার্জি পলিসিগুলো বাস্তবায়নের জন্য পাঁচটি অংশে ভাগ করে প্রকাশ করা হয়েছে। সেগুলো যথাক্রমে (১) অ-নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি (ঘড়হ-ৎবহবধিনষব ঊহবৎমু চড়ষরপু) (২) পেট্রোলিয়াম নীতি (চবঃৎড়ষবঁস চড়ষরপু) (৩) নবায়নযোগ্য এবং গ্রামীণ জ্বালানি নীতি (জবহবধিনষব জঁৎধষ ঊহবৎমু চড়ষরপু) (৪) বিদ্যুৎ নীতি (চড়বিৎ চড়ষরপু) (৫) গ্রামীণ বিদ্যুতায়ন নীতি (জঁৎধষ ঊষবপঃৎরভরপধঃরড়হ চড়ষরপু)। (১৯৯৬ জিওবি)

পরিবেশগত দিক; পরিবেশের ভারসাম্যহীনতা

জনগণের স্বার্থ বিবেচনায় যে কোন ধরনের কর্মকাণ্ড পরিচালনার ক্ষেত্রে পরিবেশের উপর কিছু নেতিবাচক প্রভাব পড়া স্বাভাবিক। যেমন; বিভিন্ন ধরনের জ্বালানি (তেল, গ্যাস, কয়লা, বিদ্যুৎ) উত্তোলন-উৎপাদন, পরিশোধন, পরিবহন, রূপান্তরকরণের বিভিন্ন ধাপে পরিবেশের বিপর্যয় ঘটতে পারে। তখন স্বাধীন গণতান্ত্রিক সরকারের কাজ হয়ে দাঁড়ায় কোন লুণ্ঠনজীবী সংস্থার মুনাফাস্বার্থ বিবেচনা না-করে বরং পরিবেশগত দিক বিবেচনা করে সাধারণ মানুষের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার স্বার্থে নানাবিধ দূষণ-বিপর্যয়রোধে একটি টেকসই বিধি ব্যবস্থা গড়ে তোলা। বৃহত্তর স্বার্থের কথা চিন্তা করে সেক্ষেত্রে জনগণও ছাড় দিতে প্রস্তুত থাকে। কিন্তু ‘উন্নয়ন’ কর্মকাণ্ড যদি হয় লুণ্ঠনধর্মী সেক্ষেত্রে জনগণের দিক থেকে ছাড়ের বিপরীত ঘটনা ঘটতে বাধ্য।

জ্বালানী নীতির পরিবেশগত দিক এবং বাস্তবতা

জাতীয় জ্বালানী নীতিতে পরিবেশগত দিকটির উল্লেখ করে অ-নবায়নযোগ্য জ্বালানী নীতির অংশে বলা হয়েছে যে, যে কোন প্রকার জ্বালানী উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করার পূর্বে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন করতে হবে। পরিবেশগত নীতি এবং আইনের আওতায় তা করা চাই।
নতুন কোন প্রকল্প গ্রহণ করতে হলে এজন্য পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন করে পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে ছাড়পত্র নেওয়ার বিধান আছে। কিন্তু ঐ পর্যন্তই। কাগজে কলমে অনেক কিছু থাকলেও বেশীরভাগ ক্ষেত্রে তার বিপরীতটিই ঘটতে দেখা যায়। বাংলাদেশের আইনগত এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোগত দুর্নীতি-দুর্বলতার কারণে অনেক ধ্বংসাত্মক প্রকল্পও আইনের ফাঁক গলে পাশ হয়ে যায়।
জীবাশ্ম জ্বালানীর মধ্যে কয়লা বিগত শতকে নির্ভরযোগ্য একটা জায়গা দখল করে ছিল। পৃথিবীর মোট জ্বালানি চাহিদার বেশীরভাগ অংশ মেটাত কয়লা। পরবর্তীতে বিকল্প জ্বালানির উৎস আবিষ্কৃত হওয়া, উত্তোলনে অর্থনৈতিক, সামাজিক, পরিবেশগত নানা সীমাবদ্ধতার দরুণ কয়লার উপর পূর্বোক্ত নির্ভরশীলতার জায়গা পরিবর্তিত হয়ে যায়। বাংলাদেশে উচ্চ আয়ভুক্ত দেশের তুলনায় অনেক কম কয়লার ব্যবহার করা হয়। কয়লা গৃহস্থালী কাজের তুলনায় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানেই বেশী ব্যবহৃত হয় বিশেষত বিদ্যুৎ উৎপাদনে এবং ইট ভাটায়। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার না করবার কারণে ইট ভাটা থেকে যে ধোঁয়া এবং ছাই নির্গত হয় সেটি পরিবেশের জন্য মারাত্মক রকমের ক্ষতিকর। কয়লা ব্যবহারের সবচেয়ে বড় অন্তরায় হচ্ছে পরিবেশগত সমস্যা। কয়লা উত্তোলনের পর খনি এলাকায় স্তূপ করে রাখা পাথর, কাদামাটি, খনি এলাকায় সৃষ্ট গভীর খাদ, কয়লা ব্যবহারের পর শিল্প-কারখানার আশেপাশে পরিত্যক্ত ছাই এবং ব্যবহারের সময় উড়ে-যাওয়া ছাই মানুষের স্বাস্থ্য অবস্থার উপর নেতিবাচক প্রভাব তৈরী করে। কয়লার কালো ধোঁয়া, ধোঁয়ার সাথে নির্গত সালফার-ডাই-অঙাইড গ্যাস থেকে সৃষ্ট এসিড পরিবেশকে বিপন্ন করে। বায়ুমণ্ডলে কার্বন-ডাই-অঙাইড সঞ্চিত হয়ে মানবসৃষ্ট গ্রীন হাউজ এফেক্ট সৃষ্টির জন্য কয়লার প্রভাব অন্যান্য জীবাশ্ম জ্বালানির বিশেষ করে তেল-গ্যাসের তুলনায় অনেক বেশী।
সরকার বাজার অর্থনীতির কথা চিন্তা করে ১৯৯৬ সালে ন্যাশনাল এনার্জি পলিসি অনুমোদন করে। সেখানে পরিবেশগত দিক বিবেচনা করে বলা হয়, জ্বালানি উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে এনভায়রনমেন্টাল ইমপ্যাক্ট এসেসম্যান্ট বাধ্যতামূলক। উক্ত পলিসিতে কয়লা অনুসন্ধান, উত্তোলন এবং বাণিজ্যিক ব্যবহারের উপর জোর দেওয়া হয়। উত্তোলন এবং ব্যবহারের (বিশেষ করে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে) ক্ষেত্রে পরিবেশের বিপর্যয় রোধ করে এমন প্রযুক্তি বাছাই করতে হবে। পরিবেশের সংরক্ষণে জনসচেতনতা বৃদ্ধির কথাও পলিসিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

