সম্পাদকীয়

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরি

এমন কথা কেউ বলতে পারবেন না যে আমরা বাঙালীরা কথা বলতে ভালোবাসি না। আমাদের বাক্যপ্রবাহ সাধারণত অবারিত থাকে। বললে হয়তো ভুল হবে না যে দেশে নদীর স্রোত যত কমছে মানুষের বাক্যস্রোত তত বাড়ছে। এর বিশেষ প্রমাণ পাওয়া যাবে গণমাধ্যমে-সেটা ছাপাই হোক কিংবা হোক চাই ইলেকট্রনিক। একটা স্থূল হস্তক্ষেপ অবশ্য আছে, সেটা বিজ্ঞাপনের। তার বাইরে শুদ্ধ অশুদ্ধ ভদ্র অভদ্র সত্যমিথ্যা কথার চলাচল চলতেই থাকে।
কিছুদিন আগে আমরা সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ছিলাম। সেই সরকারের মন্ত্রী পর্যায়ের মহোদয়েরা এতসব মস্ত মস্ত প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যেগুলোর পরিণতির কথা ভাবলে এখন তাঁদের নিজেদের পক্ষেই হাস্যসম্বরণ কঠিন হবার কথা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অবশ্য ব্যাপার হাস্যপরিহাসে সীমাবদ্ধ নেই, কথাগুলো তাঁদের পিছু পিছু ঘুরছে, এমনকি তাড়া করবে বলেও ধারণা জন্মাচ্ছে। যেমন, তাঁরা বলেছিলেন দুর্নীতিকে নির্বংশ করে তবেই ছাড়বেন। এখন দেখা যাচ্ছে দুর্নীতি বরঞ্চ বৃদ্ধি পেয়েছে-কেবল যে পরিমাণে তা নয়, গুণগত ভাবেও। বলেছিলেন, নষ্ট রাজনীতির চরিত্রটাই আগাপাশতলা পাল্টে দেবেন। আমরা দেশবাসী এখন তাঁদের অবর্তমানে প্রতিনিয়ত টের পাচ্ছি যে রাজনীতি তো বদলায়ই নি, বরঞ্চ আরো বেশী সাবেকী রূপ ধারণ করেছে, এমনকি সংসদে কে কোথায় বসবেন তা নিয়েও ভয়াবহ কলহ দেখা দিয়েছে। বলা হয়েছিল দুই নেত্রীকে মাইনাস না-করে তাঁরা আর যা-ই করুন তাঁদের ওপর অর্পিত মহান দায়িত্ব পরিত্যাগ করবেন না। তাঁরা চলে গেছেন, কিন্তু এমন ব্যবস্থা করে রেখে গেছেন যে দুই দলের দুই নেত্রী আগের তুলনায় অধিক মাত্রায় একচ্ছত্র হয়ে পড়েছেন। অভিযোগ ছিল রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্র নেই, এখন যখন ‘গণতান্ত্রিক’ ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে তখন দলের বড় বড় নেতারা তো আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় অধিক মাত্রায় নিজনিজ নেত্রীর মুখাপেক্ষী হয়ে পড়েছেন।
তবে এখন কথাবার্তাগুলো যে বেশ বৈচিত্র্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে সেটা সত্য। বাক্‌স্বাধীনতা আবার ফেরৎ এসেছে। দেখতে পাচ্ছি যে গণতান্ত্রিক সরকারের মন্ত্রীরা একেকজন একেক ধরনের কথা বলছেন, আবার এক মন্ত্রীই ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন মত প্রকাশ করছেন। কোনো অসুবিধা নেই। তবে সরকারের বাইরের লোকেরাও যে নির্বাক হয়ে রয়েছেন তা নয়। তাঁরাও গণতান্ত্রিক বাক্‌স্বাধীনতার সুযোগ পর্যাপ্ত পরিমাণেই নিচ্ছেন।