জীবাশ্ম জ্বালানীর নিঃশেষকরণ প্রক্রিয়া এবং পরিবেশের ক্ষয়ক্ষতি

একই সাথে বাজার অর্থনীতির দর্শন এবং জনগণের জ্বালানী, পরিবেশগত স্বার্থ সংরক্ষণ পলিসিতে বিবেচিত হলেও পরস্পরবিরোধী অবস্থানের কারণে বাস্তবে তা কার্যকর হয় না। প্রসঙ্গত দিনাজপুরের ফুলবাড়ীর কয়লা প্রকল্পের কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন।
ফুলবাড়ী এবং তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে মোট উত্তোলনযোগ্য কয়লা মজুদ আছে ৫৭২ মিলিয়ন টন। এই কয়লা উত্তোলনের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য প্রথমে অস্ট্রেলিয়ান কোম্পানি বিএইচপি এবং পরবর্তীতে বিএইচপি’র চলে যাওয়ার পর এশিয়া এনার্জি সরকারের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়। আইনী কাঠামোর দুর্বলতা, প্রশাসনিক দুর্নীতি এবং আন্তর্জাতিক রাষ্ট্র-সংস্থার চাপে নির্দিষ্ট সময়ের আগেই উক্ত কোম্পানীটি মিথ্যা এবং বানোয়াট প্রতিবেদন দাখিল করা সত্ত্বেও পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে ছাড়পত্র পেয়ে যায়। অন্যদিকে জনগণের তরফ থেকেও কয়লা খনি অঞ্চলের সমস্ত প্রকৃত তথ্যভিত্তিক একটি সমীক্ষা প্রতিবেদন তৈরী করে জনগণের সামনে হাজির করা হয়। সেখানে পরিবেশগত দিকগুলো বিচার করে উক্ত অঞ্চলের কয়লা উত্তোলন করা হলে কি কি ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হবে সেখানকার মানুষ-তা উল্লেখ করা হয়।
কোম্পানীর শর্ত মোতাবেক যদি উন্মুক্তমুখ খনন পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন করা হতো বা হয় তবে উত্তোলিত কয়লার বিষাক্ত বর্জ্য পার্শ্ববর্তী নদীর পানিতে গিয়ে মিশবে। বাংলাদেশের নদ-নদীগুলো পরস্পরের সাথে জালের মতো সংযুক্ত এবং বিস্তৃত বিধায় আশেপাশের ১০০ কি.মি. নদীর পানি বিষাক্ত হবে, জলজ সম্পদ ধ্বংস হবে, মৎস্যশূন্য হবে গোটা অঞ্চল। খনি কার্যক্রমের সাথে সাথে এই পুরো এলাকার কৃষি, পশুপালন, মৎস্য, বনজ ইত্যাদি সকল তৎপরতা অজানা কাল পর্যন্ত সম্পূর্ণ ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে। বিরানভূমিতে পরিণত হবে পুরো অঞ্চল কেবল কোম্পানীর স্থাপনা ছাড়া। হিসাব করে দেখা গেছে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন করতে হলে প্রতিদিন প্রায় ৮০ কোটি লিটার ভূগর্ভস্থ পানি তুলতে হবে। বর্তমানে উত্তরাঞ্চলে কৃষি আবাদের জন্য বছরে এর একশত ভাগেরও কম পানি তোলা হয়, এটি কৃষি এবং ভূবিজ্ঞানীরা সেই অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পানি স্তর রক্ষার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করেন। এর ফলে এখনই এই অঞ্চলের শতকরা ত্রিশ ভাগ টিউবয়েল অচল হয়ে পড়েছে। প্রায় দুই লক্ষ মানুষকে উচ্ছেদ করতে হবে উক্ত অঞ্চল থেকে। উচ্ছেদকৃত মানুষজনের ঢাকা কিংবা আশেপাশের শহরাঞ্চলে অভিবাসন করা ভিন্ন কোন উপায় থাকত না। দেশের পুরো জনগণকে এজন্য খেসারত দিতে হবে যেমন প্রত্যক্ষভাবে খেসারত দিতে হয়েছিল বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর লক্ষাধিক মানুষ উদ্বাস্তুকরণ এবং জীববৈচিত্র্য ধ্বংসকারী কাপ্তাই বাঁধ প্রকল্পের জন্য। এ ধরনের একটি ধ্বংসাত্মক প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য এডিবি, ব্রিটেন অনবরত চাপ দিয়ে যাচ্ছিল। আপাতত ফুলবাড়ী প্রকল্প স্থগিত করা হলেও সে চাপ এখনও অব্যাহত আছে। ২০০৬ সালে জনগণ যদি আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে নিজের রক্ত দিয়ে প্রতিরোধ গড়ে না তুলতেন তাহলে তার জন্য চরম মূল্য গুনতে হতো সমগ্র দেশবাসীকে। প্রাকৃতিক পরিবেশের নেতিবাচক পরিবর্তনে অনেক বড় ধরনের ভূমিকা রাখতো।
মাগুরছড়া এবং টেংরাটিলা, লাউয়াছড়া বিস্ফোরণের ফলে সৃষ্ট ঘটনাগুলোও উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। অঙিডেন্টাল এবং নাইকোর অসাবধানতা ও অবহেলাজনিত কারণে ঘটা বিস্ফোরণের ফলে বিপুল অঙ্কের আর্থিক ক্ষতি ছাড়াও পাহাড়, মাটি, পানি, বন, জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হয়েছে। দূষিত হয়েছে বাতাস। স্থানীয় জনগণের স্বাস্থ্যের উপর এর ব্যাপক প্রভাব পড়েছে, টাকার অঙ্কে যার হিসাব করা যায় না। এরপর দুর্লভ জীববৈচিত্র্যের অভয়ারণ্য বলে কথিত লাউয়াছড়া বনাঞ্চলের পরিবেশ বিপর্যয়ের মতো ঘটনা ঘটে। অঙিডেন্টাল, নাইকো-র পথ ধরে শেভ্রন। বিদেশী তেল কোম্পানীগুলোর অতিমুনাফার যূপকাষ্ঠে বলি হয় দেশের সাধারণ মানুষ। দীর্ঘমেয়াদে যার প্রভাব পড়বে এবং বর্তমান ধ্বংসযজ্ঞের নেতিবাচক ফলভোগ করবে পরবর্তী প্রজন্ম।
এ সমস্ত ধরনের ঘটনা ঘটানোর জন্য যে প্রতিষ্ঠানগুলো দায়ী, সেই অঙিডেন্টাল, নাইকো, শেভ্রন বিনা ক্ষতিপূরণে পার পেয়ে যায়। আইওসিগুলোর প্রতি সরকারের দৃষ্টিভঙ্গী-পক্ষপাতমূলক, উচ্চ পর্যায়ে দুর্নীতি, আইনগত দুর্বলতা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ইত্যাদির কারণে বিরাট ধরনের ধ্বংসযজ্ঞ করেও তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়।

বায়ু দূষণ সমস্যা

পরিবেশ অধিদপ্তরের এক গবেষণা প্রতিবেদনের সূত্রে জানা যায় যে, ঢাকা শহরের বাতাসে প্রতিদিন যানবাহনে ব্যবহৃত জ্বালানী থেকে ৭৩ টন কার্বন মনোঙাইড, ১৭ টন হাইড্রোকার্বন, ১৯ টন নাইট্রোজেন অঙাইড, ২ টন সালফার অঙাইড, ৪.২ টন সাসপেন্ডেড পার্টিকুলেট ম্যাটার এবং ১২৮ কেজি সীসা নির্গত হয়। বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের এক হিসাব অনুসারে ঢাকার বাতাসে প্রতি বছর পঞ্চাশ টন (প্রতিদিন গড়ে ১৪৫ কেজি) সীসা নির্গত হয়। এছাড়া দুইস্ট্রোক ইঞ্জিন বিশিষ্ট মোটরযানে যখন সীসাযুক্ত গ্যাসোলিন ব্যবহার করা হয় তখন অন্যান্য মোটরযানের ন্যায় বাতাসে কার্বনডাইঅঙাইড, কার্বন মনোঙাইড, সীসা ছাড়া অন্যান্য যে সকল গ্যাস নির্গত হয় তা হচ্ছে অসম্পূর্ণ পোড়া গ্যাসোলিনের অংশ এবং লুব্রিক্যান্ট হিসাবে ব্যবহৃত ভারী তেলের বাষ্প ও কার্বন কণা। এতদসত্ত্বেও এই বিষয়টি উল্লেখ করা প্রয়োজন যে যানবাহন থেকে নির্গত কার্বনডাইঅঙাইড ও ওয়াটার ভেপার স্থানীয়ভাবে পরিবেশ দূষণের অন্যতম কারণ না হলেও স্থানীয় মানুষের স্বাস্থ্যের উপর এবং গ্রীনহাউজ গ্যাস হিসেবে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিতে প্রভাব ফেলে। তবে গ্রীন হাউজ গ্যাসের নির্গম বেশী হলে তা দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায় বৈকি। ঢাকা শিশু হাসপাতালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে শিশুদের রক্তে সীসার অনুকণার পরিমাণ বেশী হলে শিশুর মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়।
যে যানবাহন থেকে প্রতিদিন এই পরিমাণ উপাদান নির্গত হয় তার হিসাবটি কি রকম? বিআরটিএ-এর পরিসংখ্যান মতে ঢাকায় প্রতিদিন ২ লক্ষ যান্ত্রিক যানবাহন চলাচল করে। এর মধ্যে ট্রাক ১২ হাজার, বাস-মিনিবাস ৫ হাজার, প্রাইভেট কার ও জীপ ৮৫ হাজার, অটোরিঙা (ট্যাঙি, মিশুক) ৫০ হাজার, টেম্পো ৩ হাজার, মোটর সাইকেল ৩০ হাজার, অন্যান্য যন্ত্রচালিত যানবাহন ১৫ হাজার। এই সংখ্যা ক্রমবর্ধমান।
শহর অনুপাতে যানবাহনের সংখ্যা অত্যধিক বেশী ছাড়াও এর একটি শ্রেণীগত দিক আছে। সাধারণত উচ্চবিত্ত এবং মধ্যবিত্তদের সংখ্যা তুলনামূলক যথেষ্ট কম থাকা সত্ত্বেও প্রাইভেট কার, জীপ, অটোরিঙা, মোটর সাইকেল তারাই ব্যবহার করে বেশী। সাধারণ খেটে খাওয়া দরিদ্র মানুষ যারা; সংখ্যায় যদিও তারা অনেক বেশী কিন্তু তাঁদের ব্যবহৃত পাবলিক যানবাহন অন্যান্য যানের তুলনায় যথেষ্ট পরিমাণ কম থাকায় বাতাসের বায়ু দূষণ বৃদ্ধির জন্য তারা ন্যূনতম দায়ী। বিত্তবানদের কারণেই মূলত বায়ু দূষণ বেশী হচ্ছে বলা যায়।
এক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকা কি? এনার্জি পলিসিতে বলা আছে ‘বায়ু দূষণ’ রোধের কথা। সীসামুক্ত পেট্রোল প্রচলনকে উৎসাহ দেওয়ার কথা উল্লেখ আছে। কার্যক্রম বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় কাঠামো গড়ে তোলা এবং বর্তমান সংশ্লিষ্ট করার ব্যাপারে ইঙ্গিত দেয়া আছে।
কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ নিজের অভিজ্ঞতা দিয়েই জানেন যে, পলিসিতে উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে এর কোন কার্যকারিতা নেই। অলংকার যেমন দেহের সৌন্দর্যকে আলাদা একটা মাত্রা দান করে তেমনি পলিসিতে উল্লেখিত এসব বাক্য শোভা বর্ধন করে মাত্র। সীসাযুক্ত পেট্রোলিয়াম আমদানী যেমন অব্যাহত আছে তেমনি আছে এর ব্যবহার উল্লেখযোগ্য হারে। এর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার যেমন বাধ্যবাধকতা নেই তেমনি কোন বিশেষ কারণে যদি কখনও কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয় সেগুলোর ধারাবাহিকতা রক্ষিত হয় না। কিংবা আইনের ফাঁক-ফোকর গলে কর্তৃপক্ষের পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে অপরাধীরা ছাড়া পেয়ে যায়। অতিমুনাফার তাগিদে একশ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী আইন-কানুনের দুর্বলতার সুযোগে এ কাজগুলো করে থাকে।