এসব মন্দ নয়। তবে যেটা প্রয়োজনীয় তা হলো দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের কথা বলা দরকার বুঝেসুঝে এবং দায়িত্ব নিয়ে। কথা উঠেছে টিপাইমুখে ভারত যে বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সে-বিষয়ে। সরকার পক্ষের কেউ কেউ দিব্যি বলছেন এটা নিয়ে দেশে যা করা হচ্ছে তা নিছক রাজনৈতিক গলাবাজি। ব্যাপারটা যদি অতটাই হাল্কা হতো তাহলে আমাদের জন্য বলবার কিছু থাকতো না। কিন্তু তা তো নয়। হ্যাঁ, অতিশয়োক্তিতে আমাদের বিলক্ষণ অভ্যাস আছে, ছোট জিনিসকে বড় করে তুলতে আমরা কার্পণ্য করি না। কিন্তু এই বাঁধের ব্যাপারটা তো তুচ্ছ নয়। এর গুরুত্বের সত্যকে উপেক্ষা করবার উপায় কি? বাঁধতো সত্যি সত্যি বাংলাদেশের জন্য একটা জীবনমরণ সমস্যার আকার নেবে।
আবার অনেক উঁচু বিষয়কেও নীচু করে ফেলা হয়। যেমন ধরা যাক ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রের ব্যাপারটা। একটি অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার এক দায়িত্বপূর্ণ প্রকাশনায় দেখলাম বলা হয়েছে বায়াত্তরের সংবিধানে ওই দু’টি মূলনীতি জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল; প্রথমটি এসেছিল ভারতের চাপে, দ্বিতীয়টি সোভিয়েট ইউনিয়নের, যে জন্য মূলনীতি দু’টি কোনোটিই টেকে নি, দ্রুত বিদায় নিয়েছে। এরকমের কথা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরোধী যারা তারা অহরহ বলে থাকে, বলবেও; কিন্তু ওই প্রকাশনাটি কোনো মৌলবাদী প্রতিষ্ঠানের নয়।
ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রের প্রসঙ্গ যখন উঠলই তখন ছোট করে হলেও জোর দিয়েই বলতে হয় যে, এ দু’টি মূলনীতি কারো করুণা বা চাপ থেকে আসে নি, এসেছে মুক্তিযুদ্ধের একেবারে ভেতর থেকেই। ধর্মনিরপেক্ষতা না থাকলে মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তিটাই থাকে না, এবং সমাজতন্ত্রকে (যার অপর নাম প্রকৃত গণতন্ত্র) লক্ষ্য হিসাবে সামনে না রাখলে পরিণতি কী দাঁড়ায় সেটা তো গোটা পুঁজিবাদী বিশ্বের অভিজ্ঞতাই বিলক্ষণ বলে দিচ্ছে, এবং আমরাও একেবারে মর্মে মর্মেই টের পাচ্ছি। সংবিধানে তাদের পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবি করলে আর যাই হোক অপ্রয়োজনীয় কথা বলা হবে না।
আমরা একটি গণতান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেছি, এখনো দেখছি। সেই স্বপ্নকে বাস্তবিক করে তোলার জন্য কথা কিছু কিছু বলা হয়েছে; কিন্তু ছিল অধিকাংশই হাল্কা ও আন্তরিকতাহীন বক্তব্য। বাগবিস্তারের বিপরীতে আসল কাজ করা হয় নি। নানা ধরনের কথার ভেতর দিয়ে আসলে বিভ্রান্তিই শুধু বৃদ্ধি পেয়েছে, কাজের দায়িত্বটি হারিয়ে যেতে বসেছে। কথা চালাচালি চলুক, সেটা করবার লোকের অভাব হবে না, কিন্তু সমাজ ও রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপায়ণের দায়িত্বের কথা যেন কিছুতেই আমরা না ভুলি। আর যেন না ভুলি এই সত্য, যে কাজটা কথকতার দ্বারা সম্ভব হবে না, তার জন্য ধারাবাহিক ও সুসংহত আন্দোলনের প্রয়োজন হবে।