বায়োমাস জ্বালানি বাংলাদেশের বর্তমানে ব্যবহৃত জ্বালানির প্রায় ৬০-৭০ ভাগ প্রয়োজন মিটায়। ১৯৯১ সালের একটি হিসাবে দেখা যায় রান্নার জন্য বাংলাদেশের মোট পরিবারের শতকরা ৯৪.২ ভাগ বায়োমাস জ্বালানি ব্যবহার করতেন। নবায়নযোগ্য কিন্তু অপরিসীম নয় এই জ্বালানির উৎস মূলত কাঠ, খড়, তুষ, পাটখড়ি, আখের ছোবড়া, লতা-পাতা, শুকনো গোবর ইত্যাদি। জনসংখ্যার অনুপাতে কৃষি জমির প্রাপ্যতা কমে যাওয়ার কারণে জমিভিত্তিক এই জ্বালানির প্রাপ্যতাও কমে যাচ্ছে। প্রাপ্য জ্বালানি কাঠের তুলনায় বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের জ্বালানি চাহিদা খুবই বেশী। এ কারণে গাছ কেটে সেই চাহিদা পূরণ করার কারণে পরিবেশের উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
জ্বালানী নীতিতে বায়োমাস জ্বালানির মধ্যে কাঠের ব্যবহারকে নিরুৎসাহিত করার কথা উল্লেখ আছে। বিপরীতে ন্যায্যমূল্যে বিকল্প জ্বালানী সরবরাহের অঙ্গীকার করা হয়েছে। কৃষি জমির উর্বরতা হ্রাস করে এমন জ্বালানি সংগ্রহকেও নিরুৎসাহিত করার কথা বলা হয়েছে। সামাজিক বনায়নকে উৎসাহিত করার উল্লেখ আছে।
পলিসিতে উল্লেখ থাকলেও সেগুলো বাস্তবায়নের কোন সম্ভাবনা এ যাবৎকাল পর্যন্ত দেখা যায় নি। বায়োমাস জ্বালানির চাইতে উন্নত হচ্ছে গ্যাস, তেল। বর্তমান পর্যন্ত দেশের শতকরা ৪/৫ ভাগ মানুষ গ্যাসের সুবিধা পাচ্ছে। গ্যাসের সুবিধা বঞ্চিত দেশের অধিকাংশ মানুষ। বিকল্প জ্বালানি প্রাপ্তির অভাবে বায়োমাস জ্বালানির উপর নির্ভরশীলতা কোন অংশে কমেনি। গাছ কাটা চলছে। এমনিতেই পরিমাণে কম তার মধ্যে যুক্ত হয়েছে কাঠব্যবসায়ীদের সুন্দরবন এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের বন ধ্বংস। নির্বিচারে বন ধ্বংসের পরিণামে উপকূলীয় এলাকার মানুষের জীবন মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। ‘সিডর’-এর মতো প্রলয়ংকরী ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের ফলাফলই বলে দেয় দেশের মানুষ কতটা ঝুঁকির মধ্যে আছে ।
বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিসত্তার বাস পার্বত্য চট্টগ্রাম যেমন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের লীলাভূমি তেমনি সেখানে খনিজ সম্পদেরও যথেষ্ট ভাণ্ডার রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। রুমায় গ্যাস, আলিকদমে পেট্রোলিয়াম, কাপ্তাই এবং আলিকদমে উচ্চমানের হার্ড রক, লামায় কয়লার সন্ধান পাওয়া গেছে। এছাড়াও প্রচুর পরিমাণে স্যান্ডস্টোন, লাইমস্টোন ইত্যাদির মজুদ আবিষ্কৃত হয়েছে। গ্যাস ক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়েছে অনেক আগেই। খাগড়াছড়ির সুমুতাং অঞ্চলে এ পর্যন্ত আবিষ্কৃত গ্যাস মজুদের পরিমাণ হচ্ছে ০.১৬ টিসিএফ। এখন পর্যন্ত এই সম্পদ উত্তোলনের জন্য ব্যাপকভাবে মানুষ পরিবেশ ধ্বংসের প্রক্রিয়া শুরু হতে পারেনি রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে। কিন্তু লুণ্ঠনজীবী ক্ষমতাবানদের বনাঞ্চল ধ্বংসের প্রক্রিয়া ক্রমবর্ধমান। স্থানীয় জাতিসত্তার মানুষদের বনসম্পদ থেকে প্রাপ্ত জীবন রসদ পাওয়ার যে দীর্ঘদিনের সামষ্টিক অধিকার তা হরণ করে ব্যক্তি উদ্যোগে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে পাহাড়-গাছ কাটা চলছে। ফলে ভূমির অবক্ষয়, ভূমি ধসের মতো ঘটনা ঘটছে অহরহ। কার্বন-ডাই-অঙাইড শোষণের প্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়ার কারণে বায়ুমণ্ডলে উষ্ণতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করছে। বলাই বাহুল্য, বন সংরক্ষণের কথা যেগুলো নীতিমালার অভ্যন্তরে বর্ণিত আছে সেগুলোর বাস্তবে কোন কার্যকারিতা নেই।

সীমাবদ্ধতার সীমাবদ্ধতা

প্রয়োজনীর অর্থের অভাব, প্রাইভেট সেক্টরের অংশগ্রহণ সম্পর্কিত সহায়ক নীতি প্রণয়ন না করা, নির্ভরযোগ্য এনার্জি সরবরাহের অভাব, ব্যবস্থাপনার অদক্ষতা, অযৌক্তিক এনার্জি ব্যবহার, অপরিকল্পিত বায়োমাস জ্বালানীর ব্যবহার, গ্রামাঞ্চলের চাহিদা মিটাবার ব্যবস্থা গ্রহণ না করা, প্রযুক্তির অনুন্নয়ন, দক্ষ জনশক্তির অভাব ইত্যাদি সমালোচনা করে যে নতুন নীতি প্রণীত হয়েছিল তার প্রায় সব সীমাবদ্ধতাই এখন পর্যন্ত বিদ্যমান। যে কাজগুলো সূচারুরূপে সম্পাদন করা হয়েছে তার মধ্যে অন্যতম হলো প্রাইভেট সেক্টরের অংশগ্রহণ, বিশেষ করে আন্তর্জাতিক ব্যক্তি মালিকানাধীন পুঁজির আধিপত্য সুনিশ্চিত করার জন্য বিভিন্ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা। এছাড়া জ্বালানি খাত উন্নয়নের ক্ষেত্রে অধিকাংশ সমস্যা-যেগুলো চিহ্নিত করা হয়েছিল-সেগুলো আরও গভীর হয়েছে। আগেই দেখানো হয়েছে, পরিবেশের ক্ষতিসাধন ন্যূনতম পর্যায়ে রেখে জ্বালানী উন্নয়ন সম্পর্কিত কার্যক্রম বাস্তবায়ন করার ঘোষণা দেওয়া হলেও পরিবেশের ক্ষেত্রে মারাত্মক হুমকিস্বরূপ এমন প্রকল্পকে জায়েজ করার নানা উদ্যোগ গ্রহণ অব্যাহত আছে। এর সাথে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে অর্থ-জনবল ইত্যাদির অভাবের কথা বলে শক্তিশালী করা হয়নি। জ্বালানি উন্নয়ন সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম যথাযথভাবে যাচাই-বাছাই-পর্যালোচনা করা হয় নি। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর অভ্যন্তরে দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেয়া হয়েছে। জ্বালানী উন্নয়ন কার্যক্রমে সুকৌশলে এমনভাবে দেশীয় বেসরকারী ব্যক্তিমালিকানাধীন উদ্যোক্তাদের বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে যার ফলে তারা নিরুৎসাহিত হয়েছে।
আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, গ্রীন হাউজ প্রতিক্রিয়ার জন্য দায়ী গ্যাসীয় পদার্থ এবং উচ্চ আয়ভুক্ত দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের মাথাপিছু জ্বালানি ব্যবহারের অনুপাত কমের কথা। তবুও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন, বায়োমাস ব্যবহার, সীসাযুক্ত পেট্রোলিয়াম ব্যবহার, অ-বনায়ন প্রক্রিয়া অর্থাৎ প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে বাতাসের উষ্ণতা বৃদ্ধির জন্য দায়ী তা নিরসনের জন্য সরকারীভাবে যেসমস্ত উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে তা যথেষ্ট কার্যকর নয়। যদিও নীতিতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের কথা উল্লেখ আছে। বলাই বাহুল্য, যে দেশের সরকারী মন্ত্রী-আমলারা ব্যস্ত থাকে জমি-হাওড়-বাঁওড়-খাল-বন দখলের কাজে এবং নিজস্ব অক্ষমতার কথা জোরের সাথে জানান দেয় সে দেশের নীতিমালায় উচ্চমার্গীয় কথার বাস্তব কোনো কার্যকারিতা থাকে না। শেষ পর্যন্ত তা কাগুজে নীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।

শেষ কথা

প্রকৃতির উপর সকল প্রকার আধিপত্যমূলক, নৈরাজ্যিক এবং স্বতঃস্ফূর্ত কর্মকাণ্ডের অবসান কিংবা প্রকৃতি, মানুষ ও সমাজের মিথষ্ক্রিয়ার সমন্বয় সাধন করা ও পরিবেশের পরিণতি-প্রতিক্রিয়া বিবেচনায় সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিতকরণ, এ সবের কোনোকিছুই একচেটিয়া পুঁজির শৃঙ্খল ভাঙ্গা এবং ভোগবাদী আধিপত্যবাদী মানসিকতার সামগ্রিক পরিবর্তন ব্যতীত সম্ভব নয়। তবে সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগের নামে যেসব লুণ্ঠনকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের জনগণের সম্পদ লুঠ করে নেবার পাঁয়তারা করেছে বা করছে সেসব বিদেশী বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করলেই শুধু চলবে না, পাশাপাশি দেশীয় সক্ষমতা বৃদ্ধিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা বৃদ্ধি, দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা, অভ্যন্তরীণভাবে পুঁজি সংগ্রহ, উৎপাদনশীল উদ্যোক্তা শ্রেণীর বিকাশ ঘটানো ইত্যাদি শর্তগুলো পুরানো হিসাবের মধ্যে নিতে হবে। এইসব শর্ত পূরণ হলে তখনই বাংলাদেশের পক্ষে প্রকৃতি, পরিবেশের মধ্যে সমন্বয় সাধন করে সাধারণ মানুষের জন্য একটি টেকসই সমন্বিত জ্বালানী নীতি গ্রহণ-বাস্তবায়ন সম্ভব। বলাই বাহুল্য, বর্তমান একচেটিয়া পুঁজির আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাপক প্রতিষ্ঠানসমূহ বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এডিবি’র এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রের নীতি-কৌশল-প্রক্রিয়ার মধ্যে শৃঙ্খলিত থেকে সে কাজটি করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রথমে যে কাজটি করা দরকার সেটি হলো এ প্রক্রিয়ার মধ্য থেকে বেরিয়ে আসা। যেসকল দেশ বাহ্যিক নানা চাপ সত্ত্বেও নিজের দেশের জাতীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে পেরেছে সেসকল দেশে সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগ কোন ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। যেমন : কিউবা, ভেনেজুয়েলা, বলিভিয়া।
যেহেতু সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগ বাংলাদেশের জন্য কোন সুফল বয়ে আনেনি সেহেতু বহুজাতিক কোম্পানির স্বার্থ রক্ষাকারী আন্তর্জাতিক ঋণদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ‘উন্নয়ন’ কৌশলপত্র প্রত্যাখ্যান করে জনগণের সর্বোত্তম স্বার্থের বিষয়টি বিবেচনাধীন রেখে একটি সমন্বিত জ্বালানী নীতি প্রণয়ন করা একান্ত প্রয়োজন। যার মধ্যে নবায়নযোগ্য, অ-নবায়নযোগ্য প্রাকৃতিক খনিজ সম্পদের যাবতীয় বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে। পাশাপাশি জলবায়ুর নেতিবাচক পরিবর্তনরোধে আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে একটি ‘সমন্বিত উদ্যোগ’ গ্রহণ করা প্রয়োজন। এর জন্য যে নীতিগত অবস্থান অপরিহার্য তা নিচে উল্লেখ করা হলো-

১. জ্বালানি সম্পদ সাধারণ সম্পত্তি এবং এর উপর সামগ্রিক নিরাপত্তা নির্ভরশীল বলে এর উপর জনগণের শতকরা ১০০ ভাগ মালিকানা অর্থাৎ জনগণের সাধারণ সম্পদের উপর জনগণের কর্তৃত্ব নিশ্চিত করতে হবে।
২. যেহেতু এই সম্পদ সীমিত ও অনবায়নযোগ্য সেজন্য রফতানির ঘোর থেকে মুক্ত হয়ে বিদ্যুতসহ জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে দেশের অভ্যন্তরে এর সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। উৎপাদনশীল খাতগুলোর গতিশীলতা বৃদ্ধিতে এর ব্যবহার হবে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে। আইন করে রফতানি নিষিদ্ধ করতে হবে।
৩. বাংলাদেশে উর্বর জমি, স্বাদু পানি, ভূ-বৈচিত্র্য ও জীববৈচিত্র্য খনিজ সম্পদের মতোই মহামূল্যবান। সে কারণে পরিবেশ, জমি, কর্মসংস্থান, পানি, জীবন-জীবিকা রক্ষা করেই কয়লাসহ জ্বালানি সম্পদের উত্তোলনের পদ্ধতি নির্ধারণ করতে হবে। ঘন জনবসতি, জমির উচ্চ ব্যবহার মূল্য, ভূ-উপরিস্থ ও ভূ-গর্ভস্থ পানির বিন্যাস, বিদ্যমান জীবন-জীবিকা পরীক্ষা করে এ ব্যাপারে নিশ্চয়তা বিধান করা গেছে যে বাংলাদেশে উন্মুক্ত খনন পদ্ধতি ভয়ঙ্কর পরিণতি ডেকে আনবে। কারিগরি ও অর্থনৈতিক-সামাজিক-পরিবেশগত কোন বিবেচনাতেই তা গ্রহণযোগ্য নয়।
৪. জ্বালানি সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে হলে জাতীয় সক্ষমতা বাড়াতে হবে। এর জন্য দরকার বাপেঙ, পেট্রোবাংলা, জিওলজিক্যাল সার্ভে অব বাংলাদেশ, ব্যুরো অব মিনারেল ডেভেলপমেন্ট ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানগুলোকে পরিকল্পিতভাবে পঙ্গু করবার নীতি থেকে বের হয়ে আসা, বিপরীতে এগুলোকে শক্তিশালী করবার ব্যবস্থা গ্রহণ করা। একই সঙ্গে ‘কোল বাংলা’ ধরনের এমন একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে যেটি কয়লা সম্পদ অনুসন্ধান, উত্তোলন এবং তার কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করবে। কয়লা সম্পদ উন্নয়নে পরিবেশবান্ধব উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করবে।

তথ্যসূত্র

১. বিশ্বায়ন, ভাবনা-দুর্ভাবনা, সম্পাদনায় অমিয়কুমার বাগচী, ১ম এবং ২য় খণ্ড ন্যাশনাল বুক এজেন্সি প্রাঃ লিঃ, আগস্ট ২০০৫
২. পরিবেশ ও পুঁজিবাদ, হাসানুজ্জামান চৌধুরী, জাতীয় গ্রন্থ প্রকাশন, সেপ্টেম্বর ২০০৪
৩. জ্বালানী সমস্যা : বাংলাদেশ প্রেক্ষিত, গণপ্রকাশনী, ডিসেম্বর ২০০১
৪. মুক্তবাজার অর্থনীতি প্রসঙ্গে, গোলাম মহিউদ্দিন, এপ্রিল ২০০৬
৫. বিশ্বায়ন ও বাংলাদেশের অর্থনীতিতে দেশী-বিদেশী থাবা, গোলাম মহিউদ্দিন, সেপ্টেম্বর ২০০৩
৬. উন্নয়নের রাজনীতি, আনু মুহাম্মদ, সূচীপত্র, ফেব্রুয়ারি ২০০৬
৭. বিশ্ব পুঁজিবাদ এবং বাংলাদেশের অনুন্নয়ন, আনু মুহাম্মদ, সংহতি প্রকাশন, মার্চ ২০০৭
৮. পুঁজির আন্তর্জাতিকীকরণ এবং অনুন্নত বিশ্ব, আনু মুহাম্মদ, শ্রাবণ প্রকাশনী, ফেব্রুয়ারি ২০০৬
৯. ক্রান্তিকালের বিশ্ব অর্থনীতি ও উন্নয়ন সাম্রাজ্য, আনু মুহাম্মদ, সৃষ্টি প্রকাশন, ফেব্রুয়ারি ২০০১
১০. বাংলাদেশের অর্থনীতির গতিমুখ, আনু মুহাম্মদ, শ্রাবণ প্রকাশনী, ফেব্রুয়ারি ২০০৫
১১. বাংলাদেশ উন্নয়ন সমীক্ষা, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান, পঞ্চদশ এবং ষোড়শ খণ্ড
১২. বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা এবং বাংলাদেশ, কানকুন সম্মেলন-উত্তর মূল্যায়ন, সিপিডি, ২০০৫
১৩. বাংলাদেশ রূপকল্প, সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি), আগস্ট ২০০৭
১৪. বুলেটিন, জাতীয় সম্পদ, প্রথম বর্ষ: দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ সংখ্যা এবং দ্বিতীয় বর্ষ: প্রথম সংখ্যা
১৫. উবাবষড়ঢ়সবহঃ ড়ৎ উবংঃৎঁপঃরড়হ? ঊংংধুং ড়হ এষড়নধষ ঐবমবসড়হু ঈড়ৎঢ়ড়ৎধঃব এৎধননরহম ধহফ ইধহমষধফবংয, অহঁ গঁযধসসধফ, ঝযৎধনড়হ চৎড়শধংযধহর, ঙপঃড়নবৎ ২০০৭
১৬. ঈযরঃঃধমড়হম ঐরষষ ঞৎধপঃং, ঝঃধঃব ড়ভ ঊহারৎড়হসবহঃ, ঊফরঃবফ নু ছঁধসৎঁষ
ওংষধস ঈযড়ফিযঁৎু, ঋড়ৎঁস ড়ভ ঊহারৎড়হসবহঃধষ ঔড়ঁৎহধষরংঃং ড়ভ ইধহমষধফবংয, ঝবঢ়ঃবসনবৎ ২০০১
১৭. যঃঃঢ়://ঢ়ৎড়ভরষব-নবহমধষ.পড়স/পঁৎৎবহঃধভভধরৎং/২০০৮/০৮/০৩/নধহমষধফবংয-ঃযব-ঁহঃধঢ়ঢ়বফ-বহবৎমু-সরহব/১২/২৩/২০০৮
১৮. যঃঃঢ়://িি.িবরধ.ফড়ব.মড়া/বসবঁ/পধনং/ইধহমষধফবংয/ঋঁষষ.যঃসষ
১৯. যঃঃঢ়://বহবৎমুনধহমষধ.পড়স/রহফবী.ঢ়যঢ়?সড়ফ=ধৎঃরপষব্‌পধঃ=ঈড়ধষঝবপঃড়ৎ ্‌ধৎঃরপষব=২২্‌ঢ়ধমবথড়ৎফব...১২/২২/২০০৮
২০. যঃঃঢ়://িি.িৎবংবধৎপযংবধ.পড়স/যঃসষ/ধৎঃরপষব.ঢ়যঢ়/ঢ়যঢ়/ধরফ/১৩২/পরফ/৪?চঐচঝঊঝঝওউ=৭৪সৎঃ৭৪ব৯ঢ়য়৩...১২/২২/২০০৮.
২১. িি.িনধহমষধফবংযহবংি.পড়স.নফ
২২. উবাবষড়ঢ়সবহঃ ধহফ ঈষরসধঃব ঈযধহমব রহ ইধহমষধফবংয:ঋড়পঁং ড়হ ঈড়ধংঃধষ ঋষড়ড়ফরহম ধহফ ঃযব ঝঁহফধৎনধহং, ঙৎমধহরংধঃরড়হ ভড়ৎ ঈপড়হড়সরপ ঈড়-ড়ঢ়বৎধঃরড়হ ধহফ উবাবষড়ঢ়সবহঃ জবঢ়ড়ৎঃ, ২০০৩
২৩. গরষষবহহরঁস উবাবষড়ঢ়সবহঃ এড়ধষং, ইধহমষধফবংয চৎড়মৎবংং জবঢ়ড়ৎঃ, ঋবনৎঁধৎু ২০০৫
২৪. ঊহবৎমু ধহফ ঝঁংঃধরহধনষব উবাবষড়ঢ়সবহঃ রহ ইধহমষধফবংয, ঐঊখওঙ জবঢ়ড়ৎঃ, ২০০২
২৫. জবহবধিনষব ঊহবৎমু চড়ষরপু ড়ভ ইধহমষধফবংয, উৎধভঃ চড়ষরপু, গরহরংঃৎু ড়ভ ঊহবৎমু ধহফ গরহবৎধষ জবংড়ঁৎপবং, এড়াবৎসবহঃ ড়ভ ঃযব চবড়ঢ়ষব্থং জবঢ়ঁনষরপ ড়ভ ইধহমষধফবংয, উযধশধ, ঙপঃড়নবৎ ২০০২.